ম্যানেজার চন্ডাল না হলে ক্ষুদ্র ঋণ প্রতিষ্ঠান ইতিহাসে কোনো সময়ই লাভজনক বিনিয়োগ ছিলো না।
১০ ই জুন, ২০০৯ রাত ১১:৫৩
জোনাথন সুইফটকে আমরা চিনি লেখক হিসেবে, তবে তার অন্য পরিচয় হলো সামন্ততান্ত্রিক যুগের অবসান এবং পূঁজিবাদের প্রাথমিক পর্যায়ে তিনি আয়ারল্যান্ডের রাজধানী ডাবলিনে ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্প শুরু করেছিলেন।
আজ থেকে ৩০০ বছর আগে আয়ারল্যান্ডের অধিবাসীদের সঙ্গী ছিলো ক্ষুধা, দারিদ্র এবং দুর্ভিক্ষ, এবং সে সময়ে আয়ারল্যান্ডের দুই তৃতীয়াংশ মানুষের বার্যিক আয়ের পরিমাণ ছিলো সে সময়ের অর্থে মাত্র ৪.৩ পাউন্ড, অবশ্য লন্ডনের রাস্তায় সে সময়ে কাজের ছেলে পাওয়া যেতো সপ্তাহে ৫ শিলিং-এ, মানে বছরে ২ পাউন্ড কিংবা তার সামান্য একটু বেশী অর্থ দিলে সারা বছরের জন্য একটা কাজের ছেলে রাখা যেতো।
সে সময়েই জোনাথন সুইফট কোনো কিছুর প্রত্যাশা না করে তার উপার্জিত অর্থের একাংশ ক্ষুদ্রঋণ হিসেবে ডাবলিনের দরিদ্রদের প্রদান করেছেন। সেই ঋণ এবং তার প্রভাবে দরিদ্রের বদলে যাওয়া জীবন আয়ারল্যান্ডে ক্ষুদ্র ঋণের জোয়ার তৈরি করলো।
১৮৩৭ সালে " লোন ফান্ড বোর্ড" গঠিত হয়। এবং ১৮৪৩ সালে এই বোর্ডের সদস্য সংখ্যা ছিলো প্রায় ৩০০, যারা আয়ারল্যান্ডের বিভিন্ন অঞ্চলে ক্ষুদ্রঋণ সেবা প্রদান করতো। সরকর নির্ধারিত আইনে একজনকে ১০ পাউন্ডের বেশী ঋণ প্রদান করা যেতো না। ২০ সপ্তাহের ভেতরেই এই অর্থ প্রদান করতে হতো এবং বার্যিক সুদের হার ছিলো ৮.৮ শতাংশ। আধুনিক গ্রামীণ ব্যংক ও ক্ষুদ্র ঋণ প্রকল্পের সকল বিধিবিধান তখনও কার্যকর ছিলো।
তারা ঋণের কিস্তি প্রদানে ব্যর্থ হলে জরিমানা আদায় করতো, তবে ঋণগ্রহীতারা অধিকাংশই ছিলো দরিদ্র কৃষক, যারা নিজের জমিতে চাষ করতো, কিংবা পশুপালন করতো, কিংবা এমন কৃষিভিত্তিক সভ্যতায় যেখানে নগরায়ন হয় নি প্রবল ভাবে, সেখানে অর্থনীতির চাকা যেভাবে চলে, সেসবের সাথেই সংযুক্ত ছিলো। ঋণগ্রহীতাদের ২০ শতাংশ ছিলো নারী।
এমন দারিদ্রতায় আধুনিক মানুষ যা করে, আয়ারল্যান্ডের দরিদ্ররাও তাই করার চেষ্টা করতো, আয়ারল্যান্ডের সাংবাৎসরিক দুর্ভিক্ষে মরে ফৌত হয়ে যাওয়া এবং বিদেশে চলে যাওয়া, নিরন্ন মানুষ না খেয়ে মরতে পারে, ঋণের কিস্তি শোধে ব্যর্থ হলে পরিবার পরিজন পেছনে ফেলে পালাতে পারে, যেমন পালায় মঙ্গাআক্রান্ত চরের মানুষেরা। বৌ-বিটি- ভাঙা চালা পেছনে রেখে নিরুদ্দেশ হয়ে যায়।
দরিদ্র জনগোষ্ঠীর প্রধান বিনোদন সঙ্গম এবং জন্মনিয়ন্ত্রনের কোনো পদ্ধতি জানা না থাকায় দরিদ্র জনগোষ্ঠির সংখ্যা গুনিতক হারে বাড়তে থাকে, আয়ারল্যান্ডেও সে সময়ে জনসংখ্যা সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করলো, এবং এই অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ, মূল খাদ্য আলু এবং সে আলু কোথাও সঞ্চয় করা যায় না, খেয়ে ফেলতে হয়, যোগাযোগ ব্যবস্থা ততটা উন্নত নয় যে এটাকে অন্য কোথাও পাঠিয়ে দেওয়া যাবে, সুতরাং অধিকাংশ গ্রামবাসীই দরিদ্র, যাদের জমি আছে তারাও বছরের খোরাকি জোগার করতে পারে না, আর যারা ভুমিহীন তারা অন্যের জমিতে বর্গা দিয়ে যা পায়, তা দিয়ে কোনো মতে পেটে পিঠ আলাদা করে বাচতে পারে,
এইসব জমিদার কিংবা সামন্ত প্রভুরা সবাই জৌলুসপূর্ন লন্ডন শহরে নিজের বিত্ত বিলাসিতায় মগ্ন-
