অনুরোধ, যারা ১৮+ সম্পূর্ণ মডারেশনবিহীন একটি অংশ চান সামহোয়্যারে যেখানে কতৃপক্ষ কোনো খবরদারি করবে না এবং সেখানে প্রতিটা লেখকই নিজের লেখা ও মন্তব্যের দায় বহন করবে, তারা এখানে সহমত জানিয়ে যাবেন।
সম্ভবত ২০০৬ এর ফেব্রুয়ারী কিংবা মার্চ মাসের ঘটনা, মাসুদা ভাট্টি তখনও নিয়মিত লিখতো সামহোয়্যার ইনে। তরবারীর ছায়াতলে উপন্যাসের একটি কিংবা দুটি অংশ এখানে প্রকাশিত হয়েছিলো।
সামহোয়্যারের প্রথম প্রত্যক্ষ মডারেশন, পোষ্ট মোছা এবং স্থগিত হওয়ার ঘটনাটা ঘটে তখনই। ধর্মীয় অনুভুতিতে আঘাত হানবার অভিযোগে যে উপন্যাসের অংশবিশেষ ব্লগ থেকে মুছে ফেলা হলো, সেই উপন্যাসটি প্রকাশিত হয়েছিলো ২০০৭ এর বই মেলায়, এবং বাংলাদেশের টেকিমোল্লাদের আশংকাকে মিথ্যা প্রমাণিত করে এই বইটি নিয়ে কোনো বিতর্ক উঠে নি। এমন কি বইটির প্রকাশনা নিষিদ্ধ করবার দাবি উঠে নি, লেখিকাকে মুরতাদ ঘোষণা করা হয় নি।
ঘটনাটা উল্লেখযোগ্য এই কারণেই যে, বাইনারি প্রক্রিয়ায় ভাবতে অভ্যস্ত টেকিমোল্লা, যারা ০ আর ১ এর বাইরে অন্য কিছুর অস্তিত্ব সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নয়, তাদের কল্পিত সাম্ভাব্য ধর্মীয় অনুভুতিতে আঘাত লাগবার মতো মুর্খ নয় বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ। মানুষের ধর্মানুভুতিকে আহত করতে পারে ধারাবাহিক প্রচারণা, এবং এই প্রচারণা করে ধর্মীয় রাজনৈতিক দলগুলো।
খুবই আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই বইটি নিয়ে এত বিতর্ক হলো, জামায়াতে ইসলামীর কতিপয় নেতা-কর্মী, যারা প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ প্রভাব খাটিয়ে এই লেখাটিকে হাপিশ করে দিলো, তাদের প্রচারমাধ্যম হিসেবে বিবেচিত পত্রিক দুটিতে এমন কি, সোনার বাংলা পত্রিকার সম্পাদক এবং বর্তমানের জামায়াতের নেতা কামরুজ্জামানের দুই ছেলে এখানে এই বিষয়ে বিতর্ক করবার পরেও এমন কি সোনার বাংলায় এই উপন্যাসের বিরুদ্ধে বিরুপ কোনো বক্তব্য প্রকাশ পায় নি। উপন্যাসটি প্রকাশিত হয়েছে, যারা এটা নিয়ে গলাবাজি করেছে তারাও অন্তত প্রকাশিত উপন্যাসটি নিয়ে অন্তর্জালে যতটা সরব ছিলো, বাস্তবের পৃথিবীতে তারা ততটাই নিশ্চুপ ছিলো এই বিষয়টা নিয়ে।
লেখকের স্বাধীনতা ও স্বেচ্ছাচারিতা বিষয়ে স্পষ্ট সীমারেখা টেনে দেওয়া সম্ভব নয়, কট্টর ইসলামপন্থী ইমাম গাজ্জালী ঈমাণ বিষয়ে সব সময়ই শংকিত ছিলেন, এবং এই কট্টরপন্থা সব সময়ই সাধারণের কল্যানমুখী ভাবনা দিয়ে জায়েজ করে নেওয়ার একটা প্রবণতা তার ভেতরে ছিলো।
