somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

নির্জন পুল পেরোলেই ঝিঝি পোকার গান।

১০ ই এপ্রিল, ২০০৮ রাত ১১:১৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

অভ্যাসবশত আমি পুলের উপর উঠে দাড়িয়ে পড়ি। গ্রীস্মের শুরুতে মৃদুমন্দ দক্ষিনা বাতাস। নিচে টলটলায়মান স্বচ্ছ পানি। পানি নেই বললেই চলে, যেটুকু আছে সেটুকুই ভীসন পরিচ্ছন্ন, চকচকে। উপরিপৃষ্টে বাতাসের সাথে মসৃন কাপুনি।

কালচে হলুদ রঙের একটি ফড়িং ঘোড়াঘোড়ি করছে প্রায় পানির উপরে ঝুকে পড়া বনফুলের আশেপাশে। বনফুরের আসল নাম জানিনা। কজনই বা জানে। চাচাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। স্থানীয় ভাষায় বাটই না বাটল কি বলে ডাকে । কলি অবস্থায় টকটকে লাল ফুটলে সাদা পাপড়ি মেলে হাসতে থাকে। পুলের ওপর থেকে তাকিয়ে বনফুল আর ফড়িংয়ের লুকোচুরি দেখে চোখ জুড়াই। বেশীক্ষন স্বস্তিতে থাকা যাবেনা । শরীরে ঘামের আবাস।

গরম পড়তে শুরু করেছে। কয়েকদিনের মধ্যে মাথার মগজ গলানো তাতানো রোদ তার সর্বশক্তি দিয়ে ঝাপিয়ে পড়বে পথিককে বেহাল করে দিতে। কান্ত, অবসন্ন পথিক একটু শান্তির খোজে এসে বসে যাবে এই পুলের গোড়ায়, বিশালাকার বটগাছটা যেখানে তার ডানা মেলে দিয়েছে অপার মাতৃস্নেহ নিয়ে। বয়স বেশী নয় গাছটার তবুও সূর্যের তাপদাহ আটকে রাখার তীব্র প্রচেস্টা চোখে পড়ার মত। হয়তো নিজ দ্বায়িত্বের ব্যাপারে সচেতন । মানুষগুলো যদি এমন সচেতন হতে পারত তবে আশে পাশে আরো কিছু ছায়াদার বৃক্ষ থাকা বিচিত্র ছিলনা।

গাছের ছায়ায় পুলের রেলিংয়ে হেলান দিয়ে দাড়ালে মৌনতার সাথে আমার নিরব কথোপতথন শুরু হয়ে যায়। কত শত প্রজন্মের স্মৃতি বয়ে বেড়াচ্ছে এই পুল। প্রতিদিন কত মানুষ পার হয়ে যায় এর উপর দিয়ে। ভ্যান রিকশা সাইকেল, এবং কদাচ শহর থেকে আসা অতিথি মাইক্রোবাস। ছেলেপুলে, যুবক, বৃদ্ধ সববয়সী পায়ের পরশ লেগে অছে পুলের পটাতনে। এক প্রজন্ম হারিয়ে যায় আরেক প্রজন্ম নতুন করে আবাদ করে পলেস্তারা উঠে যাওয়া কনক্রিটের বুক। আরো কত শত বছর আগে থেকে রয়ে গেছে পুলটা। হয়তো আরো চকচকে ছিল, উদ্ভিন্না যুবতীর মত সোন্দর্য লেপ্টে ছিল এর গায়ে। একসময় হয়তো কাঠের পুল ছিল, তার আগে বাশের সাঁকো। সাঁকো পার হতে গিয়ে পা পিছলে ছলাৎ করে নিচে পড়ে গেছে নববধূ , তাকে সঙ্গ দিতে পাগরি পরা বরের ঝাপিয়ে পড়ার গল্প শুনেছি বড়দের মুখে এখানেও হয়তো সে ধরনের অনেক ঘটনার ইতিহাস খুজলে পাওয়া যাবে।

আমি পুলের উপর উঠে সেই কথাগুলো বিরবির করছিলাম। আশে পাশে কেউ নেই থাকলে হয়তো আমাকে পাগল ঠাওরাতে পারে। চায়ের দেকারণগুলো ঝিমিয়ে পড়েছে। মাথার কাছে মিনি রেডিও আর হাতে একটা হাত পাখা নিয়ে আধশোয়া বিশ্রাম নিচ্ছে দোকানী। অনেকক্ষন পরে একটা ভ্যান দেখলাম। ধান কিংবা ডালের বস্তা নিয়ে হাটে যাচ্ছে।

এক্ষনে একটা অদ্বুদ অনুভুতি গ্রাস করেছে আমাকে। মাটির গন্ধ আমার চোখে মুখে। রোদেলা দুপুর তার নির্জনতাকে ছড়িয়ে দিয়েছে গোটা গ্রামটাকে।

মাটি ও আকাশ মিশেছে যেথায়
বন বিথী আর সবুজ পেরিয়ে
ছায়াঘেরা মেঠোপথ ডাকে যে আমায়।

