(আমার লেখা সবচেয়ে বড় পোস্ট। সেইসাথে ছামোয়ারিনের সবচেয়ে বেশী ফটুক সমৃদ্ধ পোস্টও বটে!
অষ্ট্রেলিয়াতে এসে প্রথমেই যে জিনিসটি আমার সবচে বেশী ভাল লেগেছিলো, সেটা হলো এই মহাদেশটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য! যে কারো মাথা খারাপ করে দেবার মত! আমি শুধু অবাক হয়ে দুচোখ খরে দেখতাম। কি নেই এখানে? বিশাল বিশাল সী বিচ থেকে শুরু করে মরুভূমি পর্যন্ত আছে! তাই ভ্রমন পাগল আর সৌন্দর্য্য পূজারী এই আমার মাথায় সবকিছু ঘুরে দেখার একটা ভূত চেপে গেল। একবছরের মাথায় ব্লু মাউন্টেনস, গসফোর্ড রিজার্ভ, ওয়াটসনস বে, এনট্রান্স বে, অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল পার্ক, সিডনী এ্যাকুরিয়াম, মাউন্ট থমাহ বোটানিক গার্ডেন, ক্রনুলা বীচ, বন্দাই বীচ, ব্রাইটন লী স্যান্ডস, মেলবোর্নের বেশ কয়েকটা জাগা (ফকনোর, হান্টিংডেল সহ আরো অনেক জাগা, এখন নাম মনে আসছে না) ব্রিসবেনের বিশ্বখ্যাত গোল্ডকোস্ট সহ আরো অনেক টুরিস্ট স্পট আর ন্যাচারাল সাইট চষে ফেল্লাম। এসব জাগাতে ছবিও তুলেছি অসংখ্য! আমার পিসির ১ টিবি হার্ডডিস্কের মোট জাগার এক চতুর্থাংশ জুড়ে রয়েছে সেসব।
এখানকার অনেকের কাছেই স্নো মাউন্টেইনসের নাম শুনেছিলাম। বরফে তৈরী বিশাল বিশাল পর্বতে ঢাকা গোটা একটা রাজ্য। শুনে যাবার লোভ হয়েছিলো ভীষন কিন্তু কখনই সময়-সুযোগ হয়ে উঠেনি। হঠাৎ করে সেটা পেয়ে গেলাম। সাব্বির ভাই'র আম্মু সিডনীতে বেড়াতে আসলেন শীতের কয়েকটা দিন বড় ছেলের সাথে কাটাতে। সেই সুবাদেই মূলত যাওয়া আরকি। রুবেল ভাইয়ের নতুন কেনা লালরংয়ের বিশাল "কিয়া" মাইক্রোবাসটা নেয়া হলো। (সাথে রুবেল ভাইকেও!) আমরা সর্বমোট ছিলাম ৭ জন। আমি বসেছিলাম সবার পিছনের সীটে। তাই, গাড়িতে বসে ঘাড় ঘুরিয়েই দেখি গাড়ির পিছনের মালপত্র রাখার কেবিনেট ভর্তি খাবার-দাবার।
২৪ শে অগাস্ট, ২০০৭ উত্তেজনায় সারাদিনের গাধার খাটুনি ভুলে রাত একটা বাজে তল্পি তল্পা গুছাতে বসলাম। সেদিন ছিলো আবার আমার রান্না।
সবকাজ সেরে ঘুমাতে ঘুমাতে সাড়ে তিনটা বেজে গেল। এদিকে ভোর ৬ টায় রওনা দেবার কথা।
দোস্ত রোমিওকে ফোন করে বল্লাম সাড়ে ৫ টায় আমাকে যেন একটা কল করে। নাহলে ঘুম থেকে উঠতে পারব না। কিন্তু, সাড়ে ৫টায় আমার ঘুম অটোমেটিকলি ভেংগে গেল। রোমিও কল না দেয়াতে টেনশনে পড়ে গেলাম। নিজেই একটা দিলাম। দেখি, গাধাটা নিজেই আমাকে ঘুম জড়ানো গলায় বলছে, "সাড়ে ৫ টা বেজে গেছে?"
