ভাববাদী মানুষের সাথে বৈজ্ঞানিক আলোচনা করতে যাওয়া বিষম পীড়াদায়ক । তাদের অনুভবের সাথে বিজ্ঞানের নৈর্ব্যাক্তিক দর্শণের ভঙ্গিটা যায় না। তারা সাধারণত এমন একটা অর্থ তৈরি করে যা কোনো কোনো সময় অনভিপ্রেত- কোনো কোনো সময় সেটা মূল নীতির বিরোধি একটা অবস্থান।
বিজ্ঞানের নৈর্ব্যাক্তিকতা কিংবা বিজ্ঞানের অবস্থাননিরপেক্ষতার ধারণাটা গ্রহন করবার মানসিকতা তৈরি না হলে কিংবা বিজ্ঞানকে বিজ্ঞান হিসেবে না দেখে অন্য কোনো ভাববাদী অবস্থান থেকে দেখলে সেটা বৈজ্ঞানিক মানস তৈরিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে না। বিজ্ঞানের তত্ত্ব কিংবা অনুসিদ্ধান্তগুলো গ্রহন এবং বর্জনের প্রক্রিয়াটা পুরোনো- তবে সেটার কিছু যৌক্তিক ভিত্তি আছে-
কোয়ান্টাম ফিজিক্স কিংবা কোয়ান্টাম মেকানিক্স বিষয়ে অনেক রকম ভাববাদী অবস্থান দেখা যায়- এখানে মানুষের পর্যবেক্ষণ প্রক্রিয়া এবং আমাদের যন্ত্রের ব্যবহারে বস্তুকণার মৌলিক পর্যবেক্ষণযোগ্য দশার পরিবর্তন সম্পর্কে আলোচনা আছে- আমাদের পর্যবেক্ষণ প্রক্রিয়া কিংবা আমাদের বস্তুকণার উপস্থিতি এবং দশা নির্ধারণের প্রক্রিয়া সম্পর্কে অবগত থাকতে হবে।
মূলত আমরা যেসব যন্ত্র ব্যবহার করে বস্তুকণার দশা পরিমাপের প্রচেষ্টা করি তা মূলত তড়িৎচুম্বকীয় পদ্ধতি- এখানে বস্তুর দশা পরিমাপের জন্য আমরা আলোক কণিকা কিংবা অন্য কোনো তড়িৎ আধানযুক্ত কণিকার সাথে বস্তুর সংঘর্ষ কিংবা বস্তুর শক্তির আদানপ্রদান লক্ষ্য করি- এবং এর ফলে আমাদের পাঠানো কণিকার দশার পরিবর্তন লক্ষ্য করে হিসাব কষে নির্ধারণ করি ঠিক কি কি কারণে কোন কোন দশায় থাকলে এই বস্তুকণাটির সাথে সংঘর্ষে আমাদের পঠানো প্রোব কিংবা পর্যবেক্ষণকার্যে নিয়োজিত কণিকার এই পরিবর্তণগুলো হওয়া সম্ভব- এইভাবেই আমরা নিশ্চিত হই বস্তুকণার তাৎক্ষণিক দশা সম্পর্কে। তবে এই দশাটাই যে চুড়ান্ত দশা তাও সঠিক কিংবা নিশ্চিত ভাবে বলা যায় না।
বস্তুকণা নিজের জগতে যতগুলো অবস্থা কিংবা দশায় থাকা সম্ভব তার কোনো একটাতে অবস্থান করে- আমাদের পর্যবেক্ষণও এটাই নিশ্চিত করে যে বস্তুকণাটি আমাদের বোধগম্য বিবেচনায় যে কয়টা দশা কিংবা অবস্থা আমরা কল্পনা করেছিলাম তার কোনো একটাতেই বিদ্যমান। এটাকে যদি আমরা একটা গাণিতিক চিহ্নের সাহায্যে চিহ্নিত করতে চাই তাহলে আমাদের সমীকরণ ধরে নিতে হবে- এই সমীকরণে থাকবে বস্তুর সাম্ভাব্যদশাগুলোর সমষ্ঠি- যদি সেগুলোকে "ক" :খ" ; "গ" এইরকম ভাবে চিহ্নিত করা যায় তাহলে আমরা সবগুলো দশার সমষ্ঠি হিসেবে একটা সমীকরণ লিখবো-
