somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

যন্ত্র মানবঃ যান্ত্রিকতায় ভুলেছে স্বকীয়তা

০২ রা নভেম্বর, ২০১০ সকাল ১০:৫৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

যন্ত্র মানবঃ যান্ত্রিকতায় ভুলেছে স্বকীয়তা

সূর্য্যদয়ের আগেই ঘুম ভাঙে এই কর্মব্যস্ত শহরের, ঘুম ভাংগে মহানগর বাসীর। তারপর নিরন্তর ছুটে চলা। মহানগরের দেড় কোটি মানুষ যানজটের মাধ্যমে দিন শুরু করে সারাদিনের কর্মব্যস্ততার পর তীব্র যানজটের ধকল পেরিয়ে ঘরে ফির লোডশেডিংয়ের লোড নিয়ে ঘর্মাক্ত শরীরে বিছানায় নির্ঘুম গড়াগড়ি-তারপর আবার সকাল। গ্রামের কথা নাহয় নাই বলি-এই ঢাকা শহরেও যখন আমরা ছোট ছিলাম তখন দেখতাম পাড়ায় পাড়ায় আনন্দ আর উৎসবের সমারোহ।জনে জনে আত্মার মেলবন্ধন।সকলেই সকলের কুশলাদি বিনিময় করতেন নিয়মিত,আদান-প্রদান করতেন তাদের কুশলাদী। আর এখন পাশের প্রতিবেশী মারা গেলেও দেখার সময় নেই। “আহারে লোকটি ভাল ছিল”-সেই কথাও আমরা উচ্চারণ করতে ভুলে গেছি। আমরা কি তাহলে বাংগালীর সহমর্মিতা আর আতিথিয়েতার অতীত ঐতিহ্য ভুলে যেতে বসেছি? মানুষের ভালোবাসা এখন বন্দি হচ্ছে নাটক সিনেমা গল্প কবিতা আর ইন্টারনেট প্রেমে!

নগর জীবনের এই ক্রান্তিকাল থেকে কি আমরা ফিরে যেতে পারিনা-সেই হারানো গৌরবের দিনে? যেখানে থাকবে শুধু পারস্পারিক সহমর্মিতা, ভ্রাতৃত্ববোধ আর পারস্পরিক ভালোবাসার বন্ধন। একটি ঘটনার কথা বলি। কিছুদিন পুর্বে ধানমন্ডি ১০ নম্বর রোডের পানশী রেস্টুরেন্টের সামনে একটি জটলা।এগিয়ে যেতেই দেখি-এক তরুণকে ৩/৪ তরুন কিল-ঘুষি মেরে মাটিতে ফেলে লাথি মারছে! তরুণ নিজেকে রক্ষার ব্যর্থ চেষ্টা করছিল। জটলায় দাঁড়িয়ে অনেক মানুষ এবং তিনজন টহল পুলিশ সেই অমানবিক দৃশ্যটি উপভোগ করছিল। প্রথমে আমি দুই তরুনকে মারা বন্ধ করতে বলি। ছেলে দুটি আমার দিকে ঘাড় বাঁকিয়ে আড় চোখে দেখে-ভাবখানা “ব্যাটা তুই আবার কে”! দুই তরুন আবার চিতকার করে গালাগালি এবং লাথি কষে দিল ছেলেটির কোমড়ে। এবার আমিই ওদেরকে “কিঞ্চিত” শক্তি প্রয়োগে নিবৃত করতে বাধ্য হই।

