ডেনিশ পত্রিকার হযরত মোহাম্মদ সাঃ এর কার্টুন নিয়ে যখন ফ্যানাটিকদের উম্মাদনা চরমে তখন বাংলাদেশে কি কি হয়েছে তার একটা রোমান্থন করা যাক
বাটার দোকানে আগুন দিয়েছে।
ডানো গুড়ো দুধ বয়কট হয়েছে।
ড্যানিশ এম্বাসী ভাঙতে চেয়েছে উম্মাদরা।
বাংলাদেশে ড্যানিসদের চলাচলের উপরে বিধিনিষেধ আরোপ হয়েছে। আমার ডেনিশ কলিগ দুইদিন অফিসে লুকিয়ে ছিল। বাসায় যায় নি ভয়ে।
হঠাৎ করে দেখা গেছে ড্যানিস স্টক একচেঞ্জে ধস নেমেছে।
ড্যানিশ সংশ্লিষ্ট পত্রিকাটা মত প্রকাশে হস্তক্ষেপ না করতে অনঢ় ছিল অনেক দিন। কিন্তু অর্থনীতি আর ব্যবসা নীতির চাপে নতি স্বীকার করে প্রধানমন্ত্রী। ক্ষমা চায় মুসলিমদের কাছে।
ততদিনে যীশুর কার্টুন হয়েছে ভুরি ভুরি। মোটামুটি ইসলাম যেভাবে প্রতিবাদের ভাষা শেখায় তার থেকে ভিন্নতর পদ্ধতি দেখেছে বিশ্ববাসী। যেমন দেখেছে নাইন ইলেভেনে। যেমন দেখেছে বাংলাদেশে জেএমবির বোমাবাজিতে।
ইসলাম সন্বন্ধে কে কি বললো মূলত তাই নিয়ে ফ্যানাটিকদের নিরন্তর গবেষণা, আস্ফালন। হযরত মোহাম্মদ সাঃ এর সময়ে এমন চিত্র গোত্রে গোত্রে অহরহ্ই সংগঠিত হতো। তায়েফে তাকে রক্তাক্ত করা হয়েছে। দুর্বিসহ সে দৃশ্যের বর্ণনা শুনে আমরা শিহরিত হই। কিন্তু ভালোবাসার উম্মাদনার চিত্র ক্রমশ বিকশিত হয়েছে এর অব্যবহিতকালে। শিয়াদের শরীর রক্তাক্ত করে হায় হোসেন হায় হোসেন মার্সিয়া এক ধরণের বিকারগ্রস্থতায় পরিনত হয়েছে। এটা মূলত মুসলিমদের একধরণের ভালোলাগার প্রকাশ, একটা অনণ্য বৈশিষ্ট্য।
সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া সবসময় ব্যাপক ও চরম মাত্রায় হয়ে থাকে। তারা খুব সহজে চিৎকার করে আবার ইঁদুর গর্তে লুকাতেও দেরী করে না। যারা কার্টুনের কথা শুনেছে, তারা নাউজুবিল্লাহ বলে চিৎকার করেছে। দেখার চেষ্টাও করেনি। ভেবেছে পাপ হবে। আর উদ্দেশ্যমূলক ইস্যু তৈরীকারী মদদদাতারা এটাকে চাবি বানিয়েছে। তারপরে খুলে দেখেছে মোহাম্মদ সাঃকে কত ব্যাঙ্গাত্বকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
এইসমস্ত সুবিধাবাদী ধর্ম ব্যবসায়ীরা সাধারণ মানুষের মধ্যে ঘৃনার বিষ ছড়িয়ে দিয়েছে। মোহাম্মদ সাঃ এর কার্টুন ইস্যুতে ইন্দোনেশিয়া থেকে শুরু করে উগান্ডা পর্যন্ত কমপক্ষে বিশ জন প্রান হারিয়েছে। কিন্তু মুসলিম ব্রাদারহুড সেই চিরচেনা অন্ধকার হিপোক্রেসীর জায়গাতেই রয়ে গেছে।
অমি রহমান পিয়ালের ব্লগসাইটিতে একশটার মধ্যে ৯৯টাই মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন ঘটনাপঞ্জী। অনেকটা আর্কাইভের মত। তার ইন্টারএ্যাকশন মন্তব্যে। ব্লগকে আজকের অবস্থানে নিয়ে আসার মত যতগুলো ঘটনা ঘটেছে তার সাথে জরিয়ে আছে ওতপ্রোতভাবে। সেই প্রাপ্তির পর থেকে ব্লগ নিয়ে গর্ব করার মত যা কিছু আছে, কি পরামর্শ আর কি নতুন ব্লগার আমদানী, সব জায়গাতেই তার সদর্প পদচারণা। সেই সাথে বিভিন্ন ফোরাম, মিডিয়া ও পত্রিকায় সামহোয়ারের বিকাশের জন্য লেখা, ইনস্পরিয়েশনের জোগান দিয়েছেন তিনি।
