১. ফ্রয়েড যে ভ্রান্ত ছিলেন, তাতে সন্দেহ কি? আধুনিক কালের প্রায় কোন মনোবিজ্ঞানীই তার পদ্ধতি মেনে নেবেন না।
এবং আমি খবর নিয়ে দেখেছি, বেশিরভাগ বিষয়ে আমাদের বিদ্যৎসমাজের অর্ধশিক্ষিত অংশ, জ্ঞান-বিজ্ঞানের বেশিরভাগ শাখায় যারা কয়েক যুগ করে পিছিয়ে থাকেন (পুস্তকের ঘাটতির কারণে যতটা নয়, তার চেয়ে অনেক বেশি সুবিধাজনক ঠেকে বলে), তারাও দুজন লোকের ভ্রান্তি বিষয়ে এই অপেক্ষাকৃত নবীন সত্যটি জেনে বসে আছেন- একজন তো বললামই ফ্রয়েড, অন্যজন ডারউইন।
আর, কথাতো সত্যি-ই। ফ্রয়েড আর ডারউইন দুজনই ভুল ছিলেন।
২.
মনোবিকলন বিষয়ে আমার সামান্য এই আলোচনার আগ্রহ জাগে ব্লগে দ্বিতীয় একজনের পোষ্টে তৃতীয় আরেকজনের কমেন্ট পড়ে। সেখানে তিনি বলেন যে, ফ্রয়েড বিজ্ঞানী মহলে আজকাল অপাংক্তেয়। (ভয়ে নাম নিলাম না, মাত্র কিছুকাল আগে বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতি বিষয়ক একটি লেখার কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্যৎকূলের এক সদস্য ব্যক্তিগত আক্রমণের দায়ে ক্রুজ দেগেছেন আমার পোস্টে, সেই ক্ষত এখনও শুকোয়নি। যদিও নাম নিলেই ব্যক্তিগত আক্রমণ হয় কিনা, এবং মিথ্যা তথ্য ব্যবহার করে পৃথিবীর ইতিহাসে সততম একজন মানুষকে আক্রমণ করলে তাকে বিদ্রুপ করা কেন যাবে না, তার উত্তর শিক্ষক মহাশয় দেননি। এমনকি তথ্যের সত্যতা বিষয়ে ব্যক্তিগতভাবে আক্রান্ত বোধকারীও আর কোন তথ্য নাজেল করেননি।) কিন্তু এ সব ধান ভানতে শীবের গীতের কি প্রয়োজন, আমাদের আজকের বিষয় তো ফ্রয়েড আর তার ভুলগুলো বিষয়ে প্রচলিত ভ্রান্তি।
৩.
ফ্রয়েড নিয়ে মাস কয়েক আগে উইকিপিডিয়ায় একটা এন্ট্রি দেখেছিলাম। তাতে এক ইংলিশ সাহিত্য অধ্যাপকের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা ছিল যে কোকেনে তীব্র আসক্ত ফ্রয়েড ভিয়েনার নারীদের (বিশেষকরে অল্পবয়েসী মেয়েদের) ওপর তার পর্যবেক্ষণ মানব জাতির ওপর চাপিয়ে দিয়েছেন। কঠিন অভিযোগ; প্রথমতঃ কোকেইন সেবন, দ্বিতীয়তঃ একটিমাত্র নগরের বাসিন্দা নারী; তৃতীয়তঃ পর্যবেক্ষণ অল্প বয়েসী নারীদের ওপর ভিত্তি করে রচিত!
অভিযোগগুলো আপাতদৃশ্যে ভয়ানক শক্তিশালী হলেও বিষয়টি আবার মনোবিশ্লেষণ বলেই এগুলোই কিন্তু আবার তার শক্তির স্থান হতে পারে। ফ্রয়েড আবার পাল্টা যুক্তি দিতে পারেন: মনের জানালা খোলায় মাদকের ভূমিকা বিষয়ে, আর ভিয়েনা নগরের নারী এবং অল্পবয়েসী নারীরা আরও গূরুত্বপূর্ণ- কেননা মানসিকভাবে সবল একজন মানুষ তো তার দুর্বলতাও অচেতনভাবেই লুকায়। ফলে হতেই তো পারে যে, যারা তুলনামূলক ভঙ্গুর, তাদের মনের প্রতিরোধ ভেঙেই হয়তো অচেতনের রাজ্যে ঢোকা যেতে পারে। তারপরই তার সাধারণীকরণ করা যেতে পারে আর সব মানুষের ক্ষেত্রেও!
