হঠাৎ করেই সংবাদমধ্যমের সুর বদলে গেছে, গত পরশু গণমাধ্যমে যেভাবে বিডিআরদের ন্যায্য বিদ্রোহের কথা বলা হয়েছিলো, গতকাল বিডিআরদের অস্ত্র সমর্পনের পরে সেই সুরের তাল কেটে গেছে। এখন বিডিআরদের দুস্কৃতিকারী এবং উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্মম হত্যাকান্ডের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হচ্ছে।
সকাল বেলাই হঠাৎ অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম পিলখানা সরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের দখল থেকে চলে গেলো সামরিক বাহিনীর দখলে। যদিও নির্দেশনা ছিলো পুলিশ এবং র্যাবের তত্ত্বাবধানে থাকবে পিলখানা, কিন্তু পরপর ৪ ট্রাক সেনাসদস্য এবং সেনাপ্রধান ঢুকে গেলে পিলখানায়, তারা এরপরে মিডিয়া কর্মীদেরও পিলখানার ভেতরে প্রবেশ করতে দেয় নি।
সাহারা বেগম এর পরপরই সংবাদমাধ্যমে ভাষ্য দিলেন আর্মি টেকওভার সরাষ্ট্রমন্ত্রলায়ের সাথে আলোচনার মাধ্যমেই হয়েছে। সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তাদের নিহত হওয়ার বিষয়টা প্রশাসনের ভেতরে বিশাল নাড়া দিয়েছে, সবাই আতঙ্কে আছে এবং এই মুহূর্তে সামরিক বাহিনীকে ক্ষেপাতা চাইছে না।
আমাদের সঙ্ঘবদ্ধ যোদ্ধা যাদের হাতে ব্যপক মরনাস্ত্র আছে তাদের সাংবাদিক, রাজনৈতিক, সম্পাদক এবং সাধারণ মানুষ, সবাই ভয় পায়। এবং দীর্ঘদিন উর্দি দেখবার পরে এই ভয় কেটে গেলেও বিষাক্ত সাপ যেকোনো মুহূর্তে ছোবল দিতে পারে, এমন উত্তেজনায় সামরিক বিরোধিতাও করে।
গতকাল যখন মুক্তিপ্রাপ্তরা বাইরে বের হচ্ছিলো, তখন তাদের সামান্য সাক্ষাৎকার শোনা হয়েছে সংবাদমাধ্যমের কল্যানে।
যখন তারা জিম্মি অবস্থা থেকে মুক্তি পেয়ে জনপথে উদ্যত মাইক্রোফোনের সামনে তখন তারা বললেন তাদের উপরে তেমন অত্যাচার হয় নি, তাদের একসাথে আটকে রাখা হয়েছিলো।
ঠিক সেই মুহূর্তের সংবাদে আমরা জানলাম, দরবার হলেই প্রাথমিক পর্যায়ে সবাইকে হত্যা করা হয়, এই হত্যাকান্ডের প্রাথমিক পর্যায়ে যারা মৃত্যু বরণ করেন, তাদের বাইরে পরবর্তীতে অন্য কাউকে হত্যা করা হয় নি। এমন কি সাক্ষাৎকারে এটাও জানা গেলো, ২৫ তারিখ দুপুরের পর থেকে আর কাউকেই হত্যা করা হয় নি।
এবং এরপরে তারা সামরিক বাহিনীর তত্ত্বাবধানে চলে যান এবং পরবর্তীতে তাদের গণমাধ্যমের সামনের সাক্ষাৎকারের ভাষ্য বদলে যায়। এই ভাষ্য বদলানোটা অনুমিতই ছিলো। প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিশোধস্পৃহা চরিতার্থ করতে একটা গল্প তৈরি করতে হবে, এমন নৃশংস গল্প যা মানুষের মানবিকতার গভীরতা স্পর্শ্ব করবে এবং মোটা দাগে বাংলা ছবির মতো সরল সোজা ভালো খারাপের স্পষ্ট বিভাজনে বিভাজিত থাকবে।
