আমাদের স্কুল (ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজ ) এর রোল কল নিয়ে বেশ কিছু মজার স্মৃতি আছে। তারই কতগুলো আপনাদের সাথে শেয়ার করছিঃ
১.
আমাদের যখন নাম ডাকা হত তখন আমরা সবসময় “ইয়েস টিচার/স্যার” বলেই ডাকতাম। একবার এক বাংলার ম্যাডাম আমাদের ক্লাস টিচার হয়ে আসলেন। উনি এসে নিয়ম করলেন যে ক্লাসে নাম ডাকার সময় কেউ “ইয়েস টিচার” ডাকা যাবে না তার বদলে যখন রোল কল করা হবে তখন রেসপন্স করতে হবে “উপস্থিত” বলে। তখন আমরা খুব বিপদে পড়ে গেলাম। কিছুতেই উপস্থিত ডাকা আয়ত্ত্ব করতে পারছিলাম না। বহুদিনের অভ্যাসবশ “ইয়েস টিচার” ডেকে ফেলতাম। ম্যাডাম তখন খুব রাগ করতেন। পরে তিনি বুঝতে পারলেন যে সোজা আঙ্গুলে ঘি উঠে না। তাই যারা উপস্থিত ডাকতো না তাদের কে পুরো ক্লাস এ শাস্তি দিতেন। তারপরও অনেকে ভুলে “ইয়েস উপস্থিত” ডেকে ফেলত। যাই হোক ধীরে ধীরে আমরা উপস্থিত বলা আয়ত্ত্ব করে ফেললাম। এখন এই ঘটনা ক্লাস এইট এর। আমাদের দিনে একবারই নাম ডাকত। আর ক্লাস টিচারের সবসময় প্রথম ক্লাসটাই নিতে হত। উনি আমাদের সপ্তাহে তিনদিন ক্লাস নিতেন। বাকি তিনদিন অন্য স্যার/ টিচার আসতেন। তো উপস্থিত বলতে বলতে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়ার পরে আমরা সব সময় ই উপস্থিত ডাকতাম। অন্য স্যাররা প্রথম প্রথম আপত্তি না করলেও পরে আমাদের এই উপস্থিত বলার ব্যাপারে আপত্তি শুরু করলেন। কারন স্যাররাও সব সময় ইয়েস স্যার শুনে অভ্যস্ত। তো উনারা আবার নিয়ম করে দিলেন উনাদের ক্লাসে উপস্থিত ডাকা যাবে না। তখন আমরা পড়ে গেলাম বিপদে। একদিকে উপস্থিত না ডাকলে শাস্তি অন্যদিকে উপস্থিত ডাকলে শাস্তি। তো কি আর করা শেষ পর্যন্ত আমরা এই বিপদ থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্য ঠিক করলাম যে প্রতিদিন সকালে এসে সবাই মিলে আলোচনা করে নিব কি বলতে হবে “উপস্থিত না ইয়েস টিচার ”। এতে কিছুটা লাভ হয়েছিল । কিন্তু তারপরও ভুল তো হতই। পরে অবশ্য আর কেউ শাস্তি দিতনা।
২.
