শিক্ষানীতিঃ উত্তর প্রজন্ম এবং জগৎচাহিদা প্রসঙ্গে
শিক্ষা সংস্কার নিয়ে হাজার কথারও বেশি কথা হয়ে গেছে। তারপরও শিক্ষা সংস্কার হয়নি। সেই গতানুগতিক পন্থায় তরলমতিদেরকে শিক্ষিত করার আপ্রাণ চেষ্টা করা হচ্ছে। শিক্ষা সমাপনান্তে মজা করে আবার বলাও হচ্ছে "শিক্ষিত হল না, অশিক্ষিতই থেকে গেল"! যেন দোষটা সেই সব তরলমতি কোমলমতি বালক-বালিকাদের। যারা শিক্ষা দেয়ার নামে, গতানুগতিক, সনাতন, অশিক্ষা এবং কুশিক্ষা দিচ্ছেন তাদের যেন কোন দোষই নেই। এরা যারা শিক্ষা দেয় তারা, নিজেদের দোষ ঢাকবার জন্য অমুক-তমুকের উদাহরণ দেয়। ভাবখানা এই এরা তো ঠিকই শিক্ষিত হয়েছে। তোমরা পারনি কেন? পারনি যে সে দোষটা তোমাদেরই। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ঐ দু'চারজন ছেলে-মেয়ে নিজেদের ঐকান্তিক চেষ্টায়ই শিক্ষিত হয়েছে। তাদেরকে শিক্ষিত করতে তাদের "পরিবার" বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে এবং এরা অতীব পরিশ্রমী এবং বিশেষ মেধার অধিকারী।
পৃথিবীর সব সমাজেই এরকম দু'চারজন ক্ষণজন্মা জন্মগ্রহণ করে এবং তারা বিশিষ্ট হয়। এদের উদাহরণ বাদ দিলে সাধারণভাবে দেখা যায় কেউই শিক্ষিত হয় না। এর প্রধান কারণ আমাদের দেশের পাঠক্রম। কোন বয়সে কাকে কি পড়াতে হবে তা সুনির্দিষ্ট নয়। প্রতিটা শিক্ষা মডেলে বিশেষ বিশেষ পাঠ্যক্রম আছে। যেমন-ফ্রি প্রাইমারীতে সরকার দায়সারা গোছের এক পাঠ্যক্রম চালিয়ে দিয়ে নাকে তেল দিয়ে ঘুমায়। আদৌ সেখানে ছেলে-মেয়েরা কিছু শেখে কিনা তা মনিটরিং-এর কোন ব্যবস্থাই নেই। প্রাচীন পদ্ধতির মনিটরিং যে আদৌ কোন মনিটরিং নয় সেটি তারাও বোঝে। কিন্তু নড়চড় করে না। ধনী লোকদের ছেলে-মেয়েরা ফ্রি পড়ে না। তারা টাকা দিয়ে পড়লেও তাদের ছেলে-মেয়েদের কি পড়ানো হচ্ছে সে বিষয়ে তাদের কোন ধারণাই নেই। সরকারও জানে না কোন কোন প্রাথমিক পর্যায়ের স্কুলগুলোতে কি পড়ানো হয়। যেটি পড়ানো হচ্ছে, সেটি তাদের পড়ানোর প্রয়োজন কি না? সবচেয়ে দুঃখজনক ঘটনা হচ্ছে মাদ্রাসাগুলোতে যা পড়ানো হয় তার সাথে জাতীয় শিক্ষানীতির কোন সম্পর্কই নেই। কে সেখানে পাঠ্যক্রম তৈরি করেছে, কেন করেছে, কারা পড়াবে, কারা পড়বে সে বিষয়ে সরকার কোন খবরদারি করার ইচ্ছাও প্রকাশ করে না-ভোটের রাজনীতির কারনে।
১৬ মে শিক্ষা মন্ত্রী ঘোষনা দিয়েছেন-"এক মাসের মধ্যেই জাতীয় শিক্ষানীতি ঘোষনা করা হবে"। আমি আগাম বলেদিতে পারি-সেই শিক্ষা নীতি কতটা অনৈতিক হবে। আমার মনে হয়, মূল সমস্যাটা শিক্ষা সংস্কারের মধ্যেই রয়ে গেছে। প্রাথমিক পর্যায়ে থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষা ব্যবস্থা একান্তই গতানুগতিক। যেমন ধরা যাক, ইতিহাস। ইতিহাসের পাঠ্যক্রম দেখলে মনে হবে হাজার বছর ধরে তারা একই জিনিস পড়াচ্ছে। যারা পড়ছে তারাও তাদের দশ বছর আগের পাস করাদের চেয়ে বেশি কিছুই জানে না।