আমাদের গ্রামবাংলায় প্রায়ই যে নারীদের ভূতে ধরে, আর প্রায় নিরক্ষর সেই নারীরা আরবীতে কথা বলে, এমন ঘটনা সেই সময়ের ইউরোপেও দু’একটা ঘটত। ওরা অবশ্য একটাকে ততদিনে ভূতের আছরের বদলে হিস্টিরিয়া বলে চিনতে শিখে গেছে। যা হোক, ফ্রয়েড নিজেই বলেছেন এমন একটি বালিকার চিকিৎসা করতে গিয়েই তিনি অচেতনের প্রতিবন্ধকতা এড়াতে শিখলেন। সে কাজে তিনি প্রথমে সম্মোহনের মত আধিভৌতিক বিদ্যাকেও ব্যবহার করেন, পরে দেখলেন শক্তিশালী ব্যক্তিত্বকে আবার সম্মোহন দিয়ে কাবু করা যায় না, কাজেই সম্মোহনের রাস্তা তিনি পরিত্যাগ করলেন। এবার তিনি ধরলেন ¯^cœwe‡kY করে মনো-সমীক্ষণ!
উইকিপিডিয়ার এন্ট্রি পাল্টানোর নিয়ম-কায়দা আমার জানা নেই, বিষয়টা আরেকজনকে দেখাতে যেয়েই কয়েকদিন আগে আবার দেখলাম ঐ অভিযোগের অংশটুকু বাদ চলে গেছে! এটা কি অন্য কোন ফ্রয়েড ভক্তের কাজ, নাকি যুক্তির দুর্বলতা বুঝতে পেরে কর্তৃপক্ষ সরিয়েছেন, সে বিষয়ে আমি জানি না। কিন্তু এখনও ঐ এন্ট্রিতে যা আছে, তা খুব বিশ্লেষণাত্মক নয়, পক্ষে বিপক্ষে কোন দিক থেকেই। উইকিপিডিয়া তথ্যগত দিক দিয়ে ব্যবহার যোগ্য, কিন্তু এনসাইক্লোপিডিয়া হিসেবে বহুক্ষেত্রেই ব্যবহার অযোগ্য।
৩. ফ্রয়েড চিকিৎসক ছিলেন, কিন্তু তার সময়ে স্নায়ুসংগঠন বিদ্যার অগ্রগতি খুব একটা হয়নি। তার পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে ফ্রয়েড একবার মনের ইড, ইগো ও সুপার ইগো এইরকম একটি প্রায় টপোগ্রাফিক কাঠামো দাঁড় করান, আবার চেষ্টা করেন কনসাস ও আনকনসাস এই দুটি স্তর দিয়ে মনকে ব্যাখ্যা করতে। এই দুই কাঠামো কিন্তু সর্বদা পরস্পরের সাথে খাপ খায় না। আবার, এই বিষয়গুলো এত সরল অথচ গোলমেলে যে, প্রায়ই পরস্পরের সীমানা ডিঙায়, মনের সুস্থতার কোন মাত্রাও নেই বলে সচেতেন মনের ক্রিয়ায় ইডের উপস্থিতি কোন মাত্রায় আপনার কাছে গ্রহণযোগ্য হবে? আবার তিনি মানবজাতিকে দুর্বল, যারা অল্পতেই মনোবিকলনের শিকার হয় শৈশবের ফ্যান্টাসি আর বেড়ে ওঠার সময়কার অবদমনের চাপে; সক্ষম, যারা শৈশবের অবদমনেক অন্যভাবে রূপায়িত করে এবং শিল্পী, যারা তাদের শৈশবের সংকটগুলোকেই শৈল্পিক ভাবে প্রকাশ করেন এই তিন ভাবে ব্যাখা করেন। উদাহরণসহ শুনলে এটা বেশ কনভিন্সিং, কিন্তু মানুষ এত এত শর্তের মধ্যে দিয়ে যায় যে, এটা আরোহী প্রণালীতে আপনাকে কোথাও (কবি বা খুনীতে) পৌঁছাবে না, তারপরও একজন কবি বা খুনীর স্মৃতিচারণ শুনলে মনে হবে- এ লোকটার তো এটাই হবার ছিল!