১৮৪৫ থেকে ১৮৫০ সাল পর্যন্ত আয়ারল্যান্ডে আলুর মড়ক চলেছিলো এবং এর প্রভাবেই সেখানে ৫ বছর মেয়াদী দুর্ভিক্ষের শুরু। ১৮৪৫ সালে যে আলুর মড়ক দেখা দিয়েছিলো তার পরের বছর উৎপাদন ব্যহত হলো, ১৮৪৭ সালে গড়পরতা উৎপাদন হলেও ১৮৪৮ সালে বীজ আলুর অভাবে অধিকাংশ চাষীই আলু উৎপাদন করতে পারলো না। তার পরের বছরও তেমন উৎপাদন হলো না শস্য, সুতরাং দুর্ভিক্ষই বাস্তব হয়ে দাঁড়াল তাদের জীবনে, সে সময়ে সরকার ত্রানের ব্যবস্থা করেছিলো, তবে সেটা খুব অল্প সংখ্যক মানুষের উপকারে এসেছে, ত্রান শিবির পূর্ণ হলেই ত্রানের খাদ্য বিতরণ শেষ, এরপরে যারা আসতো তাদের কোনো ত্রান দেওয়া হতো না।
ক্ষুধার তাড়নায় মানুষ পালাচ্ছে গ্রাম ছেড়ে, দেশ ছেড়ে-
৪ বছর দীর্ঘ একটি দুর্ভিক্ষে আয়ারল্যান্ডের ১৩ শতাংশ মানুষ মারা যায়, দেশ ও গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যায় ১২ শতাংশ মানুষ।
দুর্ভিক্ষ পূর্ব সময়ে যেখানে ৯৯ শতাংশ মানুষই গৃহীত ঋণ ফেরত দিতো, দুর্ভিক্ষের সময়ে মাত্র ১০ শতাংশ মানুষ ঋণের কিস্তি ফেরত দিতে পেরেছে, এবং মোট প্রদত্ত ঋণের ২৭ শতাংশই ছিলো অনাদায়ী কিংবা আদায়অযোগ্য দেনা।
মাত্র ৭ বছরে ক্ষুদ্রঋণ প্রদানকারী সংস্থার প্রায় অর্ধেকই বন্ধ হয়ে যায়, তবে যারা সে সময়ের পরেও ক্ষুদ্রঋণ প্রদান অব্যহত রেখেছিলো, তাদের ঋণ প্রদানের পরিমাণ বাড়ে, এবং ঋণ আদায়ের পরিমাণও বৃদ্ধি পায়।
ক্ষুদ্র ঋণ প্রকল্পের অর্থের যোগান আসতো মূলত ধনাঢ্য ব্যক্তিদের দাতব্যে, তারা বিনা সুদে দরিদ্রদের জন্য চার্চের তহবিলে অর্থ দিতেন, সে অর্থ চার্চের মাধ্যমে বিলিবন্টন হতো দরিদ্রদের ভেতরে, এবং এইসব দাতব্য ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্পের তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলো সে সময়ের যাজকেরা, তাদের মানবহিতৈষী মনোভাব অবশ্য এই ক্ষুদ্র ঋণ প্রকল্পগুলোকে ব্যর্থ প্রতিষ্ঠান হিসেবে চিহ্নিত করেছিলো। ফলাফল হলো চন্ডাল হয়ে গলায় পা দিয়ে অর্থ উপড়ে আনা না হলে অধিকাংশ ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্পই ব্যর্থ হবে। যারা মানবতাবাদী এবং দরিদ্রদের সহানুভুতি দেখান, তারা ক্ষুদ্র ঋণ প্রকল্প তত্ত্বাবধানের উপযুক্ত মানুষ নন, কারণ যেসব ক্ষুদ্ড় ঋণ প্রদানকারী সংস্থা এই ৫ বছর মেয়াদী দুর্ভিক্ষের পরেও কার্যকর ছিলো তাদের অধিকাংশই মূলত চন্ডাল প্রকৃতির তত্ত্বাবধায়কের জিম্মায় ছিলো।
ইতিহাসের উপসংহার এই-
যদিও ক্ষুদ্র ঋণ প্রকল্প শুরু করা হয় ও পরিচালনা করা হয় দরিদ্রের জীবনযাপনের মানউন্নোয়নের জন্য, তবে দরিদ্রের জীবনযাপনের মানউন্নয়ন এবং মানবাধিকার একই সাথে রক্ষা করা যম্ভব হয় না অধিকাংশ সময়ই, প্রতিষ্ঠান, পূঁজি এবং অর্থ আদায়ের কাজটাতে মানবিকতা রক্ষা করতে গেলে প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়ে যাওয়ার সম্ভবনা বেশী। সফল ক্ষুদ্র ঋণ প্রকল্প সব সময়ই চন্ডাল প্রকৃতির মানুষদের কারণেই লাভের মুখ দেখেছে।
যেখানে পূঁজি এবং লভ্যাংশের লোভ থাকে, সেখানে দরিদ্র শুধুমাত্র ক্ষেতের সরিষা, তাকে আদর করে গোলায় তোলা হয়, এবং চিপড়ে-নিংড়ে তার সবটুকু রস শুষে নিয়ে তাকে ছিবরে করে ফেলে দেওয়াই প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়।
মূলত এটা Aidan Hollis এবং Arthur Sweetman এর Microfinance and Famine: The Irish Loan Funds during the Great Famine পড়ে লেখা।
বিস্তারিত তথ্য ও আলোচনার জন্য-
Boyle, Phelim, and Cormac Ó Gráda, 1986. “Fertility Trends, Excess Mortality, and the
Great Irish Famine.” Demography 23(4): 543-562.
