somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

জীবনের সরাইখানায়...

১১ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১০ রাত ২:৫২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :




কবিও তাকে একদিন বলে, জীবনের সরাইখানায় একদিন যেয়ে আস না কেন?

তারপর নন্দিনী একদিন বেড়াতে গেল সেখানে, সবাই যেটাকে বলত জীবনের সরাইখানা। সরাইখানা বটে, সর্বদা গমগম করত মানুষ। নিচু ছাদ, চারদিকে অবিশ্রাম হট্টগোল। আর সেখানকার লোকদের কথা আর কী বলব, নিজেদের তো তোমরা সবাই চেন-ই। তোমাদের মাঝেই সেদিন সে এসেছিল। সেদিনের কথা খেয়াল নেই তোমাদের? নিজেদের লজ্জা নিজেরাই ভুলে গেলে চলবে? আচমকা কোন খবর না দিয়ে সেই যে সে হাজির হল, তোমাদের মত যারা সেদিন ওখানে হাজির ছিল, ঘিরে ধরলো তাকে। আজকে যেমন আছে, সেদিনও সেখানে ছিল আরেক কবি, সভাকবির মত নয় মোটেই সে। যদিও দু'জনে একসাথেই কবিজীবনের বড় সময়টা কাটিয়েছে, তাও দু’জনের অমিলই বেশি পস্ট। সেই বিবর্ণ, মলিন ধূলি-ধূসর জীবনের সরাইখানায় এসে নন্দিনী প্রথমেই খোঁজ করলে সরাইয়ের সেই কবিকে। সেও হাসিমুখে বরণ করে নিল তাকে, 'জানতাম একদিন তুমি নিশ্চয়ই আসবে তুমি আমাদের কাছে!' তারপর সে পরিচয় করিয়ে দিল আর যারা যারা হাজির ছিল সেখানে, তাদের সাথে। প্রত্যেকটা হাত তার দিকে এগিয়ে এল, নন্দিনী মেলালো তাদের সাথে হাত। 'কিছু মনে করো না, আমার হাতটা একটু ময়লা' হাত বাড়িয়ে দিল এক যুবক। সহজ কন্যা আরও উষ্ণভাবে তার হাত চেপে ধরল, আর একজন বলল 'তুমি তো আমাদের নগরের একমাত্র সান্ত্বনা, কতদিন আশা করে আছি তুমি আমাদের কাছে একদিন আসবে!' 'এই তো আমি এসেছি!' আন্তরিকভাবে বললে সহজ কন্যা। আরেকজন বৃদ্ধমতন বলল 'তোমার তো কত লোকের সাথে জানাশুনো! তুমি বলে দিলে আমাদের কারখানাটা আবার হয়তো চালু করবে।' 'কোন কারখানা, আমি তো জানি না, কিন্তু আমি বলব।'... 'নিশ্চয়ই দেখবো আমি।' 'আমাদের মনটা ছোট বলে কিছু মনে করো না, দেখোই তো কি রকম ঠাসাঠাসির মধ্যে থাকি।' 'না, আমি কেন তা মনে করব, আমার কি ভাল লাগছে আপনাদের কাছে এসে!' 'রোগেশোকে আমাদের দেখার কেউ নেই, দেখো ছেলেপুলের কেমন হাড় গোড় নরম হয়ে গিয়েছে, আগের মত আর শক্তপোক্ত নেই।'

নন্দিনীর কন্যার এতক্ষণে একটু অস্বস্তি, হয়তো খুব, খু-ব সামান্য একঘেয়েও লাগতে শুরু করেছে, কিন্তু মানুষগুলোর জন্য কেমন মমতাও জাগলো তার। তাই সে তখনো নরম গলায় কথা বলে চললো, আহা একবারই তো এসেছে সে, আর কতক্ষণেরই বা জন্য। সরাইখানার কবি কিন্তু বাকিদের থামিয়ে দিল, ‘আহা, তোদের আহাম্মুকি দেখে দেখে ঘেন্না ধরে গেল। কতদূর থেকে এসেছে, কত কথা শুনবে-বলবে, না, এটা চাই ওটা দাও। তোদের নিয়ে কি ভাববে, কি ধারণাটা নিয়ে ফেরত যাবে বলতো!'
'যেও না! তুমি আমাদের সাথে থেকে যাও!' 'তুমি তো আমাদেরই মত, থেকে যাও এখানে!' 'তুমি ওদের কাছে ফেরত যেও না!' সমাধান দিতে শিশুর মত হৈ হৈ করে উঠল কয়েকজন।
নন্দিনী এবার অনেকটাই বিব্রত, কিন্তু তাকে বাঁচাতে চাইলো কবি, 'তোদের এই কানাকুয়োয় ওকে রাখবি কই? আর সারাদিন তোদের চাই-নাই-দাও শুনতে শুনতে ওরও পাগল হতে খুব বেশিক্ষণ লাগবে না...' তারপর সে সহজ কন্যাকে বলল, 'তারচেয়ে আমি ওদের হয়ে তোমাকে একটা গান শোনাই। আমার গান তোমাদের সভাকবির মত না, সে যখন এখানে ছিল তখনও এখানকার লোকজন তাকেই বেশি ভালবাসত, তখন ও ছিল খুব চেতা, আমাকে বলতো মিষ্টি! ওইতো শেষে ছেড়ে গেল আমাদের, মিষ্টি আমি-ই থেকে গেলাম। শুনবে নাকি আমার গান, তোমাকে নিয়ে এ-ইমাত্র লিখেছি।' সহজ কন্যা মিষ্টি করে তার দিকে হাসল, আগ্রহে ব্যাকুল দুই চোখ। লোকটাকে কত ভালবেসে ফেলেছে সে! শুরু হল সরাইখানার কবির গান:

