মিস বৈমানিক
সোহানার খুব শখ একদিন সে বৈমানিক হবে। পাখীর মত আকাশে উড়বে, গোটা বিশ্ব চষে বেড়াবে। অনিক অনেকবার এই কথাটা ওর মুখে শুনেছে। তাই একদিন বলা নেই কওয়া নেই হঠাৎ জেদ ধরলো সে ফ্লাইং ক্লাবে যাবে। সেখানে সদস্য হবে। অনিক কথা প্রসঙ্গে সোহানাকে বলেছিল তার এক আত্মীয় সিভিল এভিয়েশনে চাকরী করেন এবং তিনি নিজেই ফ্লাইং ক্লাবের সদস্য। কথাটা সোহানার ভালই মনে আছে। হঠাৎ সেদিন সোহানা অনিকের ক্যাম্প্সাসে এসে হাজির। বললো, “চলো ফ্লাইং ক্লাবে যাবো। সদস্য হবো”। সোহানার ভাব দেখে মনে হলো এক্ষুনি সে বিমানের ককপিটে চেপে বসবে। আর অনিককে পাশে বসিয়ে উড়াল দেবে দূর আকাশে। আর সেটা করতে হলে তাকে ফ্লাইং ক্লাবের একটা বিমান নিয়ে আকাশে উড়তে হবে। আর উড়তে হলে তাকে ফ্লাইং ক্লাবের সদস্য হতেই হবে। এমন অনেক ভাবনাই তার মাথায় এসে ভীড় জমায়। অনিকের খুব ভাল বন্ধু সোহানা। বন্ধুত্বের সূত্রপাতটা কলেজে পড়াকালীন সময়ে ডিবেট করতে এসে। দুজনেই ডিবেটিং ক্লাবের সক্রিয় সদস্য। এরপর নিজেদের মধ্যে বন্ধুত্ব। বন্ধু মহলের সবাই তারা খুব ভাল বন্ধু। সোহানার যত রকম আব্দার অনিককেই বলে। মাঝে মাঝে অনেক পাগলামি অনিককে সইতে হয়, এসব আব্দার অনিকের খারাপ লাগে না।
ভোর না হতেই মুঠোফোনের ভাইব্রেশন টের পেল অনিক। আয়েশী ঘুমটা হঠাৎ ভেঙ্গে গেল। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে ভোর তখন প্রায় ছ’টা সাতটা। মুঠোফোনের ডিসপ্লেতে ইতিমধ্যে সোহানার গোটা দশেক মিসকল উঠে আছে। অনিকের বুঝতে বাকি নেই নিশ্চয়ই সোহানার মাথায় নতুন কোন পাগলামি ঢুকেছে। নইলে এই সাতসকালে তাকে এভাবে কল করতোনা। ভাগ্যিস মুঠোফোনে শব্দরোধ করা ছিল, নইলে এই ব্যস্ত শহরের এমন কাকডাকা ভোরে অনিকের প্রিয় ঘুমের আরো বারোটা বাজতো। আগাম সতর্কতা একেই বলে। একটু বিরক্তি নিয়ে অনিক সোহানেকে একটা এসএমএস করে দিল, ঠিক দশটায় যেন সে কল করে। ঠিক দশটায় সোহানার কল এলো। সোহানা জানতো ন’টার আগে অনিক বিছানা ছেড়ে উঠবেনা। সোহানার অস্থিরতা মনে মনে সে আঁচ করতে পারছে। দ্রুত কথা শেষ করলো। মোটামোটি কী কথা হবে জানাই ছিল অনিকের। যেমন করেই হোক আজ বারোটার মধ্যে তাকে নিয়ে ফাইং ক্লাবে পৌঁছুতেই হবে।
অনিক সোহানার ছোটখাট আব্দারগুলো রাখতে চেষ্টা করে। জানে সে অসম্ভব জেদী প্রকৃতির মেয়ে। কোন একটা কাজে না বললে দু’তিন দিন হয়তো কথা বলাই বন্ধ করে দেবে। সোহানার দাবী পূরণ করাই নাকি তাদের বন্ধুত্বের পূর্বশর্ত। অনিক মনে মনে এই কথাটা ভেবে নিজের মনেই হেসে ওঠে। সোহানাকে সে পছন্দ করে। হয়তো ভালও বাসে। তাই ওর জেদগুলো দেখতে মজা লাগে। রেগে গেলে ফর্সা ওর মুখটা আরো লাল হয়ে ওঠে। অনিকের সেই মুখটা দেখতে আরো ভাল লাগে। কিন্তু সেটা দেখতে অনেক খেসারত দিতে হয়। তাই কারণে অকারণে ওর সাথে খুনসুঁটি করতে ভালই লাগে। সোহানাকে মেয়ে বন্ধু ভাবার চাইতে বন্ধু ভাবতেই অনিকের বেশী ভাল লাগে। সোহানার বাবা বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ। বাবা-মায়ের একমাত্র মেয়ে। কথাবার্তায় চৌকস, বুদ্ধিমতি, লেখাপড়ায়ও ভাল তার উপর দেখতে সুন্দরী। এক নজর দেখলেই ভাল ভাললাগার মতো। অনিক মা’ও সোহানাকে পছন্দ করে। সোহানাকে বন্ধু হিসেবে পেয়ে অনিক নিজেও খুশী।
