একটি বিষয় আমরা জানি, আমাদের দেহের লোহিত রক্ত কণিকাগুলো (এরা অক্সিজেন পরিবহন করে) চার মাসের মধ্যেই ভেঙ্গে যায় (এজন্য চারমাসে একবার রক্তদানে ক্ষতি নেই) আর তা শোধন প্রক্রিয়ার একপর্যায়ে বিলিরুবিন নামক রঞ্জক তৈরী হয়। লিভার(যকৃত) একে প্রসেস করে শরীর হতে বের করে দেয়। কিন্তু কোন কারনে লিভার যখন নিজেই আক্রান্ত বা অসুস্থ হয় (যেমন হেপাটাইটিস), তখন সে প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্থ হয় আর হলুদ রঞ্জক বিলিরুবিন প্রসেসিং বাধাগ্রস্থ হয়ে এক পর্যায়ে বেরিয়ে আসে বিভিন্ন পথে। এ অবস্থাকেই আমার বলি জন্ডিস। আসলে লিভার অসুস্থতার একটি প্রকাশক, কোন রোগ নয়।
হেপাটাইটিস: আমরা যাকে বলি জন্ডিস
হেপাটাইটিস শব্দটি এসেছে হেপাটিক(লিভার/যকৃত)+ আইটিস(প্রদাহ) থেকে। যার অর্থ যকৃতে প্রদাহ। এটি এ, বি,সি, ডি থেকে ই পর্যন্ত আছে।
এ, ডি এবং ই মূলত খাবার, লালা, পানির মাধ্যমে ছড়ায়। রাস্তা-ঘাটে, হোটেলে অনিরাপদ খাবার, পানি যারা খেয়ে অভ্যস্ত কিংবা বাড়ির কারও হলে, তার গ্লাস,প্লেট থেকে থেকে হতে পারে। গরমের সময় পিপাসার কারনে যত্রতত্র পানিজাতীয় খাবার গ্রহণে এর প্রকোপ বেড়ে যায়। কিন্তু হেপাটাইটিস বি এবং সি পারএন্ট্রাল রুটে ছড়ায় অর্থাৎ কোন কিছু খাওয়ার মাধ্যমে ছড়ায় না বরং আক্রান্ত কিছু দিয়ে (যেমন:নাপিতের ক্ষুর) কেটে গেলে কিংবা আক্রান্ত ব্যক্তির রক্তের সংস্পর্শে, পেশাদার রক্তদাতার রক্ত ও দৈহিক সম্পর্কের মাধ্যমে ছড়ায়।
এ অথবা ই-কে মারাত্মক ধরা না হলেও বি বা সি ভাইরাসের পরিনতি চিকিৎসা না করালে বা ধরা না পড়লে মারাত্মক হতে পারে, কেননা এর মাধ্যমে লিভার সিরোসিস কিংবা লিভার ক্যান্সারের মতো অনিরাময়যোগ্য হতে পারে। যাদের বি ভাইরাস ধরা পড়ে ,তাদের চিকিৎসাও বাংলাদেশেই হচ্ছে। এজন্য লিভার বিশেষজ্ঞ বা হেপাটোলজিস্ট দেখাতে হবে।
ভ্যাক্সিন :
হেপাটাইটিস বি এর ভ্যাক্সিন পাওয়া গেলেও, এখনো হেপাটাইটিস সি এর ভ্যাক্সিন তৈরি হয়নি!! অল্প বয়সেই বা যত দ্রুত সম্ভব, টিকা নেয়া অত্যন্ত জরুরী।
কুসংস্কার:
আসলে এ রোগটি নিয়ে সমাজে যেসব কুসংস্কার প্রচলিত আছে, যেমন মালা পড়া, হাত ধোয়ানো, আটি বাঁধা সবগুলোই বৈজ্ঞানিকভাবে অকার্যকর। কিন্তু হেপাটাইটিস এ বা ই যেহেতু কমন ও দু-তিন সপ্তাহে সেরে যায়, তাই এ সত্যকে পুঁজি করে এসব জিনিস তৈরী করা হয়।
কি খাবেন, কি খাবেন না?
লিভার আমাদের খাদ্য প্রক্রিয়াজাত করনে সাহায্য করে। হেপাটাইটিস রোগীদের ক্ষেত্রে সাধারনত খাবারে কোন বাধা নেই তবে আমিষ বিশেষ করে রেড মিট, বড় মাছ প্রথম সপ্তাহে পুরোপুরি ও পরের সপ্তাহ থেকে পরিমানে কম খেতে বলা হয়। যদিও প্রমাণিত নয়, অতিরিক্ত গরম খাবার বা পানীয় এড়াতে পারলে ভালো। কারণটি সিম্পল। জ্বর হলে যেমন শরীরকে রেস্ট দেই, হাতে পায়ে ব্যথা হলে যেমন না নাড়িয়ে স্থির রাখি, তেমনি লিভারের ওপর চাপ কমানো আরকি।
আখের রস সরাসরি গ্লুকোজ সাপ্লাই করে, খেলে ক্ষতি নেই। তবে রাস্তার ধারে যেভাবে প্রসেস হয়, না খাওয়াই ভালো। গ্লুকোজ সাপ্লিমেন্ট (ডেক্সট্রোজ) উপকারী। কোষ্ঠকাঠিন্য এড়াতে সবজির পরিমাণ বাড়াতে পারেন, প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ল্যাকটুলোজ জাতীয় সিরাপ নেয়া যেতে পারে। তবে চিকিৎকের পরামর্শ ছাড়া ্ওষধ গ্রহণ বুদ্ধিমানের কম্ম নয়।
অনেক ডাক্তার মাসখানেক ভিটামিন বি-কমপ্লেক্স খেতে বলেন, এতে লিভারের কোষগুলো দ্রুত রিপেয়ার হয়। তবে মনে রাখবেন, বিশ্রামে থাকাটা সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমদিকে হেলা করলে আপনাকে মাসখানেক বাধ্যতামূলক বিশ্রামে থাকতে হতে পারে।
জন্মাবার কয়েকদিনের মধ্যে বাচ্চাদের জন্ডিস স্বাভাবিক ও সাধারনত এক সপ্তাহের মধ্যেই সেরে যায়। তবে মাত্রা খুব বেশি বা এক সপ্তাহের অধিক হলে অবশ্যই শিশু বিশেষজ্ঞ দেখাতে হবে।
একটি চমৎকার বিষয় মনে রাখতে পারেন, সাবান বা ডিটারজেন্ট এর সংস্পর্শে অধিকাংশ ভাইরাস দেহের আবরণ ধ্বংস হয়ে যায়, তাই সিম্পলি যে কোন জিনিস বা হাত ব্যবহারের পূর্বে সাবান দিয়ে ধুয়ে নিন।
একটি বিষয় আমি হয়তো ক্লিয়ার করতে পেরেছি যে জন্ডিস কোন রোগ নয় বরং লিভারের কোন রোগ হলে, জন্ডিস হচ্ছে তার প্রকাশক। লিভার মানবদেহের অবিচ্ছেদ্য ও সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। তাই জন্ডিস হলে সঠিক চিকিৎসা নিতে কালক্ষেপন, আপনার সুস্থ ও সুন্দর জীবনকে বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিতে পারে। তাই আপনি জানুন, আপনার প্রিয়জনকেও তথ্যগুলো জানিয়ে দিন।
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই জুন, ২০১০ রাত ১০:০৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



