আহমেদ শরীফ চমৎকার একটা বক্তব্য লিখেছেন-হোমোসেপিয়েনসগণের মানুষরূপ প্রাপ্তিকাল থেকে ১৫০০ খ্রীষ্টাব্দ অবধি মোটামুটি ছিলো বিস্ময়ের, কল্পনার, বিশ্বাসের, সংস্কারের ধারণার, আন্দাজের, অনুমাণের, ভয়ের ভরসার অবলম্বন অদৃশ্য অরি-মিত্র দৈবশক্তির। একালে প্যাগান আচার-আচরণ, পালা-পার্বন, প্রচারিত এবং প্রচলিত অপৌরুষেয় বিধি-নিষেধ রূপ শাস্ত্র এবং অলৌকিক, লৌকিক ও অলীক ভাব-চিন্তা-কর্ম- আচরণ ছিলো অজ্ঞতাপ্রসুন।
তবে অজ্ঞতার তুলনায় বর্তমানে ব্যপক হারে চলছে তথ্যের অপপ্রয়োগ। বৈজ্ঞানিক তথ্য ও তত্ত্বকে বিকৃত করে ধর্মীয় মজমা জমানোর প্রচেষ্টা চলছে বিশ্বজুড়ে। সেটা বিভিন্ন ভাবে বিজ্ঞানকে নাকচ করবার প্রচেষ্টার মাধ্যমেই প্রকাশিত হচ্ছে। ইশ্বরের উপস্থিতি এবং কর্মকান্ডকে বৈধতা দিতে সাম্ভাব্যতা তত্ত্বকে উপস্থাপন করা হচ্ছে। অপবিজ্ঞান সাময়িকী হয়ে গেছে ধর্মীয় বিধানকে প্রকাশ করা ও প্রচার করা নানাবিধ ধর্মীয় ওয়েব সাইট।
সেসব কথার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি যেমনই হোক না কেনো, যাচাই না করেই সেসব আত্মস্যাৎ করে ইশ্বরের যোদ্ধারা নিয়মিত অসি এবং মসি চালনা করছে।
বিজ্ঞান উপভোগ্য এবং আকর্ষণীয়। আমার বিজ্ঞানের প্রতি মুগ্ধতা প্রতিনিয়তই বাড়ে। বৃহৎ পরিসরে কিংবা অতিক্ষুদ্র পরিসরে বিজ্ঞান যেভাবে কার্যকারণ খুঁজে বের করে বোধগম্য একটা বিশ্লেষণীকাঠামো তৈরী করেছে সেটা আমাকে চমৎকৃত করে, তবে সেখানে আমি ইশ্বর , ভগবান কিংবা সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব ও নজির খুঁজে পাই না। এমন কি সেখানে আমি তাদের কোনো প্রভাবও খুঁজে পাই না।
মূলত বস্তুজগতের নিয়ম মেনে চলে বস্তুকণা, তাদের ঐশী অনুপ্রেরণা নেই, ঐশী ওহী মোতাবেক তারা নিজেদের কাঠামো নির্মান করে না কিংবা সেটা সাজাতে যায় না। সেখানে মূল বিবেচ্য সব সময়ই শক্তির সর্বনিম্ন ব্যবহার। অর্থ্যাৎ যে পথে গেলে সবচেয়ে কম শক্তি ক্ষয় হবে, বস্তুকণাগুলো সে পথই খুঁজে নেয়। আলোর কণিকা যখন স্বচ্ছ- অর্ধস্বচ্ছ মাধ্যমের ভেতর দিয়ে যায় তখনও এইসব বোধশক্তিহীন কণিকা কোনো ঐশী অনুপ্রেরণাব্যতীতই সংক্ষিপ্ত পথ বেছে নেয়।
যখন বৃষ্টির ফোঁটা পড়ছে, সান্দ্রতার গুণে সেই বৃষ্টিকণা নিজেই গোলাকৃতি গ্রহন করেন। কারণ এভাবেই সম্ভব নিজের শক্তিসঞ্চয় করা। মিনিমাম এনার্জি কনফিগারেশন সব সময়ের জন্যই সত্য।
বস্তুজগতের কণিকাগুলোকে নিয়েই তৈরী জৈবজগত। রুহানী কোনো বিষয়াদি সেখানে নেই, তবে অতিক্ষুদ্র পরিসরে বস্তুকণাগুলো বৃহৎ পরিসরের বস্তুকণার মতো সংঘবদ্ধ আচরণ করলেও তাদের একক ব্যবহার অনেক সময়ই যাদৃচ্ছিক মনে হয়। সামান্য উত্তেজনা কিংবা শক্তিতেই তাদের গতিপথ পরিবর্তিত হয়। এবং যেহেতু একক বস্তুকণা এত বেশী ক্ষুদ্র যে সামান্য পরিবেশের পরিবর্তনেও তাদের গতিপ্রকৃতি পরিবর্তিত হয়, তাই তাদের অবস্থান সঠিক ভাবে নির্ণয় না করে আমরা পরিসংখ্যান ও সাম্ভাব্যতাকে যাচাই করে তাদের আপাতঅবস্থানকে নির্দিষ্ট করবার চেষ্টা করি।
