এখন পর্যন্ত ঘোষিত নির্বাচনের ফলাফল সম্পূর্ণ অভাবনীয়, প্রত্যাশিত ছিলো চার দলীয় জোট পরাজিত হবে, তবে পরাজয়ের ব্যবধানটা এমন আকাশ-পাতাল হবে এটা প্রত্যাশিত ছিলো না।
বিএনপি কেনো পরাজিত হলো, এটার খতিয়ান খুলতে গেলে অন্তত হাজার পাতার খতিয়ান খুলতে হবে, তবে প্রশাসনিক ব্যর্থতা এবং দুর্নীতি ও সন্ত্রাস দমনে ব্যর্থতাই হয়তো প্রধান অক্ষমতা বিবেচিত হবে। এর সাথে আরও যুক্ত হতে পারে অভিযুক্তদের কিংবা যারা অপরাধী তাদের মনোনয়ন দেওয়ার বিষয়টি।
আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট বিজয়ী হয়েছে, বিপুল ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছে এবারের নির্বাচনে, তবে শেখ হাসিনা সমর্থকদের বিজয় মিছিল কিংবা উল্লাস প্রকাশ করতে নিষেধ করেছন, অবশ্যই আওয়ামি লীগ বিশাল ভাবে উদযাপন করবে এই বিজয়, তবে এই বিজয় আওয়ামি লীগের কাঁধে অনেক বড় একটা বোঝা চাপিয়ে দিলো।
আমি মোটেও আনন্দিত নই এই ফলাফলে, বিশেষত বাংলাদেশের সংবিধানের একটি অদ্ভুত সংশোধনী রয়েছে, দলীয় মতের বিরোধিতা করে দলের কোনো প্রস্তাবে ভেটো কিংবা বিপক্ষচারণ করিলে সাংসদের সদস্যপদ বাতিল বলিয়া গন্য হবে। এটা সংশোধন করা প্রয়োজন। যদি কার্যকর সংসদ তৈরি করতে হয় তবে সংবিধানকে সংশোধন করে এই ধারাটা মুছে ফেলতে হবে।
দলের বিরোধিতা করা স্থানীয় জনগণের কথা প্রকাশ করে কিংবা তাদের মুখপত্র হয়ে সংসদে কিছু উপস্থাপন করতে গিয়ে যদি সেটা দলীয় সিদ্ধান্তের বিরোধিতার পর্যায়ে চলে যায় তবে সেই স্থানের জনগণের মতামত প্রতিফলিত হবে না সংসদে।
এর বাইরেও যদি মহাজোটের প্রার্থীরা সংসদের তিন ভাগের দুই ভাগ দখল করতে পারেন, তবে বিরোধী দলের তোয়াক্কা না করেই তারা নির্বিচার সংসদীয় সন্ত্রাস চালাতে পারবেন। যেহেতু সব সাংসদই বংশবদ এবং দলীয় সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করতে পারবে না সুতরাং সরকারী যেকোনো প্রস্তাব বিনা বাধায় অনুমোদিত হবে। এমন কি যথার্থতা যাচাই না করেই অনুমোদিত হতে পারে, এমন নৈরাজ্যিক সংসদ আদতে কার্যকর কোনো সংসদ হবে না।
প্রকাশিত ফলাফল বিএনপি গ্রহন করবা না কি বর্জন করবে এটা আগামিকাল দুপুরে জানা যাবে, তবে অনেকগুলো আসন, অন্তত ২০টি আসনের ফলাফল পুনঃমূল্যায়ন করা প্রয়োজন। আমার মনে হয় যেসব আসনে নির্বাচিত প্রার্থী এবং পরাজিত প্রার্থীর ভেতরে প্রাপ্ত ভোটের ব্যবধান ৫ থেকে ১০ হাজারের কাছাকাছি, সেইসব আসনের ভোটকেন্দ্রে অনিয়ম কিংবা ঘাপলা হয়েছে কি না এটা যাচাই করা প্রয়োজন।
প্রতিটা আসনেই এমন করা উচিত হবে না, কিন্তু যেখানে পরাজয় সামান্য ব্যবধানে সেখানে এই যাচাই-বাছাই হওয়া উচিত। এই দাবি বিএনপি করতে পারে, এবং আমার মনে হয় এই দাবিটা করা উচিত। বিএনপি সকাল থেকেই অবশ্য ভোটগ্রহনে বাধা দেওয়া, ইচ্ছাকৃত দেরী করিয়ে দেওয়া কিংবা মিডিয়া ক্যু এর বিষয়ে আলোচনা করছে। গত রাতে প্রকাশিত এবং প্রচারিত সংবাদে ভোট কেনা বেচার সংবাদে ৪ দলীয় জোটের প্রার্থীদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ এবং ক্রস ফায়ারে একজন নিহত হওয়া ফলাফলকে সামান্য হলেও প্রভাবিত করেছে।
