somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ঘরে ফেরার গল্প

০১ লা অক্টোবর, ২০০৮ দুপুর ১:৪২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ঘরে ফেরার গল্প শুনবেন? বাড়ী ফেরার গল্প...নাড়ীর টানের গল্প? প্রতিদিন ছাপার কাগজে গাঢ় করে ছাপা হয়, সাহিত্যিকদের গল্পে কিংবা সাংবাদিকের কলামে ছাপা হয়, কখনো চোখে পড়েনি? সেই যে... ... ... সবুজ ছায়া ঢাকা গ্রামে ফিরছি, ট্রেনের ছাদে কিংবা বগিতে কোথাও জায়গা করে, কিংবা লঞ্চের অতিরিক্ত যাত্রী হয়ে, বাসের রড কিংবা ইঞ্জিনের উপরে বসে। তবুও তো ফিরছি...নাড়ির টানে ফিরছি, ব্যাগ ভর্তি করে বাবা-মা আর ছোটো ভাই কিংবা বোনটার জন্যে সামর্থ্যের শেষটুকু নিয়ে ফিরছি। স্বপ্নভরা গ্রামে ফিরছি, আমার দুরন্ত শৈশবের সাক্ষী, রহস্যঘেরা কৈশোরের সঙ্গী সেই গ্রামটায় ফিরছি, আজো যেখানে ফিরে শান্তির পরশ পাই... ... ...কতো শত পাতায় ছাপার অক্ষরের গাঢ় কালিতে পড়েছেন এই ঘরে ফেরার গল্প, তাই না?


আমার গল্পটাও অনেকটা সেরকম। আমিও আমার আপন বাড়িতে ফিরতে চাই। মা সেখানে অপেক্ষায়...বাবা থাকলে হয়তো অপেক্ষার মানুষ আরো একজন বাড়তো, ছোট্ট ভাইটাও অপেক্ষায়, ভাইয়া তার রঙ্গিন জামা আনবে তো? গত ঈদের পর ভাইয়া আর আসার সময় পায়নি...এই ঈদেও যদি তার রঙ্গিন জামা না আসে, তাহলে ওপাড়ার সামাদের কাছে মুখ দেখানো যাবে না। ঈদই এবার করবে না সে, ভাইয়া কে আগেই বলে দিয়েছে। মা...তার কোনো দাবি নেই, শুধু ছেলেটাকে দেখতে পারলেই হলো, সেদিনই তার ঈদ, চাঁদ উঠলো কি উঠলো না, তাতে তার কি যায় আসে? আর আমি...ব্যস্ত শহরটাতে বেতনের অপেক্ষায়, মালিক বেতন দিবে দিবে করে ঈদের ঠিক আগের দিনে এসেছে...এখন নাকি বেতন দিচ্ছে, তাও নাকি বোনাস ছাড়া। পার্টির লোকেরা আন্দোলন করবে বলেছে...আন্দোলনে কি তার পেট ভরবে নাকি ছোটনের রঙ্গিন জামা হবে? যা দিয়েছে তাই সই...বাড়ী যেতে হবে, ছোটনের জামা কিনতে হবে, আর যদি মার জন্যে একটা শাড়ি হয়...তাহলে তো আর কিছু লাগে না, সামনের মাসটা হয়তো অনেক কষ্টে যাবে, ওভারটাইম করে পোষাতে হবে...তবু ঈদটা যদি ঈদের মতো হয়...সবার সাথে হয়!


মার্কেটের যে ভিড়...কিভাবে কি কিনি কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না। ছোটনের জামাটা কিনতেই হবে। বহু দরদাম করেছি... শেষ পর্যন্ত ছোটনের জামাটা হয়েছে, মার শাড়িটাও হবে, আমিও বাড়ি যাবো। মা হয়তো বলবে, খোকা নিজের জন্যে কিছু নিলি না...বোকা মা, বুঝো না কেন, তোমরা খুশি হলে নিজের জন্যে কিছু লাগে না। বাজারে আজ মানুষ ভেঙ্গে পড়েছে...কোথাও তিল ধারণের জায়গাটা নেই। কোনোমতে কেনাকাটা শেষ করেই দৌড় দিলাম বাসস্ট্যান্ডের দিকে...ঈদের আগে বাড়ি যাবার শেষ দিন আজ...দেরি করা যাবে না। সেখানে বড় বড় সব মানুষ আগেই টিকেট কিনে লাইনে দাঁড়িয়ে আছে...আর আমি টাকাই পেলাম আজ...কোনোমতে যদি ছাদে উঠে হলেও বাড়ি যাওয়া যায়...

