মুহাম্মদ মক্কা অভিযানে যাওয়ার পথেই মোহাম্মদের চাচা আব্বাস তার সাথে দেখা করে তার বশ্যতা এবং ইশ্বরের আনুগত্য স্বীকার করে নেয়। আব্বাস, সর্বশেষ হিজরতী, ঝোপ বুঝে কোপ মারবার কাজে দক্ষ ছিলো- অবশ্য এই আনুগত্যের পুরস্কারও সে পেয়েছিলো মক্কা বিজয়ের পরবর্তী সময়ে।
আবু সুফিয়ান তখন মক্কা থেকে মদিনার পথে আসছেন, উড়ো খবর পৌঁছেছে মোহাম্মদ বিশাল সৈন্য বাহিনী নিয়ে মক্কা দখল করতে আসছে- সরোজমিন তদন্তের জন্য রাতের বেলায় এসেছিলো। পথিমধ্যে তার সাথে দেখা হলো আব্বাসের। আব্বাস আবু সুফিয়ানকে উপদেশ দিয়ে বললো যদি মক্কার ধ্বংস দেখতে না চাও তবে মুহাম্মদের সাথে শান্তিচুক্তি স্থাপন করো।
আব্বাস আবু সুফিয়ানকে নিয়ে পৌঁছালো রাতের বেলা মুহাম্মদের কক্ষে, মুহাম্মদ আবু সুফিয়ানকে পরের দিন সকালে দেখা করতে বললো।
পরদিন সকালে যখন আবু সুফিয়ানের সাথে দেখা হলো মুহাম্মদের তখন মুহাম্মদ তাকে সম্বোধন করে বললো-" তুমি কি এখনও উপলব্ধি করো নি আল্লাহ ব্যতিত কোনো উপাস্য নেই? আর তুমি কি এখনও আমাকে আল্লাহর প্রেরিত মহাপুরুষ স্বীকার করো না?"
আবু সুফিয়ান ধীর মগ্ন স্বরে বললো, যদি অন্য কোনো ইশ্বর থাকতো তবে সেটা আমার উপকারে আসতো, আর তোমাকে ইশ্বরের প্রেরিত মহাপুরুষ স্বীকার করতে এখনও আমার সামান্য দ্বিধা রয়েছে।
আব্বাস শঙ্কিত হয়ে বললো আবু সুফিয়ান এখন ইতস্তত করবার সময় নেই, স্বীকার করে নাও ইসলামই শান্তির ধর্ম এবং মুহাম্মদ ইশ্বরের প্রেরিত পুরুষ,নচেত তোমার বিচ্ছিন্ন মস্তক মাটিতে পড়ে থাকবে।
এটা সংশয় কিংবা বৃথা অহং এর সময় নয়- অন্য কোনো উপায়ান্তর না পেয়ে আবু সুফিয়ান ইশ্বরের আনুগত্য স্বীকার করে নিতে বাধ্য হলো। -
হিশামী।
আব্বাসের ইসলাম ধর্মের পতাকাতলে আশ্রয় নেওয়ার কারণটা নিজস্ব স্বার্থসিদ্ধির লক্ষ্যে একটি আপোষ। তার কাছে মুহাম্মদের ইশ্বর কিংবা কা'বা ঘরের মুর্তি কোনোটাই কোনো অর্থ বহন করতো না, এমন কি এরা সব আবর্জনায় পড়ে থাকলেও তার তেমন কোনো ক্ষতিবৃদ্ধি হতো না।
আবু সুফিয়ানের প্রাণভয়ে ইসলামের শরণ গ্রহনের বিষয়টাও মূলত ধর্মের শান্তিপূর্ণ বানীর প্রভাবে গৃহীত নয়, বরং শক্তিপ্রদর্শনের মাধ্যমে জোরপূর্বক কাউকে বিশ্বাসচ্যুত করে দেওয়া।
মুহাম্মদ মক্কা বিজয়ের পরে কা'বায় প্রবেশ করে প্রথমেই এটার চারপাশে সাত বার প্রদিক্ষণ করেন, তারপর একটি একটি করে মুর্তি ধ্বংসের নির্দেশ দিয়ে বললেন, সত্য এসেছে, মিথ্যা অপসৃত, মিথ্যা উবে গেছে। কা'বার মুর্তিগুলো ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পরে কা'বার দরজার চাবি প্রদান করা হলো উসমান ইবনে তালাহকে, বলা হলো, তোমরাই বংশপরম্পরায় এই কা'বা ঘরের রক্ষক হবে।
প্রতিটা গোত্রেরই নিজস্ব উপাস্য ছিলো, তাদের সেই উপাস্য ধ্বংস করবার পরে মক্কায় ইসলামের জয়যাত্রার সূচনা হলো।