যাত্রা হলো শুরুঃ
ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে ফযরের নামায পড়ে সবাই যার যার ব্যাগ এন্ড ব্যাগেজ নিয়ে বাইরে রাস্তার উপর দাঁড়ালাম।
আমার ব্যাগ দেখে সবাই আতকেঁ উঠল। রবেল ভাই তো বলেই বসলেন- "তুমি কি বিশ্বভ্রমনে যাচ্ছ নাকি প্রলয়?"
আমি দাতঁ কেলিয়ে হেসে বল্লাম- কি যে বলেন রুবেল ভাই!
সবাই আমার দিকে হা করে তাকিয়ে থাকলো।
রওনা দিলাম
সিডনী সিবিডি থেকে প্রায় ৭০০ কিমি দূরে তুষার পর্বত। বাইরে মিষ্টি রোদ উঠেছে।
আটটার ভেতরেই আবাসিক এলাকা ছাড়িয়ে এম ফাইফ ধরে আমরা ছুটতে শুরু করলাম। দুপাশে মারাত্নক সুন্দর প্রকৃতি। আমি বরাবরই অস্ট্রেলিয়ান কান্ট্রিসাইডের অন্ধভক্ত! উইকএন্ডগুলোতে যখনই লং ড্রাইফে যাই, হা করে দুপাশ দেখি। তেমনি দেখছিলাম তখনও। ফাকেঁ ফাকেঁ ছবিও তুলছিলাম বেশ।
গাড়িতে চড়েই সবাই বিভিন্নপ্রকার ফলমূল, ভেজিটেবল স্যান্ডউইজ, সসেজ - মেয়নেজ আর অরেন্জজুস দিয়ে ব্রেকফাস্ট সেরে নিলাম।
গাড়ির ভেতর আন্টি আংগুর খাচ্ছেন, রুবেল ভাইও হাত বাড়িয়েছেন!
NSW (New South Wales) পার হয়ে ACT (Australian Capital Tarritory) তে এসে পড়লাম সকাল ১১টায়। রাজধানী ক্যানবেরাতে আধঘন্টা যাত্রা বিরতি হলো পার্লামেন্ট ভবন দেখার জন্য। এর মাঝে অবশ্য টুরিস্ট ইনফরমেশনে একবার থামতে হয়েছিলো। সাথে সবাই মিলে একযোগে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিয়ে নিলাম। এত সুন্দর প্রকৃতি, ডাকলে সাড়া না দিয়ে উপায় আছে?
পুরোটা দেখার জন আধঘন্টা কিছুই না। রাজকীয় প্রাসাদ। তিনস্তরের কঠিন নিরাপত্তা বুহ্য ভেদ করে আমাদের ঢুকতে দেয়া হলো।
অস্ট্রেলিয়ার সরকারী প্রতীক এবং সংসদ ভবনের মূল ফটক।
বা থেকেঃ রুবেল ভাই, আন্টি, রোমিও।
ভেতরে ঢুকলেই এই দৃশ্য চোখে পড়বে।
এটা লাউন্জ কাম গেস্ট রুম। পিছনদিকটা আরো বড়!
লাউন্জ রুমের দেয়ালে দারুন সব ওয়াল পেইন্টিংস!
২য় তালার বেলকনীতে একটা রেস্তরাও আছে। এটা সেখানে যাবার অতিমনোরম একটা প্যাসেজ। (বাংলাদেশের সংসদ ভবনের ভেতর কি রেস্তরার কথা চিন্তা করা যায়?
রাকিব ভাই একটা পেইন্টিংসের ফটো তুলছে। (আসলে কার ছবি তুলছে আল্লাহ মালুম!
