প্রথম পর্বের লিঙ্কঃ Click This Link
রাজধানীতে ভিক্ষুক আছে ৫০ হাজার
নগরীর ২শতাধিক স্পটে ভিক্ষুকদের আনাগোনা সবচেয়ে বেশি। ঢাকার ৭৮ টি ট্রাফিক সিগনালের অর্ধেকেরও বেশি স্থানে ভিক্ষুকরা থেমে থাকা গাড়ির জানালার সামনে হাত বাড়িয়ে দেয়। ঢাকার যে সমস্ত স্থানে ভিক্ষুকদের ভিড় বেশি সেগুলো হচ্ছে, ফার্মগেট, হাইকোর্ট মাজার, পল্টন মোড়, শাহবাগ, বাংলামটর, গুলশান ১ ও ২ গোলচত্বর, বায়তুল মোকাররম মসজিদ গেট, কাকরাইল মসজিদ, মহাখালী, চক বাজার মসজিদ, আজিমপুরসহ প্রতিটি কবরস্থানের কাছে। গুলিস্থান গোলাপ শাহ ও মিরপুরের মাজার, ব্যস্ততম সড়ক মোহনা, বা সিগনাল পয়েন্ট যেমন শেরাটন, সোনারগাঁও হোটেল, শান্তিনগর মোড়, ফকিরেরপুল, মগবাজার, ইস্টার্ন প্লাজা, গাউছিয়া, নিউ মার্কেট, মৌচাক মার্কেট, এসব স্পট ছাড়াও রয়েছে কমলাপুর রেলওয়ে ষ্টেশন, সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল, গাবতলী সায়েদাবাদ মহাখালী বাস টার্মিনাল ইত্যাদি এসব স্থানে ভিক্ষুকরা গজল, হামদ নাদসহ বিভিন্ন গান গেয়ে বা ক্ষতস্থান দেখিয়ে ভিক্ষা করে।
রাজধানীর প্রায় প্রত্যেক এলাকায় ভিক্ষুকদের উপস্থিতি চোখে পড়ে। নারী, কিশোর, শিশু ও বৃদ্ধদের উপস্থিতি এই পেশায় দিন দিন বাড়ছে। অনেক মহিলার কোলে থাকে দুগ্ধপোষ্য শিশু। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এই শিশুদের বেশির ভাগই তারা আনে বিভিন্ন বস্তি এলাকা থেকে ভাড়া করে।এ ছাড়া একই পরিবারের সবাই মিলেও পাশাপাশি পয়েন্টে ভিক্ষা করে। অভিজাত এলাকার ঘর -দুয়ারে গিয়ে কলিংবেল বাজিয়ে বা দরজায় টোকা দিয়েও ভিক্ষা করে কেউ কেউ।
ভিক্ষুকদের নিরস্ত করতে কর্তৃপক্ষের কোন উদ্যোগ নেই। মাঝে মধ্যে ভিক্ষুক পুনর্বাসনের নামে ভিক্ষুক নির্মূল অভিযান চালায় পুলিশ। তাদের বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে ধরে ভবঘুরে কিংবা কিশোর সংশোধন কেন্দ্রে প্রেরণ করা হয়। কিন্তু জামিনে বের হয়ে এসে ফিরে যায় আবার সেই আগের পেশায়।
মুক্তিযোদ্ধা হুমায়ন কবীর। ভাগ্যচক্রে দুই পা হারিয়ে আজ ভিক্ষুক। এখনো শক্ত স্বামর্থ শরির। আমার অফিস থেকে একটু দুরেই হাইকোর্ট এলাকায় ভিক্ষুকদের নিয়ে যখন মিটিং করছিলেন-তখন আমি তার সাথে কথা বলার জন্য অপেক্ষা করি। মিটিং শেষে আমি তার সাথে দীর্ঘ সময় কথা বলে বিভিন্ন তথ্য জানতা সক্ষম হই। ১৯৭১ সনে দেশকে শত্রুমুক্ত করতে যে হাতে অস্ত্র ধরে ছিলেন, সেই হুমায়ন কবেরের হাতে আজ ভিক্ষার ঝুলি। ১৯৮৭ সালে এক সড়ক দুর্ঘটনায় দুই পা হারান হুমায়ন কবীর। এর আগে ছোটখাট ব্যবসা ছিল তার। গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শাহপুরের নবীনগরে । দুই পা হারিয়ে নিরুপায় এই মুক্তিযোদ্ধা পেটের তাগিদে গত ১৬টি বছর ধরে বয়ে বেড়াচ্ছেন অম্লান-অবহেলা, নিন্দা, তিরস্কার। আছে তিক্ত অভিজ্ঞতা, আছে মজার অনেক স্মৃতিও। বর্তমানে নিজে ভিক্ষা করেনা-তবে ভিক্ষুক সমিতির নেতৃত্ব দেন।
