আমার গল্পটাও অনেকটা সেরকম। আমিও আমার আপন বাড়িতে ফিরতে চাই। মা সেখানে অপেক্ষায়...বাবা থাকলে হয়তো অপেক্ষার মানুষ আরো একজন বাড়তো, ছোট্ট ভাইটাও অপেক্ষায়, ভাইয়া তার রঙ্গিন জামা আনবে তো? গত ঈদের পর ভাইয়া আর আসার সময় পায়নি...এই ঈদেও যদি তার রঙ্গিন জামা না আসে, তাহলে ওপাড়ার সামাদের কাছে মুখ দেখানো যাবে না। ঈদই এবার করবে না সে, ভাইয়া কে আগেই বলে দিয়েছে। মা...তার কোনো দাবি নেই, শুধু ছেলেটাকে দেখতে পারলেই হলো, সেদিনই তার ঈদ, চাঁদ উঠলো কি উঠলো না, তাতে তার কি যায় আসে? আর আমি...ব্যস্ত শহরটাতে বেতনের অপেক্ষায়, মালিক বেতন দিবে দিবে করে ঈদের ঠিক আগের দিনে এসেছে...এখন নাকি বেতন দিচ্ছে, তাও নাকি বোনাস ছাড়া। পার্টির লোকেরা আন্দোলন করবে বলেছে...আন্দোলনে কি তার পেট ভরবে নাকি ছোটনের রঙ্গিন জামা হবে? যা দিয়েছে তাই সই...বাড়ী যেতে হবে, ছোটনের জামা কিনতে হবে, আর যদি মার জন্যে একটা শাড়ি হয়...তাহলে তো আর কিছু লাগে না, সামনের মাসটা হয়তো অনেক কষ্টে যাবে, ওভারটাইম করে পোষাতে হবে...তবু ঈদটা যদি ঈদের মতো হয়...সবার সাথে হয়!
মার্কেটের যে ভিড়...কিভাবে কি কিনি কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না। ছোটনের জামাটা কিনতেই হবে। বহু দরদাম করেছি... শেষ পর্যন্ত ছোটনের জামাটা হয়েছে, মার শাড়িটাও হবে, আমিও বাড়ি যাবো। মা হয়তো বলবে, খোকা নিজের জন্যে কিছু নিলি না...বোকা মা, বুঝো না কেন, তোমরা খুশি হলে নিজের জন্যে কিছু লাগে না। বাজারে আজ মানুষ ভেঙ্গে পড়েছে...কোথাও তিল ধারণের জায়গাটা নেই। কোনোমতে কেনাকাটা শেষ করেই দৌড় দিলাম বাসস্ট্যান্ডের দিকে...ঈদের আগে বাড়ি যাবার শেষ দিন আজ...দেরি করা যাবে না। সেখানে বড় বড় সব মানুষ আগেই টিকেট কিনে লাইনে দাঁড়িয়ে আছে...আর আমি টাকাই পেলাম আজ...কোনোমতে যদি ছাদে উঠে হলেও বাড়ি যাওয়া যায়...
বাসস্ট্যান্ডে শুধু মানুষ আর মানুষ...বাসের দেখা নাই...সীটের বাইরের যাত্রী এমনকি ছাদের যাত্রীও বুঝি টিকেট কেটে ফেলেছে। বাড়ি যাবার কোনো উপায়ই যে দেখছি না!! ট্রেনে করে অবশ্য বাড়ির কাছাকাছি যাওয়া যেতে পারে, তবে তারপর আবার টেম্পু নিতে হবে। এখন এইটাই একমাত্র উপায়, আর কোনো গতি নাই। কমলাপুরে ছুট লাগালাম। জানা কথা...এখানেও সেই একই দৃশ্য, হাজার হাজার মানুষ, ট্রেনটাকে ঘিরে এমন ভাবে ঊঠেছে, ট্রেন আর চেনা যায় না...আমিও উঠার চেষ্টা করলাম, চেকারের হাতে আগেই ২০০টাকা ধরিয়ে দিয়েছি, এখন আমাকে উঠতেই হবে। জরিমানা দিয়ে হলেও বাড়ি যে আমাকে যেতেই হবে, ছোটনটা যে অভিমানী...জামাটা না পেলে বেচারা ঈদটাও হয়তো করবে না।
একটু জায়গাও পাচ্ছি না যে ট্রেনটাতে একটা পা রাখবো...একটা পা শুধু রাখতে পারলে হতো। পারছি না। ছাদে উঠার চেষ্টা করবো সেই তিল পরিমাণ জায়গাটাও নেই। এরই মধ্যে ট্রেন ছাড়ার হুইসেল বেজে উঠলো... বিশ্বাস করুন, হুইসেলটা আগে কখনো এমন করে আমার হৃদয়ে বাজেনি। হৃদয় ভেঙ্গে টুকরা টুকরা হয়ে যাচ্ছে মনে হয়...কেউ আমাকে একটু জায়গাও দিলো না, অবুঝ আমি...দেখতে পাইনি যে একটু জায়গাও যে ছিল না! ঝাপসা দৃষ্টিতে দেখে যেতে লাগলাম, ট্রেনটা শুধু দুরত্ব বাড়িয়ে হারিয়ে যাচ্ছে চোখের আড়ালে। কেউ কি আমার ছোটনটাকে বলবে...তার ভাইয়া তার জন্যে রঙ্গিন জামা কিনেছিল? কেউ কি মাকে সান্তনা দিবে যে তার ছেলেটা ফিরে আসবেই?
আমার ঘরে ফেরা আর হলো না...তাতে কি? আমাদের ফ্যাক্টরীর মালিক ঘরে ফিরবে, বড় বড় ওই দালানের মানুষেরা যে যার ঘরে ফিরবে, এমনকি মেসের দেয়ালের ভেন্টিলেটরের চিপার ওই ছোট্ট ঘরটায় চড়ুইটাও ফিরবে...সবাই ঘরে ফিরছে, আমার না ফেরাতে এই বিশাল পৃথিবীর কিইবা যায় আসে? বাড়ি ফেরার গল্পগুলো তো আগেই পড়েছেন...ছাপার কাগজে , গাঢ় কালিতে লেখা ছিল, পড়েছেন না??
আমার গল্পটা ভাঙ্গা পেন্সিলে লেখা...চোখের জলে শুধুই ঝাপসা হয়ে যেতে চায়, তবুও কালির ছটা রেখে যায়...

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

