২০১১ ইংরেজী বর্ষের বিদায় এবং ২০১২ ইংরেজী নতুন বছরের আগমন অনেক ঘটা করে আসে।ইংরেজী নব বর্ষের সূচনা রাত বারোটায় আর বাংলা নব বর্ষের সূচনা/উতসব শুরুহয় নতুন সূর্ষের প্রথম আলোতে। বাংলা নব বর্ষের উতসবেরমতই থার্টি ফার্স্ট জানুয়ারী উতসব এখন বাংলাদেশের শহুরে মানুষেরমধ্যে ছড়িয়ে পরেছে।তবে দুটো উতসবেরমধ্যে বিরাট একটা পার্থক রয়েছে। তাহলো-বাংলা নববর্ষের উতসব স্বার্বজনীন বাংগালীদের প্রানের উতসব আর ইংরেজী নতুন বর্ষের উতসব অনেকটাই তারুণ্য নির্ভর এবং নগর কেন্দ্রীক। বাংলা নববর্ষে আমরা শুনি বাংলাদেশের জনপ্রিয় বিভিন্ন গান। অন্যদিকে ইংরেজী নতুন বর্ষে শুনি বুক কাঁপানো ড্রামের শব্দের সাথে হাই ভল্যুউমের রক/ব্যান্ড সংগীত-যার অনেক লিরিকস আমি বুঝতে/ধরতে পারিনা।।
৩০ তারিখ থেকেই কিছুটা অসুস্থ্যবোধ করছিলাম-তাই ছোট ছেলে এবং আমাদের বিল্ডিং এর অন্যান্য তরুন তরুনীরা উচ্চ ভল্যিউমে গান বাজানো থেকে বিরত ছিল। বিল্ডিং এর পরিবেশ শান্ত থাকলেও আমার বাড়ির সামনেই লেকের এক পাড়ে "পানশী" রেস্টুরেন্ট এবং ওপাড়েই "ডিংগী" রেস্টুরেন্টে ছিল থার্টিফার্স্ট নাইট উদ্বযাপনের বিশাল আয়োজন। ধানমন্ডি আবাসিক এলাকায় স্ট্রম সুয়ারেজ লাইন স্থাপনের জন্য বেশীরভাগ রাস্তার বেহালদশা থাকলেও সব রাস্তা প্রাইভেট গাড়ির জ্যাম এবং সারারাত লোকে লোকারণ্য ছিল ধানমন্ডি লেক।আমাদের বাড়ির সামনেও বিশাল বিশাল গর্ত হাইজাম্প-লং জাম্প করে তরুন তরুনীরা পাড়হয়ে ভীর করেছিল পানশী রেস্ট্রুরেন্টে।
রাত ১২টার সময় শুরু হয় গগণবিদারিত পটকা ফোটানো,সাথে উচ্চ ভল্যিউমে ড্রাম বাদনের তালে তালে উল্লাশ! দড়জা জানালা বন্ধ করেও ড্রাম বাদনের শব্দের সাথে সাথে আমার বুকের কম্পন চলে ভোর পর্যন্ত।একসময় জানালা খুলে উপভোগ করাকেই শ্রেয় মনে করে শুনেছি ওদের মিউজিক। প্রকৃতপক্ষে আধুনিক/বর্তমান তরুনদের প্রিয় মিউজিক সম্পর্কে আমি তেমন কিছুই বুঝিনা(আমার অন্যতম প্রিয় ব্লগার কবির চৌধূরী ও আমার ছেলেদের কল্যাণে অনেকগুলো ব্যান্ড সংগীত সম্পর্কে কিছুটা ওয়াকিবহাল হয়েছি)।কিন্তু বুক ধরফর করে-সেটা হাড়েহাড়ে বুঝি!
গানের সাথে আমার একটা আত্মীক যোগ আছে।আমার মা গান পছন্দ করতেন। আব্বা মাকে একটা গ্রামোফোন কিনে দিয়ে ছিলেন।মায়ের মৃত্যুর পর গ্রামোফোনটা যৌথ পরিবারের যৌথ সম্পদ হয়ে যায়। আমরা সেই গানের যন্ত্রটাকে গ্রামোফোন বললেও আত্মীয় স্বজনেরা ওটাকে বলতেন "কলের গান"”। ঐ যন্ত্রটার কল্যাণেই পরিবারের অনেকেই মোটামুটি গানের ভক্ত বনে গিয়েছিলেন।অন্যদের সাথে ছোটবেলা থেকেই আমিও শুদ্ধ সংগীতের একজন শ্রোতা। গ্রামোফোনের রেকর্ড গান আমাদের শোনা ছিল নিয়মিত বিনোদণ। গ্রামোফোন ও রেডিও থেকেই আমি নামি-দামি অনেক শিল্পীর গান শুনে বড় হয়েছি।আমি যখন শিল্পী সাইগল,বেগম আখতার, শচীণদেব বর্মণ, ওস্তাদ বড়ে গুলাম আলী,ঋতু গুহ,তালাত মাহমুদ,কানন বালা, ইন্দু বালাদের গান, ওস্তাদ আলাউদ্দীন খাঁ, পন্ডিত রবি শংকরের শারদ,বিছমিল্লাহ খাঁর সাঁণাই শুনে অভ্যস্থ তখন আমার অনেক বন্ধুরাই সেইসব শিল্পীদের নাম শোনেনি।কারন, তখন মুসলমান পরিবারে গানের চর্চা খুবই সীমিত ছিল।কিন্তু হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সংগীত প্রীতি সব সময়ই ছিল-তাই হিন্দু বন্ধুদের অনেকেই সংগীতের সমঝদার ছিলেন।
