জামায়াতের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্ধ কোনো যুদ্ধাপরাধ করেন নি, ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীকে পাকিস্তানে পাঠানোর পরে বাংলাদেশে কোনো যুদ্ধাপরাধী নেই, কিন্তু বাংলাদেশে এখনও দালাল আইন বলে একটি আইনের অস্তিত্ব আছে, এবং বাংলাদেশের ভুখন্ডে যারা পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর সমর্থনে কাজ করেছে, যেমনটা করেছে জামায়াতের মজলিশের সুরার সদস্যগণ, তাদের বিচার করবার জন্য দালাল আইন এখনও বিদ্যমান।
১৯৭২ সালের ২৪শে জানুয়ারী সোম বার বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে দালাল আইন অধ্যাদেশ জারী করেন। এই দালাল আইন অধ্যাদেশের সূচনায় বলা হয়েছিলো, যেহেতু কতিপয় মানুষ দখলদার পাকিস্তানী সেনাবাহিনীকে প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ ভাবে সহযোগিতা দিয়েছে তাদের এই ঘৃন্য বর্বর নৃশংস আগ্রাসনে এবং যেহেতু তাদের এই মৌখিক, সক্রিয় এবং পরোক্ষ সহযোগিতায় ২৬শে মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণায় সৃষ্ট বাংলাদেশের রাষ্ট্রের উপরে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর অবৈধ দখলদারিত্বের ব্যপ্তি বৃদ্ধি পেয়েছে এবং যেহেতু বাংলাদেশের অভ্যন্তরে গঠিত এইসব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সমর্থক দলের কারণে এই দেশের জনগণের জান মাল ও সম্ভ্রম লুণ্ঠিত হয়েছে সুতরাং তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহনের নিমিত্তে এই বিশেষ অধ্যাদেশ জারী করা হলো।
সেখানে নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে ছাড় দেওয়া হয়েছে, যেমন, সে সময়ে প্রচলিত আইন অনুসারে যারা নিজের পেশাগত দায়িত্ব পালনে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী কিংবা পাকিস্তানী আমলাতন্ত্রের চাকুরিরত বাঙ্গালী হিসেবে পাকিস্তান সরকারের আদেশে কর্মরত ছিলেন তাদের এই আইনের আওতায় পড়তে হবে না, তবে ব্যতিক্রম তারা, যারা তৎকালীন প্রচলিত বিধিমোতাবেক পাকিস্তানী আমলাতন্ত্র, ও পাকিস্তানী প্রশাসনের অধীনে কর্মরত থাকা স্বত্ত্বেও যাদের কর্মকান্ডে এই দেশের নিরীহ মানুষের জীবন বিপন্ন হয়েছে কিংবা তাদের কর্মকান্ডে এই দেশের মানুষের জান মাল ও সম্ভ্রম লুণ্ঠিত হয়েছে কিংবা এই কাজে তাদের অংশ গ্রহনে এ দেশের নাগরিকদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়েছে, তবে এই সব মানুষদের দালাল অধ্যাদেশের অধীনে নিযুক্ত বিশেষ ট্রাইবুনালে বিচার করা যাবে।
অপরাধের বর্ননা এই টুকুই। একজনকে দেখলাম যুদ্ধাপরাধীর সংজ্ঞা খুঁজে হয়রান। তাকে বলবো একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি রচিত একাত্তরের যুদ্ধাপরাধ এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বইটি পড়তে। সেখানে দালাল আইনের বিস্তারিত দেওয়া আছে।
সেখানে অপরাধের বর্ণনায় যা দেওয়া আছে-
যদি কোনো ব্যক্তি এমন কি সক্রিয় ভাবে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর অবৈধ দখলদারিত্বকে সমর্থন করে কিংবা তাদের পক্ষে কাজ করে তবে তাদের বিচার হবে- এবং এই সক্রিয় মৌখিক সমর্থনের ব্যপ্তি শুধুমাত্র বাংলাদেশের সীমিত ভুখন্ডে নয়, বরং বিশ্বের যেকোনো স্থানেই যদি কোনো মানুষ পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর সপক্ষে জনমত সংগঠিত করে এমন কি তাদের উপকারে আসতে পারে এমন কোনো কাজ করে তবে সে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর দোসর কিংবা সমর্থক কিংবা দালাল।
