ঢাকার ঐতিহ্য ও ঢাকাইয়া খাবারের মেলা
ঢাকার ৪০০ বৎসরপূর্তি উদযাপনের বর্ষব্যাপী বিভিন্ন অনূষ্ঠান শুরু হয়েছিল ২০১০ সনের ২৩ ডিসেম্বর ঢাকাইয়া খাবারের বিশাল আয়োজনের মাধ্যমে।২০১১ সনে সমাপনী পর্যায়ের অনূষ্ঠান আবারো ঢাকাইয়া খাবারের মেলা বা উৎসবের আয়োজন করা হয় ২৩ ডিসেম্বর কলাবাগান মাঠে। এই মেলার ইংরেজি নাম ছিল 'টেস্ট অব ঢাকা'।এই অনূষ্ঠানে অনেক বিদেশী দূতাবাস কর্মকর্তা ও বিদেশী মিশনের বহু কর্মকর্তা, ঢাকায় বসবাসরত অনেক বিদেশীরা আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে অংশ নেন এবং ঢাকার ঐতিহ্যবাহী ও মুখরোচক খাবার খেয়ে প্রশংসায় পঞ্চমুখ হন। ঢাকা শহরের প্রায় ৫০টি বিখ্যাত খাবারের দোকান ও রেস্তোরাঁ মেলায় অংশগ্রহণ করে। তাদের পরিবেশিত খাবারের তালিকায় ছিল- শিরমাল, কাবাব, নানরুটি, তন্দুরি, পোলাও, কোরমা, কোফতা, বিভিন্ন পদের বিরিয়ানি, ভুনা খিচুড়ি, হাজির মাখন তেহারি, মুস্তাকিম চপ, বাকরখানি, বিউটি লাচ্চি, নানা রকম মিষ্টান্ন ও পিঠা-পায়েস ইত্যাদি। খাবারের পাশাপাশি মেলা প্রাঙ্গণে ছিল আলোকচিত্র প্রদর্শনী, কাওয়ালি, ছাদ পিটানো ও বাউল গানের আসর, চুটকি পরিবেশন প্রভৃতি।
রাজধানী হিসেবে ঢাকার অগ্রযাত্রা শুরু হইয়াছিল মোঘল আমলে ১৬০৮ বা ১৬১০ সালে। মোঘল বাদশাহ জাহাঙ্গীর তাঁর খেলার সাথী ও প্রখ্যাত সাধক সেলিম চিশতীর নাতি শেখ আলাউদ্দিনকে ইসলাম খাঁ উপাধি দিয়ে বাংলা/বাংগাল প্রদেশের স্থায়ী গভর্নর নিযুক্ত করেন। সেসময় বাংলার রাজধানী আকবর নগর বা রাজমহল হতে ঢাকায় স্থানান্তরিত হয়। এ দেশীয় স্বাধীনচেতা শাসক বারো ভুঁইয়াদের অন্যতম ঈসা খাঁ’র রাজধানী সোনারগাঁয়ের পতনের প্রেক্ষিতে ভূ-কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ ঢাকার ভাগ্য খুলে যায়। যদিও স্বাধীন-সার্বভৌম দেশের পূর্ণাঙ্গ রাজধানী হিসাবে ঢাকার গোড়াপত্তন হয়েছে মাত্র চার দশক আগে অর্থাৎ ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। একটি ভূ-অঞ্চল যখন দীর্ঘদিন ধরে রাজধানীর মর্যাদা পায়, তখন স্বাভাবিকভাবে তার নিজস্ব কৃষ্টি-কালচার বিকশিত হয়। আবার সময়ের বিবর্তনে অনেক কিছু হারিয়েও যায়।
রাজধানী ঢাকার ঐতিহ্য কেবল খাবার-দাবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সে সময়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, কাব্যকলা, নৃত্য-কলা ইত্যাদিও তার অন্তর্ভূক্ত। উল্যেখযোগ্য স্থাপনা ও অন্যান্য ঐতিহ্য স্মারকগুলি জনদাবির প্রেক্ষিতে অবশ্যই ধরে রাখতে হবে। কিন্তু নগরায়ণ, যুগের নূতন হাওয়া ও অন্যবিধ বাস্তবতার কারণে অনেক কিছু বদলে যাবে তাও সত্য। পুরাতন ঢাকার অনেক বনেদি পরিবার এখন বাস করেন গুলশান, বনানী, ধানমন্ডি ও উত্তরার মত অভিজাত এলাকায়। তাদের পুরাতন ঢাকার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য মাঝে-মধ্যে টানে বটে, কিন্তু ঐ পর্যন্তই। উনিশ শতক পর্যন্ত বহু বিদেশী ভাষার সংমিশ্রণে গড়ে ওঠা ঢাকাইয়া ভাষার একটা প্রবহমানতা ছিল। বর্তমানে তা গন্ডিবদ্ধ ও অগতিশীল। তার পরও আমরা মনে করি, পুরাতন ঢাকা-ই ঢাকাইয়া সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ধারক।
শত পরিবর্তনের মাঝেও এই সংস্কৃতির আবেদন আরও বহু যুগ পর্যন্ত থেকে যাবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে অক্টোবর, ২০২৪ রাত ৯:১৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