সংসদ ভবন চত্বর
যা হোক, ধান ভানতে শীবের গীত অনেক গাইলাম। এবার ইউ টার্ন নেই।
দুপুর সাড়ে বারটায় এসে পৌছলামঁ 'ক্যানবেরা মসজিদে।'
মসজিদের মিনার
এখানে আমাদের দুপুরের খাবার এবং যোহরের নামায বিরতি দেয়া হলো।
মসজিদ প্রাংগনে লান্চ সারলাম। মেন্যু ছিলোঃ
ভুনা খিচুড়ি (সাথে গরুর গোশতের রেজালা), আলুভাজি, সালাদ, ভেড়ার মাংসের কিমা আর স্পাগেটি (প্রচুর সবজি দিয়ে রান্না করা একধরনের নুডুলস) দিয়ে জম্পেশ ভূরিভোজন সের নিলাম।
খাবার শেষে আবার ডেজার্ট হিসেবে ছিলো ফিরনি। আন্টির নিজের হাতে বানানো।
(রোজা থাইকা এই লাইন কয়টা লিখলাম! একটা মেন্টাল টর্চার!
মসজিদের আশ পাশে দেখলাম বিভিন্ন দেশের দূতাবাস। বাংলাদেশেরটাও দেখে যাবো ভাবতেই সাব্বির ভাই তাড়া লাগালেন। --- "কারো দেখি উঠার নাম নেই। আরো কিন্তু ৪ ঘন্টার ড্রাইভ। এখানেই তো সব সময় চলে যাচ্ছে!" আসলে হেভী খাবার পর সবাই ঝিমিয়ে পড়েছিলাম।
খাবারের একটু পরই সেখানকার মালশিয়ান ইমাম আজান দিলেন। পরিচয় পর্বের পর ইমাম সাহেব মসজিদের লাইব্রেরী থেকে আমাদের সবাইকে বিশাল সাইজের এনসাইক্লোপিডিয়া টাইপের একটা করে বই উপহার দিলেন। ফ্রি বিতরনের জন্য মিডেল ইস্ট থেকে এখানে প্রায়ই প্রচুর বই আসে এইরকম। আন্টি চলে গেলেন উপরের তলাতে। শুধুমাত্র মহিলার সেখানে নামায পড়তে পারেন। খাবার এবং নামাযের সময় স্থানীয় লোকজন তেমন একটা দেখলাম না। এলাকাট খুব আইসোলেটেড মনে হলো। আমরা সবাই মিলে নামাজ পড়ে তড়িঘড়ি আবার রওনা দিলাম। এর আগে রুবেল ভাই গম্ভীর গলায় বল্লেন- রাস্তায় আর কোন থামাথামি নাই। কারো যদি ছোট ঘরে যাবার প্রয়োজন হয়,, এখান থেকেই সেরে নিতে হবে।" এই কথা শুনার পর টয়লেটে যাওয়ার জন্য সবার মাঝে ছোটখাট একটা হুড়াহুড়ি পড়ে গেল! আর আমি আশে পাশের ছবি তুলতে লাগলাম।
যাত্রা হলো আবার শুরুঃ
গাড়ীতে উঠে সবাই যথারীতি নাক ডাকিয়ে দুপুরের ভাত ঘুম!
সাব্বির ভাই ড্রাইভ করছিলো। দেখি একটু পর পর বেচারা পিছনে ফিরে অসহায় দৃষ্টিতে আমাদের ঘুমানো দেখছে।
আমার ঘুম আসছিলো না। তাই দেখে আমাকে বল্ল- "প্রলয়, তুমি একটু ড্রাইভ করো, আমি খানিক্ষন ঘুমিয়ে নেই।" এই কথার সাথে সাথে আমিও সিটে গা এলিয়ে দিয়ে নাক ডেকে ঘুমাতে শুরু করলাম। একটু পর বাম চোখ ইকটু খুলে দেখি, সাব্বির ভাই রিয়ার ভিউ মিররে আমার দিকে অগ্নিদৃষ্টিতে তাকায় আছে!
জাগাটা পাহাড়ের অনেক উপরে। চারদিক খুবই নিরব-নির্জন। মসজিদের দিকে তাকিয়ে মনে হলো আমি বুঝি মোঘল আমলের কোন সম্রাটের খাস মহলে চলে এসেছি। একবিংশ শতাব্দীর চাক চিক্য যেন নিমিষেই ভুলে গেলাম। নিজেকে মনে হচ্ছিল প্রাচীন পৃথিবীর একাংশ!