মেঠোপথের সে নিবিড় আমন্ত্রণকে আমি গভীর আবেগে গ্রহণ করি কিংবা গ্রহণ করতে বাধ্য হই। একে বেঁকে চলে যাওয়া মেঠো পথের শেষ সীমানায় থাকা ছাউনিতে বাস করেন এক বৃদ্ধা যিনি আমাকে দেখলেই কিরে দাদু এতদিনে আমার কথা মনে পড়ল বলে জড়িয়ে ধরেন, হাত মুখ ধোয়ার জন্য কলতলা পর্যন্ত এগিয়ে দেন, চিংড়ি মাছ দিয়ে রান্না করা কুমড়ো জালি আর মোটা চালের ভাত নিয়ে অপেক্ষা করেন গভীর আগ্রহ ভরে। তাতেই শেষ নয় সকালে পাখি ডাকারও আগে আমর ঘুম ভেঙ্গে যায় তে তেলে তপ্ত তাওয়ায় পিঠার মসলা ছিটারো শব্দে। চালের গুড়া আর পানির মিশ্রণ ভাল করে নেড়ে ছিটিয়ে দিতে একসময় অনেকটা রুটি পিঠার অবয়ব চলে আসে। সাড়ম্বর আয়োজন শেষে আমার হাতে আসে আসে যে পিঠা ওটাকে আমরা ছিটারুটি পিঠাই বলি। নরম পিঠার ভাজে ভাজে লুকিয়ে থাকা আন্তরিকতায় আমি আপ্লুত হই। আজও নিশ্চয়ই তেমন হবে ভাবতে চলার গতি আপনা থেকে দ্রুততর হয়ে ওঠে। পরক্ষনেই আবার শ্লথ হয়ে পড়ে। মন ভাল রাখা কঠিন হয়ে যায়। পরিপাটি সবুজের একি হাল ! । সর্বনাশা সিডর গভীর আচর রেখে গিয়েছে নিতল নিসর্গের বুকে। একটা চাপা হাহাকার মেখে আছে পথের আশেপাশে। খালের উপর আড়াআড়ি ভাবে শুয়ে আছে বিশালাকার রেইন ট্রি। চাইলে ওটাকেই এখন সাঁকো হিসেবে ব্যবহার করা যায়। হাজারো অনটনের মধ্যেও মেয়ের বিয়েতে খাট বানিয়ে দেয়ার জন্য রেখে দেয়া হয়েছিল যে মুল্যবান সেগুন গাছটি তাতে প্রাণ অবশিস্ট নেই। নিরব মৃত্যু গৃহস্থের স্বপ্নের ইতি ঘটিয়ে দিয়েছে। সবুজ গাছের সাড়ি নিজেদেরকে সর্বসান্ত করে দিয়ে মানুষের প্রাণ বাচিয়ে দিয়েছে। আমি নিরবে দেখলাম। গভীর দুখবোধ নিয়ে নিরবেই সমবেদনা জানালাম।

অকস্মাৎ ঝিঝি পোকার ডাকে আমার সম্বিত ফিরে আসে। কতদিন পরে শুনছি এই ডাক !!! আমি চমকে উঠি। ঝি-ঝি-ঝি-ঝি-ঝি-ঝি-ঝি-ঝি- ররররররররররররর –র-র-র—র—র----র-----র------র -- ঝি-ঝি-ঝি-ঝি । কে যেন আমাকে টেনে নিয়ে যায় অনেক অনেক দিন আগের কোন এক অপরিকল্পিত কোলাহলমুখর সময়ে। সন্ধার আলোআধারিতে বাঁশের খুটিতে কঞ্চি পিটিয়ে--

আয় ঝিঝি আয়
তোর মায় তোরে থুয়ে
কলই ভাজা খায়।

আমার কি ঝিঝিপোকা ধরার বয়স আছে !

একটা দুস্ট প্রশ্ন আমার মাথায় কিলবিল করছে। আচ্ছা অস্ট্রেলিয়ায় কি ঝিঝি পোকা আছে। চৈতালী দুপুরের রোদে টরেন্টোর কোন বাঁশ বাগানে কি ঝিঝি পোকার ডাকে কান ঝালাপালা হয়? কিংবা আবুধাবীর বিস্তীর্ণ বালুর সমুদ্রে !! আছে কি কোকিলের একটানা কুহু কুহু ডাক।


আমি জানিনা আছে কিনা। না থাকলেও আমার কিছু করার নেই। আমি কেবল আরেকবার আমার বাড়ির ছায়াঢাকা আঙ্গিনায় আপনাদের দাওয়াত দিতে পারি যেখানে লাউয়ের ডগায় লকলকিয়ে ওঠে সম্বাবনার বাংলাদেশ। আমার পুলের রেলিংয়ে হেলান দিয়ে দক্ষিনা বাতাস গায়ে মাখার অনুমতিটুকুই কেবল আমার দেয়ার মত আছে। শ্যামলিম বাংলাদেশ কেমন আছে সে আমি বলতে পারবনা
১১টি মন্তব্য ১০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×