এখন সেই প্রক্রিয়াই চলছে, আমরা বিভিন্ন নৃশংসতার সংবাদ পাচ্ছি। তারা আবেগের বশে এমন করে নি, বরং অনেক দিনের পরিকল্পনা এবং ক্ষোভ প্রকাশিত হয়েছে এই ঘটনায়। তারা খুবই ঠান্ডা মাথায় হত্যা করেছে, এটা হিট অফ দ্যা মোমেন্ট কিছু নয়
এই ঘটনা কিংবা এই গল্প তৈরি করে সামরিক বাহিনী তাদের ঠান্ডা মাথার হত্যাকান্ডগুলোকে জায়েজ করে নিবে। যেহেতু কোনো ধর্ষণের ঘটনা ঘটে নি, লাথি চড় কিংবা গালি যদি ধর্ষণের পর্যায়ে পরে তবে সেসব বিচ্ছিন্ন ভাবে ঘটেছে সেখানে, কিন্তু যৌনহয়রানির ঘটনা ঘটে নি। এটা আমার নিজস্ব বিশ্বাস।
যাই হোক আভ্যন্তরীণ গোলোযোগে অনেকে নিহত হয়েছেন, বিডিআর জাওয়ানদের হাতেও বিডিআর জাওয়ান নিহত হয়েছে। নিহত হয়েছে বিদ্রোহ সমর্থন না করা কিছু সদস্য। এবং যারা বিদ্রোহ করেছিলো এবং যারা তাদের সাথে ছিলো, তারা সবাই যে এই হত্যাকান্ডকে সমর্থন করেছিলো এমন না।
ঘটনায় নতুন ডালপালা গজাচ্ছে এবং আরও গজাবে। দুর্নীতিপরায়ন শাকিল এবং বিবেচক চরিত্র পাচ্ছেন, তার ক্ষমতার দাপটে অন্ধ বেগমও এখন ঠিক টাকা পাচারের দায় মাথায় বয়ে বেড়ানো কেউ নন, তিনিও বিডিআরদের জিঘাংসার শিকার এক মাসুম প্রাণ।
সেরা গল্প ফলস সিলিংয়ের ভেতরে লুকিয়ে বেঁচে থাকা সামরিক কর্মকর্তার, ডাই হার্ডের ভক্ত এই কর্মকর্তা বোধ হয় ফলস সিলিংয়ের ভারবহন ক্ষমতার কথা অবগত নন, কিংবা হতে পারে প্রফেসর শঙ্কুর আন্টিগ্রাভিটি মলম মেখে দরবার হলে ঢুকেছিলেন তিনি।
আপাতত ভিলেন হলো বিডিআর জাওয়ান, তারা পরিকল্পিত হত্যা করছে, তারা ধর্ষণ করছে, তারা লাশের উপরে পাশবিক অত্যাচার করছে। এবং এইসব অমানবিকতার গল্প শুনে সাধারণ মানুষের মোভাব বিডিআর বিরোধী হয়েছে। এটাই আসলে এই গল্প ছড়ানোর মূল লক্ষ্য।
দেশে ৩ দিনের শোক দিবস, নিহত মানুষদের স্মরণে, তাদের সন্তানদের শিক্ষার ব্যয়ভার বহন করবে রাষ্ট্র, তাদের পরিজনদের লালন পালন করবে রাষ্ট্র।
আমাদের নিরন্ন মানুষ, যারা ফুটপাতে বসে থাকে, তাদের জন্য এক কেজি চালও বিনামূল্যে পাওয়া যাবে না, রাষ্ট্রের তহবিলে তাদের জন্য বরাদ্দ নেই।
পিতলের তারা আর জলপাই জামা না থাকলে রাষ্ট্রকতৃক প্রতিপালিত ভিখারী হওয়া যায় না। আশা করবো ফুটপাতের মানুষ এবার বঙ্গবাজার থেকে জলপাই জামা ট্রাউজার কিনে পিতলের তারা লাগিয়ে নিজেদের ভেতরে লড়াইয়ে লিপ্ত হবে। উর্দির রং দেখে যদি সহৃদয় রাষ্ট্র তাদের সন্তানদের শিক্ষার ব্যবস্থা করে দেন, যদি তাদের পরিজনদের নিয়মিত দুবেলা আহারের ব্যবস্থা করে দেন। আমরা কৃতার্থ হবো।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