৪. এ কারণেই দশ জন গূরুত্বপূর্ণ মনোবিশ্লেষক আপনাকে প্রায় দশ রকম ব্যাখ্যা দেবেন, আর প্রায় সবগুলোই দশ রকম ভাবে কনভিন্সিং হতে পারে। এই দ্বিমত তো শুরু হয়েছিল ফ্রয়েড বেঁচে থাকতেই, তারই শিষ্য ও সহকর্মী ইয়ুং-এর হাত ধরে। প্রায় একই রকম একটা কথা বলেছিলেন ইবনে খলদুন স্বপ্নের বিষয়টার চেয়ে কে কখন দেখছে তাই গূরুত্বপূর্ণ। (রেফারেন্স একটু এদিক ওদিক হতে পারে, ধুলো ঝেরে মুকাদ্দিমা দেখে নেবো পরে কখনও।)
৫. শৈশবের ওপর যে একক গূরুত্ব ফ্রয়েড দিয়েছেন, সেটাও আজ আর একতরফা কোন গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে না। মোড় ফেরানোর মত পরিবর্তন মানব জীবনে যে কোন সময়েই আসতে পারে।
৬. ছেলে শিশুদের বয়ঃসন্ধির সময়টাতে পুরুষত্ব হারানোর আশঙ্কা নিয়ে ফ্রয়েডের পর্যবেক্ষণ অনেকটাই সত্যি, কিন্তু তার ওপর তিনি অযাচিত বাড়তি গূরুত্বারোপ করেছেন। নারী শিশুদের লিঙ্গের অভাববোধ নিয়ে তার মন্তব্যের বিরোধিতা করেছেন প্রায় সকল নারীবাদী, বরং নারীর লজ্জাশীলতা ও আত্মরক্ষামূলক প্রবণতা বেড়ে ওঠার পদ্ধতিরই অনিবার্য ফলাফল বলে তারা মনে করেন, নিপীড়ন ও ধর্ষণের আশঙ্কা মুক্ত আদিম বহু সমাজের নারীদের ভীতিহীন বিকাশ তাদের মতামতকেই অনেকখানিই প্রমাণ করে।
৭. কিন্তু ইডিপাস কমপ্লেক্স ও ইলেকট্রা কমপ্লেক্স ফ্রয়েডের গ্রিক সাহিত্যে দখলদারিত্ব প্রমাণ করলেও এটাকে আঁকড়ে ধরে খুব বেশি দূর যাওয়া যায় না। কিন্তু নারী-পুরুষ উভয় শিশুর ক্ষেত্রেই ঘনিষ্ঠ এবং প্রাপ্তবয়স্ক বিপরীত লিঙ্গকে প্রথমদিকে স্বপ্নে দেখা এবং লজ্জাবোধে আক্রান্ত হওয়াটাও বহু পর্যবেক্ষণে সত্য। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পরিনত মানুষ ঐ স্মৃতিটা ভুলে যায় কিংবা যেতে চাওয়াটাই হয়তো নিরাপদ।
৬. কিন্তু আমরা ফ্রয়েডকে মনের কোন অজানা গহন অংশ থেকে থেকে ভয় পাই?
কারণ ফ্রয়েড আমাদের ট্যাবু ধরে টান দিয়েছেন। যৌন আকাঙ্খার ক্ষমতার যে স্বীকৃতি ফ্রয়েড দিয়েছেন, তা প্রথম দর্শনেই আমাদের পরিবার, স্নেহ, মমতা ইত্যাদির শিকড়শুদ্ধ উপড়ে ফেলার মত ঝড় নিয়ে আসছে বলেই মনে হয়। প্রায় সকল কিছুর মধ্যেই তিনি যৌনতা আবিষ্কার করেছেন; আবার নিজেই বলেছেন আমি ঠিক প্রচলিত অর্থে যৌনতা বলিনি, (একভাবে জীবনের আকাঙ্খাটাকেই তিনি যৌনতার অপরনাম হিসেবে চালিয়েছেন)। তাহলে আমাদের মনের ভেতরটা কি শুধুই অন্ধকার! বাসনা আর ভয় পরস্পরকে পোষ মানিয়ে স্নেহ, মমতা, ইত্যাদির মায়া জাল তৈরি করেছে! নাস্তিক! ঘোর নাস্তিক ফ্রয়েড!! নরকে যা তুই!!! যা তুই সোভিয়েত ইউনিয়নে!!!!