আমার অনেক বন্ধুই হিন্দু ধর্মাবলম্বী হওয়ায় ওদের সাথে পুজোর সময় ঢাকেশ্বরী মন্দির, আমাদের পুরনো বাড়ি ওয়ারীসহ পুরনো ঢাকায় বিভিন্ন দুর্গাপূজা মণ্ডপে ঘুড়ে বেড়াতাম। তখন মাইকে বাজতো সন্ধ্যা মূখোপধ্যায়, মান্না দে, হেমন্ত মূখোপধ্যায় ও কিশোর কুমারের গান। আরো বাজতো আব্বাস উদ্দীন, আবদুল আলীম, নীনা হামিদ, ফেরদৌসী রহমানের গান। তখন 'আমি মেলা থেকে তাল পাতার এক বাঁশী কিনেছি'/'দাদা পায়ে পড়িরে মেলা থেকে বৌ কিনে দে...' কিম্বা 'লেলে বাবু ছয় আনা, নীলামবালা ছয় আনা' গানগুলো খুব শোনাযেতো উতসব সংগীত হিসেবে। পুঁজার আনন্দের স্মৃতিরমতই কানে ও মনে লেগে থাকতো ঐ গানগুলো।
তখন ধানমন্ডি, কলাবাগান এলাকায় কোনো পুঁজা মন্ডপ হতোনা। এখন বাড়ির সামনেই কলাবাগান মাঠে বিশাল জৌলুশপূর্ণ পুঁজা উদ্বযাপিত হয়। ঢাকা সিটিতে ঢাকেশ্বরী মন্দিরে পুঁজা হয় ট্রাডিশনাল পুঁজা। সেটাই আসল পূঁজা। এখন কলাবাগান ছাড়াও বনানীতে খুব জৌলুশময় পুজার আয়োজন করা হয়।এই দুই পুঁজায় কোটি কোটি টাকা ব্যয় করা হয়। ঐসব পূঁজায় ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে দেশের সকল বিখ্যাত সংগীত শিল্পীরা গান পরিবেশন করেন এবং অনেক সেলিব্রেটিরা উপস্থিত থাকেন দলমত নির্বিশেষে। তারপরেও মনে হয়-পুজোর আনন্দটা প্রাচুর্যে ঢেকে যাচ্ছে। এখন আর পুজোর প্যাণ্ডেলে সেই সব পুরনোদিনের শ্রুতিমধূর গান বাজানো হয় না। যা বাজানো হয় তাকে আর যাই বলা যাক উত্সবের গান বলা যায় না।
আগেই বলেছি-বাধ্য হয়ে জানালা খুলে থার্টি ফার্স্ট নাইট উতসবের গান শুনছিলাম। ইতোমধ্যে হৈ হৈ শব্দ! সিকিউরিটি গার্ড জানালো-কিছু তরুন তরুনী উতসবের আমেজ সামলাতে নাপেরে সদ্য রাস্তা কেটে স্ট্রম সূয়ারেজ লাইন বসানোর ১০/১২ ফুট গভীর বিশাল গর্তে পরেছে
ইদানীং কিছু শিল্পী শুধুমাত্র টাকার জন্য যেভাবে কুরুচিপূর্ণ কথায় আর চটুল সুরে গান গাইছেন তা যে আমাদের চারপাশটাকে কী অসহ্য করে তুলছে তা বোধহয় তাদের ধারণায় নেই। আগে কোনো বাচ্চাকে যদি বলা হতো,‘বাবু একটা গান শোনাও তো’। তখন সে যদি কোনো গান নাও জানতো তবে স্কুলে শেখানো "আমার সোনার বাংলা" কিম্বা "আমরা সবাই রাজা-আমাদের এই রাজার রাজত্বে"-গানের দুটো লাইন শুনিয়ে দিতো। কিন্তু এখন পাড়ার মোড়ের দোকান,পুজোর প্যাণ্ডেল,বিয়েবাড়ি, পহেলা বৈশাখ, ইংরেজী নব বর্ষ উতসবে যেধরনের গানশুনি তা প্রকৃতই কি কোনো সংগীত! এখন গান মানেই-সবার হাতে হাতে চায়নীজ সস্তা মোবাইল ফোনে ডাউনলোড করা গানের তোড়ে ওরা শিখছে অত্যন্ত কুরুচিপূর্ণ কথার গান! কী যে মন খারাপ হয়ে যায়!
থার্টি ফার্স্ট নাইটে কত রকমের গানই যে শুনতে বাধ্য হয়েছিলাম তার ইয়ত্তা নেই। সৌভাগ্য-আমি মাত্র ১/২ গানেরই দুএকটা লাইন বুঝতে পেরেছিলাম।বুঝতে পারা সেই বিখ্যাত গান হলো-......"উলা-লা উ-লা-লা..." এবং “রুপবানে নাচে কোমড় দোলাইয়া......”! সংগীতে এখন আর উত্সবের আনন্দ বাড়ে না,বেড়ে যায় শব্দ দূষণ।
শুধু উত্সবে বলি কেন আমাদের চারপাশে,আমাদের জীবনে সুমধুর বলে যেন আর কিছু থাকছে না,সব কেমন বদলে যাচ্ছে অদ্ভুতভাবে। বদলে যাক,তবে সেই বদলে যাওয়াটা শুভ হোক। মঙ্গলময় পরিবর্তনগুলোই আমাদের কাম্য।
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে অক্টোবর, ২০২৪ রাত ৯:২১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



