জাবিতে এসব কি ঘটছে?
[মেঝেতে পড়ে থাকা অবস্থায় ইলেকট্রিক যন্ত্রে ব্যবহƒত প্লাস দিয়ে পিঠের দুই জায়গা থেকে চামড়া টেনে ছিলে ফেলা হয়। তখন সে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। কিছুক্ষণ পর ফিসফিস কণ্ঠে পানি পানি করলে এক ছাত্রলীগ নেতা প্যান্টের চেন খুলে তার মুখে পেসাব করে দেয়। এ সময় সে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে যা লেখার অযোগ্য। এর পর ছাত্রলীগের তিন-চারজন কর্মী সিগারেট জ্বালিয়ে তার পুরুষাঙ্গে সিগারেটের আগুন ঠেসে ধরে। ]
দাড়িঅলা এক ছাত্র আমার সামনে তার বন্ধুকে বলছিল, ‘বন্ধু এখন দেখি দাড়ি রেখে ভুল হয়েছে।’ মূলত বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশে ধর্মের প্রতি সরকারের সহযোগী সংগঠন ছাত্রলীগের যে বিষদৃষ্টি দেখছি প্রকাশ্যে তার প্রতিবাদ করার সাহস আমার নেই। তাই লিখতে বসেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের চার বছরের জমানো অনেক বেদনাদায়ক ঘটনা হজম করেছি। কিন্ত– বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ক্যা¤পাসে ছাত্রলীগের তিন মাসের বেদনা হজম করতে না পেরে আজ প্রধানমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রী বরাবর লিখতে বাধ্য হচ্ছি।
গত ২০ মার্চ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে বেনামী চিঠির সূত্র ধরে ছাত্রশিবির সন্দেহে ছয় শিক্ষার্থীকে মারধর করা হয়েছে বলে খবর প্রকাশিত হয়। কিন্ত– কেউ প্রশ্ন করেনি শুধু সন্দেহের ভিত্তিতে বা বেনামী চিঠির সূত্র ধরে একজন শিক্ষার্থীকে মারধর করা কতটা যৌক্তিক। যুক্তি দিয়ে ওই ঘটনাকে কারো পক্ষে নেয়া আমার উদ্দেশ্য নয়। কিন্ত– আমাদের ক্যা¤পাসের সাংবাদিকরা শব্দটি মারধর বললেও তা যে মানবাধিকার লড়ঘন ও ইতিহাসের সবচেয়ে বর্বরোচিত ঘটনাকেও হার মানায় তা কেউ লেখেনি। আমি সেই নির্যাতনকারীদের মুখ থেকে যে বর্ণনা শুনেছি তা তুলে ধরছি। তানিম নামের ওই শিক্ষার্থী পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ত। তাই বেনামী চিঠির সূত্র ধরে তাকে এক ছাত্রলীগ নেতার রুমে ডাকার পর তার কাছে জিজ্ঞাসা করা হয় শিবির করে কি না। সে অ¯¦ীকার করে। কিন্ত– সে নিয়মিত নামাজ পড়ত। তাই তারা ধরেই নিয়েছিল তানিম শিবির করে। এ জন্য তারা মুখ থেকে ‘আমি শিবির করি’ বাক্যটি বের করার জন্য রড, লাঠি, হকি¯ষ্টিক দিয়ে বেধড়ক মারধর শুরু করে। রাত ১১টা থেকে প্রায় ২টা পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে একের পর এক পেটাতে থাকলে মৃত্যুর মুখে পতিত হয়ে সে বাধ্য হয়ে বলে আমি শিবির করি। এর পর শুরু হয় আরো নির্যাতন। তখন সম্ভবত হাত ও পায়ের হাড় ভেঙে গিয়েছিল। রুমের মেঝেতে পড়ে থাকা অবস্থায় ইলেকট্রিক যন্ত্রে ব্যবহƒত প্লাস দিয়ে পিঠের দুই জায়গা থেকে চামড়া