যদিও অণু-পরমাণুগুলো নিজস্ব ক্ষুদ্রতার কারণেই অনেক বেশী বিচলিত আচরণ করে কিন্তু ঠিক সে সময়েও তারা পদার্থবিজ্ঞানের বিধি মেনেই চলে। পারস্পরিক আকর্ষণ-বিকর্ষণ,সাম্যতা, নিত্যতার সূত্রগুলো মেনে চলে সকল বস্তুকণাই।
আমাদের অতিপরিচিত বস্তুজগতে আমরা যা অনুভব করি, তা মূলত তড়িৎচুম্বকীয় বল, আমাদের হাঁটা-চলা, অনুভবএবং উত্তেজনা সবই নিয়ন্ত্রন করে এই তড়িৎচুম্বকীয় বল। একটা চার্জবাহী কণিকার উপস্তিতি তার চারপাশে কতদুর পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে? পদার্থ বিজ্ঞান বলছে সেটা অসীম পর্যন্ত বিস্তৃত, কিন্তু কার্যত অতিক্ষুদ্র চার্জের প্রভাব বলয় তার চারপাশের সীমিত স্থান। হয়তো সেটা আমাদের প্রচলিত মাপের সীমায় অতিক্ষুদ্র কিন্তু সে চার্জের আকৃতির তুলনায় অনেক বড় বলেই আমরা ধরে নিচ্ছি তাদের প্রভাব অসীম পর্যন্ত বিস্তৃত।
যদিও ইলেক্ট্রনের আকার নিয়ে এখনও স্পষ্ট কোনো ধারণা বিজ্ঞানীদের নেই, তবে সেটা ফেমটোমিটারের কম- অর্থ্যাৎ এক সেন্টিমিটারের কোটি ভাগের কোটিভাগ। তাদের প্রভাব হয়তো পিকোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত, অর্থ্যাৎ তার নিজস্ব আকৃতির ১০০০ গুণ বেশী দুরত্ব পর্যন্ত তার প্রভাব আমরা অনুভব করতে পারি।
এই প্রভাব এবং আশেপাশের বস্তুর উপস্থিতি জৈব যৌগের আচরণ নির্ধারণ করে থাকে। গাণিতিক ভাবে সকল কিছুই ব্যখ্যা করা সম্ভব, তবে চলকের সংখ্যা অনেক বেশী হয়ে যাওয়াও গণনা হয়তো দুরহ হবে, আমাদের অনেক বেশী চলককে ধ্রুব ধরে নিতে হবে, এবং গবেষণার খাতিরেই আমাদের সব সময়ই বেছে নিতে হয়, কোন কোন চলকের প্রভাব ন্যুনতম।
তবে সব সময়ই যেটা গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে সেটা আশে পাশে অন্যান্য চার্জের উপস্থিতি। আমরা পানিকে সাধারণত অপরিবাহী জ্ঞান করি, অর্থ্যাৎ যদি কোনো দুষণ না থাকে তবে পানি সাধারণত বিদ্যুত পরিবহন করে না। অর্থ্যাৎ পানিতে মুক্ত চার্জ নেই, কিন্তু পানির ভেতরে দুটি হাইড্রোজেন পরমাণু একটি অক্সিজেন পরমাণুর সাথে যুক্ত হয় এবং তাদের নির্দিষ্ট একটি ব্যবধান রাখতেই হয় পরস্পরের ভেতরে। অর্থ্যাৎ হাইড্রোজেন এবং অক্সিজেন সংযুক্ত হয়ে পরস্পরের সাথে একটা নিরাপদ গ্রহনযোগ্য দুরত্ব বজায় রাখে, এবং এ জন্যই অক্সিজেন পরমাণুর বাইরের খোলসের ৬টি ইলেকট্রন এবং হাইড্রোজেন পরমাণুর বাইরের খোলসের একমাত্র ইলেক্ট্রন, এবং তাদের আপাত অবস্থানের কারণে পানির অণুর চারপাশে ক্রিয়াশীল তড়িৎক্ষেত্র বিদ্যমান।
সেখানে ইলেক্ট্রন কিংবা চার্জঘন জায়গা এবং চার্জবিহীন জায়গা থাকায়, অন্য যেকোনো চার্জের উপস্থিতিতে তারা সাড়া দেয়, এবং তাদের ইলেক্ট্রনিক কনফিগারেশন বদলায়। এ জন্যই আমরা হাইড্রোফোবিক এবং হাইড্রোফিলিক অণু পাই প্রকৃতিতে।
