১.
সুন্দর পরিপাটি সাজানো বিছানায় বালিশের একপাশে আলগোছে পড়ে থাকে নজরকাড়া মলাটের একটি বই, নানা মতের নানাপথের গুনীজন অন্তত যার অমরত্বের ব্যাপারে কোনরূপ দ্বিমত পোষন করার কারন খুজে পাননি। ক্লান্ত শরীরে গা এলিয়ে দিতে গেলেই বইয়ের দিকে নজর পড়ে। আস্তে করে তুলে নেই। অন্যরকম সুবাস মাখা পৃষ্ঠাগুলো একটা একটা করে উল্টাতে থাকি। যতই গভীরে যাই ততই যেন আমার ইচ্ছেরা তাদের পুরাতন ভুলের প্রায়শ্চিত্য করার জন্য উম্মুখ হয়ে ওঠে।
একসময় খুব বই পড়ার অভ্যাস ছিলো। এখনও যে নেই তা নয় তবে নানা কাজের চাপে একটু কমেছে। বাসায় আসতে পারলেই আরেকবার সে অভ্যাসের দিকে হেটে যাবার একটা মৃদু তাকিদ চারপাশে হাটাহাটি করতে থাকে। গোলাম মোস্তফা সমগ্র হাতে নিয়ে আমি পুরাতন দিনের কথাগুলো মনে করে নিজেকে তিরস্কার করছিলাম। পৃথিবীর তাবৎ জানা অজানা কথা গুলো লেখা আছে বইয়ের পাতায় অথচ আমি কিনা ধীরে ধীরে বইয়ের আঙিনা থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। ঠিক না, একদমই ঠিক না। বই হোক আমাদের নিত্য সঙ্গী। দ্বিধাদ্বন্দ ছেড়ে আমি আরেকবার জেগে উঠতে চাই। জেগে উঠতে গিয়ে নরম বিছানায় হারিয়ে যাই ঘুমের দেশে।
২.
পেটে অসম্ভব ক্ষুধা নিয়ে ঘুম থেকে জেগে উঠি। গতকাল রাতে খেয়েছিলাম তাড়াতাড়ি এবং পরিমানেও কম। রাত পোহাতেই তাই ক্ষুধার দৈত্য হানা দিয়েছে। তর্জন গর্জন উথাল পাথাল গুড়গুড়ানীতে আমার সাধের ঘুম পালিয়ে যায় দুরে, বহুদুরে।
ছুটে গিয়ে অসম্ভব দ্রুততায় উদরপূর্তি করে আমি শান্তির নিশ্বাস ফেলি। আমি শান্ত হলেও আমার মনে খচখচানী লেগেই থাকে। মনে হচ্ছে যেন এতদিনে একটি চরম বাস্তবতাকে আমি আমার উপলব্দিতে যায়গা করে দিতে পেরেছি। যে নির্মম সত্যকে প্রান্তিক জনপদের মানুষ নিয়মিত মোকাবিলা করে আমি যেন আজই প্রথম তার দেখা পেলাম।
প্রত্যেকদিন সকালেই কি এমন ক্ষুধা নিয়ে বাংলাদেশ জেগে ওঠেনা !
৩.
ক্ষুধা না থাকলেও ঘুম থেকে উঠি খুব সকালেই তবে আলস্যবশত সময় কেটে যায় বিছানায় গড়াতে গড়াতে। টম এন্ড জেরি কার্টুনের টমের মত চোখের দু পাতা মাসকিন দিয়ে আটকে তারপর তাকিয়ে থাকি জানালা দিয়ে বাইরে। সকালের এই নিরব সময়ে সবুজ গাছ, শুভ্র ফুলের হাসি কিংবা কোলাহল মুখর পাখির ডানা ঝাপটানো দেখার ইচ্ছে থাকলেও ঢাকা শহর বলে কথা, যেদিকেই তাকাই কেবল নিস্প্রান দেয়াল কখনোবা পাশের বাড়ির জানালা। আমি আনমনে তাকিয়ে থেকে ইট গুনি। গুনতে গুনতে কখন ঘুমিয়ে পড়ি আবার। লাল নীল স্বপ্নগুলো খেলা করে যায় স্বপ্নের আঙিনায়।
কখনো কখনো ঘুম ভেঙে যায় আরো আগে। টুং টাং থালা বাসনের নড়াচড়া, পানির কল থেকে ছরছর পানি পড়ে, আবার বন্ধ হয়। গরম তেলে পড়ে কিছু একটা ঝলসে ওঠার শব্দ শোনা যায়। আমি জানি কি ঘটছে তাও আরেকবার কৌতুহল ভরে এগিয়ে যাই। আপন মনে চলছে রান্নাঘরের টুকিটাকি। নিত্য দিনের চালচিত্র। একদিন.. দুইদিন.. প্রতিদিন..........। জ্ঞান হবার পর থেকে দেখে আসছি যে স্বাভাবিক চিত্র কখনো কখনো তাই বড় অসাধারন, ব্যতিক্রম হয়ে ওঠে আমার অভিভূত চোখের পর্দায়। শীতের তীব্রতায় কাপে যখন পুরো শহর. উত্তুরে কনকনে হাওয়ায় মুড়ি দিয়ে পড়ে থাকে জনপদ, একটা পাতলা চাদর গায়ে রান্নাঘরের ছোট্ট চৌহদ্দিতে তখন ঠিকই তার আনাগোনা।
ছাদের সাথে ঝুলানে পাখা ফুল স্পীডে ঘুরিয়ে মাথার নিচে বালিশ আরো একটা দিয়ে আমার আরামের ব্যারাম মাথাচারা দিয়ে ওঠে কিন্তু ততক্ষনে উনুনের তাপে নেয়ে ঘেমে একাকার সারা শরীর, তীব্র আচে লাল হয়ে যায় মুখমন্ডল।
দাত ব্রাশ করি, মুখে পানি দিয়ে গড়গড়া করে তোয়ালে ছুয়ে একসময় ডাইনিং টেবিলে এসে বসি। হটপটে সাজিয়ে রাখা পরোটার ঘ্রান পেটের মধ্যে একটু আধটু ইচ্ছেরা জানান দিতে শুরু করেছে। চেয়ার টেনে বসার শব্দেই রান্না ঘর থেকে ধুয়া উঠানো সব্জির পাত্র নিয়ে চলে আসেন তিনি। সকল কস্টকে ছাপিয়ে ভোরের ফোটা ফুলের স্নিগ্ধতা লেগে থাকে তার চোখে মুখে। আমি কেবল অবাক হয়ে সেদিকে তাকিয়ে থাকি।
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই জুন, ২০০৮ রাত ১২:৩৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



