প্রিন্ট মিডিয়ায় চটকদার বিজ্ঞাপন, বিল্ডিংয়ের ওপর বিশাল আকৃতির বিলবোর্ড, জনবহুল এলাকায় দেখা যাচ্ছে ব্যাঙের ছাতার মত গজিয়ে ওঠা কিউবির অস্থায়ী বিক্রয়কেন্দ্র। অফার আর ফ্রি গিফটের ঝুলি একজন ইন্টারনেট ব্যবহারকারীকে খুব সহজেই প্রলুব্ধ করছে কিউবির সংযোগ নেওয়ার জন্য।
ইন্টারনেটের ধীর গতি, নেটওয়ার্ক সমস্যা, অতিরিক্ত বিলের ঝামেলাসহ নানা কারণে কিউবির সংযোগ কেনার পর গ্রাহক পড়েন চরম বিড়ম্বনায়। কাস্টমার কেয়ার নম্বরে ফোন করে ঘণ্টার ঘণ্টা পর সমস্যা সমাধানের তাগাদা দেওয়ার পরও সমস্যা সমাধান না হওয়ার বিড়ম্বনা মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দেখা দেয়।
গ্রাহকদের অসহায়ত্ব
কিউবির প্রতারণা অনুসন্ধান করে দেখা গেছে, কিউবি মূলত তাদের ইন্টারনেট সার্ভিসের পরিবর্তে গ্রাহকদের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে ব্যবসা করছে। বাংলাদেশের ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা বিগত ৫ বছরে তিন গুণ বেড়েছে। কিন্তু সেবার মান বাড়েনি। লোকাল ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সার্ভিসের নিম্নমান ও সমস্যার কারণে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা কিউবির তারহীন সার্ভিসের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন। আর এই আকৃষ্টতাকে পুঁজি করে ব্যবসা করছে কিউবি।
মিডিয়ার নিষ্ক্রিয়তা
কিউবির অনেক গ্রাহক ইন্টারনেট সার্ভিসের নিম্নমান নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করলেও অধিকাংশ প্রিন্ট মিডিয়ায় খবরটি স্থান পায়নি। বিভিন্ন বাংলা ব্লগ এবং ফোরামে কিউবির নিম্নমানের সার্ভিস নিয়ে লেখা মুছে ফেলা হয়েছে। কিউবির ফেসবুক ফ্যান পেজে অসন্তুষ্ট গ্রাহকরা তাদের কথা পোস্ট করলে তাদের ব্লক করা হচ্ছে। কোন প্রিন্ট মিডিয়া কিউবির বিরুদ্ধে কোন রিপোর্ট প্রকাশ করলে কিউবির কোনও বিজ্ঞাপন সেই পত্রিকায় দেওয়া হবে না বলে মৌখিকভাবে সতর্ক করা হয়েছে। বিভিন্ন জনপ্রিয় বাংলা ব্লগের মালিকপক্ষ এবং মডারেটরদের মৌখিকভাবে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে যাতে কিউবি বিরুদ্ধ পোস্ট ব্লগে প্রকাশ হওয়া মাত্রই মুছে ফেলা হয়। নয়তো সে ওয়েবসাইটকে বাংলাদেশ থেকে ব্লক করে দেওয়া হবে।
নিম্নমানের মডেম