আমরা এই প্রজন্মকে কি শিক্ষা দিচ্ছি! আমাদের প্রজন্ম কি শিখছে? বড়দের প্রতি সম্মান বোধ কি কমে গেছে। আমাদের শিক্ষার হারতো ঠিকই বাড়ছে কিন্তু আমরা কি এই শিক্ষা শুধু পুঁথিগত শিক্ষায় আবদ্ধ করে ফেলছিনা? তাহলে পথে অসহায় পথচারীর প্রতি কিম্বা মরে পড়ে থাকা লাশের প্রতি আমরা তাকাইনা কেন? আবার দিন দূপুরে হাজার লোকের সামনে,পুলিশের সামনে রাজনৈতিক সন্ত্রাসীরা একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিকেও পিটিয়ে-কুপিয়ে হত্যা করে-আমরা প্রতিবাদটুকুও করিনা।রাজপথে ছিনতাইকারী ছিনিয়ে নেয় সবকিছ-অথচ আমরা নির্বিকার! কোথায় গেল বাঙালির সেই দুঃসাহসীকতা?বাঙালিতো ভীতু নয়, হারবার নয়। আমরা কি যন্ত্র মানবে পরিণত হয়েছি? যান্ত্রিক জীবন কি আমাদের জীবনও যান্ত্রিকতায় রূপ দিচ্ছে?নাকি মানবিক মূল্যবোধ হারিয়ে আমরা সবাই ডিজিটাল হয়ে গিয়েছি? আমরা ভুলে যেতে বসেছি বাঙালি উদ্যোমী দুঃসাহসী বীর জাতি। নগর জীবনের এই যান্ত্রিকতায় আমরা কি হারাতে বসেছি আমাদের স্বকীয়তা? কর্মব্যস্ত এই পৃথিবীতে সবাইকে নিয়মানুবর্তীতার মধ্যেই চলতে হয়। তার মানে এই নয় যে, আমরা যান্ত্রিকতায় নিজেদেরকে হারিয়ে ফেলবো।

এখন আমাদের নাগরিক জীবন অনেকটাই যান্ত্রিক। যন্ত্রচালিত আমাদের প্রাত্যহিক জীবন। ঘুম থেকে উঠে, কর্ম ব্যস্ততায় শুরু থেকে, রাতে ঘুমোনোর সময় পর্যন্ত নানা যন্ত্রের সান্নিধ্যে কাটে আমাদের এক একটি দিন। বাতি, পাখা থেকে শুরু করে নানা যন্ত্র আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অঙ্গ। আর এসব যন্ত্রের আবিষ্কারও হয়েছে আমাদের প্রয়োজনীয়তার কথা ভেবেই, কিন্তু এসব যন্ত্রের চেয়েও যান্ত্রিক আমাদের মানব জীবন। যন্ত্রগুলো ব্যবহার করতে করতে আমরাই এক একটি মনুষ্য আকৃতির যন্ত্র হয়ে গেছি। আমাদের বিবেক-বুদ্ধি-বিচার সব যেনো কম্পিউটারের প্রোগ্রামের মত প্রোগ্রাম করা। স্বার্থ যেখানে সেখানেই আমাদের পথচলা, স্বার্থবিহীন কোন কাজে এমনকি আর্তের সেবায়ও কেউ আর এগিয়ে আসেনা। নিজেদের স্বার্থ-সিদ্ধি হাসিলই আমাদের একমাত্র পাথেয়। ছাত্রদের বন্ধুত্ব নামক পবিত্র সম্পর্কও আজ নোট আদান-প্রদান নির্ভর হয়ে গেছে। সেই পাঠশালার সময়কার অমর বন্ধুত্ব এখন আর চোখে পড়ে না, অথচ সে বন্ধুত্ব ছিলো আত্মার সাথে আত্মার প্রগাঢ় সম্পর্ক। এখন তো বন্ধুত্ব নামক সম্পর্কের আড়ালে, স্মার্টনেসের আড়ালে চলে অর্থ বিত্তের প্রতিযোগিতা। লাল-মুড়ি, চানাচুরের বদলে চলে ফাস্টফুড কালচার। দু’একটি যাও অনাবিল বন্ধুত্ব চোখে পড়ে তাও ঐসব অন্যরকম বন্ধুত্বের আড়ালে ঢাকা পড়ে যায়।‘পেন ফ্রেন্ড’তো এখন রূপকথার গল্প! আত্মীয়তার মঝেও আজকাল কৃত্রিমতা, নেই রক্তের সম্পর্ক রক্ষার তাগিদ, নেই কোন আত্মার টান। সব কিছু যেন ঢাকা পড়ে গেছে বিত্তের লালসায়। ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক আজকাল রূপ নিয়েছে ব্যবসায়িক স্বার্থে।অথচ কতো শ্রদ্ধা আর মমতা মিশানো ছিলো সে সম্পর্ক।