সাহিত্যেও তাই, ভূগোলেও তাই। এমনকি বিজ্ঞানেও তাই। এরা পাঠ শেষে কে কোথায় কি করবে তা তারা নিজেরাও জানে না। কর্মজীবন পুরোপুরি ভাগ্যের উপরে থাকে। পদার্থ বিজ্ঞান পড়ে ব্যাংকে চাকরি করে, অর্থনীতিতে উচ্চতর ডিগ্রী নিয়ে উচ্চমান সহকারী হয় কিংবা ভূগোল পড়ে বায়িং হাউজে কাজ করে। সবচেয়ে দুঃখজনক ঘটনা হচ্ছে পড়ুয়াদের চাহিদার প্রতি অবজ্ঞা। যারা পড়ে তাদেরকে পড়ানোর জন্য যোগ্যব্যক্তিকে সরকার বা কম্যুনিটি সুনির্দিষ্ট করে না। যেমন সরকারী প্রাথমিক স্কুলে এসএসসি পাস করারা মাস্টার হয়। প্রায় ক্ষেত্রে দেখা যায় এরা শুদ্ধু উচ্চারণে নুণ্যতম ইংরেজি পড়তে/বলতে পারে না। পড়ানোর ক্ষমতা ও দক্ষতার বিষয়টি একেবারেই হিসেবে নেয়া হয় না। মনে করা হয় যে, বৃটিশ আমলে তো এরকম শিক্ষিতরাই প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াতো। এই যে সনাতনকে উদাহরণ হিসেবে নেয়া, এটিই হয়েছে আমাদের কাল। আমরা প্রাগ্রসর না হয়ে সনাতনী হই এবং একই সাথে প্রতিক্রিয়াশীল হই।
যারা শিক্ষা সংস্কারের সাথে সংশ্লিষ্ট তাদের প্রথমেই এ বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে হবে। কোন একটিকে উদাহরণ হিসেবে না নিয়ে দেশ ও জাতির প্রয়োজনে শিক্ষানীতি প্রণয়ন এবং অনুশীলনের ব্যবস্থা করতে হবে। জাতীয় শিক্ষা নীতি প্রণয়নের জন্য একটি স্থায়ী কমিটি গঠন করতে হবে। যারা প্রতিনিয়ত জাতির "মুহূর্তের চাহিদা" নিরসন করে পাঠ্যক্রমে পরিবর্তন সাধন করবে এবং মোট অনুশীলনে নিয়ে যাবে। আমরা জাতি হিসেবে আধুনিক বিশ্বের তুলনায় পশ্চাদপদ। এটি স্বীকার করে নিয়েই আমাদের শিক্ষা পাঠ্যক্রম তৈরি করতে হবে। আমরা আর্থিকভাবেও সমৃদ্ধশালী জাতি নই। পাঠ্যক্রম প্রস্তুতের ক্ষেত্রে এটাও খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
যদি প্রাথমিক পর্যায় থেকেই কাজের জন্য উপযুক্ত করে গড়ে তোলা যায় তবে জনশক্তি সম্পদ হয়। কিন্তু সাধারণ পাঠে তা হয় না। বৃটিশ আমলে উদ্দেশ্য ছিল কেরানী তৈরি করা। এখনও ঠিক তেমনিই কেরানীই তৈরি হচ্ছে। বিশিষ্ট কর্মী কিংবা সৃষ্টিশীল মানুষ তৈরি হচ্ছে না। কিন্তু আমাদের প্রয়োজন বিশাল এক কর্মীবাহিনী। যারা যে কোন প্রয়োজনে যে কোন স্থানে কাজ করার যোগ্যতা অর্জন করবে। কিন্তু জনসংখ্যার সাথে সঙ্গতি রেখে তেমন সংখ্যক কর্মীবাহিনী তৈরি করার কোন পরিকল্পনা কোনো সরকারেরই ছিলনা এবং এখনো নেই।