বাসস্ট্যান্ডে শুধু মানুষ আর মানুষ...বাসের দেখা নাই...সীটের বাইরের যাত্রী এমনকি ছাদের যাত্রীও বুঝি টিকেট কেটে ফেলেছে। বাড়ি যাবার কোনো উপায়ই যে দেখছি না!! ট্রেনে করে অবশ্য বাড়ির কাছাকাছি যাওয়া যেতে পারে, তবে তারপর আবার টেম্পু নিতে হবে। এখন এইটাই একমাত্র উপায়, আর কোনো গতি নাই। কমলাপুরে ছুট লাগালাম। জানা কথা...এখানেও সেই একই দৃশ্য, হাজার হাজার মানুষ, ট্রেনটাকে ঘিরে এমন ভাবে ঊঠেছে, ট্রেন আর চেনা যায় না...আমিও উঠার চেষ্টা করলাম, চেকারের হাতে আগেই ২০০টাকা ধরিয়ে দিয়েছি, এখন আমাকে উঠতেই হবে। জরিমানা দিয়ে হলেও বাড়ি যে আমাকে যেতেই হবে, ছোটনটা যে অভিমানী...জামাটা না পেলে বেচারা ঈদটাও হয়তো করবে না।


একটু জায়গাও পাচ্ছি না যে ট্রেনটাতে একটা পা রাখবো...একটা পা শুধু রাখতে পারলে হতো। পারছি না। ছাদে উঠার চেষ্টা করবো সেই তিল পরিমাণ জায়গাটাও নেই। এরই মধ্যে ট্রেন ছাড়ার হুইসেল বেজে উঠলো... বিশ্বাস করুন, হুইসেলটা আগে কখনো এমন করে আমার হৃদয়ে বাজেনি। হৃদয় ভেঙ্গে টুকরা টুকরা হয়ে যাচ্ছে মনে হয়...কেউ আমাকে একটু জায়গাও দিলো না, অবুঝ আমি...দেখতে পাইনি যে একটু জায়গাও যে ছিল না! ঝাপসা দৃষ্টিতে দেখে যেতে লাগলাম, ট্রেনটা শুধু দুরত্ব বাড়িয়ে হারিয়ে যাচ্ছে চোখের আড়ালে। কেউ কি আমার ছোটনটাকে বলবে...তার ভাইয়া তার জন্যে রঙ্গিন জামা কিনেছিল? কেউ কি মাকে সান্তনা দিবে যে তার ছেলেটা ফিরে আসবেই?


আমার ঘরে ফেরা আর হলো না...তাতে কি? আমাদের ফ্যাক্টরীর মালিক ঘরে ফিরবে, বড় বড় ওই দালানের মানুষেরা যে যার ঘরে ফিরবে, এমনকি মেসের দেয়ালের ভেন্টিলেটরের চিপার ওই ছোট্ট ঘরটায় চড়ুইটাও ফিরবে...সবাই ঘরে ফিরছে, আমার না ফেরাতে এই বিশাল পৃথিবীর কিইবা যায় আসে? বাড়ি ফেরার গল্পগুলো তো আগেই পড়েছেন...ছাপার কাগজে , গাঢ় কালিতে লেখা ছিল, পড়েছেন না??
আমার গল্পটা ভাঙ্গা পেন্সিলে লেখা...চোখের জলে শুধুই ঝাপসা হয়ে যেতে চায়, তবুও কালির ছটা রেখে যায়...

সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১০ সন্ধ্যা ৬:২১
১০টি মন্তব্য ১০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×