‘চিঠি দিও প্রতিদিন’-কেউ আর বলেনা আজ। বর্তমান ই-মেইল আর এসএমএস এর যুগে দ্রুত যোগাযোগ হয় কিন্তু সেই হাতে লিখা চিঠির ভালোবাসা স্পর্শ আবেগ অনুভূতি কি পাওয়া যায় ইলেকট্রনিক মাধ্যমে? হাজারো ঝামেলার মাঝে আপন বা প্রিয়জনের চিঠি পাওয়ার যে তীব্র আকাঙ্খা থাকতো, যে পুঞ্জিভূত অনুভূতি থাকতো সেই প্রত্যাশিত চিঠিতে তা আজ আর আমাদের জীবনে নেই। আমরা আজকাল ই-মেইল বা এসএমএস করে দায়সারা ভাবে উত্তর লিখেই দায়িত্ব শেষ করি।কিশোরী প্রেমিকা এখন আর লুকিয়ে সেলাই করেনা সাদা রুমালে রংগীন সূতোয়-“ভুলনা আমায়”, তুলে দেয়না প্রিয় বন্ধুকে।এখন বন্ধুত্ব হয়-তিনশ’ টাকা ফ্লেক্সি করার জন্য। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মাঝেও সেই আগের দিনের মত ভালোবাসা-শ্রদ্ধা বিশ্বাসের যায়গা স্থান করেনিয়েছে ‘নিয়ম রক্ষা’। গ্রামের বাড়ির নারীর টান এখন আর শহুরে যান্ত্রিক অ্যাপার্টমেন্ট আভিজাত্যের কাছে টিকে না, তেমনি টিকে না সন্তানদের কাছে থাকার বৃদ্ধ বাবা-মায়ের আকুতি। সন্তানদের সেই অ্যাপার্টমেন্ট নামক আভিজাত্যের কাছে ঠাই হয়না-বৃদ্ধ মা বাবাদের। তাদের ঠাঁই হয় আগারগাঁওয়ে যান্ত্রিক জীবনের সৃষ্টি ‘বৃদ্ধাশ্রম’ নামক নিস্প্রান ভবন। আমরা আমাদের সন্তানদের প্রকৃত ও নৈতিক শিক্ষা না দিয়ে পাশ্চাত্যের আভিজাত্য সম্পর্কে শিক্ষা দিতে আগ্রহী। নিজস্ব শিল্প সংস্কৃতি ভুলে আমরা পাশ্চাত্য আভিজাত্য, সংস্কৃতিকে আঁকড়ে ধরছি। এ সব কিছুর মূলেই যান্ত্রিকতা-কিন্তু যান্ত্রিকতা আমাদের জীবন নয়।জীবন হল আমাদের মনুষত্ব, বিবেক, নৈতিকতা।মানবিক মুল্যবোধের মানুষ আমরা নেই, হয়ে গেছি বিবেক বর্জিত, নৈতিকতাহীন, মনুষ্যত্বহীন মানুষ আকৃতির ‘যন্ত্র মানব’।
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৩ দুপুর ১:৫৭
২৮টি মন্তব্য ২৯টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বিলুপ্ত প্রানীকে আবার ফিরিয়ে আনা

লিখেছেন কলাবাগান১, ০৬ ই জুলাই, ২০১৫ সকাল ১০:৪৮

বিশ্ব জুড়ে সাইন্টিফিক ওয়ার্ল্ডে হই চই পড়ে গিয়েছে এই সপ্তাহে বিখ্যাত জার্নাল সাইন্সে প্রকাশিত একটা নিবন্ধের জন্য। যেখানে de extinction-... ...বাকিটুকু পড়ুন

আবদুল গাফফার চৌধুরীর মূর্খতার প্রমাণ কাবা ঘরে রক্ষিত দেব দেবির নামসহ ..