বিভিন্ন দেশের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জেনে তাদের চাহিদার প্রতি দৃষ্টি দিয়ে শ্রম ও মেধাশক্তি প্রস্তুত করা এখন জাতীয় দায়িত্বে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের শিক্ষানীতি যদি ভবিষ্যতের পৃথিবীর মানসলোকের মত করে নির্মাণ করা যায় তবে সত্যি সত্যি বাঙালী জাতি তথা বাংলাদেশীরা খুব তাড়াতাড়ি মর্যাদামন্ডিত জাতিতে পরিণত হতে পারবে। পার্শ্ববর্তীদেশ ভারত এ বিষয়ে অনেক অগ্রসর হয়েছে। তারা শুধুমাত্র তার নিজের দেশের প্রয়োজনে কারিকুলাম তৈরি করে না। অন্যান্য দেশের কারিকুলমকেও আত্মস্থ করেছে। আবিষ্কার এখন একমাত্র লক্ষ্য হতে পারে না। এ্যাসেম্বিলিংও এখন আবিষ্কারের প্রতিস্থাপন। জাপান, কোরিয়া যেমন এ্যাসেম্বিলিংকে মৌলিক হিসেবে নিয়ে সমৃদ্ধি অর্জন করেছে। হয়ত অনেকেই না বুঝে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করবে। মানুষ টেকনোলজি নির্ভর হলেও ঐ মডেলের টেক্সটবুক তারা সংগ্রহ করবেই। বাংলাদেশের মেধাশক্তি ঐ সেক্টরটাও কাজের করে নিতে পারে। আইটি সেক্টরের মত আরো বহু বিশেষ সেক্টর বাংলাদেশের কর্মী মানুষের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। কিন্তু সে জন্য ঐ চ্যালেঞ্জকে মোকাবিলার জন্য প্রয়োজন সংখ্যা ও শিক্ষায়তনের সামঞ্জস্য বিধান। উটকো-ছুটকো শিক্ষায়তনগুলো চিরতরে ধ্বংস করা এবং পরিকল্পিত সৃজনের জন্য শিক্ষায়তন তৈরি করা। ভবিষ্যতের দুনিয়া শক্তি নির্ভর হবে না। জ্ঞান ও প্রজ্ঞা নির্ভর হবে। তবে সেটি সনাতনী মডেলের নয়। অত্যাধুনিক মডেলের। সরকার শিক্ষাখাতে অর্থব্যয় করতে "কাগুজী" প্রস্তুতি নিয়েছে। শিক্ষানীতিকেও নিজস্ব ধ্যান-ধারনায় ঢেলে সাজানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু গবেষণার মাধ্যমে উত্তর প্রজন্ম ও জগৎ চাহিদার সমন্বয় করে করলে ভাল হবে নিশ্চয়ই।
পাল্টে গেছে পৃথিবী। আমাদেরকেও পাল্টাতে হবে। বেকার ও নির্ভরশীল হওয়ার সব পথ রুদ্ধ করে কর্মী ও সহযোগী সৃষ্টি করার মহাপরিকল্পনা নিয়ে শিক্ষা নীতি ও শিক্ষাখাতকে পুননির্মাণ করতে হবে। প্রয়োজন এখনই বিশেষ সেল গঠন করা। সেলের পরামর্শ মোতাবেক নিত্য এ্যাডাপটেশন করা। প্রতিটি পরিবর্তনের সাথে নিজেকে পরিবর্তন করা। এখন হয়ত এটি বিশ্বাসযোগ্য যে মার্সনারী বাহিনী হয়েও বাঙালিরা নির্ভরতা কমাতে পারে। কেবলমাত্র দেহশ্রমিক নয় বিশ্বব্যাপী মেধাশ্রমিকের চাহিদা পূরণ করে আমরা ভবিষ্যতকে আলিঙ্গন করতে পারি।
(আমার ছোট ছেলে যেস্কুলে পড়ে সেই স্কুল/কলেজের ছাত্র-অবিভাবকদের কাছে স্কুল কর্তিপক্ষ চিঠি দিয়ে "শিক্ষানীতি" নিয়ে নিজস্ব অভিমত প্রদানের জন্য চিঠি দিয়েছিল। আমি উপরোক্ত ভাবেই আমার লিখিত বক্তব্য দিয়েছি-যা ব্লগের পাঠকদের সাথে শেয়ার করলাম)
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে অক্টোবর, ২০২৪ সকাল ৮:৩৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