আমি আনন্দিত, অন্তত এখন পর্যন্ত জামায়াত একটি সংসদীয় আসনেও বিজয়ী হয় নি। যদিও এটার গণতন্ত্রীয় অর্থ মানুষ ধর্মীয় রাজনীতিকে উপেক্ষা করেছে, তবে কথাটা সর্বৈব মিথ্যা। আদতে গণতন্ত্র সীমিত ব্যবধানে একটি রাজনৈতিক এজেন্ডা দ্বারা অন্য একটি রাজনৈতিক এজেন্ডার পরাজয়। জামায়াতের ভোট ব্যংক বাড়ে নি, তাদের নিবেদিত প্রাণ কর্মীরা অনেক চেষ্টা করেও মুজাহিদ কিংবা নিজামীর পরাজয় ঠেকাতে পারে নি, পারে নি রাজশাহীতে তাদের প্রার্থীর পরাজয় ঠেকাতে। ব্যপক শো ডাউন আর ভয়-ভীতি প্রদর্শন করেও তারা জয়ী হতে পারে নি এমন আসনের সংখ্যা ৫।
তবে বাংলাদেশের মানুষ ধর্মীয় রাজনীতিকে প্রত্যাখ্যান করে নি, বরং গত ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত যে অব্যবস্থা চলেছিলো কিংবা উন্নয়ন স্থবিরতা ছিলো, সেটার বিপক্ষে মতামত প্রদান করেছে জনতা।
খুশীর সংবাদ রাশেদ খান মেনন কিংবা ইনুর বিজয়, তারা খুব বড় কোনো পরিবর্তন আনতে পারবে না রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে তবে সংসদে অন্তত জনতার প্রত্যাশা মতো এমন কিছু বাম ঘেঁষা মানুষ গেলো যাদের উপরে অনেক ভরসা রেখেছে মানুষ গত ২ বছরে। আওয়ামি লীগ মূলত মধ্যপন্থী এবং জোতদারদের সমর্থক দল, তারা কিংবা বিশ্বের অধিকাংশ রাষ্ট্রের নির্বাচিত প্রধানেরাই মূলত বনিক শ্রেণীর প্রতিনিধি। তাদের দেখাশোনা করাই এদের মূল দায়িত্ব।
এরপরও আশাবাদী হয়ে উঠতে চাই, আওয়ামী লীগ এবং তাদের কর্মীরা ১৯৯৬ থেকে ২০০১ এ যেই ভুলগুলো করেছিলো, সেই ভুলের পুনরাবৃত্তি করবে না। আশা করবো শেখ হাসিনা তার নির্বাচনী ইশতেহার এবং পথসভায় যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, সেসব পুরণে তার আন্তরিক প্রচেষ্টা থাকবে। আওয়ামী লিগের নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করা হয়েছে এমন লক্ষ্য নিয়ে যেনো জনগণ তাদের দ্বীতিয় মেয়াদেও নির্বাচিত করে, এবং এ জন্য আওয়ামী লীগ সালওয়ারী যে রূপরেখা তুলে ধরেছে, তাতে নির্বাচনের বছরের হিসাবও আছে।
সবার জন্য স্নাতক পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষা প্রদানের মতো অর্থনৈতিক কাঠামো বাংলাদেশে তৈরি হবে এমনটা আমি বিশ্বাস করি না, তবে আশা করবো মানুষ যেনো অন্তত নিজস্ব জীবিকা নির্বাহ এবং নিজস্ব স্বাধীন মতামত গড়ে তউলবার মতো বাস্তবতা শিক্ষায় শিক্ষিত হয়।
বিএনপি এই পরাজয় থেকে কি শিক্ষা নিবে আমি জানি না, তবে বিএনপির নেতৃবৃন্দকে অন্তত উপলব্ধি করতে হবে, ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের সাথে জোট করে তারা মধ্যপন্থা থেকে যেভাবে বিচ্যুত হয়ে কট্টর ডানপন্থী দলে পরিনত হয়েছিলো, যেভাবে তাদের নেতাদের ভেতরে ধর্মীয় গোঁড়ামি প্রবেশ করেছিলো এইসব বাহ্যিক কারণে অনেক মধ্যপন্থী ভোটার, যারা বিএনপিকে মৌন সমর্থন দিতো, ধর্মীয় সন্ত্রাস এবং জঙ্গীবাদ দমনে দুর্বলতা তাদের এই ভোটারগুলোকে বাধ্য করেছে আওয়ামী লিগের প্রার্থীকে ভোট দিতে। এমন কি জামায়াতের সাথে গাঁত বেধে বিএনপির যতটুকু ক্ষতি হয়েছে, তার চেয়ে বেশী লাভবান হয়েছে জামায়াত। জামায়াত ক্যান্সারের মতো বিএনপির শরীরে বাসা বেধে বিএনপিকে ধ্বংস করে দিয়েছে।
নেতৃত্বের পরিবর্তন না করে তারা যদি দলীয় মনোভাব এবং দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করে তবে তারা অন্তত এমনজঘন্য ভাবে পরাজিত হবে না ভবিষ্যতে। বরং ২০১৪ সালের নির্বাচনে তারা বিজয়ী হতেও পারে।
সুখি সুন্দর ডিজিট্যাল বাংলাদেশে স্বাগতম।
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে ডিসেম্বর, ২০০৮ সকাল ৯:৪৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