Hollis, A., 2002. “Women and Microcredit in History: Gender in the Irish Loan Funds,”
in Gail Campbell, Beverly Lemire and Ruth Pearson, eds., Women and Credit:
Researching the Past, Refiguring the Future, Oxford: Berg Press, pp. 73-89.
Hollis, A. and A. Sweetman, 2001. “The Life-Cycle of a Microfinance Institution: An
Economic Analysis of the Irish Loan Funds,” Journal of Economic Behavior and
Organization 34(3): 291-311.
যুক্তরাষ্ট্র ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্প শুরু করেছে ১৫ বছর আগে, তবে সেখানে ক্ষুদ্রঋণ প্রদান সংস্থাগুলো ধাওয়া করে বাড়ী বাড়ী গিয়ে মানুষকে ঋণ নিয়ে জীবন পরিবর্তন করতে উদ্বুদ্ধ করে না। বরং তারা এটার ব্যপক প্রচার চালাচ্ছে টিভিতে, এবং অধিকাংশ ঋণের শর্তই ঋণগ্রহীতাকে অন্তত দায়িত্ববান নাগরিক হতে হবে, তাদের নিয়মিত অর্থের যোগান থাকতে হবে, এবং অবশ্যই একটা ব্যবসায়িক পরিকল্পনা থাকতে হবে। বাংলাদেশের সম্পূর্ন ব্যবস্থাটাই উল্টো, সেখানে একটি গ্রামের জন্য ২ থেকে ৩টি ব্যবসায়িক প্রকল্প বিদ্যমান। এবং এর বিপননের দায়িত্ব প্রায় সময়ই ক্ষুদ্রঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান গ্রহন করে না। সেখানে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা হয় এবং প্রতিটা কর্মীকেই তার প্রদত্ত ঋণের বিপরীতে একটা বার্ষিক প্রতিদান দেওয়া হয়।
এবং প্রদত্ত ঋণ আদায়ের জন্য চন্ডালপ্রকৃতির কর্মী রাখা হয়, যারা তাগাদা দিয়ে, জোর জুলুম করে ঋণের কিস্তি আদায় করে।
যদিও এসব বাস্তবতার কিয়দংশ প্রকাশিত হয় দৈনিক পত্রিকায়, তবে বাংলাদেশের দারিদ্র নিরসনে তারাই একমাত্র আন্তরিক এবং যেহেতু বর্তমানে বাংলাদেশে এই ক্ষুদ্র ঋণ প্রকল্পের উদ্যোক্ত সম্মানিত ব্যক্তি সুতরাং এইসব যতটা শোভন এবং আড়াল করে প্রকাশ করা যায় পত্রিকায় ঠিক ততটাই আড়াল করে এসব সংবাদ প্রকাশিত হয় এবং প্রয়োজনে চেপে যাওয়া হয়।
ফারুক ওয়াসিফের আগের দুইটি লেখায় আনু মুহাম্মদের সাপ্তাহিক ২০০০ এ প্রকাশিত প্রবন্ধ এবং এর প্রতিক্রিয়া রয়েছে।
বিষয়বস্তুর স্বত্ত্বাধীকার ও সম্পূর্ণ দায় কেবলমাত্র প্রকাশকারীর...
একজন সুখীমানুষ বলেছেন:
+
মেহেদী_হাসান বলেছেন:
+
সামহোয়্যার ইন...ব্লগ বাঁধ ভাঙার আওয়াজ, মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর...