ঠিক সাড়ে দশটায় অনিক নিজেই গাড়ী নিয়ে বের হলো। গাড়ী চালানো অবস্থায় সিভিল এভিয়েশনে কর্মরত তার এক আত্মীয় মি: আনোয়ারকে কল দিলো অনিক। তাঁর দেয়া তথ্যের উপর ভিত্তি করে ফ্লাইং ক্লাবের একজনের সাথে কথা বললো। ক্লাব কর্মকর্তা জানালেন আনোয়ার সাহেব তাঁকে জানিয়েছেন তাঁর আসার কথা। বারটার মধ্যেই তারা পৌঁছে যাবে সেটাও জানিয়ে দিল। সোহানাকে বারিধারা থেকে তুলতে হবে। তারপর সোজা তাকে নিয়ে নিকুঞ্জ সংলগ্ন ফাইং ক্লাবে যেতে হবে। অগত্যা অনিক গাড়ী নিয়ে ছুটলো বারিধারার উদ্দেশ্যে। সোহানার বৈমানিক হবার স্বপ্ন পূরণের প্রাথমিক কাজটুকু সম্পন্ন করা এখন শুধু সময়ের ব্যাপার। যথাসময়ে গাড়ী এসে থামলো নির্দ্দিষ্ট একটা বাড়ীর গেটে। সোহানা আগে থেকেই তৈরী ছিল। নীল ফুলতোলা সালোয়ার কামিজে সোহানেকে দারুন লাগছিল। সে সোজা এসে অনিকের পাশে বসলো। বসার ভাবখানা এমন যে সে বিমানের ককপিটে এসে বসলো আর তার পাশেই বসে আছে বিমানের কোন অভিজ্ঞ পাইলট আর নিজে সদ্য প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এক কো-পাইলট। ভাবতে ভালই লাগছে। এখন শুধু দুজনে ওড়ার পালা। সামনে খোলা আকাশ।
ছুটির দিন, রাস্তা কিছুটা ফাঁকা। সোহানাকে পাশে বসিয়ে গাড়ী চালাতে অনিকের ভালই লাগছে। গাড়ী ন্যাভাল হেড কোয়ার্টার ছাড়িয়ে সোজা এয়ারপোর্টের দিকে চলতে লাগলো। অল্প সময়ের মধ্যেই গাড়ী পৌঁছে গেল ফাইং ক্লাবের কাছাকাছি। আগে থেকে ফোনে কথা বলা ছিল তাই গেটের সিকিউরিটি গার্ড গাড়ীর নম্বর প্লেট দেখেই গেট খুলে দিল। গাড়ী সোজা গেট পেরিয়ে ফ্লাইংকাব চত্ত্বরে। রিসিপশনে আগে থেকেই এক ভদ্রলোক অপেক্ষা করছিলেন। তিনিই মি: আনোয়ারের বন্ধু। অনিক ও সোহানাকে বসতে বললেন এবং চা অফার করলেন। প্রাথমিক কিছু কথাবার্তা শেষ হবার পর সোহানার হাতে ফাইং ক্লাবের সদস্য হবার ফর্ম ও অন্যান্য কিছু কাগজপত্র দিলেন। তাতে সকল নিয়মাবলীসহ ঘন্টাপ্রতি উড্ডয়নের খরচের একটা হিসেব দেয়া আছে। সোহানার বৈমানিক হবার প্রাথমিক কাজ সম্পন্ন হলো।
মাস্টার্সের লেখাপড়া নিয়ে অনিক ভীষণ ব্যস্ত ছিল। সোহানাও তার সেমিস্টার ফাইনাল নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত। লেখাপড়ায় দুজনেই বেশ সিরিয়াস তাই কিছুদিন কোন কথাবার্তা নেই। পড়ায় যাতে বিঘ্ন না ঘটে তাই মুঠোফোনও প্রায়ই বন্ধ থাকে। অনিকের পরীক্ষা ভালভাবেই শেষ হলো। সোহানার পরীক্ষা কেমন হলো জানার জন্য একদিন অনিক সোহানাকে কল দিলো। একবার, দু’বার, তিনবার এভাবে অনেকবার কল করলো। কিন্তু অদিক থেকে নো-রেসপন্স। বার বার চেষ্টা করেও সোহানাকে পেলোনা। অনিক এবার ল্যান্ডফোনে চেষ্টা করলো। সোহানার আম্মা ফোন ধরলেন। অনিক সালাম জানিয়ে সোহানার কথা জিজ্ঞেস করলো। সোহানার আম্মা অবাক হয়ে অনিককে বললেন, “বাবা, সোহানা তোমাকে কী কিছু বলেনি? সোহানাতো লন্ডন চলে গেছে হায়্যার স্টাডি করতে। ওর বড় খালাই সব ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। রাত দু’টোয় বৃটিশ এয়ারওয়েজের ফ্লাইট ছিল, তাই হয়তো তোমাকে ডাকেনি। বললো তুমি নাকি পড়া নিয়ে খুব ব্যস্ত। আমিতো মনে করেছি তুমি সবই জানো”। অনিক আর কিছু না বলে সালাম জানিয়ে ফোনটা রেখে দিল।
অনিক পাইলট হয়ে কখনো আকাশে ওড়ার কথা ভাবেনি। অভ্যন্তরীণ রুটের বিমানে কয়েকবার ভ্রমণের তিক্ত অভিজ্ঞতা তার রয়েছে। তবে বৈমানিক হবার সুপ্ত বাসনা মনে কখনো জাগেনি। অনিককে নিয়ে যে সোহানার একদিন আকাশে ওড়ার স্বপ্ন ছিল সেই সোহানা অনিককে কিছু না জানিয়েই একদিন গভীর রাতে বৃটেনে পাড়ি জমায়। অনিক জানেনা সোহানা আজ পেশায় বৈমানিক কিনা! তবে অনিকের কাছে সে চিরকালই সে একজন “মিস বৈমানিক”।
(পুরোনো লেখা, সংশোধন করে গল্পের মতো করে লেখার চেষ্টা করলাম)
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই জানুয়ারি, ২০০৯ দুপুর ১২:৪৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



