বিশ্বব্যাপী মন্দার প্রভাব বাংলাদেশে তেমন পড়ে নি, বরং বাংলাদেশের পরিস্থিতি ভিন্ন, আন্তর্জাতিক বাজারের পণ্যগুলো মূল্য হারাচ্ছে প্রতিদিন, ক্রেতার চাহিদা কমে যাওয়ায় অর্থনীতিকে গতিশীল রাখতে নানাবিধ মূল্যহ্রাসের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের দেশগুলো, এর বিপরীতে বাংলাদেশে মূল্যবৃদ্ধির প্রবনতা শুরু হয়েছে।
নির্মান সামগ্রীর প্রধান উপকরণ রডের দাম কমেছে আন্তর্জাতিক বাজারে এবং দেশীয় বাজারে, মূলত নির্মান ব্যয়ের ৪০ শতাংশই ইমারত নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় রড কিনতেই খরচ হয়। দেশীর বাজারে ৪০ গ্রেডের রডের দাম কমেছে ৩০ শতাংশের বেশী এবং ৬০ গ্রেডের রডের দাম কমেছে ২৫ শতাংশের বেশী তবে এরপরও ভোক্তারা তেমন সুফল পাবেন না, কারণ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের দাবি এই একইসময়ে ইট, সিমেন্ট, বালির দাম বেড়েছে, বেড়েছে পেইন্টের দাম। এসবের সাথে বেড়েছে শ্রমিকের দৈনিক মজুরী। সুতরাং তারা সব মিলিয়ে আপাতত প্রতি বর্গ ফুটে মাত্র ৪০ টাকা দাম কমাতে পারবে।
অর্থনীতি সম্পর্কে আমার ধারণা খুব কম, তবে যখন অর্থনীতি শাস্ত্রের উৎপত্তি হয়েছিলো তখন এমনটাই ধারণা করা হতো কোনো পণ্যের মূল্য মূলত নির্ধারিত হয় এর চাহিদা এবং চাহিদার বিপরীতে এর যোগানের উপরে। যে পণ্যের চাহিদা বেশী এবং যোগান সীমিত সেটার মূল্য বাড়তেই থাকবে।
সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক প্রবনতা দেখে এটা বুঝলাম আদতে অর্থনীতির প্রাথমিক সূত্র মেনে এটা চলছে না, এখানে কৃত্রিম উপায়ে দাম বাড়িয়ে রাখবার প্রবণতা আছে। যখন আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়তে শুরু করলো লাগাম ছাড়া তখনও তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো বলছিলো তেলের উৎপাদন কমে নি, এমন কি বিশ্বব্যাপী তেলের চাহিদা বাৎসরিক যে হারে বাড়ছে সেই হারের তুলনায় সামান্য বাড়লেও সেটা এমন লাগামছাড়া মূল্যবৃদ্ধির কারণ হতে পারে না।
ব্যরেল প্রতি ৫০ ডলার মূল্য লাফিয়ে লাফিয়ে পৌঁছালো ১৪৭ ডলারে, তেলের উৎপাদন বাড়ানো হলো, এবং এই মুল্যের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির পেছনে ছিলো নিউইয়র্কের কয়েকটি অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান। তারা গত ১ বছরে প্রচুর বিনিয়োগ করেছিলো তেলে, বর্তমানে তারা বিনিয়োগ সরিয়ে নিয়েছে, ফলে সেই লাগামছাড়া মূল্য বৃদ্ধির প্রবনতা শুধু থেমে যায় নি, বরং মুখ থুবড়ে পড়েছে সেই অস্বাভাবিক দাম।
খাদ্য শস্য কিংবা ভোজ্য তেল সব কিছুর মূল্য আসলে বাজারের চাহিদা কিংবা যোগানের উপর নির্ভর করে না। বরং এইসব মূল্য নির্ধারন করে দেয় কয়েকটি বৃহৎ প্রতিষ্ঠান, তারা যে মূল্য নির্ধারণ করে দেয় আমাদের সেই দামটাকেই মেনে নিয়ে কেনাকাটা করতে হয়।
