বাংলাদেশের রাজনীতির প্রচলিত ধারণায় ভারতবিরোধীতা যতটা প্রবল, বাংলাদেশের সংস্কৃতিকর্মীদের সবার ভেতরেই এই ভারতবিরোধিতার শেকড় বিদ্যমান।
তারাও সমাজের বাইরের মানুষ নয় বিধায় চলমান রাজনৈতিক বাস্তবতার ছোঁয়া তাদের ভেতরেও রয়েছে, তারা ভারতবিরোধী, তারা কোলকাতার সাংস্কৃতিক এবং মনস্তাত্বিক আগ্রাসন বিরোধী, বৃহৎ অর্থে বাংলাদেশের সংস্কৃতিকর্মীদের একাংশ তীব্রভাবেই কোলকাতাবিরোধী।
অতিআবশ্যিক ভাবে সত্য, লেখক নিজের চলমান রাজনীতির ভেতরে থেকেই নিজের রাজনৈতিক দর্শণ খুঁজে নিবে, তার রাজনৈতিক অবস্থান কিংবা ভাবের দীনতা যখন নিজের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং নিজের দর্শণ প্রদান করতে ব্যর্থ হয়, তখন লেখক নিজের অবস্থান ভুলে অন্য কারো দর্শণকে আত্মস্থ করতে ব্রতী হন। বাক্যালংকারের মোহে হয়তো লেখক এই পথসন্ধানের মোহে পথভ্রষ্টও হয়ে যেতে পারেন।
বাংলাদেশী লেখক ও কবি কোলকাতার ছাপ মুছে বাংলাদেশী লেখক হওয়ার সাধনা করছে এবং আত্মপরিচয় সন্ধানের এই পর্যায়ে উপস্থিত ফরহাদ মজহার তার ভাবান্দোলনসমেত।
কোলকাতার বাবুয়ানী সংস্কৃতিউদ্ভুত বাংলা সাহিত্য এবং বাংলা ভাষারীতি এবং বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতানির্মিত বাংলা ভাষারীতি ভিন্ন, আমাদের শব্দপ্রকরণ, আমাদের বাক্যবিন্যাস এবং আমাদের নিজস্ব স্ল্যাং ও নিজস্ব উপমাগুলো কোলকাতার সাহিত্যের মতো নয়। আমাদের নিজেদের সাহিত্য নিজেদের নির্মাণ করতে হবে- এমন একটা ভাবনা থেকেই কোনো এক সময় "পূর্ব বাংলার ভাষাআন্দোলন" এর সূচনা করেছিলো কয়েকজন তরুণ। তারা নিজেরাও কোলকাতার আগ্রাসন থেকে বের হয়ে নিজেদের আগ্রাসী মনোভাব জানান দিয়েছিলো, এটা বূঝবার পরিপক্কতা তখনও তাদের হয় নি।
অবিভক্ত ভারতে কোলকাতা ছিলো বাংলা সংস্কৃতির রাজধানী, তখনও ঢাকা কিংবা সিলেটে তেমন ভাবে বাংলাসাহিত্যের প্রচলন হয় নি, এখন যেমন মফস্বল থেকে কবি সাহিত্যিক ঢাকার বাতাসে নিজের পুষ্টি সন্ধানে আসে, তখন যেকোনো কবিযশপ্রার্থী, লেখক, কিংবা চিত্রকর কোলকাতার আলো বাতাসে নিজস্ব শিল্পের পুষ্টিসন্ধানে যেতো।
ঠিক একই কারণে একটা দীর্ঘ সময় কোলকাতা ও কোলকাতার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের ভাষারীতি বাংলা সাহিত্যের মূল সুর হয়েছিলো। সে অবস্থান বদলে যখন পূর্ব বাংলা ভাষাআন্দোলন কর্মীরা দাবি জানালো, তথাকথিত বিক্রমপুর অঞ্চলের ভাষাই হবে নতুন বাংলা সাহিত্যের প্রধান ভাষা। আমি নিজে সেই ভাষা আন্দোলনকে যথার্থ মনে করতে পারি নি।
