বে লা ল চৌ ধু রী
পিতৃপুরুষ
একটি কৃপাণ কিংবা একটি বুলেট
কখনো পারে না বিদীর্ণ করে দিতে
একজন মৃত্যুঞ্জয়ী মহাপ্রাণের বুকের পাঁজরা,
অগণিত মানুষের হৃদয়ে যার অধিষ্ঠান
কার সাধ্য সে ভিত টলায়,
এতই কি সহজ!
তবুও নশ্বর মানুষ আমরা
শোকানলে জ্বলে পুড়ে খাক হই
বুকের রক্তক্ষরণে কাতর হই
বিয়োগ ব্যথায় টনটন করে বুক
একদিন যাঁর বজ্রকণ্ঠ হাঁকে
ফুঁসে উঠেছিল সব ক'টি নদী,
একদিন যাঁর একটি মাত্র অঙ্গুলি হেলনে
গর্জে উঠেছিল আসমুদ্র হিমাচল,
যিনি বিজয়ের ডাক দিয়েছিলেন
সমুদ্রের সমস্ত ধ্বনিকে একত্র করে
আকাশ-পাতাল মেদিনী কাঁপিয়ে
পুঞ্জীভূত জয় বাংলা বলে...
গাঙ্গেয় বদ্বীপ এই ভূমিতে তাঁর মৃত্যু নেই
তিনি অবিনশ্বর, তিনি চিরঞ্জীবী,
তিনিই বাংলার আকাশ বাতাস
তিনিই বাঙালির শ্বাস-প্রশ্বাস
তিনিই আমাদের নিত্যবহমান রক্তধারা
তিনিই আমাদের পুণ্যশ্লোক পিতৃপুরুষ।
ম তি ন রা য় হা ন
ও জাদুকর বাঁশিওয়ালা
কী সুর ছড়ালে তুমি রমনার উদ্যানে, জনসমুদ্রে
লাখো জনতার পরানে লাগিল দোলা
ও জাদুকর বাঁশিওয়ালা, তোমার বাঁশির সুরে
দিগন্ত কাঁপে মৃত্যুর জয়গানে
হায় আগুন! পতঙ্গ যেন অগণন জনতার প্রাণ!
কী বাঁশি বাজালে তুমি মেঘে-বিদ্যুতে ছড়াল সারা গ্রামগঞ্জ
সুরের এমন মহিমা এর আগে কখনো কেউ দেখেনি
জেলে তার জাল ফেলে দিল ধরা তোমার ইন্দ্রজালে
মাঠের কৃষক প্রিয় কৃষাণীকে ভুলে লিখে নিল মৃত্যুনাম
লাঙলের ফলায়
কার কথা বলি আজ, কত কত তাজা প্রাণ
হায় বাঁশি! তোমার সুরের আগুনে পুড়ল সব দাউ দাউ!
ও জাদুকর বাঁশিওয়ালা, এত এত মৃত্যুর ঢেউ
ভাঙে তাঁর ঘরবাড়ি শস্যসম্ভবা দিগন্তবিস্তৃত মাঠ
কত আর বলি মৃত্যুঝরা জীবনের কথা
এসব দেখতে দেখতে ভয়াল মৃত্যুদূতও ভাবে;
'এমন মৃত্যু হলে মরতে পারি আমিও'
ও জাদুকর বাঁশিওয়ালা, বাজাও তোমার অবিনাশী মরণ-বাঁশি!
মা কি দ হা য় দা র
হৃদপুরে
আমার চাকরিটা ভীষণ রকমের খাপছাড়া
সকালে হয়তো পঞ্চগড়
বিকেলেই যেতে হবে
বুড়িমারী
তিনবিঘা।
মাঝে মাঝে এমনও হয়
রাতে হয়তো তেঁতুলিয়া-বাংলাবান্ধা
পরের দিনই যেতে হবে
গোপালগঞ্জ
টুঙ্গিপাড়া।
সেবার টেকেরহাটে গিয়ে তিনটি লোককে
আমার ইচ্ছার কথা বললাম
আমি গোপালগঞ্জে যাব
যাব
টুঙ্গিপাড়ায়।
একজন বললেন মুকসুদ পুর দিয়ে,
আর একজন বললেন, রাজৈর হয়ে, শুধু
শেষ জন বললেন
এই মধুমতী নদী সাঁতরেই
চলে যেতে পারেন
যেভাবে গিয়েছে
আমাদের খোকা।
ভাবলাম,
খোকা বোধহয় কোনো সন্তরণ শিক্ষকের নাম
তাই তাড়াতাড়ি বললাম
খোকা লোকটি কে,
তিনি করেনই
বা-কী?