আমরা যারা হোস্টেল এ থাকতাম তাদের রাতের বেলা পড়া তৈরী করার জন্য নাইট ক্লাস হত। নাইট ক্লাসে স্যাররা আসতেন আমাদের গার্ড দেয়ার জন্য। আমরা ঠিকমত পড়ছি কিনা তা খেয়াল রাখতেন। এখন পরীক্ষা না থাকলে আমরা কেউ পড়তে চাইতাম না। কিন্তু স্যাররা না পড়লে অনেক বকা দিতেন। যখন ছোট ছিলাম তখন বকার ভয়ে বই খুলে বসে থাকতাম কিছু পড়তাম না। এখন যখন বড় হলাম মানে ক্লাস টেন এ উঠলাম তখন তো আর বকাকে ভয় পেতাম না। তাই নাইট ক্লাস ছিল আমাদের দুষ্টামীর জায়গা। এখন স্যাররাও সাধারন্ত ছাত্রদের কিছু বলতো না। কিন্তু কিছু কিছু স্যার আমাদের শাসন করার চেষ্টা করত। যেসব স্যাররা এভাবে আমাদের উত্যক্ত করত তাদেরকেও আমরা উত্যক্ত করতাম। এখন এই রকম এক স্যার আমদের নাইট ক্লাসে গার্ড দিতে আসত। উনি খালি কথায় কথায় আমাদের বকা দিত আর বলত
“তোরা জিপিএ দেড় পাবি, কিছুই তো পড়স না”। তো আমরা উনাকে অনেক উত্যক্ত করতাম। একবার আবিষ্কার করলাম উনি নাম ডাকার সময় উপস্থিত বললে রাগ করেন। তাই আমরা নিয়ম করে সবাই উনার ক্লাসে উপস্থিত বলতাম। আর উনি রেগেমেগে সবাইকে যাতা বলতেন। উনার অবস্থাটা তখন দেখার মত হত। তো একদিন তিনি নাম ডাকছেন আমাদের সাথের এক ফাজিল বন্ধু ওর রোল ডাকার সময় কি মনে করে বলল “উপস্থিত জনাব”। স্যার কিছুই বললেন না। নাম ডাকা শেষ হওয়ার পর আমার ওই বন্ধুর নাম ধরে ডেকে বললেন “তোমার নামটা বড়ই সুন্দর, কিন্তু ভেতরটা কুঁৎসিত”। উনার কথায় সে লজ্জা পাবে কি বরং হাসতে হাসতে শেষ সাথে আমরাও। তারপর থেকে উনি আর ক্লাসে রোল কল করতেন না। ক্লাস ক্যাপ্টেন কে বলতেন নাম এর পাশে প্রেজেন্ট কিনা লিখে দিতে। তবে আমাদের উত্যক্ত করা বন্ধ করেন নি।
৩.
এটা অবশ্য আমাদের কাহিনী না। এটা আমাদের সিনিয়র ভাইয়াদের কাহিনী। আসলে যারা সিনিয়র ছিল তাদের কে স্যাররা কিছু বলার সাহস পেত না। তাই সবাই স্যারদের একটু আকটু উত্যক্ত করত। একবার নাইট ক্লাসে উনারা সবাই সিদ্ধান্ত নিলেন স্যারকে খেপাবেন। স্যার আবার বেশ চুপচাপ ছিলেন কাউকে কিছু বলতেন না। তো স্যার নাম ডাকছেন আর সবাই গনহারে বলতে লাগল “ইয়েস”। আর কিছু না। তো স্যার কাউকেই কিছু বলেন না। কিছুক্ষন পর বললেন “ তোমরা খালি ইয়েস ইয়েস বলতেছ, সাথে কিছু একটা লাগাও। স্যার বলতে চাওনা বল না। কিন্তু ভাই, চাচা, কাকা ,কিছু একটা লাগাও। এভাবে খালি ইয়েস ইয়েস বললে ভালো লাগে না।” তো পরের জনের নাম যখন ডাকা হল। সে বলল “ইয়েস চাচা”। দেখাদেখি সবাই তাদের যার যার রোল কলের সময় বলল ইয়েস চাচা। পরের থেকে উনারা যতদিন আমাদের স্কুলে ছিলেন ততদিন ওই স্যার নাম ডাকলে রেসপন্স করত ইয়েস চাচা বলে। স্যারও কোনদিন এই ব্যাপারে কিছু বলেন নি।
এখন ভার্সিটিতেও রোল কল করার সময় অনেকদিন নিজের অজান্তেই বলে ফেলেছি উপস্থিত। একবার তো স্যারকে খেপানোর জন্য লাব্বায়েক পর্যন্ত বলেছি। কিন্তু ভার্সিটির স্যাররা এইসব ব্যাপারে মনে হয় অভ্যাস্ত। তারা কখনো কিছু মনে করে না।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