হাউজিং বাবল ফেটে যাওয়ার পরে এই অস্বাভাবিক প্রবনতাও থেমেছে, খাদ্যশস্যের মূল্য কমেছে, অর্ধেকের বেশী কমে গিয়েছে ভোজ্য তেলের দাম, তবে এখনও বিপনন চলছে এবং মুনাফাও হচ্ছে, তাই বুঝা যাচ্ছে আমাদের বাজারে যে দাম আমরা দেখি সেটা আদতে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান নির্ধারণ করে দেয়, তাদের ইচ্ছার কাছে আমরা জিম্মি।
তবে বাংলাদেশের বাজারে এর প্রভাব পড়ে নি, যখন আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ছিলো ৭০ টাকা কেজি, এবং সেই তেল পরিশোধন করে প্যাকেটে ভরে বাজারে পৌঁছানোর জন্য যখন খরচ হতো ১০ টাকা তখন বাংলাদেশে বলা হলো আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেশী, সুতরাং আমরা ১২০ থেকে ১২৫ টাকা কেজি তেল কিনে খেলাম, এখন বাজারে তেলের দাম অর্ধেকের বেশী কমেছে, তবে বাজারে তেলার দাম বাড়তি, এবং এই দাম বাড়া অব্যহত থাকবে আগামী মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত। এটা কৃত্রিক উপায়ে বাড়ানো দাম।
আন্তর্জাতিক বাজার থেকে বাংলাদেশ সম্পূর্নই বিচ্ছিন্ন, আন্তর্জাতিক বাজারের কোনো উঠানামাই এখানে কোনো ছাপ ফেলে না।
ওবামা নির্বাচিত হওয়ার পরে বাংলাদেশের গার্মেন্টস সেক্টরে নতুন অর্ডারের জোয়ার এসেছে। চীন এবং কম্বোডিয়া থেকে তৈরি পোশাক কিনবে না যুক্তরাষ্ট্র, সুতরাং এই কাজগুলো আসছে বাংলাদেশে। বিপুল পরিমাণ কাজ আসছে বাংলাদেশে। এমন কি এই দুই মাসে নির্ধারিত রপ্তানী লক্ষ্যপাত্রারও ১০ শতাংশের বেশি রপ্তানি হয়েছে।
এবং গত বছরের তুলনায় প্রায় ৪২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে তৈরি পোশাকের রপ্তানি।
তবে তৈরি পোশাক শিল্পের মালিকগণের কথা শুনে এটা বুঝবার উপায় নেই, তারা অনেক কষ্টে গার্মেন্টস চালাচ্ছে, বাংলাদেশ সরকার ন্যুনতম যে মজুরি নির্ধারণ করে দিয়েছে সেটা প্রদান করতে তাদের ক্লেশ হলেও তারা সেটা প্রদান করছে। আন্তর্জাতিক ক্রেতার চাহিদা পুরণের জন্য তারা লোক দেখানো ফার্স্ট এইড বক্সের প্রদর্শনী করে গার্মেন্টস ফ্লোরে, সপ্তাহে একদিন ডাক্তার এনে গার্মেন্টসে বসিয়ে রাখে।
কর্মক্ষেত্রে শিশুদের রাখবার জন্য শিশুসদন বানানোর দাবি থাকলেও এখানে গর্ভবতী মায়েদের ৪ মাসের মজুরি দিয়ে বিদায় করে দেওয়া হয়। এবং এখানে যুবতি ও কিশোরীরাই কাজ করে, গর্ভবতী এবং মায়েরা এখানে কাজ করতে পারে না ।
তারা সরকারের কাছে বিশেষ বিবেচনার দাবি জানায়। তাদের এই ক্লেশ লাঘবের জন্য আবেদন নিবেদন করে, আপাতত তাদের মূল সমস্যা তারা তেমন দরদাম করতে পারছে না, ফ্যাশনের জন্য সব সময়ই বাড়তি পয়সা খরচ হয়, এখন কসমেটিক শিশুসদন, কসমেটিক ফার্স্টএইড বক্স ও শ্রমিকদের আন্তর্জাতিক কাজের পরিবেশের কসমেটিক নিদর্শন- এইসব কাজে বাড়তি পয়সা খরচ হচ্ছে, এই পয়সা তারা এতদিন শ্রমিকদের বেতন কম দিয়ে পুষিয়ে ফেলতে পারতো এখন সেটাও সম্ভব হচ্ছে না।
এই দরিদ্র জনগণের সেবকদের আরও কিছু বাড়তি সুবিধা দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষের কাছে আবেদন জানাই আমরা।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