শেষ জন বললেন,
লোকটি কিছুই করেন না তিনি শুধু
সাঁতারে বেড়ান
সোনার বাংলা
প্রিয় নদী। মধুমতী।
বাড়ি
গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায়।
হঠাৎ জানতে চাইলেম
'খোকা'
লোকটির বসবাস
এখন কোথায়!
প্রথম জন
দ্বিতীয় জন
শেষ জন
একবাক্যে উচ্চারণ করলেন,
লোকটির বসবাস
বাঙালির হৃদপুরে।
জাতির জনকের ডাকনাম 'খোকা'
মা ন সী কী র্ত নী য়া
আজও কাঁদে নদী
সংগ্রাম সংগ্রাম সংগ্রাম
জাতি দেশ একটি নাম
শেখ মুজিবুর রহমান
লড়াই লড়াইয়ে যিনি
স্বাধীনতার সুর তিনি
সুনীল আকাশ প্রাণের বৃক্ষ
আমাদের অন্তরে অন্তরীক্ষ
জল নদী হাওয়া
আর অনন্ত পাওয়া
বাসনা জাগানো সেই সে নাম
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান
বাংলাদেশ আর বাঙালির সত্তা
বাংলা জীবনে সুরভিত নিরাপত্তা
তার নামে দেশ, তার নামে গান
তার নামে জপি তারই জয় গান
তার নাম, তার নাম, তারই নাম
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান
হায়! সেই নামে আজও কাঁদে নদী...
মু জি ব মে হ দী
কোথাও বিকল্প নাই
পিতামহ মুগ্ধ ছিলেন সুখ্যাতি নিয়ে
নাতনামে ঘটেছিল মানস মুদ্রণ
সেই হেন মুগ্ধতার সয়¤প্রকাশ আজ
আমারি মাধ্যমে
তবু সইতে পারি না আমি 'মুজিব' নামের ভার
ঘাড়খানা এ কারণে খানিকটা কুঁজো, নতশির
পাহাড়ের দিকে হেলে পড়া বিনীত নবীন গাছ
আধেক করেছি ত্যাগ, তবু যদি লজ্জা কিছু কমে
আধেক স্মারক নিয়ে যতদূর যাই
প্রতিদ্বন্দ্বী রাশি রাশি
কোথাও বিকল্প দেখি না
মু হ ম্ম দ নূ রু ল হু দা
জাতিপিতা
বাঙালির উৎস-তীর্থ, দেশ-জাতি-সীমা
পতাকার হৃৎপিণ্ডে বৃত্ত অরুণিমা;
তোমাকে ব্রহ্মাস্ত্র করে সন্তানের বুক
ন্যায়যুদ্ধে চিরকাল বিজয়ী চাবুক;
আসুক সংকট যত, আসুক অশণি
সত্তÍানের হাতে হাতে তোমার তর্জনী
জন্ম নেয় প্রতিরোধে, অজেয় শপথে-
তোমার প্রমিত মুখ আঁকা সব পথে।
যে চেনে না জাতিপিতা, সে-জন কাঙালি-
পিতা তুমি, ত্রাতা তুমি, হে শ্রেষ্ঠ বাঙালি।
র বী ন্দ্র গো প
একটি সূর্যের গল্প
পৃতিবার ঝড়ের শেষে ভাঙনের পর একটি সূর্য ওঠে
রক্তের সাগর উথাল পাতাল, দাঁড়ায় একটি সূর্য
আঁধার আচ্ছন্ন কাল থেকে নিশিলাগা কাল থেকে
একটি সূর্য দাঁড়ায় এসে আমাদের শিয়রের পাশে
বত্রিশের সিঁড়িতে এক সাগর রক্তের মাঝে ফুটে ওঠে এক সূর্য
টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া, আলো দিয়ে যায় সে সূর্য।
প্রতিবার ঝড়ের তাণ্ডবে
তোমাকে স্মরণ করি
হে সূর্য
হে স্বাধীনতা
হে মুজিব
হে পিতা!
আমাদের রক্তের ঢেউয়ে ঢেউয়ে তোমারই দোলা লাগে প্রাণে প্রাণে
আকুল করা মাঝির প্রাণে বটের ছায়ায় রাখালের গানে
যতবার ভাবি আমি তোমাকে বিদ্রোহে বিপ্লবে
ততবার তুমি আমার প্রাণে দোলা দিয়ে যাও
হৃদয়ের আঁধার ঘরে তুমিই জ্বালিয়ে দাও দীপ্ত প্রদীপশিখা
আমাদের বিদ্রোহের প্রতীক তুমি, তুমিই আমাদের স্বাধীনতা
লু লু আ ব দু র র হ মা ন
জাগো, শুধু একবার জাগো
আর কতকাল ঘুমাবে
হে অগ্নি পুরুষ!
টুঙ্গিপাড়ার নিদ্রা মহলে
কখন হাসবে সোনালি সকাল?