পথিমধ্যে পাহাড়েরর চূড়ায়, প্রেটোল নেবার জন্য শুধু একবার থামা হয়েছিলো কয়েকমিনিটের জন্য। ছবিতে নীল শার্ট পরা রোমিওকে দেখা যাচ্ছে।
পটেটো চিপস চিবুতে চিবুতে বাইরের দৃশ্যে ছবি তুলতে লাগলাম। তুষার পর্বতে যাওয়ার আগেই কয়েকশ' ছবি তুলে ফেল্লাম!
তীরবেগে ছুটছে আমাদের গাড়ি। সূর্য ডোবার আগেই তুষার পর্বতে পৌছতেঁ হবে।
গাড়ির ভেতর আন্টির সম্নানার্থে চুপচাপ বসে ছিলাম সবাই। আন্টি সেটা বুঝতে পেরে নিজেই সবার সাথে গল্প-গুজব শুরু করে দিলেন। সেখানে রুবেল ভাই তার প্রথম চাকুরী জীবনের অনেক মজার মজার ঘটনা শুনালেন। তিনি ছিলেন বিশ্বখ্যাত মাল্টিন্যাশনাল একটা কোম্পানির চিটাগাং ডিভিশনের অপারেশনাল সুপারভাইজার। ফরেনার সাথে নিয়ে সুন্দর বন ঘুরে বেড়ানো, সন্ধ্যায় ক্যাম্প ফায়ার করা, সবাই মিলে চিৎকার করে ইম্পেল দেয়া, বংগপোসাগরে স্পিডবোট নিয়ে দাবড়িয়ে বেড়ানো, সেনা বাহিনীর সাথে ভ্রমন, কাপ্তাই বাধেঁর সুইসগেটের কন্ট্রোলরুমে যাওয়া (এইখানে প্রবেশ অত্যন্ত কড়াকড়ি। স্টাফ ছাড়া কাউকে ঢুকতে দেয়া হয় না), উপজাতিদের সাথে ঘনিষ্ঠ হওয়া, পাহাড়ে পাহাড়ে ক্যাম্পিং করা ইত্যাদি ছিলো উনার অফিসিয়াল ডিউটি। [এসব শুনতে শুনতে বিভোর হয়ে গিয়েছিলাম। আর মনে মনে উনার ভাগ্যকে প্রচন্ড ঈর্ষাও করছিলাম।/#( ]
একবার মারমা উপজাতিরা তাকে মুক্তিপনের জন্য কিডন্যাপ করে নিয়ে গিয়েছিলো দুর্গম পাহাড়ের গুহায়। পরে সেনাবাহিনীর সহায়তায় অনেক কষ্টে ছাড়া পান। কয়েকবার পালানোর চেষ্টা করেও পারেনি। সে এক ব্যাপক এ্যাডভেন্চারাস ঘটনা। জনকন্ঠের প্রথম পাতায় তার ছবিসহ এই খবর ছেপেছিলো তখন। মজার ব্যাপার হলো, অপহৃত থাকা অবস্থায় রুবেল ভাই এক মারমা তরুনীর প্রেমে পড়েছিলে। হা কপাল।
রুবেল ভাই'র প্রেম কাহানী শূনতে শূনতে কখন যে আমরা তুষার পর্বতের ১০০ কিমির ভেতরে চলে এসেছি টেরই পাইনি। দুপাশে দেখলাম মাইলের পর মাইল আংগুরের ক্ষেত। এসব দিয়ে মদ বানানো হয়। তারপর দেখলাম অস্ট্রেলিঢার বিশ্বখ্যাত গরুর খামার। একেকটা গরুর কি সাইজ! দেখলে পিলে চমকে যায়। মাঝে মাঝে কয়েকটা গ্রাম পড়লো। মেখানে কয়েকটা ছোট ছোট সেসনা উভচর বিমান ল্যান্ড করা দেখলাম কোন কোন বাড়ির আংগিনায়। মূলত এগুলো ক্ষেতে সার এবং কীটনাশক দেয়ার জন্য ব্যবহৃত হয়।
দূরে, দিগন্তের শেষে... মেঘ আর পাহাড় একসাথে মিশে গেছে।
পাহাড়ের ওপাশেই তুষার পর্বত। মেঘ আর রোদের লুকোচুরি খেলা পাহাড় আর তার নীচের সমতল ভূমিতে অদ্ভুত এক দ্যোতনা সৃষ্টি করছিলো। যেসব জাগাতে রোদ পড়েছে, সেব জাগার ঘাসগুলো চিক চিক করছে। আর যেখানে মেঘের ছায়া পড়েছে ঐ জাগাগুলোর ঘাস কুচকুচে কাল। যেদিকে চোখ যায় শুধু মাঠ, পাহাড় আর গাছপালা। এক গ্রামের পাশ দিয়ে যাবার সময় খুব সুন্দর একটি চার্চ দেখলাম। গাড়ি এত জোরে চলছিলো যে ছবি তোলার জন্য ক্যামেরা তাক করে সাটার টেপার আগেই ফুরৎ করে চলে গেল!