ওদিকে নাস্তিকের রাজ্য বলে খ্যাত সোভিয়েত ইউনিয়নেও কিন্তু ফ্রয়েডের ঠাঁই হয়নি। কারণ ওই একই- মানবাত্মার সুখের সম্ভাবনা অস্বিকারi, নারীর অবমাননা। এই সবকিছু আবার ন্যায্য প্রতিপাদিত হয়েছে মনোদৈহিক কার্যাকলাপের আরেক পদের বৈজ্ঞাবিক আবিষ্কারের দৌলতে। মানুষের মন বোঝার পাভলভীয় পদ্ধতি যথেষ্টই কার্যকরও বটে।
৭. বরং ফ্রয়েডকে আঁকড়ে ধরেন পশ্চিমের অবসাদগ্রস্ত, প্রতিযোগিতায় ক্লান্ত জীবনের নারী-পুরুষ। সেখানে তিনি একাংশের কাছে রীতিমতো কাল্ট হিরোতে পরিণত হন। নগরে যেন নতুন যাদুকর।
মার্কিন মুল্লুকে তার প্রতিপত্তির কারণটা আমার বিবেচনায় আরেকদিক দিয়েও গভীর। ফ্রয়েড বারবার প্রমাণ করেছেন মনোবিকলন সভ্যতার এই জটিল সম্পর্ক বিন্যাস, তীব্র অবদমন শিক্ষারই ( সব মিলে যার নাম সংস্কতি) ফল। ফলে তুমি বাপু যেই হও না কেন, নিজেকে পুরোপুরি খোলাসা করতে পারবে না। ফলে অসন্তোষ অনিবার্য, তাই তার একটি বইয়ের নামের বাংলা করলে দাঁড়াবে সভ্যতা ও তার অসন্তোষ। সেখানে ফ্রয়েড এটাই দেখাবার চেষ্টা করেছেন এই সভ্যতায় মনের পক্ষে সুখী হওয়া অসম্ভব, এমনকি ব্যক্তিগত মালিকানার বিকাশকেও তিনি অসুখী মনের কারণ হিসেবে দেখিয়েছেন। কিন্তু এখানেও ফ্রয়েডের প্রতিক্রিয়াশীলতা: তার হিসেবে আদিম ধরনের একটি সমাজ সুখীতর হলেও ফ্রয়েড ব্যক্তিমালিকানা-উত্তর কোন উচ্চতর সুখী সমাজকে অসম্ভব মনে করেন। কাজেই ফ্রয়েডের সিদ্ধান্তের স্বাভািবকপ্রতিপাদন হলো মনের অসুখ সভ্যমানুষের অলঙ্ঘ্যনীয় নিয়তি। গোটা সমাজের চিকিৎসা অসম্ভব ঘোষণা করে ফ্রয়েড তাই মন দেন অবসাদগ্রস্ত ধনকুবের ও তার বউদের মনসমীক্ষণে। রোগের বাস্তবতা উপড়ে ফেলা নয়, ব্যক্তিগত রোগীর চিকিৎসার দর্শনই মার্কিন মুল্লুকে তার আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তার কারণ।
৮. কিন্তু আমার ঐ প্রবাসী সহব্লগার যে মন্তব্য করলেন, ফ্রয়েড অপাংক্তেয়, তার কি হবে? আসলে ফ্রয়েড অপাংক্তেয়, এমনটা কোন ঘোর ওষুধ-নির্ভর সাইক্রিয়াটিস্টও বলবেন না। কিন্তু আজ মন বলে অভৌত কিছুর অস্তিত্ব নিয়েই আসলে প্রশ্ন।আমাদের সকল ভাবনা, অনুভূতি ও সংবেদ এর নিউরোনিক ব্যাখা সম্ভব। কগনিটিভ প্রক্রিয়ায় মগজ তথ্য সঞ্চয় করে, তার ওপর ভিত্তি করেই দাঁড়ায় ব্যক্তিত্ব, রুচি, অভ্যেস। ফলে সব কিছুই নিউরনে অনুরণন হিসেবেই থাকে। আপনার মগজের একটা নির্দিষ্ট অংশে রাসায়নিক কার্যকলাপ হিসেবেই বাস্তব কোন দুঃখ কিংবা সুখ জমা হয়। সেখানে হস্তক্ষেপ মানুষ যতদূর করতে পারবে, ততই সে বাস্তবে দুঃখ না ঘুচিয়েও আপনাকে সুখী, আত্মবিশ্বাসী এবং সুস্থ রাখতে পারবে। ফলে মন নিয়ে কারবার আধুনিক মনোচিকিৎসক কম করেন, তার বরং ওষুধের দিকে ঝোঁক একটু বেশি, ক্রমশঃ তা বাড়ছেও। সাজেশন এর গূরুত্ব অবশ্য আছে, কিন্তু তা সহায়ক, মূল নয়।