পর্যবেক্ষণের পূর্বে বস্তুর অবস্থান হবে এই দশাগুলোর সবগুলোই।
আমরা পর্যবেক্ষণ করবো, পর্যবেক্ষণ শেষে বস্তুর দশা কোনটা হবে এটা নিশ্চিত করলে দেখবো আমাদের সমীকরণে যে দশাগুলো ছিলো তার কোনো একটাই আসলে বস্তুর দশা। গাণিতিক হিসাব যেমনই হোক না কেনো দশাগুলোর প্রতিটি আরও কিছু বিধি মেনে নির্দিষ্ট হয়- এই বিধিগুলোও যৌক্তিক এবং এদের গ্রহন করবার কারণও নির্ধারিত হয় বস্তুর চরিত্র কিংবা বস্তুকণার চরিত্র দিয়ে। এই বিধিগুলো মেনে কোনো কোনো দশায় অবস্থান করা কণাটির জন্য অন্য দশাগুলোর তুলনায় অধিক সহজ, সেখানে বস্তুকণাকে খুঁজে পাওয়ার সম্ভবনাও বেশী।
যাই হোক কোয়ান্টাম মেকানিক্সে ভাগ্যের ভুমিকা বলে কিছু নেই- একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ অনিশ্চয়তা থাকবে প্রতিটা পর্যবেক্ষণে- আর এই পর্যবেক্ষণের অনিশ্চয়তার ন্যুনতম মানটা নির্দিষ্ট করে দেওয়া আছে-
পর্যবেক্ষণের এই অনিশ্চয়তা কেনো তৈরি হয় তারও একটা ব্যখ্যা দেওয়া আছে-
আমাদের পর্যবেক্ষণের পদ্ধতি সম্পর্কে অবগত থাকলে হয়তো সেটা বুঝানো সহজ হতো। আমাদের পর্যবেক্ষণ অন্তত অতি আণবিক ক্ষেত্রে যন্ত্রের উপর নির্ভরশীল। এই যন্ত্র আমাদের অতি আণবিক কণার অস্তিত্ব সম্পর্কে জানায়- তার বিভিন্ন দশা কিংবা পর্যায় সম্পর্কে জানায়।
শ্রোয়েডিঙ্গারের কালো বিড়ালের উপাখ্যানে যে কথাটা বলা আছে সেটা দার্শণিক সমস্যা না, সমস্যা হলো অন্ধকার একটা ঘরে একটা বেড়াল আছে- সেটা জীবিত কিংবা মৃত এই দুই অবস্থায় থাকতে পারে- আপনার পর্যবেক্ষণের কাজটা করতে হলে ঘরটা কিংবা বাক্সটা খুলতে হবে, বাক্সটা খুলার আগে বিড়ালটার অবস্থা দুটোই হতে পারে- হয় সেটা জীবিত কিংবা সেটা মৃত- তার দশা কিংবা অবস্থা নিয়ে যদি কোনো গাণিতিক সমীকরণ তৈরি করতে হয় তবে তার জীবিত অবস্থা এবং মৃত অবস্থা এই দুটি অবস্থাকেই আমার সম্ভাবনায় রাখতে হবে-
যখন আমি বাক্সটা খুলবো ( স্থুল অর্থে বললে- সুক্ষ্ণার্থে যখনই আমরা কোনো একটা পর্যবেক্ষণ করবো তখনই পদার্থ কিংবা অতি আণবিক কণার দশাটা নির্দিষ্ট হবে) তখনই আমি জানতে পারবো বিড়ালটা মৃত না কি জীবিত- অর্থ্যাৎ আমাদের বাক্সটা খোলা কিংবা পর্যবেক্ষণ একটা নির্দিষ্ট দশা কিংবা অবস্থায় দেখায় অতি আণবিক কণাগুলোকে।
আমাদের প্রতিটা পর্যবেক্ষণ অতি আণবিক কণাগুলোর দশার পরিবর্তন করে-