নিজস্ব রাজনৈতিক দীনতা কিংবা নিজের হীনমন্যতা থেকেই পুর্ব বাংলা ভাষাআন্দোলন কর্মী এবং তাদের সমর্থকগোষ্ঠীর অনেকেই ফরহাদ মজহারের রাজনৈতিক দর্শণের ছাতার তবে মাথা রেখে ফরহাদ মজহারের ভাবের বুদ্বুদে ভিজছেন কিংবা চলমান ভাব থেকে নিজেকে আলাদা রাখছেন।
বাংলাদেশী না কি বাঙালী এই আত্মপরিচয় সংকটের জায়গা থেকে ফরহাদ মজহার নিজেকে বাংলাদেশী হিসেবে চিহ্নিত করেন, এই রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের বাইরে বাংলাদেশীদের আলাদা একটা সাংস্কৃতিক ঝোঁক বিদ্যমান এমন বক্তব্যও প্রদান করেন, সীমানার এপার ওপারে সাংস্কৃতিক বিভাজন রেখা হয়তো ৪৭ এ অঙ্কিত হয় নি বরং এই সাংস্কৃতিক বিভাজন রেখা অনেক আগে থেকেই বিদ্যমান ছিলো।
ফরহাদ মজহার নিজের সিদ্ধান্ত জানান- " বাঙালী জাতিয়তাবাদ" হিন্দু বৌদ্ধ জৈন ইসলাম কোনো ধর্মেরই পর্যালোচনা করে গড়ে উঠে নাই, কিন্তু এরপরেও বাঙালী জাতিয়তাবাদ শু সাম্প্রদায়িক নয় বরং ঘোরতর ভাবেই অনৈতিহাসিক, ইতিহাসের বিপরীতে তার অবস্থান"
" বাঙালী জাতিয়তাবাদ একটা ইসলামবিরোধী সাম্প্রদায়িক মতাদর্শ"
যদিও বাঙালী জাতিয়তাবাদ কোনো ধর্মকে পর্যালোচনা করে গড়ে উঠে নি, এরপরও কেনো সেই জাতিয়তাবাদি ইসলামবিরোধী হয়ে উঠবে সেটা বুঝবার সামর্থ্য আমার নেই।
বাঙালী জাতিয়তাবাদী চেতনার সূচনা হিসেবে ফরহাদ মজহার চিহ্নিত করেন ৫২ র ভাষা আন্দোলনকে। সেই সময়েই বাঙালী জাতিয়তাবাদের উত্থান হয়।
তাই আমি নিজে মেনে নিতে পারি না,
" আমরা বাঙালী বলেই ইসলামের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক আত্মিক- ইসলাম প্রশ্ন বাদ দিয়ে বাঙালীর কোনো ইতিহাস নেই"
কথাগুলোর সত্যতা কতুটুকু?
পাকিস্তানী শাসকদের মতাদর্শকে সম্মিলিত ভাবে প্রতিরোধের জন্য যে ভাষাভিত্তিক রাজনৈতিক আন্দোলন গড়ে উঠেছিলো তা মূলত শুধুমাত্র নিজের ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণ ও বঞ্চনার উপলক্ষ্য না হয়ে বরং পাকিস্তান প্রস্তাবের মৌলিক ধারণা অনুযায়ী স্বাধীকার ও সার্বভৌমত্বের রাজনৈতিক ভাবনার সূচনা।
এই ভাবনার মঞ্চ নিজেদের অভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিচয়। এই রাজনীতি ধর্মীয়বোধউপজাত নয় বরং ধর্মীয় বিভাজনের উর্ধে উঠে ভাষিক ও সাংস্কৃতিক ঐক্যের রাজনীতি চর্চা।
পাকিস্তানের শাসকদের মতাদর্শকে অস্বীকার করা অর্থ ইসলামকে অস্বীকার কর নয়।
ঠিক একই রকম ভাবনা নিয়েই ফিরোজ কামাল নিজের ইসলামমনস্কতা এবং একবিশশ শতাব্দীতে বাঙালী মুসলিমদের করনীয় সংক্রান্ত পাঠ প্রদান করেন। আমি এই অবস্থানে এসে চিন্তিত হই, কে কার গুরু?