আমরা যারা তারা সাথে ঘনিষ্টভাবে মিশেছি তাদের প্রত্যেকেই একবাক্যে স্বীকার করবে পিয়াল কখনও ধর্মকে নিয়ে অশালিন মন্তব্য করেনি। যারা ব্লগে জামাত বিরোধী মুসলমান তারা এ বিষয়টা একবাক্যে স্বীকার করবেন। আর তাছাড়া আমাদের যাদের নাস্তিক হিসাবে অহরহ মাপা হয় তাদের দলে পিয়ালকে ফেলতে কেউ রাজী হবে না, আমরাই হবো না। সংগতকারণে আমাদের আড্ডাতেও ধর্মবিষয়ক কথা বলো হতো মেপেঝেপে।
জানতে চাই, পিয়ালের মোহাম্মদ সাঃ এর কার্টুন দেখাটা কি ফরজ ছিল, যে সে না জানলে তার মুসলমানিত্বের ক্ষতি হবে। নাকি এটা দেখা প্রতিটা মুসলমানের জন্য জরুরী কারণ নইলে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা যাবেনা? যদি তাই হয় তবে প্রতিটি কার্টুনের অসংখ্য কপি করে বাংলার প্রতিটি মানুষকে দিয়ে দিন, যেন আর কখনও এমন ভুল না হয়। প্রয়োজনে তারা সেটাকে সাজিয়ে রাখুক তাদের ঘরে, প্রার্থনাস্থানে!
পিয়াল কার্টুনটি নবীজীর জানার পরে দুঃখিত বলে অপসারণ করেছে। যদি তার উদ্দেশ্য থাকতো আঘাত দেয়া তবে কে কে আঘাত পেয়েছে একটু খতিয়ে দেখুন। যারা এই কার্টুন আগে দেখেছে তারাই। এবং কারা তারা আপনারা ভাল করেই জানেন।
পিয়াল যদি না জানার জন্য অপরাধী হয় তবে যারা সেই কার্টুন দেখে চিনে ফেলেছে তারা আরো বড় মাত্রার অপরাধী। পিয়ালের ইচ্ছে যদি আঘাত দেয়া হতো, তবে সে সেটা এত সহজে পালটে ফেলতো না। আর এ প্রশ্নটা ওঠার আগ পর্যন্ত কেউ আঘাত পেয়েছে বলেও জানা যায় না। কারণ তারা জানতোই না। একজন যখন কার্টুনটিকে সনাক্ত করে তখন সেটা জীবিত হয়ে ওঠে, সেটা আঘাতের বিষয়বস্তু হয়ে ওঠে। ঠিক এ জায়গাটাতে এসে আপনারা দৃষ্টি নিবদ্ধ করুন। ঠিক এ জায়গাটাতে, একটা অচিন্থিত কার্টুন আর চিন্থিত কার্টুনের আগে ও পরের চিত্র।
এবার তাহলে বলতে হচ্ছেই পিয়াল কে অভিযুক্তদের নেতৃত্ব দিয়েছে জামাতের মুসলমান নামধারীরা। সাথে টেনেছে সাধারণ ধর্মানুভূতিসম্পন্নদের। যার জন্য সুবিধাভোগী হয়েছে সেই জামাতমনস্ক ব্লগার। সামহোয়ারকে ম্যানিপূলেট করতে পেরেছে সাফল্যজনকভাবে।
যদি মোহাম্মদ সাঃ এর কার্টুন দেখে কিছু মানুষ একজন মানুষকে অশ্লীল গালাগালি আর রক্তারক্তি করতে দ্বিধাগ্রস্থ না হয় তবে একজন দেশের স্বাধীণতা ও মুক্তিযুদ্ধের আর্কাইভ তৈরী কারী পিয়ালকে ব্যান হতে দেখে চক্র নামের ব্লগার হিতাহিতজ্ঞানশূণ্য হওয়াটাও স্বাভাবিক চিত্র হতে পারে। চক্রের নিয়ন্ত্রণ হারানোর আসল রহস্য হচ্ছে পিয়ালের ব্যান। যদিও চক্রের এই আচরণের সাথে ধর্মান্ধদের ব্যান আন্দোলন একই প্রকারের তারপরেও চক্র যদি দোষী হয় টু সাম এক্সটেন্ড পিয়ালকে ভিকটিম এবং তার সরি ও অজ্ঞতাকে সরাসরি মিথ্যা বলে প্রতিপন্ন করা ব্লগারাও সমান অপরাধে অভিযুক্ত।