উপায়ান্তর না দেখে ইসলামের পতাকাতলে আশ্রয় গ্রহনের অনেকগুলো উদাহরণ রয়েছে। বিশেষত একটি সম্পূর্ণ গোত্রকে হত্যা করে তাদের স্ত্রীদের যুদ্ধবন্দী এবং দাসী হিসেবে মদিনায় ধরে এনে সাহাবিদের ভেতরে বন্টন করে দেওয়ার নৃশংস ঘটনাটির রাজনৈতিক প্রভাব ছিলো অপরিসীম। এর পরে শুধুমাত্র রোমান সৈন্যরা ব্যতিত অন্য কোনো ক্ষুদ্র গোত্র মুহাম্মদের বিরোধিতা করবার সাহস পায় নি। বিরোধিতার অর্থ যখন গোত্রের বিলুপ্তি এবং গোত্রের নারীদের যৌনদাসীতে রুপান্তরিত হওয়ার বাধ্যবাধকতা, কোনো রকম বিদ্রোহ মাথা চাড়া দেওয়ার উপায় নেই, নিজের বিশ্বাস প্রকাশের উপায় নেই।
ঘটনাগুলো ঘটেছিলো আজ থেকে প্রায় ১৩৭৮ বছর আগে। ৬৩০ খ্রীস্টাব্দের কাছাকাছি সময়ে। ২০০৮ সালের বাংলাদেশে এয়ারপোর্টের সামনের ভাস্কর্য ভাঙবার জন্য মরিয়া মাদ্রাসার ছাত্রদের ছবি দেখে মনে হলো বাংলাদেশ তার সম্পূর্ণ ভূখন্ড সমেত কোনো এক অলীক টাইম ম্যাশিনে চড়ে চলে গেছে ৬৩০ সালের আশেপাশের কোনো একটা সময়ে।
ন্যুজ্ব তত্ত্বাবধয়াক সরকারের নিজস্ব হীনতার প্রকাশ ঘটেছে একজনকে ফেরারী আসামি ঘোষনা দেওয়ার পরেও তার সাথে রাজনৈতিক আলোচনা অনুষ্ঠানের নোংরামিতে।
ক্ষমতার লোভ বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো নেই, এদের লক্ষ্য শুধু জনসেবা এইসব পাগলের প্রলাপ শুনলে চিরিয়াখানায় অবশিষ্ট গাধাগুলোও হাসতে হাসতে মরে যাবে। আওয়ামি লীগ কিংবা বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহন করবেই। তারা নির্ধারিত সময়েই গঠনতন্ত্রের প্রয়োজনীয় সংশোধন করেই নিবন্ধিত হতে।
মূলত সমস্যায় আছে ইসলামপন্থী দলগুলো। এদের সাথে কৌশলগত মিত্রতা রয়েছে আওয়ামী লীগের, তবে অধিকাংশ ধর্মাশ্রয়ী দলের প্রধান অবলম্বন বিএনপি, এই ইসলামপন্থী জোট, জোটবদ্ধ হয়েই নির্বাচনে অংশগ্রহন করবে তবে নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধনের শর্ত মূলত এদের ইসলামপন্থাকে নিস্কলুষ রাখতে দিচ্ছে না।
সরকার নানামুখী চাপে একটা সমঝোতার মাধ্যমে সব রাজনৈতিক দলকে নিয়েই নির্বাচন অনুষ্ঠিত করতে চায়। এ কারণে যতটুকু নোংরামি করা সম্ভব তার সবটুকুই তারা করছে। হাসান আরিফ সাহেবের আইনমুখী বক্তব্যগুলো তার নিজস্ব বক্তিত্বের উপরে একটা চরম উপহান হয়ে থাকলো। বাংলাদেশে তার নিজস্ব যে ব্যক্তিত্ব ও পরিচিত গড়ে উঠেছিলো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আইন উপদেষ্টা হওয়ার পরে তার সমস্ত কার্যকলাপ এবং উচ্চারণ মূলত এই ব্যক্তিত্ব ও পরিচিতির সাথে শুধু বেমানান নয় বরং একেবারে বিপরীত। ক্ষমতার সংস্পর্শও মানুষকে অনেক রকম পরিবর্তনে বাধ্য করে, কারো ভেতরে নিজস্ব ব্যক্তিত্বের অভাব থাকে, কারো আবার অসহায়ত্ব থাকে, জিল্লুর রহমান এবং হাসান আরিফের প্রকট ব্যক্তিত্বহীনতাকে নিন্দনীয় বললেও আসলে তাদের প্রতি আমার নিজস্ব ঘৃনার প্রকাশ যথাযথ মাত্রা পায় না।
