অবশেষে নির্বাচন পূর্বঘোষিত নির্ধারিত সময়েই অনুষ্ঠিত হবে। এখনও পর্যন্ত চার দলীয় জোট নির্বাচন বয়কটের পক্ষেই অবস্থান নিয়েছে, তবে জামায়াতের অবস্থান নির্বাচনমুখী। জামায়াতের সাথে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর কুটনৈতিকেরা সাক্ষাত করে জামায়াতকে নির্বাচনে অংশগ্রহনের অনুরোধ করেছে। বিএনপি'র সাথে অনেক দিনের জোটবদ্ধতার দায় এড়িয়ে জামায়াত এককভাবে নির্বাচনে যেতে পারে। এমন সম্ভবনাই প্রবল।
তবে মুজাহিদীর সাথে একান্ত বৈঠকের পরে জামায়াতের অবস্থান নির্বাচনে এখনই অংশগ্রহনের বিপক্ষে। চার দলীয় জোটের নির্বাচনে অংশগ্রহনে সম্মত না হাওয়ার কারণগুলো আলোচিত হয়েছে অনেক বারই-তবে তাদের আশঙ্কা এখনও ঠিক নির্বাচনী পরিবেশ তৈরি হয় নি। বরং তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিজের পিঠ বাঁচাতে একটা সাজানো নির্বাচনের নাটক করে আওয়ামি লীগের হাতে ক্ষমতা তুলে দিতে চায়। এই সাজানো নির্বাচনের নাটকে বিএনপি অংশগ্রহন করবে না।
চার দলীয় জোটের সদস্য দলগুলোও এমন সাজানো নির্বাচনে অংশগ্রহনের বিপক্ষে। তবে ২ মাস আগেও রাজনৈতিক দলগুলো অবিলম্বে নির্বাচনের তফশিল ঘোষণা করে নির্বাচিত রাজনৈতিক দলের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবি জানিয়েছিলো। ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা সমাপ্ত হওয়ার আগে থেকেই এই দাবি উত্থাপিত হয়েছে এবং যখন ভোটার তালিকা তৈরির কাজ সম্পন্ন হয়েছে তখনও তাদের দাবি ছিলো- ভোটার তালিকাভুক্তি শেষ- এখন অবিলম্বে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার তখন গররাজি ছিলো, নির্বাচন কমিশনও তখন প্রস্তুত ছিলো না, রাজনৈতিক সংলাপ, রাজনৈতিক সমঝোতা, নির্বাচন আইন সংশোধন এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবি- তাদের কার্যক্রমের বৈধতা দেওয়ার বিষয়টা নিশ্চিত করা- এইসব খুটিনাটি সমাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত বিষয়টা ঝুলে ছিলো। তখনও এইসব রাজনৈতিক দলের নির্বাচনের আগ্রহ কমে নি।
অবশেষে নির্বাচন কমিশন যখন নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা দিলো, এরপর থেকেই নানাবিধ বায়না শুরু হয়েছে রাজনৈতিক দলগুলোর। তারা বিভিন্ন রকম ছোটো ছোটো দাবি উত্থাপন করছে। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ আইনের যে ধারার সংশোধন তারা চাইছে সেটাতে বলা হয়েছে কারো প্রার্থীতা নাকচ করবার সম্পূর্ণ ক্ষমতা ও অধিকার রাখবে নির্বাচন কমিশন। নির্বাচন কমিশন চাইলেই যেকোনো প্রার্থীর প্রার্থীতাকে বাতিল ঘোষণা করতে পারে। অবশ্যই এই প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিলের কারণ উল্লেখপূর্বকই তারা এই কাজ করবে এবং তাদেরই প্রার্থীতা বাতিল ঘোষিত হবে যারা নির্বাচন বিধিমালা লঙ্ঘন করেছে কিংবা প্রাথমিক শর্তগুলো পুরণে ব্যর্থ হয়েছে।
তবে এই নির্বচন কমিশনের ক্ষমতা রাজনৈতিক দলগুলোর পছন্দ নয়। রাজনৈতিকরণের লজ্জ্বাস্কর ইতিহাস বহন করছে বাংলাদেশের বিগত ১৫ বছরের আপাতগণতান্ত্রিক ব্যবস্থা। সেখানে দলীয় বিবেচনায় বিচারালয় থেকে নির্বাচন কমিশন সবখানেই রাজনৈতিক কর্মীদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বিসিএসের কোটায় বৈধ এবং অবৈধ উপায়ে ঢুকানো হয়েছে দলীয় ক্যাডার। ছোটো থেকে বড় মাপের সকল সরকারী দপ্তরেই দলীয় কর্মীদের আশ্রয় ও চাকুরি নিশ্চিত করা হয়েছে।
