বুদ্ধিবৃত্তিক আইকন হয়ে উঠা কিংবা নিজস্ব মনীষা এবং মেধার সমন্বয়ে মানুষের আস্থার পাত্র হয়ে উঠা আইনস্টাইনকে নিয়ে মাঝে মাঝেই কিছু বক্তব্য প্রকাশিত হয়। আইনস্টাইনের ইশ্বরভাবনা এবং তাকে আস্তিক প্রমাণ করবার প্রচেষ্টা খুব একটা খারাপ লাগে এমনটাও বলবো না।
এমন একজন মেধাবী মানুষ, যার মেধাকে সবাই সম্মান করে এবং যাকে বুদ্ধিবৃত্তির মাত্রায় অনন্য একটা অবস্থান দেওয়া হয়েছে, তার এই আইকন হয়ে উঠবার দুর্ভাগ্য তাকে তার জীবিত থাকা অবস্থায় অনেক বারই বাধ্য করেছে ধর্ম বিষয়ে তার নিজস্ব অবস্থান পরিস্কার করতে।
আইনস্টাইনের ইশ্বর জুয়া খেলেন না বিষয়টার সাথে আইনস্টাইনের ধর্ম বিষয়ক বক্তব্য এক সাথে পাঠ করলে একটু বুঝা যায় যে প্রচলিত অর্থে যে ইশ্বরের ধারণা নির্দিষ্ট করা হয়েছে সেই ইশ্বরে আইনস্টাইন বিশ্বাসী নয়, তবে তার গভীর বিশ্বাস পৃথিবীতে একটা নির্দিষ্ট ধরণের আইন কিংবা বিধি কাঠামো রয়েছে।
এই বিধি কাঠামোকে বিশ্বাস করাটা কি আস্তিকতা?
প্রতিটা মানুষ হয়তো নিজস্ব বিবেচনায় নিজস্ব ধরণের ইশ্বরে বিশ্বাস স্থাপন করে। প্রত্যেকের সতন্ত্র ইশ্বর বিদ্যমান। অন্তত আমার নিজস্ব ধারণা এমনই যে প্রতিটা মানুষই নিজের মতো করে ইশ্বরের অনুভুতি ধারণ করে।
সবার ইশ্বর সব সময় কঠোর, রাগী, প্রতিহিংসা পরায়ন নয়। প্রেমময় ইশ্বর বিদ্যমান- মানুষের মানবীয় অনুভুতিগুলোর চরমপন্থী অবস্থানে ইশ্বর-
মানবীয় আবেগের অসীম সীমাই বোধ হয় ইশ্বরের গুনাবলীতে প্রকাশিত। তাই তিনি একই সাথে চরম প্রতিহিংসা পরায়ন এবং একই সাথে অনন্ত ক্ষমার সাগর। একই অঙ্গে নানবিধ মানবিক মানসিক চাহিদা পুরণ করে চলেছেন।
মানুষের অনিশ্চয়তা এবং সৃজনশীলতার চরমপ্রকাশ। মানুষের সমাধান খুঁজবার প্রয়াসের দুর্বল উদাহরণও ইশ্বর। তবে সব শেষে ইশ্বর মানুষের জিগীষার অবসান। সেখানে গিয়ে মানুষ প্রশ্নবিহীন, সমর্পিত এবং এরপরে আর কোনো অনুসন্ধিৎসা নেই মানুষের।
ধর্ম বিষয়ে উন্নাসিকতা কিংবা অহেতুক বিলাসিতা করবার মতো যথেষ্ঠ অবসর সব সময় থাকে না। মানুষ কেনো অতিপ্রাকৃতকে বিশ্বাস করে। মানুষ কেনো অলৌকিকত্বকে বিশ্বাস করতে চায়। মানুষ কেনো অসম্ভব কিছুর প্রত্যাশা করে? এইসব প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই।
মানুষ ভুত বিশ্বাস করে- সবাই হয়তো বিশ্বাস করে না, তবে ভুতের ভয় মানুষকে ছেড়ে যায় না। মানুষ নিজের অজ্ঞতা, অনভিজ্ঞতা আর নিজের সংশয়কে ভয় করে। নিজের অজ্ঞাত যেকোনো বিষয়কে মানুষ সন্দেহ করে। এই সন্দেহ কিংবা সংশয় অবশ্যই প্রাণী হিসেবে মানুষের প্রজন্ম টিকে থাকবার একটা কারণ। প্রাণী মাত্রই এই আচরণ করে থাকে। নিজস্ব চৌহদ্দি আর নিজস্ব পরিচিত পরিবেশের পুষ্ঠি ব্যতিত অন্য কোনো কিছু সচারাচর গ্রহন করতে চায় না। উট যতটা সহজে ক্যাকটাস খেয়ে ফেলবে, ততটা সহজে ছাগলকে ক্যাকটাস খাওয়ানো যাবে না। ছাগল কাঁটা গাছ খায় না।