আমাদের মতো এলেমদার মানুষের ঈমান এতে নষ্ট হবে না কিন্তু সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হতে পারে, সুতরাং কতল করো বিরুদ্ধবাদীদের। যারা প্রশ্ন উত্থাপন করে, যারা কতৃত্ব নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে তাদের শক্ত হাতে দমন করো।
এই নীতিতে পরিচালিত হত্যাগুলোর কয়েকটা আছে নুরুজ্জামান মানিকের লেখায়, তার কয়েকটা লেখা সামহোয়্যারেও প্রকাশিত। কতৃপক্ষীয় হস্তক্ষেপ এবং কতৃপক্ষীয় হামবাগ আচরণের কোনো প্রয়োজনীয়তা আমি বোধ করি নি সে সময়েও যখন আমাকে কতল করা হবে হুমকি দেওয়া হলো সামান্য ব্লগে নিজের মনোভাব প্রকাশ করবার জন্য। অতিরিক্ত স্পর্শ্বকাতর এবং অতিরিক্ত সহানুভুতিশীল বাইনারি পন্থায় ভাবা মানুষের সংখ্যা কম নয়, যারা সাধারণের কল্যানমুখী ভাবনায় বিরুদ্ধবাদীতাকে দমন করতে চায়, যারা আন্দোলনে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বিবেচনায় সকল মতকে দমন করে শুধুমাত্র একটি মতকেই আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চায়, এমন মতাদর্শিক শুদ্ধতা কিংবা শূঁচিবায়িতা আদতে কোনো কাজের বিষয় নয়।
কতৃপক্ষ যখন প্রকাশ্যে আম -ব্লগারের কল্যান বিবেচনা করে প্রকাশের পথকে রুদ্ধ ও দমন করতে সচেষ্ট তখন যেকোনো বিরুদ্ধাচারণ লেখকের স্বাধীনতাকে ক্ষুন্নই শুধু করে না, এমন কি তার লেখাকে মুছে দিতে পারে সাধারণের কল্যান বিবেচনায়।
যারা ড্রাইং রুমে বসে বস্তিবাসী জীবনের দুঃখ-কষ্ট নিয়ে হাহাকার করে এবং বস্তিবাসীদের নিজস্ব জীবনের স্বরগুলোকে নেহায়েত অশালীন বিবেচনা করে, তাদের শুদ্ধাচারিতা নিয়ে আমার সব সময়ই সংশয় রয়েছে। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মুখের ভাষা, ততটা সুশীল নয়, অন্তত আমি যতজনকে চিনি, তাদের কেউই ঠিক সুশীল হওয়ার প্রক্রিয়াকে সমর্থন করে না, অন্তরঙ্গ আলাপচারিতায় কিংবা সাধারণের সাথে সংযোগের সময় তাদের সাধারণ বুলিতে তেমন সুশীলতা থাকে না, রাবিন্দ্রিকতা থাকে না। রাজনৈতিক ভাবে শুদ্ধ এবং সঠিকপন্থী কোনো সাধারণ মানুষ নেই। সাধারণ মানুষ সাধারণ মানুষের দোষগুণ সমেত সাধারণ মানুষ।
এখানে যারা ব্লগিং করে, যারা মূলত সারা বিশ্বেই ব্লগিং করে, খুব বেশী হাইলাইটেড হয়ে উঠবার আগে, তারা সাধারণ মানুষ। সাধারণ মানুষের সাধারণ কথা, সাধারণ মত প্রকাশের অবাধ স্বাধীনতাকে ধারণ করে ব্লগ।
মানুষ নিজের মনের অনভুতি অন্য সবার সাথে বিনিময় করতে পারছে এখানেই ব্লগের স্বার্থকতা , এবং এ কারণেই হু হু করে বাড়ছে ব্লগিং।ব্লগারের সংখ্যাও বাড়ছে প্রতি দিন।
