ধর্মের অপরিহার্যতা সম্পর্কে তথাকথিত আস্তিকদের যুক্তি আমাকে আশ্চর্য করে, আবশ্যিক ভাবেই যৌনআগ্রাসী একটা চরিত্র ধারণ করে সেসব যুক্তি। ধর্মীয় অনুশাসন না থাকলে মানুষ অধিকমাত্রায় ধর্ষণ করতো- প্রাথমিক যুক্তি হিসেবে কিংবা আলোচনার সূচনায় এটার উপস্থিতি রীতিমতো আপত্তিকর হলেও তাদের কোনো বিকার থাকে না। তারা যুক্তির পরতে পরতে নিজের ধর্ষকামী চরিত্রকে উন্মোচিত করতে থাকে এবং অবশেষে সিদ্ধান্তে উপনীত হয়, তারা এই ধর্ষণ করতে পারতো কিন্তু করছে না, কারণ তারা ধার্মিক। ধর্মীয় বোধের কারণেই তারা নিজেরা ধর্ষক হয়ে উঠতে পারছে না, নিজের যৌনবিকৃতিকে দমন করবার জন্য মানুষের ধর্মের প্রয়োজন হয় না।
এটা যে লৈঙ্গিক বৈষম্যের প্রকট প্রকাশ, এবং এটা যে যৌনআগ্রাসী বক্তব্য বিবেচিত হতে পারে এবং সেটা যে নারীর প্রতি অবমাননা কর, এই বোধটুকু ধার্মিক এবং আস্তিকের ভেতরে তৈরি হয় না।
ঠিক যে কারণে সামহোয়্যারে অনেকগুলো নিক ব্যন হলো, সেটাও ঠিক একই রকম ধার্মিক মানসের অধিকারী একজনের যৌনআগ্রাসী মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায়।
মানুষ শুধুমাত্র ধর্মীয় বোধের কারণে অপরাধ প্রবন নয় এই বাস্তব সত্যটা মনে হয় শুধু আস্তিকদের বিকৃত মস্তিস্কেই জন্মায়। সামাজিক বৈষম্য, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং সামাজিক ক্ষমতাকেন্দ্রের চারপাশে থাকতে পারা এবং না পারার প্রতিক্রিয়াগুলো সম্মিলিত ভাবে মানুষের ভেতরে যেসব অভাববোধের ধারণা জন্মায়, সেই ধারণাগুলোর কারণেই মানুষ সামাজিক বৈভব অর্জন করতে চায়, এবং এই অর্জনের ক্ষমতা সবার সমান থাকে না।
যারা স্বকীয় যোগ্যতায় এসব সামাজিক বৈষম্যকে অতিক্রম করতে পারে , তাদের ভেতরে ধর্মীয় কারণেই শুধুমাত্র অপরাধপ্রবনতা দমনের ভাবধারা দেখা যায় না। এবং এর বাইরেও লোভ আর লালসা, যা একটা অসম সমাজের বিকৃত মানসিক উপজাত, সেসবের প্রভাবেই মানুষ সামাজিক আইন কিংবা শৃঙ্খলাকে পাশ কাটিয়ে অনৈতিক কিংবা অসামাজিক সুবিধা নিতে চায়। এখানেই অপরাধপ্রবনতার জন্ম।
যেসব সমাজে এখনও এসব সামাজিক প্রকট বৈষম্য নেই, সেখানে মানুষ নিজের সম্পদ এবং পরের সম্পদকে আলাদা করে দেখে না, সেখানে নারী সংক্ষিপ্ত আচ্ছাদনে নিজেকে আবৃত করলেও কেউ ধর্ষনউন্মুখ হয়ে তাকে তারা করে না।
এমন কি বাংলাদেশের পাহাড়ী অঞ্চলের কিছু কিছু এলাকায় এখনও উপজাতি মেয়েরা উর্ধাঙ্গ অনাবৃত রেখেই চলাফেরা করে, সেসব স্থানেও ধারাবাহিক ধর্ষণের ঘটনা ঘটে না। তাদের যৌনবিকৃতি কিংবা বিকৃত যৌনকামনাও নেই। সেখানে তথাকথিত উন্নত সভ্য দেশের ধর্মও বিকশিত হয় নি। তারা কিভাবে নিজেদের অপরাধ প্রবনতা দমন করে?