লিখেছেন সাখাওয়াত হোসেন বাবন, ০৬ ই জুলাই, ২০১৫ দুপুর ১২:৩৫

গাফফার চাচা অর্থাৎ আবদুল গাফফার চৌধুরীর লেখা পড়ি ক্লাস নাইন থেকে । তখন তিনি দৈনিক ইত্তেফাকে লিখতেন । নিউইয়র্ক বসে তিনি লিখতেন ইত্তেফাকে তা ছাপাত এবং আমি মূর্খ সেগুলো পড়তাম... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিকাশ এর অভিনব জালিয়াতি ! ! ! বাচতে হলে জানতে হবে।

লিখেছেন নুরুল পলাশ, ০৬ ই জুলাই, ২০১৫ দুপুর ১:২৭

কয়েকবছর আগে থেকে মোবাইলে এই ধরনের বিভিন্ন জালিয়াতি শুরু হয়েছে। মনে পড়ে মাত্র কয়েকবছর আগের কথা। একদিন গ্রামীনের একটি নাম্বার থেকে ফোন এলো। অত্যন্ত মার্জিত ও ভদ্র ভাষায় বললো --

"সুপ্রভাত... ...বাকিটুকু পড়ুন

আব্দুল গাফফার চৌধুরী সত্য বলেছেন।

লিখেছেন মেহেদী হাসান+, ০৬ ই জুলাই, ২০১৫ দুপুর ২:৪৪

আমার এক চাচার নাম আজিজ, দাদার নাম ময়েয, আরেক প্রতিবেশি চাচার নাম রহিম, গ্রাম সম্পর্কে দাদার নাম রহমান। প্রতিবেশি দাদার নাম সাত্তার, মামার নাম গাফফার।। এভাবে হাজারও নাম... ...বাকিটুকু পড়ুন

কিছু আশ্চর্য ঘটনা যা বিজ্ঞানিরা এখনো সমাধান করতে পারেননি (পর্ব-১)

লিখেছেন বশর সিদ্দিকী, ০৬ ই জুলাই, ২০১৫ বিকাল ৩:০৩

অনেকের কাছেই বিষয়টা বিশ্বাস করতে একটু কস্ট হলেও সত্যিটা হচ্ছে আমাদের এই অত্যাধুনিক সময়েও বিজ্ঞানিরা অনেক প্রাকৃতিক ঘটনারই বৈজ্ঞানিক কোন ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। এই প্রাকৃতিক ঘটনা গুলো বিজ্ঞানি এবং মানুষের... ...বাকিটুকু পড়ুন

হিন্দু ধর্মের গোপন তথ্য । হিন্দুগ্রন্থে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর পরিচয় ও হিন্দু সম্প্রদায়কে ইসলাম গ্রহনের নির্দেশ ।

লিখেছেন মোঃ মুন্না খান, ০৬ ই জুলাই, ২০১৫ বিকাল ৪:২৩

হিন্দু ধর্মের গোপন তথ্য । হিন্দুগ্রন্থে হযরত মুহাম্মদ
(সাঃ) এর পরিচয় ও হিন্দু
সম্প্রদায়কে ইসলাম গ্রহনের নির্দেশ ।
যে জন্য যুগে যুগে বহু সত্য সন্ধানী শিক্ষিত হিন্দু , ইসলাম
গ্রহন করেন ।
কল্কি অবতারের (শেষ... ...বাকিটুকু পড়ুন