আরও সংক্ষিপ্ত উদাহরণ হতে পারে আপনি একটি রাস্তায় হাঁটছেন- আপনার অবস্থান এবং আপনার গতিবেগ জানা থাকলে ঠিক পরবর্তী ১০ সেকেন্ডে আপনি কোথায় থাকবেন এটা নিশ্চিত করে বলা যাবে- এটাই ক্ল্যাসিকাল ফিজিক্সের বক্তব্য- ডিটারমিনিস্টিক নেচার কিংবা পরবর্তী দশা সম্পর্কে ভবিষ্যতবাণী করতে পারবার ক্ষমতা-
কিন্তু এটা কি সত্য হবে যখন আপনার গতিবেগ মাপার জন্য আমি একটা কামানের গোলা ছুড়লাম। কামানের গোলা আপনার গায়ে লেগে যখন আমার কাছে কিংবা পর্যবেক্ষণ যন্ত্রের কাছে ফেরত আসবে তখন কামানের গোলার যাওয়ার বেগ আসার বেগ, তার কৌণিক সরণ এইসব মেপে আমি বলতে পারবো আপনি ঠিক সেই মূহূর্তে কোথায় ছিলেন- তবে আপনি কি সত্যিই কামানোর গোলার ধাক্কা খাওয়ার পরে আগের গতিতেই সরল পথে চলতে থাকবেন?
আপনার গতিতে পরিবর্তন আনবার জন্য সামান্য ভরবেগই যথেষ্ট- এটাই নিউটন বলে গিয়েছেন সপ্তদশ শতাব্দিতে- ভরবেগের সামান্য সংযুক্ত আমাদের গতির অবস্থা পরিবর্তন করে।
অতি আণবিক পর্যায়ে আমাদের প্রতিটা পর্যবেক্ষণ বস্তুকণার দশাকে বাড়তি কিছউ ভরবেগ দিয়ে দেয়- তাই তার তাৎক্ষণিক অবস্থান কিংবা গতিবেগ জানতে পারলেও আমাদের জানা হয় না এইমূহুর্তে সেটা কোন দিকে রওনা দিলো- প্রতিটা পর্যবেক্ষণ এক একটা কামানোর গোলার মতোই বস্তুকণাকে দিক পরিবর্তণে বাধ্য করে-
আর বস্তুর দশা সম্পর্কিত অনিশ্চয়তার উৎস আমাদের সাম্ভাব্য যতগুলো অবস্থা হওয়া সম্ভব তার সবগুলোকে বিবেচনায় আনলে পর্যবেক্ষণ শেষে আমরা উপরে উল্লেখিত দশাগুলোর একটাতে বস্তুকণাকে দেখবো- অনিশ্চয়তা হলো ঠিক কোন দশায় দেখবো এটা আমরা বলতে পারবো না- তবে আমি চাইলে যেই দশায় দেখতে চাই সেই দশায় বস্তুকণা থাকবে এই বাস্তবতা নেই- বস্তুকণা আমার মনের খবর জানে না, বস্তুকণা জানে তার পক্ষে ঠিক কোন কোন খানে যাওয়া উচিত কিংবা যাওয়া বৈধ - সেই বৈধ অবস্থান ব্যতিত অন্য কোনো অবস্থানে গিয়ে বস্তুকণাকে জেনা করতে দেখা যাবে না- আমাদের যাবতীয় প্রার্থনা এবং কামনাকে ব্যর্থ করে বস্তুকণা তার নিজের মতোই আচরণ করবে। আমি যতই প্রার্থনা করি, মনের জোর খাটাই দুটো ইলেক্ট্রনকে একই দশায় রাখতে পারবো না-
আমাদের চারপাশের দৃশ্যমাণ জগতের বাস্তবতা কিংবা তাদের এই আকৃতি- তার সবটাই এই ছোটো একটা কারণে- আমাদের দৈর্ঘ্য আমাদের প্রস্থ আমাদের উচ্চতা- আমাদের বিপাক এবং আমাদের প্রজনন সবগুলোই এই নীতিকে বাস্তবায়ন করে। দুটো ইলেক্ট্রন কিংবা দুটো প্রোটন কিংবা দুটো নিউট্রন একই দশায় থাকবে না।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