সোশ্যাল ব্লগিং কিংবা ক্লোজডোর ব্লগিং শব্দগুলো শুধুমাত্র বিচ্ছিন্নতার ধারণা জন্ম দেয়। কর্পোরেট রেস্পন্সিবিলিটি কিংবা তথাকথিত সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার বিবেচনা করে মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে পদে পদে ক্ষুন্ন করা কতৃপক্ষীয় হস্তক্ষেপ ব্যতিরকেই ব্লগস্পট চলছে। মাইস্পেস কিংবা ফেসবুকেও এমন কতৃপক্ষীয় হস্তক্ষেপ নেই। নিজের পাতায় নিজের মতো সাজিয়ে রাখা এবং নিজের ভাবনার অবাধ প্রকাশ রয়েছে বলেই সেই সাইটগুলোর ভিজিটর বাড়ছে, বাড়ছে ব্যবহারকারী।
তবে বাংলাদেশের মানুষ একটু শিক্ষিত হলে, একটু চাকচিক্য কিংবা চেকনাই বাড়লেই তারা সাধারণের মতের উপরে খবরদারি শুরু করে দেয়। একটু শিক্ষিত হলেই তাদের মনে হয়, তারা যা ভাবে কিংবা যা বিবেচনা করে সেগুলো সাধারণ মানুষ নেহায়েত অশিক্ষিত বলেই উপলব্ধি করতে পারছে না, এবং এই উচ্চমন্যতার কারণে তারা অহেতুক সামাজিক শৃঙ্খলার দায় তুলে নেয় নিজের কাঁধে।
সামহোয়্যারের কতিপয় ব্যবহারকারী এই শিক্ষিত মানুষের কাতারে, সুতরাং, তারা এই কাঁটছাট, এই মডারেশনের আঁওতায় নিরাপদ বোধ করে, ভাবনাকে রুখতে রুখতে এরা এমনই ভাবনাভীরু, যে নিজের ডায়েরিতেও অবাধে নিজের মনোভাব প্রকাশ করতে পারে না। সেখানেও অদৃশ্য একটা দেয়াল তুলে রাখে।
এবং এদের প্ররোচনা এবং সহযোগিতায় এখানে যখন মডারেশন শুরু হলো, সেই কতৃপক্ষও নিজেকে সাধারণের কলয়ানে নিয়োজিত করেছে।
মাসুদা ভাট্টির ঘটনা থেকে আমার উপলব্ধি হয়েছিলো, অনেকেই নিজের ভাবনা প্রকাশ করতে নিরাপদ বোধ করেন না, অনেকেই বিরুদ্ধাচারণকে নিজের উপরে আক্রমন মনে করেন, অনেকেই সমালোচনাকে সহ্য করতে নারাজ, সারাক্ষণ প্রশংশিত হতে হতে অজান্তেই তাদের নিজের উচ্চমন্যতা এমন একটা জায়গায় পৌঁছে যায় যে তাদের মতের বিরুদ্ধ অবস্থানও যে সমান মাপের নৈতিক এবং সঠিক অবস্থান হতে পারে, এটা তারা সযত্নে অস্বীকার করে।
মাসুদা ভাট্টির হারিয়ে যাওয়া লেখা কতৃপক্ষ ফিরিয়ে দিতে পারে নি, আমি নিজে এই কতৃপক্ষীয় স্বেচ্ছাচারিতাকে সমর্থন করতে পারি নি, সুতরাং আমি সে সময়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম আমি নিজে দুই দিন ব্লগ লিখবো না। পরবর্তীতে অনেকেই নিজ ইচ্ছায় ব্লগবিরতিতে গিয়েছিলো অহেতুক মডারেশনের বিরোধিতা করে।
মডারেশন আদৌ কি প্রয়োজনীয়? প্রাপ্ত বয়স্ক সাধারণ মানুষকে যদি কেউ নিয়মনীতি শেখাতে চায়, সেটা কতৃপক্ষের আভিজাত্যের প্রকাশ হয়ে দাঁড়ায়। কতৃপক্ষ যে সাধারণ মানুষের তুলনায় আলাদা একটা স্বত্ত্বা এই বোধটা সদাজগ্রত থাকে, এবং আমার ঘরে আমার নিয়মে চলতে হবে এমন একটা বাধ্যবাধকতা স্বীকার করেই এখানে লিখতে হয় নতুন লেখকদের।
