আমাদের ফারু ভাই...
ছোটবেলা থেকেই একটু অন্য রকম। একটু বোকাসোকা। বয়সে তিনি আমার দুবছর বড়।
ফারুভাই কেন জানি পড়ালেখায় তেমন সুবিধায় ছিলেন না। পড়ালেখার ক্ষেত্রে তার ছিল রাজ্যের কুঁড়েমি।
একবার ফারুভাইর পরীক্ষা চলছে । আমরা গেলাম তার বাসায় । দেখলাম তাঁর অংক পরীক্ষা পরদিনই। কিন্তু তিনি মহা সমারোহে হিন্দি সিনেমা দেখছেন ।
সে সময় তাদের গ্রামে বিদ্যুত আসেনি। ১২ ভোল্টের ব্যটারী দিয়ে কাজ চালাতে হয়।
তো আমরা বন্ধূরা গিয়ে তাকে ধরলাম, "কি ভাই ! কাল আপনার অংক পরীক্ষা আর আপনি বসে বসে 'রাজা হিন্দুস্তানি' দেখছেন?"
ফারুভাই বললেন, " কেন কি হইছে?"
-"সেকি! ফেল করবেন তো!"
ফারুভাই ছবিটা পস দিয়ে ঘুরে তাকালেন
-" কেন ? ফেল করার কি আছে?"
আমরা তো তাজ্জব। যে ফারু ভাই অংক পরীক্ষার আগেরদিন পাঁচ অক্ত নামায মসজিদে গিয়ে পড়েন তার একি অবস্থা?
-"ফারু ভাই , আপনি এর মধ্যে পড়া শেষ করে ফেলছেন?"
-"বুদ্ধি থাকলে তোরাও পড়া শেষ করতে পারতি, আর আমার মত ছবি দেখতে পারতি।"
-"মানে!?!?"
-"মানে শহরে গিয়ে কাল অংকের পাতা গুলো ছোট করে ফটোকপি করে নিয়ে আসছিলাম। এখনতো আমার টেনশন নাই"
-"কিন্তু ????"
তারপর আমরা সবাই মিলে তাকে নকল করার কুফল আর তার পাপ ইত্যাদি নিয়ে বয়ান দিতে লাগলাম। ফারু ভাই বেশ কিছুক্ষণ আমাদের সহ্য করলেন । কিন্তু , কিছুক্ষণের মাঝেই তার ভাব অবনতি ঘটল। তার আবার একটা সমস্যা ছিল তিনি কাউকে বকতে পারতেন না। তাই আমাদের কে সুন্দর করে বাইরে এনে দরজা লাগিয়ে দিলেন এবং আবার সিনেমা দেখতে বসলেন।
ভাই রেগেছেন.. বুঝতে পেরে আমরাও উচ্চবাচ্য করলাম না।
পরদিন দুপুরে একাডেমীর দিঘিতে গোসল করতে যাচ্ছি বন্ধুরা মিলে। হঠাৎ চোখে পড়ল , ফারু ভাই তার বইপত্র মাথাতলে রেখে নারকেল গাছছায়ায় নিদ্রা দিচ্ছেন।
আমরা তো আঁতকে উঠলাম। পরীক্ষার সময় ভাই এখানে কেন? নকল নিয়ে ধরা টরা পড়লেন নাতো?
পড়িমড়ি করে তার কাছে ছুটে গিয়ে ডেকে তুললাম। ভাই আমাদের দেখে একমুখ মুচকি হাসলেন। তারপর জোরে হাই তুলে বললেন,
-"কি হইছে?"
- "ভাই কোন দুঃসংবাদ নাকি?"
-"কিসের দুঃসংবাদ?"
-"না মানে এই সময় আপনি এখানে?? আপনার তো পরীক্ষার হলে থাকার কথা"
আবার মুচকি হাসি।
-"যাই নাই।"
-"মানে?"
-"পরীক্ষা দিতেই যাই নাই।"
-"কেন? !!!! যান্নাই কেন?"
-"সিনেমা দেখতে দেখতে বেশ রাত হয়ে গেছিল ঘুমাইতে। সকালে উঠে তো চোখ মেলতে পারতেছি না । ফটেকপির যে ছোট ছোট লেখা ....পরীক্ষা দেব কি?
তাছাড়া তোরা রাতে এত করে বোঝালি । আর আমি তোদের অপমান করে বের করে দিলাম। তাই এমনিতেই খারাপ লাগছিল । তাই.... "
-"কিন্তু....."
- "কিন্তু কি? তোরা কি আমার উপর এখনো রাগ করে আছিস??"
-"না না ! ঠিক আছে!!!!" আমরা মজা করে ভাব নিলাম।
-"আচ্ছা ! চল তোদের আজকে জানে আলমের দোকানে খাওয়াবো"
আমরা তক্খুনি গোসল ভুলে তার সাথে রওনা দিলাম।
আর আমি ভাবছিলাম - 'এই সরল মানুষটার আর পড়ালেখা হলোনা'।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

