এ্যাই জান,জানরে তুমি কি শুনছো?চমকে উঠে টিভির দিকে তাকিয়ে দেখি কাটুর্ন নেটওয়ার্ক চ্যানেলে টম এন্ড জেরি চলছে। ইংরেজী চ্যানেলে বাংলা সংলাপ তাও কিনা সব সময় টম কে দৌড়ের উপরে রাখা জেরীর মুখে!পিচ্চি বেলায় কোন কিছু বিশ্বাস হতে না চাইলে যেমন করে নিজের হাতে চিমটি কেটে জেগে আছি না ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখছি নিশ্চিত হতাম তেমনি করে ডান হাত দিয়ে বাম হাতে চিমটি কাটতে যাব এমন সময় আবারও এ্যাই জান,জানরে তুমি কি শুনছো বলতে বলতে মিথি ডয়িংরুমে এসে আমার পাশে বসে অবাক করে দিয়ে আমার হাতটা ওর হাতের মাঝে নিয়ে বলল,আমার লক্ষী জানটা কি আমার ডাক শুনতে পাইনি?অবাক বিষ্ময়ে মিথির দিকে তাকিয়ে রইলাম।আজ সকালেও অফিসে যাওয়ার সময় মিথি আমার মত হাজার বিশেক টাকা রোজগারী ছেলের সাথে বিয়ে দেওয়ার জন্য ওর মা-বাবাকে বকাঝকা করেছে।প্রায় প্রতিদিনই কোটিপতি স্বামী না পাওয়ার দুঃখে যে মিথি মা-বাবাকে বকাঝকা করে মনের ক্ষোভ মেটায় সেই মিথির এমন উপচে পড়া ভালবাসা!
ঠিক কতমাস আগে মিথির মুখে ‘এ্যাই জান,জানরে’ শুনেছি সে ভাবনার রাজ্যে হারাতে যাওয়ার আগেই মিথি আমার হাতে আলতো করে চিমটি কেটে বলল,এ্যাই জান,এমন করে হাঁ করে থাকলে মশা তোমাকে না কামড়ে মুখের ভেতর ঢুকবে।রাজ্যের বিষ্ময় নিয়ে মিথিকে কিছু বলতে যাব তার আগেই মিথি থামিয়ে দিয়ে বলল, তোমার শ্যালিকা তিথি আসছে দুলাভাইকে নিয়ে শপিংয়ে যাবে তাই।ওর ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছে ‘আপু বলেছে দুলাভাই নাকি আমাকে বাজারে আসা শীলা কি জাওয়ানি থ্রিপিস কিনে দেবে’। তিথির সেই স্ট্যাটাসে লাইকের সেঞ্চুরি হয়েছে।ওর এফবি ফ্রেন্ডরা তোমার যা প্রশংসা করেছে না !তোমাকে সবার কাছে বড় করতেই আমি তিথিকে বলেছি ওকে তুমি থ্রিপিস কিনে দিবা। আমি জানি তুমি রাগ করনি।আমার বেশী কিছু লাগবেনা।তিথি বলেছে বাজারে নাকি মুন্নি বদনাম হুয়ি গানটায় নায়িকাটা যে ড্রেসগুলো পড়েছেনা সে ড্রেসগুলোর আদলে বাজারে ‘মুন্নি’ থ্রিপিস এসেছে।আমাকে একটা ‘মুন্নি’ থ্রিপিস কিনে দিলেই হবে।এখন উঠো ফ্রেশ হয়ে তাড়াতাড়ি রেডী হয়ে নাও সোনা মানিক আমার বলে মিথি বেডরুমের দিকে হাটাঁ শুরু করল।অফিস থেকে বেতন+ঈদ বোনাস হিসেবে পাওয়া মানিব্যাগ আলোকিত করে থাকা ২৫হাজার টাকার কচকচে নোটগুলোই যে ‘এ্যাই জান,জানরে,সোনা মানিক’ টাইপের ভালবাসা উপচে পড়ার গোপন রহস্য বুঝতে পেরে মনটা হাহাকার করে উঠলো।