হুমায়ন কবীর বলেন, ভিক্ষুকদের মধ্যে সবাই প্রতারক নয়। বেশিরভাগ মানুষই পেটের দায়ে বাধ্য হয়ে এই পথে নামে। তবে এই পেশায়ও রয়েছে নানা ছল-চাতুরী, প্রতারণা। ভিক্ষাবৃত্তির একাধিক কলা-কৌশলে মধ্যে রয়েছে, দৈহিক পঙ্গুত্ব এবং বার্ধক্য দেখানো, অসুখের চিকিৎসা না করে অসুস্থ সাজা, দাড়ি, টুপি, দিয়ে ধর্মীয় লেবাস গ্রহণ ময়লা ও ছেঁড়া কাপড় পরিধান, পুষ্টিহীন ও রুগ্ন শিশুদের দেখানো, শরীরের দগদগে ঘা কিংবা ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন দেখানো, হাসপাতালে রোগী ভর্তি আছে কিংবা যাতায়াতের ভাড়া নেই, পকেট মারের অজুহাত, বোবা সেজে চেয়ারম্যানের সার্টিফিকেট দেখিয়ে ভিক্ষা, কন্যার বিয়ের নামে কিংবা মৃত পিতা মাতার সৎকারের নামে ভিক্ষা ইত্যাদি।
গুলিস্তান এলাকা, বঙ্গভবনের আশাপাশ, কোর্ট কাচারি , সদরঘাট ও নয়াবাজার এলাকায় এক শ্রেণীর মাদকসেবী ভিক্ষুক হাতে ব্লেড নিয়ে ভয় দেখিয়ে রিকশা কিংবা বেবি ট্যাক্সি যাত্রীদের কাছ থেকে টাকা আদায় করে। এ সময় এদের শরীরের বিভিন্নস্থানে দগদগে ঘা থেকে রক্ত ঝরতে দেখা যায়। এরা সময় সুযোগ বুঝে ছিনতাইও করে।
হুমায়ুন কবীর বলেন, আরেক শ্রেণীর ভিক্ষুক আছে যারা নেশা করে। তাদের আমরা বলি ‘খতরনাক ভিক্ষুক' ’। এরা মানুষের মল-মূত্র গায়ে মেখে ভিক্ষায় নামে। আবার কেউ ইট, কাঠি, বাঁশে মল মেখে পথচারী কিংবা রিকশা যাত্রীদের গতিরোধ করে দাঁড়িয়ে। গায়ে মল ছিটিয়ে দেয়ার ভয় দেখিয়ে ভিক্ষার নামে যাত্রীদের সর্বস্ব কেড়ে নেয়। পুলিশ এসব দেখেও না দেখার ভান করে। প্রশাসন এদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয় না। আরেক শ্রেণীর ভিক্ষুক মুসল্লীবেশে নামাজ পড়তে গিয়ে মসজিদ থেকে সুযোগ বুঝে জুতা চুরি করে। এসব চোরাই জুতা বিক্রি করে সদরঘাট ও গুলিস্থানের চোরাই মার্কেটে। স্থানীয় একাধিকচক্র টাকা দিয়ে চোর পোষে। ধরা পড়লে জামিনেরও ব্যবস্থা হয় চোর পোষা ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে।
চলবে...
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে অক্টোবর, ২০২৪ ভোর ৬:৫২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


