তাকে আবার দেখা গেল পশু উৎসর্গ দেবার দিনটিতে, বিশাল পশুটিকে সবাই যখন দড়ি বেধে নিয়ে যাচ্ছিল বধ্যভূমিতে, আমাদের নগরের সেই বিশেষ উৎসবে। শাস্ত্রমতে যে কেউ যে কোন দিনই তা করতে পারে, শুধু বছরের একটা নির্দিষ্ট দিনে সবাই ঘটা করে কাজটা করে। সেখানে হাজির ছিল সকলে। ছিল রক্ষীদল, বাদকদল। এমন সময় কোত্থেকে এসে হাজির হল নন্দিনী। জাপটে ধরলো দড়িবাধা পশুটিকে, বললো, বাউণ্ডুলে, তোমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে ওরা? আমি এতদিন ধরে তোমাকে খুঁজে বেড়িয়েছি। সেদিন আমাকে কোথায় ফেলে রেখে গেলে তুমি! আমি শুধু তোমারই, গ্রহণ কর আমাকে, নিয়ে নাও আমাকে। তোমার সহজ কামনাকে স্বীকার করিনি বলেই সব মিথ্যারা চেপে বসেছে আমার ওপর, আমাকে নাও...’ হট্টগোলে শোনাই গেল না আর কী কী সে বলল।
উৎসর্গের পশুটির সামনে ছিল সেনাপতি, বিচারক, বণিক, উদ্ভাবক, পণ্ডিত, মনোবিদ, পরিচ্ছদকারসহ গণ্যমান্য সবাই, মায় কবিও। সবাই এসে নন্দিনীকে ঘিরে ফেলল, চারদিকে একত্রে বেজে উঠল শিঙা, ঢাক-ঢোল, খোল-করতাল, সেনাপতির আদেশে কোত্থেকে পুরো বাহিনী এসে আলাদা করে ফেলল সহজ কন্যা আর পশুটিকে। বনিক দাঁড়িয়ে চতুর্দিকে তাড়া তাড়া মুদ্রা আকাশে ওড়াতে লাগল, পরিচ্ছদকার তার পশরা সাজিয়ে বসল তারই সামনে, অধ্যাপক জনতাকে বুঝিয়ে শান্ত করতে লাগলো, আর সেই তরুণ নিরাপত্তা কর্মকর্তা ছিল, স্থির বাড়নো তর্জনী তার। বাকি সব প্রার্থীরা এসে ঘিরে ধরল সহজকন্যাকে: বেছে নাও, আজই, এক্ষুনি। আজ শুভ মুহুর্ত। আজ উৎসর্গ করা হবে পাপপশুকে। আজ আমাদের পুরো নগর বাৎসরিক বলিতে মুক্ত হবে। নন্দিনী, এই মুহুর্তে তুমি একজনকে বেছে নাও।
কেবল কবি হাঁটু গেড়ে বসল সহজ কন্যার সামনে, বলল, ক্ষমা কর, ক্ষমা কর, ক্ষমা কর।
সহজ কন্যা তার দিকে থু থু ছেটাল, বলল একমাত্র তুমিই মানুষ হবার যোগ্য ছিলে, তাই তোমাকে ঘৃণা করি সবচেয়ে বেশি।
কাহিনীর বাকিটুকুও খানিকটা অস্পষ্ট। অচিরেই সেই পশু বলি হল প্রকাশ্য ময়দানে, নিয়মিত যেমনি হয়। সহজ কন্যা নিজেও নাকি হাজির ছিল সেখানে, অন্যদের মতই স্বাভাবিক। তারপর অভিজাতের পিঠে পা রেখে সে বনিককে বিয়ে করল, নাকি বনিকের টাকার থলে ফাঁকা করে সেনাপতির গলায় মালা দিল, নাকি মনোবিদের কপালেই শিকে ছিড়ল (সেই তো তাকে সত্য উপহার দিয়েছিল!), নাকি অভিজাতকে, ভুলেই গেছি সে সব। অনেক আগের ঘটনা তো। একেকজন একেক কথা বলে, আর দাবি করে নিজেরটাই সত্যি। কেউ কেউ বলে, এত রকম কাহিনী থাকার আসল কারণ সকলের সাথেই নাকি ছেনালিপনা চালিয়ে যাবার স্বভাব ছিল তার। সত্যি কী আজ আর জানার উপায় নেই। শুধু এটুকু জানি, খুব দ্রুতই সেই কন্যা আর সকলের মতই সহজ আর স্বাভাবিক হয়ে উঠেছিল। অন্যদের মত পরিচ্ছদ বাছতে, সাবধানে ফলে কামড় দিতে আর কেতামাফিক পদক্ষেপ ফেলতে শিখে গিয়েছিল সে। আর তার গায়ের ঘেসো গন্ধটাও বহুকাল হলো পায়নি কেউ। জীবনের সরাইখানায়ও সে আর কখনো যায়নি। তবে নাকি এই, মাঝে মাঝেই মাঝ রাতে ঘুম ভাঙত তার, আর কাটা পশুর মত আহ্হ-আহ্হ-আহ্হ-আহ্হ বলে চিৎকার করতে করতে নিেেজর গলা চেপে ধরত সে। কোনদিন হাজির হত কবির আস্তানায়, তার চুল ছিড়ত, অশ্লীল গালি দিয়ে থু থু ছেটাত আর বলত: তুমি চাইলেই সব কিছু আরেকরকম হতো; নীচ, স্বার্থপর! কবি অধোবদনে শুনত তার কথা, কেননা, কেবল এই দু’জনই তো বুঝত পরস্পরকে। তারপর দু’জনেই নীরব বসে থাকত। আর তারপর দেখো আবার সব কেমন স্বাভাবিক, কী স্বাভাবিক!
আর এই উৎকট উপসর্গটার ঠিক আগে আগেই নাকি সে আনমনা হতো, লোকে বলে সেখান থেকেই এ রোগের জন্ম। আর দ্রুতই তা বাকিদের মাঝে সংক্রামক ব্যাধির আকারে ছড়িয়ে পরল আমাদের নগরে।
তো, এই হলো গল্প। বুড়ো খোকার দল, রাত অনেক হলো, এবার ঘুমোতে চলে যাও। কাল তো সেই আবার একই দিন। আবার সন্ধ্যায় নতুন কিছু শুনতে চাইবে, আর জানি-ই তো কি শুনতে চাও। আবার কাল এই একই গল্প বলব নতুন কোন কাহিনীতে।
নতুন গল্প শুনতে কাল আবার এসো জীবনের এই সরাইখানায়।
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১০ সকাল ১১:২৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