তুমি সত্যি এসেছিলে
না কী স্বপ্নে পরিচয়
আমার গেল না সংশয়।
আমার ঘোচে না সংশয়
তুমি সত্যি এসেছিলে
না কী স্বপ্নে পরিচয়।
নিত্য বহে দখিন হাওয়া
বসন্তেরই কালে
নিত্য ফোটে কদম্ব ফুল
বরষারই ডালে।
প্রত্যহ গাই আপন সুরে পর ভোলানো গান,
প্রত্যহ কি আপন গানে আত্মভোলা প্রাণ?
প্রত্যহ কী আকাশ হতে খসে পড়ে তারা?
প্রত্যহ কী মর্ত্যে নামেন আদিম দেবতারা?
প্রত্যহ কই কত কথা, বাণী কী আর নিত্য আসে
প্রত্যহ ...'

আবেগে সহজ কন্যা হাত ছুঁল কবির। কবিও উচ্ছ্বসিত হয়ে গেয়ে চলেন

'তুমি ছুঁয়ে দি লে গো, তাই বাড়ে সংশয়
প্রত্যহ কী ঘটে তা, যা ঘটার কভু নয়
তুমি সত্যি এসেছিলে,
না কী স্বপ্নে ছুঁয়েছিলে
আমার ঘোচে না সংশয়...'

'থামো!' হঠাৎ একটা জড়ানো বাজখাঁই আওয়াজে সবাই থমকে যায়। সরাইখানার পেছন দিকে যে গন্ধময় নেশার জগত, চেনোই তো তোমরা ভালো করে, সেইখান থেকেই ভীড় ঠেলে এক তাগড়া যোয়ান ঢুকে পড়ে, শরীরে তীব্র মাদক গন্ধ। 'কবি, তোমার লজ্জা নাই! ওপরওয়ালাদের সাথে নিত্য ঘষাঘষি করে উনি আমাদের এসেছেন দাক্ষিণ্য দেখাতে, আর তুমি আবার তাই নিয়ে গান জুড়ে দিলে।' অকস্মাৎ গানে বিঘ্ন ঘটায় কবির ভ্রু কুচকে ওঠে, ঠাণ্ডা গলায় বলেন, ‘তুই তোর আড্ডায় যা। এখানে কথা বলবার উপযুক্ত তুই নোস্!'
'তুমি-ই যে একমাত্র উপযুক্ত লোক তা তো দেখতেই পাচ্ছি। তা এই যে ভালোমানুষের মেয়ে, এদিকে দেখি তো।' হেঁচকা টানে সে নন্দিনীকে সহজ কন্যাকে তার দিকে ফিরিয়ে দেয়, আতঙ্কে দুই হাত মুঠো করে থুতনির কাছে জড়ো করেছে সে। 'তুমি-ই নাকি জগতের আলো, তাহলে আমাদের এখানেই থাকো না কেন? আলোর দরকার তো এখানেই সবচে' বেশি। তুমি যদি ভালোই হও, তো সব ভালো যেখানে জড়ো হয়েছে, তোমারও সেখানেই জোটার দরকারটা কি? ওদের সাথে যা যা হয়, আমাদের সাথেই তা করে নাও না?'
'আমাকে সাঙা করো, সহজ কন্যা, আমাকে সাঙা করো!' সাথে সাথে তীব্র শিস ওঠে কোনা থেকে। 'আমাকে! আমাকে!' বহুস্বর ক্ষ্যাপাটে গর্জে ওঠে। 'আবার পাগলগুলোকে ক্ষ্যাপাচ্ছিস? মনে নেই গতবারের ঘটনা?’ কবি হুঁশিয়ার করে।
'তুমি যদি তেমন কবি হতে, গতবারের ঘটনাই আরেক রকম হত, এই এতগুলো লোক চেয়ে চেয়ে দেখত না। এমনি এমনি যারা ক্ষেপে আছে, তারা তোমাকে পোছে না, বাকিদের যদি ক্ষেপাতে নাই পার, কিসের কবি তুমি? সব নিয়ে গেল আমাদের জীবন থেকে, আর তুমি আছ কদম্ব ফুলের শোভা নিয়ে। কবে দেখেছ শেষ কদম ফুল, হ্যাঁ? আমাদের মেয়েরা যখন উধাও হয়, ছেলেরা যখন নিকেষ হয়, আমাদের জীবনটা ছোট হতে হতে এইটুকুন গাড্ডার মধ্যে...' কথা মোটেই শেষ করতে পারেনি সেই মাতাল, হয়তো এই সরাইয়ের মাঝেও ছিল কোন চর। তীব্র বাঁশির আওয়াজে সবার চমক ভাঙে, একজন তরুণ কর্তা ঢোকে ঘরের ভেতর, হাত তার সটান লম্বা করে বাড়ানো। কোন কথা বলে না সে, শুধু স্থির তর্জনী নির্দেশ করে। তার দিকে তাকিয়ে কবি নীরব শ্বাস ফেলে, বাকিরা ঠেলাঠেলি করে যতটা সম্ভব পিছিয়ে যায়, আর সেই মাতাল তার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে চুপচাপ ফেরত যায় তার অন্ধকার নেশার আড্ডায়। আর সেই ভয়ে মুর্চ্ছিত প্রায় সহজ কন্যা আলগোছে এলিয়ে পরে সেই তরুণের বুকে। আহ্, নিরাপত্তা, তার জ্ঞান ফিরলে সে দেখে কবির বাড়ির প্রায় সামনে এসে পড়েছে সে। তরুণ সেই কর্তাকে ধন্যবাদ জানায় সে, চায়ের নিমন্ত্রণ করে।

৭টি মন্তব্য ৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×