মাঝে মাঝে দুয়েকটা ক্যাংগারু মরে পরে আছে হাইওয়ের দুধারে। রবেল ভাই কারন দর্শালেন, হঠাৎ হঠাৎ এগুলো তীব্র গতিতে ছুটন্ত গাড়ির সামনে পড়ে যায়, চালক কিছূ বুঝে উঠার আগেই ছিটকে পড়ে যায় পথের পাশে। স্পট ডেড!
শুধু যে নিজে মরে তা নয়, ক্যাংগারুর সাথে সংঘর্ষে চালকও প্রায়ই নিয়ন্ত্রন হারিয়ে গাড়িসহ খাদে পড়ে যায়। এটা শুনার পর আন্টি সাব্বির ভাইকে ধমাক লাগালেন- "আস্তে চালা!"
মাঝে মাঝে কঠিন বাক নিতে হচ্ছে। পাহাড়ের অনেক উচুঁ হওয়াতে আমাদের দুকান বন্ধ হয়ে যাচ্ছিলো অত্যাধিক উচ্চতায় অবস্থানের দরুন।
ঘন্টাখানে পর আমরা ছোট্ট একটা শহরতলীতে এসে পৌছলামঁ। শহরের নাম "জিন্দাবাইন"। এইনামে ২০০৬ সালে একটা ফাটাফাটি মুভি বানানো হয়েছিলো। শূটিং হয়েছিলো এই শহরেই।
শহরের পাশ ঘেষেঁ অসম্ভব সুন্দর শান্ত-নীল রংয়ের একটা হ্রদ বয়ে চলেছে। নামঃ "লেক জিন্দাবাইন"।
সেই পানিতে ওযু করে জিন্দবাইন পার্কে সবাই মিলে আসরের নামায পড়ে নিলাম। পাশে দেখলাম একটা বিরাট দোকান। নামঃ জিন্দাবাইন ডিপার্টমেন্টাল স্টোর। (এখানকার সবকিছু নামের সাথেই মনেহয় শহরের নাম জুড়ে দেয়া।)
ওযু করে তীরের অসংখ্য পাথর ডিগিংয়ে বেস ক্যাম্পে ফিরছে রোমিও আর রাকিব ভাই।
লেকের পাড়ে একটি মনোরম মনুমেন্ট
লেকের পানির নীচ দিয়ে চলে গেছে শহরের সাবমেরিন ক্যাবল।
পাশেই পাথর দিয়ে গড়া ছোট্ট আরেকটি সৌধ।
আমরা ৭০/৮০ কিমির ভেতর চলে এলাম। রুবেল ভাই বল্লেন, "আমরা এখানে এসে মাগরিব পড়ব।" আমাদের মন খারাপ হয়ে গেল শূনে। মাত্র দেড় ঘন্টা!