কিন্তু ব্যাপারটা আরেকদিক সেই একই থাকল, সমাজের চিকিৎসা নয়, চিকিৎসা ব্যক্তির। ফলে সমাজে অসুস্থ হবার কারণ উপস্থিত থাকলে বারবার আপনি অসুস্থ হতেই থাকবেন।
৯. সবকিছুকে ভৌত গতিসূত্র মেনে চলতেই হবে, এমন দোহাই জ্ঞানের সেই অংশে চলে না, যেখানে চলক এর সংখ্যা অসংখ্য। ফ্রয়েড সাহিত্য কিংবা সমাজ অধ্যায়নে এখনও খুবই কার্যকর। কেননা, তার সিদ্ধান্তগুলো না মেনেই তার প্রক্রিয়া আপনি সমাজ অধ্যয়নে ব্যবহার করতে পারেন।
এমনকি নব্য আধ্যাত্মিক বহু গোষ্ঠী, নৃবিজ্ঞানের বেশ ক’টি ধারা ও সংস্কৃতিবিশ্লেষকরা তাকে নানান ভাবে ব্যবহার করেন। কিছু মার্কসবাদীও ফ্রয়েডের অসুখের সামাজিক উৎসের ওপর গূরুত্ব দেন, আবার জোসেফ ক্যাম্পবেল হিরো উইথ অ্যা থাউজ্যান্ড ফেসেস-এ ছন্নছাড়া পুঁজিবাদী সমাজের সংকট পর্যালোচনায় প্রথা ও মূল্যবোধ থেকে দূরে সরে যাওয়াকে কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন, জাক লাকা’র ভাষা ও সংস্কৃতি বিষয়ক আলোচনাও অ্যাকাডেমিক মহলে যথেষ্টই গূরুত্বপূর্ণ। মোটকথা, চিকিৎসা-মােনবিজ্ঞানের সীমানার চেয়ে অন্যতর মানববিদ্যার জগতেই তার গূরুত্ব ক্রমশঃ পোক্ত হচ্ছে। একদিকে একদল চেষ্টা করছেন সমাজের অসুখ কাটাতে প্রথা, পরিবার, নৈতিকতা ইত্যাদিকে পুনর্বহাল করতে- যদিও পুঁজি আর বিজ্ঞাপনের প্রবল স্রোতে তা সামান্য বালির বাঁধের মত হচ্ছে, অন্যদল পুঁজির ব্যবস্থাটাকেই আমূল টান দিচ্ছেন; যদিও ওপড়াতে কতদূর সফল হচ্ছেন তা বলা যাচ্ছে না। কিন্তু গূরুত্বপূর্ণ, ফ্রয়েডকে তারা ব্যক্তি থেকে সমাজে এনে পাঠ করছেন।
১০. আমার মনোবিকলন বিষয়ক পূর্বের এন্ট্রিতে সামান্যই ক্লিক পড়েছিল, তবু এই দীর্ঘ লেখার পাঠকদের (যদি থাকেন) অনুরোধ করি সেখানকার কাহিনীগুলোর সাথে মিলিয়ে বর্তমান লেখাটি পরতে। সবগুলো এন্ট্রি সাধারণ বলেই বাছাই করা হয়েছে, আপনারা নিজেরাই সেগুলোর বিশ্লেষণ করতে পারবেন, কিন্তু ওই যে সবুজ বাতি দেখে এক ভদ্রলোকের মনোবিভ্রমের সূচনা- ওটির সাহিত্য মূল্য অসাধারন। তেমন মন কারো যদি থাকে, আর যদি মহিষকুড়ার উপকথা নামের উপন্যাসটি পড়ে থাকেন- তাহলে বুঝবেন উপন্যাসটি সুসভ্য-আমাদের নিয়েই লেখা, যাদের বুকের মাঝে আদিম বুনো মোষ হাঁক ছাড়ে আ-ড়-ড়-ড়-ড় ..., কিন্তু সভ্যতা আজ ফাঁকা সব স্থানই গ্রাস করে নিয়েছে।
১১. তাও ফ্রয়েড ভুল।
কেননা, মনোসমীক্ষণের যে জগতের রাস্তা তিনি খুলে দিয়েছেন, ফ্রয়েডকে m¤^j করে সেই রাজ্যে আজ কেউ আগ্রাসন চালালে সাইরাস দি গ্রেটের বাহিনী নিয়ে আজকের দিনে যুদ্ধ ঘোষণার মত হবে, কিংবা ইবনে সিনা ক্লিনিক রেখে ইবনে সিনার পুস্তক পাঠ করে হৃদরোগ সারাবার মত হবে।
একই কারণে কিন্তু ডারউইনও ভুল। তার আবিষ্কার দিয়ে বড়জোর ঘোড়া বা মানুষের বহু প্রজাতির ব্যাখ্যাই চলবে, বিবর্তনের ক্ষেত্রে তার বাকি প্রায় সবটাই বাতিল, বহু আগেই!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