মূলত বাঙালী জাতীয়তাবাদ, যা কোনো ধর্মের শেকড় ধরে বেড়ে উঠে নি সেটাকে অস্বীকার করে বাংলাদেশী মুসলিম জাতিয়তাবাদী চেতনার সম্প্রসারণ চাইছে ভাবান্দোলন।
তার ভাষ্যে- বাঙালী জাতীয়তাবাদ ইসলামবিরোধী অথচ আবার ঔপনিবেশিক কোলকাতার উচ্চবর্ণের অভিজাত ও মধ্যবিত্তের হাতে গড়ে ওঠা শিল্প-সাহিত্য- সংস্কৃতিকে কোনো প্রকার ঐতিহাসিক ও ভাবগত পর্যালোচনা ছাড়া তৈরি জামার মতো নিজের গায়ে তুলেছে।
এইসব স্ববিরোধিতা কেনো আমি জানি না। কৌলিন্যবিরোধিতা কিংবা প্রচলিত ভাবধারাকে অস্বীকার করবার তারুণ্য এই এক জায়গায় এসে ফরহাদ মজহারের অনুসারী হয়ে উঠে, কোলকাতার বাবুয়ানী সংস্কৃতির বিরোধিতা করতে গিয়ে অসাম্প্রদায়িক না হয়ে বরং নিজেকে ইসলামী ভাবধারার অনুসারী চিহ্নিত করে এবং এই পরিচয়েই আশ্বস্ত বোধ করে। নিজের ভাবনা ও দার্শনিকতার জায়গায় এটাকে জোরপূর্বক স্থাপন করতে চায়।
" ধর্ম নিরপেক্ষতা" এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিরোধী শক্তি। ভাবান্দোলন শুধুমাত্র ইসলামি ভাবধারা অনুগত এবং আস্তিক গোষ্ঠির আন্দোলন, সেখানে শুধুমাত্র মুসলিম বাংলাদেশী জাতিয়তাবাদের নির্মাণ হতে পারে। বাঙালীর ইতিহাসের সুচনা হয়েছে আদতে ইসলাম এই দেশে শেকড় গড়বার পরে, তার আগে পৃথিবীর মানচিত্রে বাঙালী সংস্কৃতি বলে কিছু ছিলো না।
যখন উপমহাদেশে ব্যপক লুণ্ঠন এবং বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের উপরে ব্যপক নির্যাতন চলছে, তখনও বাংলার সমতলে এই সব বৌদ্ধ শ্রমণদের জায়গা দিয়েছে। তাদের উপরে কোনো অত্যাচার করে নি। এরা সহজিয়া দর্শনের অনুসারী হয়েছে। শাসকের ধর্ম এবং শাসিতের ধর্মে ব্যপক ফারাক। তাই শাসিত নিজেরা কোনো ধর্মীয় বিভাজনে নিজেদের চিহ্নিত করে না। তাদের এই ঐক্য অবশ্য তথাকথিত উচ্চভাবধারার মানুষ বুঝতে অক্ষম। তারা নিজেদের সাম্প্রদায়িক চশমায় সমাজকে সব সময়ই ধর্মীয় বিভাজনে বিভক্ত দেখতে পান।
সুতরাং ফরহাদ মজহার যখন বলেন, " বুৎপত্তিগত ভাবেও যদি বিচার করি তাহলে ভু থেকে ভাব" ভূ মানে হওয়া আর ভাব তাহলে সত্যের হয়ে ওঠা-
যদিও আমি উৎপত্তিগত অর্থ জানি না তবে ভূ অর্থ ভুমি এটা নিশ্চিত জানি।
তাই যারা আন্তরিক ভাবেই বাংলার ভাবান্দোলনের প্রতী আগ্রহী তাদের সাথে আমাদের কিছু আন্তরিক কথাবার্তা আছে। বিশেষত শ্রেণী ও রাজনীতির জায়গাটা থেকে।
ফরহাদ মজহারের এই বক্তব্য পড়ে আমি অবাক হয়ে লক্ষ্য করি, এখানে বাংলাদেশী হিসেবে আমার কোনো অবস্থান নেই। আমি বাঙালী হয়েও বিচ্ছিন্ন ভাবান্দোলন থেকে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