এবং তাদের বিচারের জন্য দালাল আইন রয়েছে।
এখন কথা হলো মতিউর রহমান নিজামী, কামরুজ্জামান, মুজাহিদী কিংবা গোলাম আজম পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর দালাল কি না? এটার উত্তর কিংবা সাক্ষ্য দিবে দৈনিক সংগ্রাম ১৯৭১ সংখ্যাগুলো। সেখানে মতিউর রহমান নিজামীর ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্য আছে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর সমর্থনে, আছে গোলাম আজমের বক্তব্য, এমন কি ১৯৭১ সালের পরবর্তীতে গোলাম আজম বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গিয়ে পূর্ব পাকিস্তান পুনরুদ্ধার কমিটি করে যে চাঁদা গ্রহন করেছিলো সেটাও বিবেচনায় আনা যাবে।
মুজাহিদীর কর্মকান্ড, তার বক্তব্য এবং তার রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই, সেটা প্রথম দালাল আইন অধ্যাদেশের আওতায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এমন কি পাকিস্তানী সেনাবাহিনী বাংলাদেশ দখল করে থাকবার সময় যদি বাংলাদেশের কোনো ব্যক্তি তাদের অধীনে কোনো নির্বাচনে অংশগ্রহন করতে চায় এমন কি নমিনেশন পেপার সাবমিট করে তবে তাকেও দালাল হিসেবে চিহ্নিত করে তার বিচার করা যাবে এই আইন অনুসারে।
কারো বিরুদ্ধে এই অভিযোগ থাকলে বাংলাদেশের প্রশাসন বিনা ওয়ারেন্টে তাকে গ্রেফতার করে ৬ মাসের জন্য কারান্তরীন রাখতে পারে, এই সময়ে তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের তদন্ত হবে। মুজাহিদী কিংবা নিজামী কিংবা গোলাম আজমের জন্য সমস্যা নেই, এদের জন্য আদতে তদন্ত করবারও প্রয়োজন নেই, পেপার কাটিং উপস্থিত।
কামরুজ্জামানের বিরুদ্ধে থানায় মামলা হয়েছিলো, সেটা মুনতাসির মামুনের একটি প্রবন্ধে মামলার নাম্বার সহ লিখিত আছে। এবং দালাল আইনের একটি বিশেষ বিধি হলো, যেহেতু পাকিস্তানী সেনাবাহিনী এবং তাদের দোসরদের বর্বরতা ও নৃশংসতায় এমন পরিবারও রয়েছে, যাদের প্রায় সকল সদস্যই নিহত হয়েছে এবং এমন অনেক বর্বরতার ঘটনা রয়েছে সেগুলোতে সাক্ষীর প্রচন্ড অভাব, তাদের ক্ষেত্রে একজন বিশেষ ব্যক্তিই সাক্ষ্য দিলেই সেটা প্রমাণ হিসেবে গণ্য হবে।
১৯৭৫ সালের ৩১শে ডিসেম্বর জিয়াউর রহমানের নির্দেশে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি দালাল আইন রদ করবার আগ পর্যন্ত এই অধ্যাদেশের অধীনে স্থাপিত বিশেষ আদালতে যুদ্ধাপরাধের বিচার হচ্ছিল। এবং এখানে প্রথম মৃত্যুদন্ড প্রাপ্ত রাজাকার সদস্য ছিলো চিকন আলী।
তবে ৩১শে ডিসেম্বর ১৯৭৫ এর পর থেকে এই আইনের অধীনে কোনো বিচার চালানো যাবে না এবং এই আইনের আওতায় আটক সকল ব্যক্তির বিরুদ্ধে চলমান বিচার প্রক্রিয়াকে রদ করবার ফলে রাতারাতি অভিযুক্তরা মুক্তি পায়।
এবং কারা কারা এই আইনের অধীনে বিচারাধীন ছিলো, সেটার অনেক দলিল সচেতন ভাবে মুছে ফেললেও হয়তো এখনও কিছু নথি পাওয়া যাবে।
আর যেহেতু ট্রাইব্যুনালের সকল কাগজ ধ্বংস করা সম্ভব হয় নি সুতরাং এখনও খুঁজে পাওয়া সম্ভব সবই। শুধু আমরা আন্তরিক থাকলেই এটা সম্ভব।
সুতরাং যেই ব্যক্তি আপাতত প্রমাণ চেয়ে নাকি কান্না কাঁদছেন, তার কান্নার প্রয়োজন নেই, সংগ্রামের সংবাদে যে তথ্য আছে তা দিয়ে দালালীর অভিযোগে অন্তত ১০ বছরের কারাদন্ড দেওয়া যাবে জামায়াতের মজলিশে সুরার অধিকাংশ সদস্যকে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