তিথিকে ‘শিলা কি জাওয়ানি’ আর মিথিকে ‘মুন্নি’ থ্রিপিস কিনে দিলেই ১৫হাজার টাকার উপর চলে যাবে।ঈদের আরো কত খরচ।ঈদের পরের মাস চলব কি করে ভাবতে ভাবতে ফ্রেশ হয়ে বাথরুম থেকে বেরিয়ে দেখি তিথি হাজির।আমাকে দেখেই ঢংঙ্গী স্বরে মুখ ফুলিয়ে বলল,আল্লাহ! দুলাভাই তুমি এত্ত সুইটা!আল্লাহ! আমার দুলাভাইটা কত্ত লক্ষী।জানো এমন লক্ষী দুলাভাই পাওয়ায় আমার হিংসুটে বান্ধবীরা না তোমার ড্রেস কিনে দেওয়া নিয়ে যে স্ট্যাটাস দিয়েছি ঐটাই কমেন্ট করে নাই।শুধু ছেলেরা লাইক আর কমেন্ট দিয়েছে।ইচ্ছা হলো তিথির ঢংয়ে কিলবিল করা ফোলানো মুখে কইষ্যা একটা চড় দিতে।কিন্তু মনের আশা মনেই রয়ে গেলো।অল্প বয়সী আমাকে দুলাভাই ডাকতে যে তিথির কয়েকদিন আগেও লজ্জা লেগেছে সে তিথি বাসা থেকে ঝলমলে শপিং সেন্টারের সামনে সিএনজি থেকে নামা পর্যন্ত কম করে হলেও ২০০বারের উপর দুলাভাই ডেকে ফেলেছে।রায়হানকে গতকাল ওর শ্যালিকা দুলাভাই ডাকতে শুনে তিথির মুখে দুলাভাই ডাক শুনতে না পারার দুঃখে গতকালও ব্যাপক আফসুসিত হয়েছিলাম।কিন্তু আজ যতবারই তিথি দুলাভাই ডাকছে ততবারই মনে মনে একটাই বাক্য ‘গুষ্টি কিলাই তোর দুলাভাই ডাকের’।একটু আগেও আমার প্রতি ভালবাসায় উপচে পড়া বউ-শ্যালিকা আমাকে বাইরে রেখেই শপিং সেন্টারের ভেতরে ঢুকে গেলো।ঘন্টা তিনেক আগেও ভারী থাকা মানিব্যাগ হালকা হওয়ার দুঃখ নিয়ে শপিং সেন্টারের সামনের সিড়িঁতে বসতেই এক ৯-১০বছরের একটা পিচ্চি এসে সামনে দাড়াঁল।
-ভাইজান ১০টা ট্যাহা দিবেন?
-১০টাকা দিয়ে কি কাপড় কিনবি?
-ভাইজান দেহি বোকা।১কাপ চা আর একটা বনরুটির দামই ১০ট্যাহা।
-আরে তাই তো!১০টাকা দিয়া কি করবি শুনি।
- আইজক্যা,কাইলক্যা,পরশু,তরশু,বরশু আরো যা পামু সব জমায়া আমার লাইগ্যা একটা কোর্তা কিনুম প্যান্ট কিনুম লগে একটা চশমাও কিনুম।ঈদের দিন শাকিব খানের ছবি দেখুম।ভাইজান আপ্নে কি কিনবেন?
-আমি কিছু কিনব নারে।
-ক্যান ভাইজান আপ্নের কি ট্যাহা নাই?
-বিয়া করলে পুরুষের সব টাকা বউয়ের হয়ে যায় বুঝেছিস পিচ্চি?
-বুঝছি আপ্নেও আমার মত ফকির।ভাইজান একটা বুদ্ধি দেয় আপ্নারে।পুরান কাপড় চোপড় পইরা আমার সাথে নাইমা পড়েন।আপ্নে আন্ধা সাজবেন।আমি আপ্নের হাত ধইরা ধইরা মাইনষের কাছে পয়সা চামু।ঈমানে কইতাছি ভাইজান,এখন ঈদের বাজার বেশ ভাল ধান্ধা করতে পারুম দুইজন মিল্যা।
পিচ্চিটাকে কিছু বলতে যাব এমন সময় ৪জন RAB দৌড়ে এসে আমাদের দুইজনকে ঘিরে ধরে টেনে নিয়ে মাইক্রোতে উঠাল।আমার অপরাধ (?) শপিং সেন্টারের সামনে বসে টোকাইয়ের সাথে ছিনতাইয়ের প্ল্যান করছি!ছিনতাইয়ের না ভিক্ষার প্ল্যান করছি পিচ্চিটা RABকে বলতেই এমন ধমক দিল যে পিচ্চিটা প্যান্ট ভিজিয়ে ফেলল।প্যান্ট ভিজানোর পুরষ্কার হিসেবে RAB ভাই পিচ্চিটাকে মাইক্রো থেকে নামিয়ে দিলো।কি মনে করে আমাকেও নামিয়ে দিলো!পিচ্চিটার হাত ধরে একটু সামনে গিয়ে বললাম,ঈদের দিন পর্যন্ত তুই আমার সাথে থাকবি।RAB যেভাবে ক্রসফায়ার থেরাপী দিয়ে ঈদের আইন শৃংঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক রাখতে চাইছে কোনদিন না জানি আবার ধরে।তুই থাকলে তোর ‘হিসু থেরাপী’ আমাকে উদ্ধার করবেরে পিচ্চি..
ফান ম্যাগাজিন ভিমরুলের ঈদ সংখ্যায় প্রকাশিত।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