এইসব ঘটেছে বৈধ প্রক্রিয়াই- সকল রীতিনীতি মেনেই এইসব রাজনৈতিক অনাচার হয়েছে বাংলাদেশে। সেটা বিএনপির ১০ বছরের শাসনামলে যেমন ঘটেছে, ঘটেছে আওয়ামী লীগের ৫ বছরের শাসনামলে। সুতরাং তাদের নিজস্ব অন্ধকার ইতিহাসকে তারা স্মরণ করেই ভাবছে এই নির্বাচন কমিশন হয়তো হয়রানির জন্যও কারো কারো প্রার্থীতা বাতিলের সিদ্ধান্ত গ্রহন করবে।
বিএনপি এর আগে তিন নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবি উত্থাপন করেছিলো। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছিলো, তিনি আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রাপ্ত এবং আওয়ামী লীগেকে বাড়তি সুবিধা দিতে পারেন কারণ ১৯৭০এর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তিনি তৎকালীন সরকারের হয়ে কাজ করেছিলেন। সে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিপুল ভোটে জয়লাভ করেছিলো। অবশ্য খন্দকার দেলোয়ার হোসেনকে দেখলেই আমাদের রাজনীতির নোংরামি দেখা হয়ে যায়।
এই মদ্যপ মানুষটিই সংসদে কোনো একটি এলাকার মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে এ কথা ভাবলেই মনটা বিষিয়ে যায়। তার মাতাল প্রলাপের উপরে কিছু বলা উচিত নয় তবে নির্বাচনকালীন সময়ে তার অনেক মাতাল প্রলাপ শুনতে হবে।
আপাতত এই অভিযোগ শুনে বাক্যহত। তবে গতকাল যখন নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হলো চুড়ান্ত ভাবে, যেহেতু বৃহৎ দুই দলের ভেতরে কোনো সমঝোতার সম্ভবনা নেই সুতরাং সরকার তার নিজস্ব ঘোষিত সময়েই নির্বাচন করবে- এই ঘোষণা আসবার পরে চার দলীয় জোটের মানুষের প্রতিক্রিয়া দেখেও আশ্চর্য হলাম। তারা বলছে তারা ২৮শে ডিসেম্বরেও নির্বাচনের জন্য আগ্রহী ছিলো, যদিও বোঝা মুশকিল, মাত্র ১০ দিনের ব্যবধানে কিভাবে একটি দেশের সামগ্রীক কাঠামো বদলে নির্বাচনের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হয়ে যাবে।
বিষয়টি চার দলীয় জোটের নির্বাচনমুখী কর্মীদের সান্তনার জন্যই বলা হয়েছে যেনো তারা এটা না ভাবতে পারে যে পরাজয়ের ভয়ে চার দলীয় জোট নির্বাচনে অংশগ্রহন করে নি,বরং তাদের আগ্রহের কমতি ছিলো না, হুট করেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিশেষ একটি রাজনৈতিক দলকে বাড়তি সুবিধা দেওয়ার জন্যই এই কাজটি করলো।
যদিও বিএনপি দলীয় ভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহন করতে এখনও অনাগ্রহী তবে আগামি ৫ দিনে তাদের অবস্থান বদলাতেও পারে, মনোনয়নপ্রত্যাশী সবাই তাদের নিজেদের শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ উত্তোলন করেছেন। তারা যে নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত নির্বাচনে অংশগ্রহন করবার ন্যুনতম যোগ্যতা ধারণ করে এটার জন্যই বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্টার অফিসে দলীয় কর্মীদের ব্যস্ত আনাগোনা। মনোনয়ন প্রত্যাশীদের সনদ গ্রহনের চাপে বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যসব স্বাভাবিক কাজ ব্যহত হচ্ছে।
বিএনপি নির্বাচন বয়কট করলেও বিএনপি এই নির্বাচনকে কোনোভাবেই প্রতিহত করতে পারবে না।