পড়ন্ত বিকেলে আবার যাত্রা শুরু হলো। বাইরের বাতাস ঠান্ডা হতে শুরু করেছে। জানালায় হাত রেখে দেখলাম গাড়ির গ্লাস প্রচন্ড ঠান্ডা। সবাই বুঝলাম যে গন্তব্যের খুব কাছে এসে পড়েছি। পাহাড়েরর গা কেটে বানানো হাইওয়ে দিয়ে উপরে চড়তে শূরু করলাম আমরা। একসময় বাইরে তাকিয়ে দেখি অনেক নীচে জিন্দাবাইন হ্রদের লেজ বড় বড় পাথরের ফাকঁ দিয়ে একেঁ বেকেঁ বয়ে চলেছে।
এখান থেকে এই গাড়ি যদি কোনভাবে নীচে পড়ে, তাহলে আর দেখতে হবে না।
সবাই দোয়া দরুদ পড়তে লাগলাম। যদিও সাব্বির ভাই খুব সাবধানে আস্তে আস্তে চালাচ্ছিলেন। সেইসাথে তিনি একটু পর পর আমাদের দুপাশে পড়ে থাকা ক্যাংগারুর মৃতদেহ দেখাচ্ছে। আন্টি একসময় তাই ধমকে উঠলেন। -" হয়েছে, তোমার আর দেখাতে হবে না। আমাদের সবারই দুটো করে চোখ আছে। আমরা দেখে নিতে পারব। তুমি শুধূ সামনের দিকে চোখ কান খোলা রাখো।" আন্টির ধমকে কাজ হলো। সাব্বির ভাই চুপ করে গেলেন।
আমি আন্টিকে সায় জানিয়ে বল্লাম- "ঠিক বলেছেন আন্টি। নতুবা পরে দেখা যাবে মরা ক্যাংগারু দেখতে গিয়ে আমরাই মরে পড়ে আছি পথের একপাশে।
"যাহ, তোর শুধু অলুক্ষুনে কথা!"-- আন্টির মৃদু ধমক খেয়ে আমিও সাব্বির ভাই'র মত চুপসে গেলাম।
রুবেল ভাই আংগুল উচিয়ে দূরে তুষার পর্বতের বরফের মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকা দেখালেন। বাইরে কনকনে ঠান্ডা বাতাস বইছিলো। রাস্তার পাশে একটা সাইনবোর্ড দেখলাম।
SNOW MOUNTAINS - 10 KM
অবশেষে পৌছলাম আমাদের বহুল আরাধ্য তুষার পর্বতে! এইটা সেখানে তুলা প্রথম ছবি।
চারপাশে হাজার হাজার গাড়ি পার্ক করা।
মানুষ গিজ গিজ করছে। অসংখ্য পর্যটক। ভিনদেশীই বেশী। প্রায় প্রত্যেকের সাথেই আইস স্কি সেট। গাড়ির থার্মোমিটারে দেখলাম বাইরের তাপমাত্রা -৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
অন্যতম প্রবেশ পথ।
যতদূর চোখ যায়, শুধূ বরফ আর বরফ। চারদিক ধবধবে সাদা। দূরে পাহাড়ের চূড়া শেষ বিকেলের সোনালী রোদ পড়ে সোনার মত চিকটিক করছে বরফ কুচি।
অনেক কষ্টে পার্কিং খুজেঁ পেলাম। সবাই গরম কাপড় পড়ে গাড়ি থেকে নামলাম।
সবাই মিলে বরফে আচ্ছাদিত ছোট একটা পাহাড়ের উপর চড়লাম। এই পাহাড়ের মাটি কত নীচে কে জানে! বরফে আমাদের পা বারবার পিছলে যাচ্ছিল।
অথচ, পিচ্চি পিচ্চি ছানা পোনাদের দেখলাম বরফের উপর দিব্যি স্কেটিং করছে!:
আমি অবাক হয়ে চারপাশ দেখছি আর ছবি তুলছি।
আমাদের দলের ভেতর সবচে বেশী আনন্দ করছেন আন্টি।
উনি প্রচন্ড খুশী হয়েছেন। আমাকে বল্লেন-"বাবা, আমি পৃথিবীর অনেক দেশ ঘুরেছি। কিন্তু এত সুন্দর দেশ আর কোথাও দেখিনি।" আন্টির সাথে পুরোপুরি একমত হলাম।
আন্টির সাথে স্থানীয় দুই তরুনী।
রোলার কোস্টারে চড়ার খুব ইচ্ছা ছিলো। কিন্তু ইচ্ছাপূরন হয়নি!