এতসব বলবার কোনো প্রয়োজনই ছিলো না, যদি না মোদ্দা কথায় ফেরত আসি। জৈবযৌগ বিশিষ্ট এখানেই যে তারা নিজেদের পুনরুৎপাদন করতে পারে উপযুক্ত অনুকুল পরিবেশে। এবং পুনরূৎপাদন প্রক্রিয়াটা সম্পাদন হচ্ছে নিয়মিতই, উপযুক্ত পুষ্টি এবং রাসায়নিকের উপস্থিতিতে চমৎকার পুনরুৎপাদন প্রক্রিয়াকে কেউ কেউ সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বের মাহত্ব্য হিসেবে প্রচারিত করছে।
যেকোনো একটি বিক্রিয়ায় যদি কোনো মিথাইল এলকোহলের অনু নিজেকে পরিবর্তিত করতে পারে, তবে সেই একই পরিবশে সকল এলকোহল অণুই নিজেকে পরিবর্তিত করবে। সেটা তার চেইনে কার্বন পরমাণুর সংখ্যা যত বেশীই হোক না কেনো তারা কিছু সাধারণ বৈশিষ্ঠ্য মেনেই বিক্রিয়ায় অংশগ্রহন করে। সেটা তাদের চেইনের শেষ মূলকের উপরে নির্ভরশীল।
আমরা ডিএনএ নিয়ে এত আলোচনা করি, জেনেটিক্সের মূল কিংবা মোদ্দা কথাই হলো বিভিন্ন জৈবিক প্রক্রিয়ায় কিভাবে এই দিএনএ চেইনের অণুর স্বজ্জা কার্যকর থাকে, তারা কিভাবে প্রোটিন এবং শক্তি উৎপাদন করে? এটা কে ঐশী অনুপ্রেরণা না কি স্বাভাবিক কোনো বিষয়?
যদি উপযুক্ত রাসায়নিকের উপস্থিতি না থাকে তবে অলৌকিক ভাবে কোনো প্রোটিন উৎপাদিত হবে না, আপনার শরীরে গরুর প্রোটিনের অংশ পাওয়া যাবে না কখনই যদি আপনি শাকাহারী হন। যদিও আপনি মাংশাসী তবুও বাঘের শরীরে পরিচায়ক প্রোটিন আপনার শরীরে উপস্থিত থাকবে না, যদি আপনি বাঘ মেরে খেয়ে ফেলেন তবে বাঘের প্রোটিণ আপনার শরীরে পাওয়া যাবে, অনথ্যায় আপনি যতই খাওয়া দাওয়া করেন, আপনার শরীরে বাঘের প্রোটিন উৎপাদিত হবে না।
প্রতিটা প্রাণীই নিজস্বতা পরিচায়ক কিছু প্রোটিন উৎপাদন করে, এবং সেটা সব সময়ই তার পুষ্টির উপরে নির্ভর করে। আমি যা খাই আদতে আমি তাই।
ম্যান ইজ হোয়াট হি ইট।
বিবর্তন কিভাবে এই বিষয়টাকে প্রভাবিত করে, যদিও ৯৫ শতাংশ জেনেটিক প্রোফাইল মিলছে, যদিও বলা হচ্ছে আজ থেকে ন্যুনতম ১ থেকে ২ লক্ষ বছর আগে মানুষে বাঁদরে তেমন তফাত ছিলো না, প্রকৃতিক বিপর্যয়ে মানুষ এবং বাঁদর আলাদা দুটি প্রাণীতে রুপান্তরিত হয়েছে। সে রুপান্তরপ্রক্রিয়াটি একমুখী কেনো এটা নিয়ে বিতর্ক চলতে পারে? একটা জীব বিবর্তিত হয়ে নতুন প্রজাতিতে পরিণত হলে সে কেনো পুনরায় পূর্বের প্রজাতিতে ফেরত যায় না, বিবর্তন কেনো এখমুখী এসব নিয়ে আলোচনা চলতে পারে, কিন্তু বিবর্তনের বাস্তবতা এড়ানো যায় না।
বরং এখন বলা হচ্ছে বিবর্তন একমুখী হলেও সেটা শুরু করবার জন্য কোনো ঐশী অনুপ্রেরণার প্রয়োজন ছিলো। তবে দুঃখের সংবাদ হলো বিশ্বে বিরাজমান প্রাকৃতিক নিয়মাবলী ও শৃঙ্খলা পাল্টে দেওয়ার স্বাধীনতা ইশ্বরের নেই। এমন কি এই মহাবিশ্ব সৃষ্টির সময়ও ইশ্বরকে পদার্থবিজ্ঞানের বিধি মেনই চলতে হয়েছে। এই বর্তমানের পৃথিবীতে এমন কি একটা অতিক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অণু যা খুব সহজেই বিচলিত হয়ে নিজের অবস্থান পরিবর্তন করে, তাকেও সামান্য বিচলিত করবার ক্ষমতা নেই সর্বশক্তিমান ইশ্বরের।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

