
ইমাম প্রশিক্ষণ একাডেমীতে গত শনিবার ব্যালে ড্যান্সের পর নৃত্যশিল্পীর সাথে করমর্দন করেন ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ডিজি সামীম মো: আফজাল
বিগত শতাব্দীর আশি ও নব্বইয়ের দশকজুড়ে ইসলামিক ফাউন্ডেশন এ দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে সুস্খ ধারার সঙ্গীত চর্চা এবং স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে তা ছড়িয়ে দেয়ার মহতী উদ্যোগ গ্রহণ করে। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ইসলামি সঙ্গীতের একটি চমৎকার সঙ্কলন প্রকাশ করে এই জাতীয় প্রতিষ্ঠান।
প্রতি বছর দেশজুড়ে হামদ, না’ত ও গজল প্রতিযোগিতার আয়োজন করে ইসলামিক ফাউন্ডেশন। বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয় তুলে ধরা এবং ইসলামের সার্বজনীন রূপকে ছড়িয়ে দিতে এসব অনুষ্ঠান সুধীমহলে সমাদৃত হয়।
১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালেও এ কর্মসূচি অব্যাহত রাখে।
কখনোই ধর্মীয় ভাবধারার কল্যাণমুখী কর্মকাণ্ড নিরুৎসাহিত করা হয়নি। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কর্মসূচির বদৌলতে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তৈরি হয়েছে বহু প্রতিশ্রুতিশীল শিল্পী, যারা এখনো সুষ্ঠু সংস্কৃতির বিকাশে কাজ করে চলেছেন। কিন্তু এবার পরিস্খিতি ভিন্ন। ইসলামিক ফাউন্ডেশনকে (ইফা) তার লক্ষ্য-আদর্শ থেকে বিচ্যুত করে প্রচলিত গানবাজনা প্রচলনের কাজে ব্যবহার করার ব্যাপক অভিযোগ উঠেছে।
কাজী নজরুল ইসলামের ইসলামি গানের খ্যাতনামা শিল্পী কিংবা বাংলাদেশের আবহমান কালের ভক্তিমূলক গানের শিল্পীদের বাদ দিয়ে আধুনিক গানের শিল্পীদের দিয়ে এরই মধ্যে একাধিক অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়েছে, যাদের অনেকেই মুক্তমঞ্চে নৃত্য ও গানবাজনা করেছেন। ধর্মীয় এই প্রতিষ্ঠানে যে ধরনের ভাবগাম্ভীর্য রক্ষা করা প্রয়োজন তা এখন কাগজে কলমেই সীমাবদ্ধ।
গত শনিবার আগারগাঁওয়ে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ইমাম প্রশিক্ষণ কেন্দ্র পরিদর্শনে আসে একটি মার্কিন প্রতিনিধিদল। এই প্রতিনিধিদলের সম্মানে আয়োজন করা হয় একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের। বাংলাদেশের সংস্কৃতির সুস্খ ধারার বিনোদন বলতে যা বোঝায় কিংবা ঐতিহ্যবাহী ইসলামি কোনো অনুষ্ঠানমালা প্রদর্শনের বদলে ইফা’র ডিজি সেখানে অশ্লীল ব্যালে ড্যান্স প্রদর্শন করেন। ডিজি নিজে উপস্খিত থেকে নামাজের ওয়াক্তে এই নৃত্য প্রদর্শনের হুকুম দেন। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ধর্মীয় ভাবমর্যাদা এভাবেই তিনি ধুলায় লুটিয়ে দেন। সারা দেশের আলেমসমাজ এ ঘটনায় ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন। ডিজি এবং তার অনুগত কিছু কর্মকর্তা ঘটনাটিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের একাধিক কর্মকর্তা নাম না প্রকাশ করার শর্তে বলেন, নিজে একজন লেবাসধারী লোক হয়ে বর্তমান ডিজি যা করছেন তাকে বেলেল্লাপনা বললেও কম বলা হয়। ইসলামের নাম ব্যবহার করে এ ধরনের কার্যক্রম পরিচালনার কোনো এখতিয়ার না থাকলেও গায়ের জোরেই তিনি তা করে চলেছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের রাষ্ট্রীয় কিংবা জাতীয় পর্যায়ভিত্তিক অনুষ্ঠানে এর আগে ভক্তিমূলক সঙ্গীত, হামদ ও না’ত পেিরবেশন করেছেন প্রখ্যাত শিল্পী সোহরাব হোসেন, মুস্তফা জামান আব্বাসী, খালিদ হোসেন, শবনম মুশতারীর মতো প্রথিতযশা শিল্পীরা। তাদের অংশগ্রহণে সেসব অনুষ্ঠান