অমি রহমান পিয়াল ও আমি যখন সামহোয়ারে গেলাম সেই দিনটির কথা মনে পড়ে। আরিল বলেছিল, এটা মোর লাইকলী এ কমুনিটি ব্লগার। ব্লগস্পটে কারো ব্লগে যদি কার্টুন থাকতো কেউ কিছু মনে করতো না হয়তো, কিন্তু যেহেতু কমিউনিটির মুখপত্র সুতরাং এখানে সবাইকে এমোমোডেট করাটাই হচ্ছে এর আসল সৌন্দর্য্য। ভিন্নমত, আস্ফালন থাকবেই আবার সবাই ভিন্ন ইস্যুতে নতুন পোলারাইজেশন করবেই। আমরা প্রতিনিয়ত ব্লগে আমাদের ইন্টারএ্যাকশনের মাত্রায় নতুনত্ব ও পরিবর্তন নিয়ে আসি, বা আসতে হয় স্বাভাবিক নিয়মে। এই ব্লগের জামাতী ব্লগারদের আমি যেমন শ্রদ্ধা করি তেমন করি ছেড়ে যাওয়া প্রতিটা ব্লগারকে। কিন্তু অমি রহমান পিয়াল যখন ছবির জন্য এপলজি করেছে তখন সেটাকে উড়িয়ে দিয়ে তাকে ব্যান করার আন্দোলন বাস্তব জীবনের এমন কাজের সাথে জড়িতদের মৃত্যুদন্ড প্রদানের মত মনে হয়েছে। এখনও খুজলে অসংখ্য ইসলাম প্রিয় ধর্মভীরু মুসলিমের কম্পিউটারে ঐ কার্টুন পাওয়া যাবে। পার্থক্য হচ্ছে সেগুলো প্রকাশ্যে নেই আর পিয়াল ভুলবশত প্রকাশ করেছে।
এই অভিনব সরি-অস্বীকার প্রচেষ্টায় সামহোয়ার পুরোমাত্রায় ম্যানিপুলেশন হয়েছে। আমি শুধু একটা সম্ভাবনাময় সাইটে ডাইভারসিটির কিলিং দেখতে পাচ্ছি। ব্লগিং এ যারা মিশন নিয়ে নেমেছে তাদের জন্য এটা সুবিধাজনক হতে পারে কিন্তু সাধারণ মানুষ যারা অসংখ্য রঙের মধ্যে বাস করতে চায় তারা আগ্রহ ও আনন্দ হারিয়ে ফেলবে অচিরেই।
একটা কালারফুল মোমেন্টের ঘনছবিতে রং থাকবে, থাকবে ব্যবসায়িক উপদান। তবে মিশন নিয়ে যারা জংগীবাদ উসকে দিয়ে জামাতের স্বার্থসিদ্ধি করতে চায় তারা সংখ্যায় অল্প হলেও অনেক বেশি প্রতিক্রিয়া সংগঠিত করতে সক্ষম। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ তো চেতনার নামই কেবল নয়, একটা অত্যন্ত মুনাফালোভী ব্যবসায়িক মূলধনও। আজকে পিয়ালের ব্যান-দৃষ্টান্ত আগত কালের সমস্ত সম্ভানাময় ব্যবসায়িক অংশীদারদের মধ্য ছড়িয়ে যাবে। এ্যাডমেকার থেকে শুরু করে, সমস্ত সৃজনশীল সাংস্কৃতিকর্মীদের মধ্যে আর বাংলাদেশে সাংস্কৃতিক প্রতিক্রিয়া যেকোন উদ্যোগের সলিল সমাধির জন্য যথেষ্ট। জেনে যাবে এনজিও থেকে শুরু করে বিগ মার্চেন্ট আর এদেশে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা তৈরী হলে ক্ষতিগ্রস্থ হওয়া মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানীগুলোও। জামাত ব্যাকড আপ ও তাদের অভয়ারন্যের এমন একটা সাইটের সাথে ব্যবসায়িক অংশীদারিত্বও পুরোমাত্রায় ব্যর্থ হবে।
পিয়াল মুক্তিযুদ্ধের কথা স্বরণ করিয়ে দেয় ব্লগে। পিয়াল সামহোয়ারের স্বার্থের জন্য জরুরী। বিষয়টা ভেবে দেখার জন্য অনুরোধ করছি সংশ্লিষ্টদের।
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে জুলাই, ২০০৭ বিকাল ৫:১৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