সমাজ নিজের বৈষম্য এবং অন্যায়ের বিরোধিতাকে দমন করে একটা সামাজিক শৃঙ্খলা নির্মাণের প্রয়োজনেই পুলিশি কাঠামো তৈরি করে, প্রশাসনিক কাঠামোর ভেতরেই ক্ষমতাবানদের বিলাসের অর্থ সংস্থান এবং নিরন্ন মানুষ, যারা এই বিলাসব্যসনের অর্থ যোগায় তাদের বিক্ষোভ দমনের জন্যই রাষ্ট্রের প্রশাসন ও পুলিশী ব্যবস্থা ব্যতিব্যস্ত থাকে।
সেখানে পুলিশ কার বিরুদ্ধে সক্রিয় হবে এবং কার বিরুদ্ধে নিরব থাকবে, এটা নির্ধারণ করে দেয় ক্ষমতাচক্রে সেই নির্দিষ্ট ব্যক্তির অবস্থান। ধর্ম তেমন ভুমিকা রাখে না এখানে।
বিকৃত যৌনকামনাকে চরিতার্থ করবার সামাজিক মতবাদ তৈরি হয়েছে বর্তমানের সময়ে এসে, এ সময়ে প্রাচীন ধর্মগুলোর অনুসারীদের কিয়দংশ ধর্মীয় মতবাদকে খানিকটা বিকৃত করে নিজেদের যৌনবিকৃতিকে চরিতার্থ করবার উপলক্ষ্য খুঁজে পেয়েছে। অবাধ যৌনতা কিংবা যৌনআগ্রাসণ ঠিক তেমন ভাবে কোনো প্রাচীণ ধর্মের মূল উপজীব্য ছিলো না।
তবে আধুনিক আস্তিকেরা নিজেদের এইসব সামাজিক চাহিদা এবং বিকৃত চাহিদাকে ভুলে থাকেন ধর্মের কেতাবের আদেশ নিষেধ মেনে। তাতেই আমাদের নিজেদের বাইরে যাওয়া নিরাপদ হয়।
পুরুষতান্ত্রিক এই মনোভাবের কোনো অর্থ আমি খুঁজে পাই না। পুরুষেরা নিজেদের ধর্ষকামীতা দমন করে ধর্মীয় বিধিনিষেধে, নারী নিজের ধর্ষকামীতা দমনের জন্য ইশ্বরানুগ? নারী আস্তিকও কি ঠিক একই রকম যুক্তির জাল বিস্তার করে? নারী আস্তিক যখন এই যুক্তির ধারাবাহিকতা শুনবে, যে চাইলেই তার সম ধর্মের অনুসারী একজন পুরুষ তাকে ধর্ষণ করে ফেলতে পারতো, এবং সম্ভবত সে এটা চায়ও, কিন্তু সেই চাওয়া সে পুরণ করছে না, অনুগ্রহ করে নয়, বরং ধর্মীয় নিষেধের কারণে। তখনও কি সে নিজের ধর্মের প্রতি অনুরক্ত থাকতে পারে?
যেই ধর্মবোধ তাকে নিছক একটা শরীরে পরিণত করে সমধর্মের পুরুষদের কাছে? তাকে সস্তা খাওয়ারে পরিনত করে? কিংবা একই যুক্তির ধারাবাহিকতায় তারও ধর্ষকামী চরিত্র উন্মোচন করে।
কোনো নারী কি নিজের এই পরিচিতি মেনে অতিশয় ধার্মিক হয়ে উঠতে পারে?

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