প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। কিন্তু এখন আর এসব শিল্পীদের ডাকা হয় না। পরিবর্তে আধুনিক গানের শিল্পীদের দিয়ে আসর বসানোর রেওয়াজ চালু করা হয়েছে। ইফা’র মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম প্রকল্পের শিক্ষার্থী, ইমাম মুয়াজ্জিন এবং অভিভাবকদের নিয়ে গত ১৭ মার্চ একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বঙ্গবìধুর জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে ইফা’র ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয় এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। আগারগাঁওয়ে অবস্খিত ফাউন্ডেশন ভবনের অনুষ্ঠানে সঙ্গীত পরিবেশন করেন শিল্পী কাঙ্গালিনী সুফিয়া। অনুষ্ঠানে কাঙ্গালিনী সুফিয়ার সাথে করমর্দনও করেন ডিজি সামীম মোহাম্মদ আফজাল । কাঙ্গালিনী সুফিয়ার একতারা এবং শরীর দুলিয়ে নাচ-গানে বিব্রত অবস্খায় পড়েন উপস্খিত ইমামরা। এ ছাড়া ১২, ১৩ ও ১৪ এপ্রিল ইফা’র ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয়ে জাতীয় শিশু-কিশোরদের প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠানে হামদ ও না’তের বিচারক হিসেবে এমন শিল্পীদের আনা হয় যাদের অনেকেই ইসলামি সঙ্গীতের ধারার সাথে পরিচিত নন। উপস্খিত অনেকে এনিয়ে প্রশ্ন তুললে ডিজি তাদের ধমক দিয়ে বসিয়ে দেন।
শরিয়তের বিধান লঙ্ঘন করে ফিতরা : রমজানে ফিতরা নির্ধারণের দায়িত্ব সরকারিভাবে বরাবরই ইসলামিক ফাউন্ডেশন কর্তৃপক্ষ পালন করে। ধর্ম মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি, বায়তুল মোকাররম মসজিদের খতিব ও বিশিষ্ট আলেমরা একত্রে বসে ফিতরার পরিমাণ নির্ধারণ করে দেন। মূলত ইসলামিক ফাউন্ডেশনই এ কাজে অফিসিয়াল যোগাযোগ রক্ষা করে। এত দিন এ নিয়ে কোনো বড় ধরনের মতপার্থক্য হয়নি। শরিয়তের বিধান লঙ্ঘনের মতো গুরুতর অভিযোগও ওঠেনি। কিন্তু গত রমজান মাসে হঠাৎ করেই সম্পূর্ণ মনগড়াভাবে ইফা’র উদ্যোগে ফিতরা নির্ধারণ করা হয়। হাদিসে ফিতরার হিসাবে গম বা আটার কথা বলা হয়েছে। আলেমদের মতে যেহেতু হাদিসে গম বা আটার কথা বলা হয়েছে তাই গম বা আটার মূল্য হিসাবে যে টাকা আসে সেই পরিমাণ টাকা বা সেই পরিমাণ টাকায় অন্য যেকোনো খাদ্যদ্রব্য প্রদান করা যাবে।
কিন্তু এ বছর ইফা চালের হিসাব করে ফিতরা নির্ধারণ করে ১০০ টাকা। এতে সারা দেশের আলেমসমাজের পক্ষ থেকে প্রতিবাদ করা হয়। পরে ভুল স্বীকার করে আবার ৪৫ টাকা ঘোষণা করা হয়। এতে জাতীয় এ প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা নষ্ট করা হয়েছে বলে অনেকেই মনে করেন। যত দূর জানা যায়, ফিতরা নির্ধারণে ১০০ টাকা প্রস্তাবের মূল নায়ক ছিলেন ইফা’র ডিজি। ‘বর্তমান সরকারের আমলে ফিতরার পরিমাণও বেড়েছে’ এ ধারণা প্রচার করতেই তিনি মনগড়াভাবে ‘চালতত্ত্ব’ হাজির করেন।
দেশের সর্ববৃহৎ কওমি মাদরাসা দারুল উলুম মুইনুল ইসলামের (হাটহাজারী মাদ্রাসা) প্রধান মুহাদ্দিস আল্লামা হাফেজ শামসুল আলম বলেন, ইসলামিক ফাউন্ডেশনে শরিয়তবিরোধী কাজ যেভাবে চলছে তা মেনে নেয়া যায় না। ইসলাম প্রসারের কথা বলে শরিয়ত সমর্থন করে না এমন কাজ অপরাধের শামিল।
বাংলাদেশ কওমি মাদরাসা শিক্ষাবোর্ডের মহাসচিব মাওলানা আবদুল জব্বার বলেন, ইসলামিক ফাউন্ডেশনে একের পর এক শরিয়তবিরোধী কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে। ইসলামি বিধি বিধানের তোয়াক্কা না করেই অনেক কাজ চলছে। ইসলামের নামে শরিয়তবিরোধী এসব কাজ চলতে পারে না।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