অপেক্ষায় আছি- দেখো,
তোমার বাংলা ধর্ষিতা আজ
তোমার জায়নামাজেও ধর্ষকের হাত
ব্যবচ্ছেদ হচ্ছে সংবিধান
ধর্মনিরপেক্ষতা-
জাগো, শুধু একবার জাগো
তোমার বজ্র নিনাদে
থরথর করে কেঁপে উঠুক
বাংলার আকাশ
রেসকোর্স ময়দান
ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ার আসুক আহ্বান
কান পেতে আছি- আবার শুনতে চাই
মুক্তির গান।
শা মী ম রে জা
ভূর্জপাতায় লিখি নাম তার
এখানে শঙ্খ আপনা বাজত
মৃদঙ্গ আজ করে হায় হায়
ভূর্জপাতায় লিখি নাম তার
এ মাটি এখনো বেদনা কুড়ায়।
বিরহী জনপদ নেতাহীন কাঁদে
পতিহারা যেন কুলবধূ
দরজার পাশে সিংহ কণ্ঠে
কে যেন এখনো ডাকে
নীড় ছেড়ে পাখি চলে আসে
সুর তুইলা ডাকে আপনার মাকে।
দখিনা বাতাস পড়েছে ধূলায়
পড়েছে আপন পাঁকে।
ওরে অভাজন ওহে শূন্যমন
শকুনি সন্ধ্যায় শরবিদ্ধ ঘুঘু
পাশার ছকের নেশায়
কেবলি মূর্ছিত রাত পায়
আর পতিহীন মাটি পায়-বৈধব্য প্রণয়।
সন্ধ্যারতি বাজে দূর অজানায়
তারায় তারায়।
সৈ য় দ শা ম সু ল হ ক
পিতার উদ্দেশে
পিতা, তোমার কথা এখন কেউ এখানে আর বলে না;
এখনো তোমার প্রিয় পছন্দগুলোই রান্না হয়,
হাতের আঙুলগুলো আমাদের মাখামাখি হয়ে যায় হলুদে,
কিন্তু তোমার কথা কেউ বলে না।
তোমার হাতে লাগানো পেয়ারাগুলো এখনো
গোলাপি মাংসের মতো ফলে ওঠে আমাদের দরোজার বাইরে,
পাখি বসে, বালকেরা লোভী হয়ে ওঠে,
কিন্তু তোমার ছায়া এখানে আর পড়ে না,
তারা নিঃশঙ্ক পায়ে ঘোরাফেরা করে।
দূরে যাবার সাইকেল তোমার, পিতা,
অপেক্ষায় পড়ে আছে তোমারই পুত্রের কাছারি-ঘরের কোণে,
সময় ক্রমশ খুলে নিচ্ছে তার নাট বল্টু চেন,
ক্রমে বসে যাচ্ছে চাকা;
এখন তোমার মতো আর কেউ বেরিয়ে পড়বার জন্যে
হাত রাখে না এর হাতলে।
এ বাড়ির মানুষের কাছে
তোমার পালঙ্ক এখন কত বিশাল বলে মনে হয়;
সেখানে কেউ স্বপ্ন দেখবার জন্যে পূর্ণিমায় আর শুয়ে পড়ে না;
বসে যাচ্ছে মাটি,
সিংহের থাবার মতো পালঙ্কের পায়ের কাছে ইঁদুরের গর্ত এখন
এবং শয্যার 'পরে আমাদের বর্জিত সব বস্তুসমূহের স্তুূপ।
পিতা, তোমার চিঠিগুলোর অক্ষর এখন প্রায়-বিলীন,
তোমার হাতের লেখার ছাঁদটিও এখন পৃায় অচেনা,
তোমার উপদেগুলোও এখন যেন অন্য এক গ্রহ থেকে উচ্চারিত বটে।
তোমার মৃত্যুবার্ষিকীতে সমবেত হয় এখনো তোমার পুত্ররা,
তারা তাদের কথা বলে,
তারা তাদের পুত্রদের দিকে তাকিয়ে থেকে কথা বলে
এবং মাথার ঘ্রণ নেয়।
পিতা, তোমার পুত্ররা জানে না
তাদের পায়ের কাছে গর্ত করছে ইঁদুর
এবং নিঃশব্দে;
তারা জানে না তাদের হাতের লেখা এই লেখার কালেই
অচেনা ছাঁদের লেখা হয়ে যাচ্ছে
এবং তাদের চারদিকে অনবরত খসে পড়ছে নাট বল্টু চেন।
পিতা, একটি জীবনের শেষে বিদায় নিয়েছিলে তুমি;
আর তোমার পুত্ররা তো আজ বিদায় নিচ্ছে তাদের জীবদ্দশাতেই
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে জুলাই, ২০০৯ বিকাল ৫:১৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