তারা যা করেছেন এবং এখন যা করছেন তা মূলত পা চাটা তাবেদারী, মৃত্যুর সন্নিকটে থেকেও আবু সুফিয়ান অন্তত নিজস্ব সংশয় প্রকাশ করেছিলো, তবে এরা নিজের সংশয়ের কোনো প্রকাশ ঘটাচ্ছে না বরং আনুগত কুকুরের মতোই ঘুরছে দ্বারে দ্বারে। মুজাহিদকে পুলিশ খুঁজে পাচ্ছে না যখন তখন চার দলীয় জোটের সাথে সরকারের সংলাপে তার চেহারা দেখা যায়,
ভাস্কর্য সরানোর এই রাজনৈতিক সিদ্ধান্তও একটা প্রচ্ছন্ন হুমকি। ইসলামি দলগুলো আশা করেছিলো এর প্রতিরোধ করবে সরকার, জামায়াত আর ঐক্যজোট ঐক্যবদ্ধ হয়েই পিছিয়ে যাওয়া বাংলাদেশের রথের সারথি হবে। সরকারের ন্যুজ্ব মেরুদন্ড বিরোধিতার সাহস পায় নি, সরকারের আচরণ সাম্প্রদায়িক ।অসাম্প্রদায়িক ভাববাদীতাকে প্রশ্রয় দিয়ে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিলে যতটুকু উজ্জ্বল হতে পারতো সরকারের ভাবমুর্তি, ইসলামি দলগুলোর প্রতিটা কর্মসূচিতেই নিরব এবং সরব সমর্থন দিয়ে এটার মলিনতার প্রলেপই বাড়িয়েছে সরকার।
মুর্তি ভাঙার রাজনীতিতে আপাতত জয়ী ইসলামপন্থী দলগুলো। তাদের নিরেট এবং সাম্প্রদায়িক ভাববাদ আচ্ছন্ন মগজে গেঁথে আছে মুহাম্মদের কা'বা প্রবেশের পরের বানী, সত্য সমাগত, মিথ্যা অপসৃত, মিথ্যা বিলীন।
এই নিরেট মস্তিস্কের মাওলানা সম্প্রদায় কি ভাস্কর্যের সমূল উৎপাটন দাবি করে এয়ারপোর্ট রোড থেকে? যে রাস্তা দিয়ে হাজীরা যাবে বলেই না লালনের ভাস্কর্যের গলায় দড়ি পড়লো? লালন কাঠমোল্লাদের হাতে নিপীড়িত ছিলো, তেমন নিপীড়নের শিকার হয়েছে অন্য সব বাউল সম্প্রদায়ের মানুষেরা। এই নিরেট মাস্তিস্কের মানুষগুলো অতীতেও ধর্মীয় স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেয় নি, বর্তমানেও দেয় না, তবে তাদের অনেক ভেদবুদ্ধি থাকলেও তাদের বিচক্ষনতা মূলত আব্বাসের মতোই। তারা কখনই চাইবে না নেভী হেডকোয়াটারের সামনে স্থাপিত দৃষ্টিপীড়াদায়ক ভাস্কর্যটি ভেঙে ফেলা হোক।
তারা মূলত সামরিক সরকারের কোলে বসে সামরিক সরকারের মুখমেহনে ব্যস্ত সব সময়ই। তাদের চটিয়ে দিয়ে কোনো ভাস্কর্য উপড়ে ফেলবার রাজনীতি তারা করতে নারাজ। মূলত অসাম্প্রদায়িক লালনই এই উৎপীড়নের লক্ষ্য হবে।
ইসলামের তরবারী তলে অনেক বিশ্বাসীর স্থান হয়েছে প্রাণ ভয়ে। অনেক স্বার্থান্ধ মানুষ নিজস্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ইসলামকে এবং এর বশ্যতাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছে , এখন বাংলাদেশে সেই ঢালের হাতল গিয়েছে ফজলুল আমিনী আর মতিউর নিজামীদের হাতে।
অন্ধ বাংলাদেশে স্বাগতম- মূলত এটাই হবে বাংলাদেশ বিমানের স্বাগত সংলাপ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