সরকার ইতিমধ্যই ঘোষণা দিয়েছে এই নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য যতটুকু করা প্রয়োজন ততটুকু তারা করবে। সহিংস দলীয় কর্মীদের দিয়ে নির্বাচন বানচাল কিংবা ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার ক্ষেত্রে বাধা দানের কোনো ঘটনা ঘটবে না ১৮ই ডিসেম্বর। মরিয়া বিএনপি যেকোনো মূল্যেই চাইবে জামায়াত তাদের সাথে থাকুক। এই নির্বাচনে জামায়াত অংশগ্রহন করলে বিএনপি নির্বাচন পরবর্তী সময়েও নির্বাচিত সরকারের বিরুদ্ধে তেমন বড় আন্দোলন সহসা গড়ে তুলতে পারবে না।
যদি এই নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহন না করে তবে সামগ্রীক ক্ষতি হবে এই দলটিরই। বিগত ৭ বছর জামায়াতের হাতের পুতুল হয়েছে নেচেছে বিএনপি এবং ছাত্রদল। জামায়াত তাদের রাজনৈতিক পুনর্গঠনের সমাপ্তি করেছে বিএনপির আঁচলের নীচে বসে। এবং জামায়াত মোটামুটি ৩০০ আসনেই কাদের মনোনয়ন দেওয়া হবে সেটা ঠিক করে রেখেছে। একই ভাবে জাতিয় পার্টিও ৩০০ আসনে প্রার্থী প্রায় ঠিক করে রেখেছে। আওয়ামী লীগ ৩০০ আসনে প্রার্থী চুড়ান্ত করেছে।
যাদের ক্ষেত্রে ৯১ ধারা ব্যবহৃত হতে পারে এমন আশংকা রয়েছে তাদের মনোনয়ন দেয় নি দলটি। বিএনপির কর্মীরা নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত হলেও এর নেতৃবৃন্দ এখনও তেমন কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহন করে নি।
যদি তত্ত্বাবধায়ক সরকার স্বাভাবিক এবং সুন্দর উপায়ে ক্ষমতা নির্বাচিত রাজনৈতিক দলের হাতে হস্তান্তর করতে চায় তবে তাদের উচিত হবে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোকে নির্বাচনে অংশগ্রহনে উৎসাহী করা। তারা চার দলিয় জোট ছেড়ে আসলে পরবর্তী সংসদ নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত তেমন বড় মাপের আন্দোলন হবে না দেশে।
বিএনপি নিশ্চিহ্ন হবে না বাংলাদেশ থেকে, তবে বিএনপির পুনর্গঠনে অনেকটা সময় লাগবে। নতুন নেতৃত্ব এবং নতুন কর্মী সংগ্রহ করে দলটি পুনরায় উঠে দাঁড়াবে। এবং জামায়াতকে বর্জন করেই নিজের ক্ষমতায় উঠে দাঁড়াবে, এই বিষয়ে আমি নিশ্চিত।
এই নির্বাচন মূলত অনেকগুলো প্রশ্নের সমাধান করবে এবং অনেকগুলো নতুন সমীকরণ উস্কে দিবে। বাংলাদেশের সামনে এখন বিব্রতকর একটি পরিস্থিত। যদি সুষ্ঠ এবং নির্বিবাদী ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রচেষ্টা নেওয়া হয় তবে সেটাও এক কথায় হিতে বিপরীত হবে। বাংলাদেশকে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের অস্তিত্ব স্বীকার করে নিতে হবে , স্বীকার করতে হবে যাদের যুদ্ধাপরাধী চিহ্নিত করা হচ্ছে সেই জামায়াত আদতে বাংলাদেশের একটি রাজনৈতিক দল। তাদের সকল রাজনৈতিক অধিকার প্রদান করতে হবে।
ক্ষতিগ্রস্থ বিএনপির অবস্থান কি হবে যদি জামায়াত একক ভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহন করতে আগ্রহী হয়? তারা নিজেদের ক্ষীণ এবং দুর্বল অবকাঠামো দিয়ে ফেব্রুয়ারী মাসে আন্দোলন গড়ে তুলতে পারবে।
সমস্যা হলো সাধারণ মানুষও এখন নির্বাচন চাইছে। তারা চাইছে সকল দলই অংশগ্রহন করুক এই নির্বাচনে। বিএনপি উটকো দাবি তুলে এই নির্বাচনে অংশগ্রহনের বিপক্ষে- এই অবস্থান থেকে যদি তারা সরকার নামানোর আন্দোলনে যেতে চায় তবে সাধারণ মানুষ কি এই আন্দোলনকে সমর্থন দিবে?
বিএনপি কিংবা চার দলীয় জোট যারা নির্বাচন বয়কটের পক্ষে- তারা কি উপলব্ধি করছে এই সিদ্ধান্তটি আসলে প্রচলিত জনমতের বিপক্ষে যাওয়া একটি সিদ্ধান্ত।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