সমস্যা হলো কতৃপক্ষীয় খবরদারীর সাথে কতৃপক্ষের স্বচ্ছতা না থাকা। এমন কি মডারেশন যখন ছিলো না, সেই প্রথম ছয় মাসে আমার স্মরণ নেই খুব বেশী অশালীন কিছু এখানে প্রকাশিত হয়েছিলো। খুব বেশী ব্যক্তিআক্রমনাত্মক ছিলো না আবহাওয়া, আম জনতার নিজস্ব বিবেচনাবোধ থেকেই সবাই একটা ন্যুনতম মাণ নির্ধারণ করে নিয়েছিলো।
আমি তোমার মতকে সমর্থন করতে না পারি কিন্তু আমি তোমার মত প্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য আমৃত্যু লড়াই করবো।
আরিল তার লেখায় এমনটাই জানালো। তবে বাস্তবে এই বক্তব্য মেনে চলবার কোনো লক্ষণ দেখালো না মডারেটরগণ। তারা কতৃপক্ষের স্বচ্ছতা দাবি করা লেখাগুলো প্রথম পাতা থেকে মুছে দিলো। সেটা কি মত প্রকাশের স্বাধীনতার সাথে সাযুজ্যতাপূর্ণ? মত প্রকাশ অর্থ শুধুমাত্র সহমত প্রকাশ নয়, এমন কি বিরুদ্ধমত প্রকাশ এবং সেটাকে রক্ষা করবাড় দায়িত্ববোধটাই মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সাথে চলে আসে।
অশালীন যৌনআগ্রাসী মন্তব্য, কিংবা সচেতন পিঠ চাপড়াচাপড়ি কোনোটাই কোনোভাবেই সামগ্রীক মানকে উন্নত করতে পারে না, কিন্তু যদি দুগ্ধপোষ্য শিশু বিবেচনা না করে প্রতিটা ব্লগারকে নিজের মতের দায়িত্ব নেওয়ার মতো যোগ্য বিবেচনা করতো কতৃপক্ষ, যদি ভাবতো যে মানুষটা এখানে লিখছে সে তার ভাবনার অবাধ প্রকাশ ঘটাচ্ছে এখানে, তবে এখানে মডারেশনের কোনো প্রয়োজন ছিলো না, কোনো কতৃপক্ষ বরাবর দাবিদাওয়া করবার মতো শিশুতোষ আচরণ করতো না ব্লগারেরা। আমরাও পরিপুর্ণ স্বাধীন একটা পরিবেশে লেখা প্রকাশ করতে পারতাম।
এবং সামগ্রীক ভাবে একটা মাণ নির্ধারণ হয়েই যেতো অবধারিত ভাবেই, এবং এটা নির্ধারিত হয়ে যাওয়ার পরে প্রতিটা ব্লগার অন্তত সাইটের চরিত্র বুঝেই নিজের স্বাধীনতাকে এই পরিবেশের ছাঁচে বাধাই করে নিতো।
আশা করি কতৃপক্ষ এই বিষয়টি বিবেচনা করবেন। অথবা যারা মডারেটেড হতে চায়, যারা কতৃপক্ষ বরাবর ছিঁচকাঁদুনি গাইতে আগ্রহী তাদের জন্য সংকলিত পাতা রেখে, যারা এই মডারেশন চায় না, তাদের জন্য আলাদা ১৮+ একটা অংশ চালু করতে পারেন। সেখানে যারা যাবে তারা নিশচিত হয়েই যাবে যে সেখানে যাই ঘটুক না কেনো, কতৃপক্ষ এটার দায়দায়িত্ব নিবে না।
একবার করে দেখেন। এখানে অধিকাংশ ব্লগার সেই মডারেশনমুক্ত পরিবেশেই লিখতে আগ্রহী হবে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