প্রাকৃতিক পরিবেশ প্রানির পুষ্টি আর খাদ্যাভাস নির্দিষ্ট করে দেয়।
মানুষও প্রাণী হিসেবে একটা পর্যায় পর্যন্ত সংশয়ী হয়েই খাদ্য গ্রহন করতো। বহুমাত্রিক খাদ্যরুচি তার পুষ্টি এবং আহার্যের উপরে প্রাকৃতিক নির্ভরশীলতা কমিয়েছে। তার বলিষ্ঠ প্রানী হিসেবে টিকে থাকবার সম্ভবনা বাড়িয়েছে।
এই মানুষই একটা পর্যায়ে হয়তো আমরা যেভাবে বর্তমানে ভাবি সেভাবে একটা ভাবনাপ্রকাশের ধাঁচ তৈরি করেছে। যেহেতু অন্য কোনো প্রানীর ভাষা অনুবাদ করবার ক্ষমতা মানুষের করায়ত্ব নয়, এরপরও মানুষ শব্দউচ্চারণ রীতি এবং ইশারা বারংবার পরীক্ষা করে নিশ্চিত হয়েছে প্রানী জগতের কোনো কোনো সদস্য অন্তত ৫০০ ধরণের ইশারা করতে পারে।
যদি তারা পরস্পরের সাথে যোগাযোগ স্থাপনের জন্য ইশারা ইঙ্গিত করতে পারে, তাদের নিজস্ব একটা ভাবনার ধরণ আছে। এবং এই ভাবনার ধরণটা যেহেতু অনুবাদে আমাদের কাছে ধরা পড়ছে না তাই আমরা তাদের অবলা প্রানী হিসেবে ধরে নিয়েই নিজেদের ভাববার ধরণটাকে প্রাধান্য দিচ্ছি।
ঐতিহাসিক সত্য হলো রাম ছাগলের জন্ম হয়েছিলো আরব উপদ্বীপে, এবং ঐতিহাসিক সত্য বর্তমানের অধিকাংশ ধর্মাবলম্বীরাই সেই সেমেটিক ধর্মের উত্তরাধিকার বহন করে। এই দুটো ঐতিহাসিক সত্যকে একত্র করে দেখবার প্রয়োজন নেই কোনো।
রামছাগলও হয়তো নিজের ভাবনায় আর ভাষায়, ইশারা ইঙ্গিতে ইশ্বরের কিংবা তাদের নিজস্ব সৃষ্টির কার্যকারণ নির্ধারণের প্রচেষ্টা করে। হয়তো গ্রামের কুকুর শহরের কুকুরকে এসে জিজ্ঞাসা করে এখানে মাটি নেই কেনো? আমরা তাদের কুশল বিনিময় কিংবা সম্পর্কের ভিত্তি বুঝতে পারি না। সম্ভবনা বিচার করলে শুধুমাত্র মানুষই কল্পনা এবং চিন্তা করতে সক্ষম এমনটা আমার মনে হয় না। নতুন পরিকল্পনা গ্রহন এবং সীমিত মাত্রার বুদ্ধিবৃত্তির চর্চা বাঁদরও করে, বাদুরও করে।
সুতরাং মানুষের যেসব ভীতি সেসব প্রানীরও থাকতে পারে। এমন কি তারাও এই প্রশ্নে আস্তিক নাস্তিক অংশে ভাগ হয়ে লড়াই করে। তাদের ইশারা কিংবা ইশ্বর ভাবনা আমরা হয়তো ভবিষ্যতা জানতেও পারি। যেভাবেই শুরু হোক না কেনো। মানুষের প্রশ্ন করবার এবং উত্তর খুঁজবার প্রক্রিয়াতেই ধর্ম এবং ইশ্বর জন্ম নিয়েছে।
আর সেই সমাধানে পৌঁছে যাওয়ার পরে মানুষের বাড়তি কোনো সংশয় কিংবা প্রশ্নের আবশ্যকতা হারিয়েছে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