কিন্তু দেখি ওটা ইতোমধ্যেই সন্ধ্যা হয়ে গেছে বলে বন্ধ হয়ে গেছে। সবাই বাড়ী ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছে। মন খারাপ হয়ে গেল।
আসলে আমরা খুব কম সময় নিয়ে এসেছি। সবাই ২/৩ দিন হাত নিয়ে আসে। ইচ্ছেমত ঘুরে।
শীতকালে এই লেকের পানি পুরোটা জমে যায় বরফে। আর গরমকালে বরফ জমে হ্রদ হয়!
আশে পাশে প্রচুর রেস্টুডেন্ট-হোটেল-মটেল-ব্যাকপেকার দেখলাম। রেস্টুরেন্টে খাবার কথা ছিলো! কিন্তু ঘেন্নায় খাওয়া হলো না। শূনেছি ওরা যে প্যানে শুকর রান্না করে, সেই একই প্যানে গোশত রান্না করে মুসলমানদের খেতে দেয়। ওয়াক থু!
যাহোক, মজা আমরা কিছু কম করলাম না। বরফের গোলা বানিয়ে এক অপরের গায়ে ছুড়েছি। শুধুমাত্র এই একটা ছবিতেই আমি আছি। ডানপাশে।
হাতের মুঠোতে একদলা বরফকুচি নিয়ে স্পর্শ করে দেখেছি। (কিন্তু হাতমোজা খুলিনি ঠান্ডার ভয়ে!
আমার পায়ের নীচে বরফের আস্তরন।
পরিস্কার একটা জাগা থেকে অনেক নীচে খুড়েঁ কিছু বরফ তুলে নিয়ে প্রাকৃতিক বরফের স্বাদ চেখেও দেখেছি!
বারবার বরফের উপর আমি ইচ্ছে করে আছাড় খেয়ে পড়ছিলাম।খুব মজা লাগছিলো। বরফের উপর হাটঁ কনুই গেড়ে বসেছি। জ্যাকেট-জিনস সব বরফে ভিজে চুপচুপে হয়ে গেছে। কিন্তু কারো সেদিকে কোন খেয়াল নেই। আশেপাশের লোকালরা আমাদের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলো। কারন ওরা এসেছে স্কেটিং করতে। আমাদের মত লাফালাফি করার জন্য নয়!
শুধূ স্কেটিং নয়, আমাদের পাশে একদংগল ছেলে-মেয়ে আইস হকিও খেলছিলো। দারুন মজার খেলা। টিভিতে দেখেছি অনেক। কিন্তু বাস্তবে দেখতে যে এত মজা সেটা জান্তাম না।
আমরা বড় বড় বরফের বল বানিয়ে খেলছিলাম। আমাদের সাথে কয়েকটা পিচ্চিও এসে জুটলো।
একসময় কিছু ছেলে মেয়ে আমাকে এসে ধরল ওদের স্লিপওভার খেলার (অনেক উচুঁ থেকে প্রচন্ড গতিতে বরফের উপর গড়িয়ে অথবা পিছলিয়ে নীচে নামার একটা খেলা।) রেফারি হবার জন্য। আমার তো খেয়ে দেয়ে কাজ নেই। যে প্রকৃতি দর্শন বাদ দিয়ে ওদের খেলার রেফারি হবো। তাই, ওদেরকে খেলা শূরু করিয়ে দিয়ে একফাকেঁ ভেগে চলে এলাম।
শুনেছিলাম, কুকুরে টানা স্লেজ গাড়ি নাকি এখানে ভাড়া পাওয়া যায়। কিন্তু কোথাও সেরকম কিছু দেখলাম না।
তবে তার বদলে দেখলাম মেশিন টানা স্লেজ!