টেনে ছিলে ফেলা হয়। তখন সে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। কিছুক্ষণ পর ফিসফিস কণ্ঠে পানি পানি করলে এক ছাত্রলীগ নেতা প্যান্টের চেন খুলে তার মুখে পেসাব করে দেয়। এ সময় সে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে যা লেখার অযোগ্য। এর পর ছাত্রলীগের তিন-চারজন কর্মী সিগারেট জ্বালিয়ে তার পুরুষাঙ্গে সিগারেটের আগুন ঠেসে ধরে। তখন প্রচণ্ড চিৎকার দিয়ে সে আবার অজ্ঞান হয়ে যায়। সূচ দিয়ে তার দুই ঊরুতে অবিরাম খোঁচানো হয়। একের পর নির্যাতন চলতে চলতে ভোর ৫টা বেজে যায়। শুনেছি আগে থেকেই শিবির সন্দেহ করা হয় এমন কিছু ছাত্রকে মারধর করার অনুমতি দিয়েছিল প্রক্টর। একজন সাংবাদিকের কাছ থেকে জেনেছি, এ ঘটনা তারা রাত ৩টার দিকে জানতে পারে। কিন্ত– প্রক্টরকে একাধিক ব্যক্তি অন্তত ৫০ বার ফোন করলেও তিনি ফোন ধরেননি। ভোর বেলায় বিশ্ববিদ্যালয় মেডিক্যাল থেকে ডাক্তার গিয়ে অবস্থা খারাপ দেখে দ্রুত সরিয়ে ফেলতে বলে। এ সময় ছাত্রলীগ নেতারা যার যার মতো কেটে পড়ে। পরে একজন সিকবয় (হলের কর্মচারী) বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাম্বুলে›েস করে নিয়ে তাকে রাজধানীর পঙ্গু হাসপাতালে ফেলে রেখে আসে। পরে আহতের আত্মীয়রা সেখান থেকে নিয়ে যায়।
শুধু একটি বেনামী চিঠির সূত্র ধরে এই নির্যাতনের লোমহর্ষক বর্ণনা ক্যা¤পাসে ছড়িয়ে পড়ার পর দাড়িওয়ালা ও নামাজি শিক্ষার্থীরা ভয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়ে। ফলে যেকোনো মুহূর্তে নির্যাতনের খড়গ নেমে আসার আশঙ্কায় নামাজ পড়া বšধ করে দিয়েছে অনেক শিক্ষার্থী। অনেকে ভয়ে দাড়িও কেটে ফেলছে। ছাত্রলীগের একটি সূত্র থেকেও নিশ্চিত হওয়া গেছে, ক্যা¤পাসে নামাজ পড়ে এমন শিক্ষার্থীদের ওপর দৃষ্টি রাখা হচ্ছে। ইতোমধ্যে হলগুলোতে নামাজি ও দাড়িঅলা প্রায় ২০০ শিক্ষার্থীর একটি তালিকা করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে এদের ব্যবস্থা নেয়া হবে। বিষয়টি অত্যন্ত গোপনে হচ্ছে। জানাজানি হওয়ার পর হয়তো মসজিদে আর আজানের দরকার হবে না। দাড়িঅলা শিক্ষার্থীও হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবে না।
কোনো তথ্যপ্রমাণ ছাড়া শুধু দাড়ি রাখা ও নামাজ পড়ার কারণে শিবির সন্দেহ করে মারধর করা হয় এবং জীবন নিয়ে শঙ্কায় থাকতে হয় তাহলে এ দেশে কি আর কেউ নামাজ পড়বে না। কেউ কি দাড়ি রাখবে না। প্রধানমন্ত্রী শিক্ষামন্ত্রী ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে বিষয়টির দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। দয়া করে আপনারা ছাত্রলীগকে সামলান।
লেখক ঃ বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন নামাজি ছাত্র।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