কিউবির ইন্টারনেট ব্যবহার করতে হলে গ্রাহকদের একটি মডেম কিনতে হয়। নিম্নমানের মডেমগুলো চীন থেকে আমদানিকৃত। সংযোগ কেনার সময় ৬ মাসের ওয়ারেন্টি দেওয়া হয় এবং এই ওয়ারন্টি হচ্ছে সার্ভিস ওয়ারেন্টি যা গ্রাহকদের সংযোগ কেনার সময় খুবই পরিকল্পিতভাবে এড়িয়ে যাওয়া হয়। এই ওয়ারেন্টির আওতায় কারো মডেম খারাপ হয়ে গেলে সেটি শুধু মেরামত করে দেওয়া হবে, যা প্রথম ছয় মাসের জন্য প্রযোজ্য। কিন্তু মডেমটি কেনার ছয় মাসের মধ্যে নষ্ট হয়ে গেলেও সেটি পরিবর্তন করা হয় না বরং নতুন করে মডেম কিনে কিউবির সংযোগ চালু করতে বলা হয়। গ্রাহকদের অভিযোগ, মডেম মেরামতের সময় তারা ইন্টারনেট ব্যবহার না করলেও বিলের ক্ষেত্রে সেটি বিবেচনা করা হয় না এবং মডেম মেরামতেও সময় ক্ষেপণ করা হয়।
অতি নিম্নমানের সার্ভিস, যন্ত্রনাদায়ক কাস্টমার কেয়ার লাইন এবং বিক্রয়োত্তর সেবা
চটকদার বিজ্ঞাপন আর ভুরি ভুরি অফারের ফাঁদে পা দিয়ে গ্রাহক যখন কিউবির ইন্টারনেট সেবা ব্যবহার করতে যান, তখন অধিকাংশ সময় তাদের স্লো স্পিডের বিড়ম্বনায় ভুগতে হয়। কিউবিতে কর্মরত এক প্রকৌশলী নাম না প্রকাশের শর্তে জানান, তাদের প্রযুক্তিগত অবকাঠামো কিউবির বর্তমান গ্রাহক সংখ্যার তুলনায় খুবই অপ্রতুল এবং এ জন্যই গ্রাহকেরা ইন্টারনেট ব্যবহারের সময় স্লো স্পিড এবং অন্যান্য সমস্যায় পড়েন। জানা গেছে, কিউবির কাস্টমার কেয়ার চুক্তিভিত্তিক একটি তৃতীয় কোম্পানি দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। চুক্তিভিত্তিক তৃতীয় কোম্পানিটির কর্মীদের নামমাত্র প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, যাদের কম্পিউটার এবং ইন্টারনেট সম্পর্কে জ্ঞান খুবই দুর্বল। কাস্টমার কেয়ার লাইনে সমস্যা সমাধানের নামে গ্রাহকদের অহেতুক প্রশ্ন করা হয়, যা গ্রাহকদের বিরক্ত করে তোলে। বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে কিউবির কাস্টমার কেয়ার থেকে গ্রাহকদের বাসায় কিংবা অফিসে ‘ইঞ্জিনিয়ার’ পাঠানো হয়। কিন্তু ‘ইঞ্জিনিয়ার’ কোন গ্রাহকের বাসায় পৌঁছতে ২-৩ সপ্তাহ লেগে যায়। এরকম বেশ কয়েকজন ইঞ্জিনিয়ারকে প্রশ্ন করে জানা যায়, তারা কিউবি নয়, তৃতীয় একটি কোম্পানির জন্য চাকরি করেন। এই তৃতীয় কোম্পানিটির ‘ইঞ্জিনিয়ার’দের শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং কম্পিউটার বিষয়ক কারিগরি দক্ষতা অত্যন্ত প্রশ্নবিদ্ধ। সমস্যা সমাধান না করতে পারলে কিউবির ‘ইঞ্জিনিয়ার’ গ্রাহকের কম্পিউটারের ওপর দোষ চাপিয়ে চলে যান।
এভাবে নিম্নমানের ইন্টারনেট সেবা নিয়েই বাংলাদেশের ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে। তারহীন ইন্টারনেট প্রযুক্তির নিয়ে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান সেবা প্রদান শুরু করলেও তাদের সন্তুষ্ট গ্রাহকদের চেয়ে প্রতারিত গ্রাহকদের সংখ্যা বেশি, কিউবি তাদের মধ্যে অন্যতম প্রতারণাকারী একটি প্রতিষ্ঠান।
সূত্র: বাংলানিউজ

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