একটু দূরে বুলডোজার দিয়ে বরফের আস্তরন সমান করা হচ্ছিল।
তুষারপাতের ছবিসহ বরফের রাজ্যের প্রচুর ছবি আর ভিড্রি নিয়ে সবাই ফিরতি পথ ধরলাম।
বাড়ি ফেরাঃ
তখন বাজে সন্ধ্যা ৬টা। দলের সবার পরে আমি এসে গাড়িতে চড়লাম। কারন, ছবি তুলতে তুলতে হাটঁছিলাম।
তুষার পর্বতে তুলা এটা আমার শেষ ছবি। গাড়িতে উঠার ঠিক আগের মূহুর্তে তোলা।
গাড়িতে বসে ল্যাপটপে আমার তোলা ছবিগুলা দেখতে লাগলাম। শেষের কয়েকটা ছবি ঘোলা এসেছে, লেন্সের উপর কুয়াশার পরত জমাতে। গাড়িতে বসে মুছতে গিয়ে আরো ল্যাপ্টে ফেল্লাম। এবার গাড়ি চালাচ্ছিল রুবেল ভাই। আসার সময় ফাকিঁ দিয়ে গাড়ির পেছনে বসেছিলাম যাতে ড্রাইভিংয়ের দায়িত্ব ঘাড়ে চেপে না বসে। এবার আর পারলাম না। আসলে যত দোষ আন্টির। আমি গাই গুই করাতে বল্লেন-"ঠিক আছে। প্রলয় না পারলে আমিই চালাব। নেভিগেটর তো আছেই। সেটা দেখে দেখেই সিডনী চলে যেতে পারব।" বলাবাহুল্য, আন্টি বাংলাদেশে বেশীর ভাগ সময় নিজের গাড়ি নেজেই চালান। কিন্তু আন্টির কথাটায় পৌরষত্বে খুব লাগল। এরপর আর গাড়ির পেছন সিটে ঘাপটি মেরে বসে থাকা যায় না।
বীরের বেশে (আসলে হওয়া উচিৎ কো পাইলটের বেশে) ড্রাইভিং সিটের পাশে গিয়ে বসলাম। তবে আমার কপাল ভাল ছিলো। ড্রাইভিং করতে হয়নি। রুবেল ভাই'র ভীষন স্টেমিনা। পুরোটা পথ সে একাই চালিয়েছে।
লং ড্রাইভিংয়ে আসলে আমার কিছু শারীরিক সমস্যা আছে। নাহলে অটো গিয়ারের গাড়ি। তার উপর গাড়িতে ক্রজ কন্ট্রোল ছিলো। তাই চালানো অনেক সোজা। কিন্তু, হাইওয়েতে বেশীক্ষন ড্রাইভ করলে আমার মাথা ব্যথা করে। বসে থাকতে থাকতে কোমড় ব্যথা হয়ে যায়। তাছাড়া একটুতেই ক্লান্তি শরীরে এসে ভর করে। এইসব ভয়েই রাজি হচ্ছিলাম না।
আবার জিন্দাবাইন পার্কে এসে মাগরিব পড়ে হালকা কিছু নাস্তা করে জোরে সোরে সবাই রওনা হলাম সিডনীভিমুখে। পেছনে পড়ে রইলো বরফের রাজ্যের শীতল সব স্মৃতি।
বাড়ী ফিরছি।
(অর্ধশতাধিক ছবি রেডি করেছিলাম দেয়ার জন্য কিন্তু পাঠকের সহ্যক্ষমতার দিকে চাহিয়া তার কিছু বাদ দিলাম সেইসাথে অনেক সংক্ষেপিত ও কাটছাটকৃত করিয়া পোস্টানো হইলো।)
জানি, কেউ-ই আমার পোস্টা খুটিয়েঁ খুঁটিয়ে পড়েনি। সবাই শুধু ছবিগুলোই দেখেছে। বড়জোড় ক্যাপশনগুলো। কিন্তু আর কেউ পড়ুক আর না পড়ুক, আমার স্বপ্ন এই পোস্টের প্রতিটি লাইন পড়েছে। স্বপ্ন, তোমার জন্যই এত সময় নিয়ে তিনদিন ধরে একটু একটু করে টাইপ করে পোস্টা লিখলাম। তানাহলে শুধু ছবি আর ক্যাপশনগুলো দিয়েই এটা পোস্টাতাম এই পোস্টার মত। Click This Link
কারন, তখন তুমি ছিলে না।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

