ঢাকায় বিভিন্ন রাস্তার ফুটপথে ঘরবিহীন মানুষের নিশিযাপন খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। মাঝেমাঝে মনে হয় এমন কিছু কি কেউ উদ্যোগ নিতে পারে না, যেখানে এইসব লোক নিদেনপক্ষে মাথা গোজার ঠাই পাবে। স্রেফ রাত্রিটা। অবশেষে তেমন একটা কিছুই হলো বাস্তবে। ভাসমান কর্মজীবিদের রাত্রিকালিন অবস্থানের জায়গা।
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় প্রায় চার হাজার স্কয়ারফিটের একটা ঘর উঠিয়েছে মিরপুরে। প্রায় দেড়শো মানুষ সেখানে চিতকাত হতে পারবে।
১৫ জুলাই উক্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব উদ্বোধন করে গেছে এবং ছিন্নমুলদের জন্য উন্মুক্ত হয়েছে ২২শে জুলাই। অবশ্য সেদিন রাতে কোন অতিথি এখানে থাকতে আসে নি।
ভেতরে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ফ্লোর, উপরে টিন, এমনকি ফ্যানও আছে। আহসানিয়া মিশনের পরিচালনায় এখানে একটা বালিশ ও মাদুর দেয়া হয়। রাত ৮টার পর থেকে সকাল সাতটা পর্যন্ত মাত্র ৩টাকায় এখানে থাকতে পারে যেকোন নিম্নআয়ের মানুষ। তবে একসাথে তিনদিনের বেশী নয়। একদিন পরে আবার তিনদিন থাকতে পারবে। এটা একদম পুরুষদের জন্য। নারীদের এখানে প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ।
কিন্তু এ পর্যন্ত সর্বোচ্চ ১২ জন এখানে ছিল। এদের মধ্যে রিকশা চালক, খন্ডকালিন মজুরী খাটা লোকজন, এমনকি গ্রামের ছাত্র, শহরে রিকশাচালক এমন লোকজন বেশী।
ভবিষ্যতে এই সিলিং এ আরেকটা ফলস ছাদ তৈরী করে টিউবলাইট বসানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এখন মশারী না দেয়া হলেও ভবিষ্যতে নাকি তারও ব্যবস্থা করা হবে।
রাত্রিনিবাস কেন্দ্রটি পরিচালনার জন্য তিনজন কর্মচারী এখানেই থাকে। সুপারভাইজার মুস্তাফিজুর রহমান দারুন আশাবাদী, ক্রমশ এই জায়গাটা গৃহহীনদের অবলম্বন হয়ে উঠবে হয়তো।
রাত্রি নিবাসে ক্রমশ কিছু নিয়ম-কানুন তৈরী হচ্ছে। অনাহুত পরিস্থিতির উদ্ভব এড়াতে সতর্কবানী উচ্চারণ করা জরুরী হয়ে পড়েছে এর মধ্যে।
এমন একটা রেজিস্ট্রি খাতা মেনটেন করা হয়। যেখানে লিপিবদ্ধ থাকে নাম, ঠিকানা, বয়স, পেশা। স্বাক্ষর করতে হয়। ইন্টারেস্টিং হলো নাম স্বাক্ষর করতে পারে না এমন একটা দৃষ্টান্ত আমি সেখানে খুঁজে পেলাম না। কয়েকজন নাম লিখেছে ইংরেজিতে।
গ্যাসের একটা লাইন থাকলে কর্মচারীরা সম্ভবত বৈদ্যুতিক হিটার ব্যবহার করতো না।
একটা সিকিউরিটি কোম্পানী থেকে আহসানিয়া দুজন গার্ড নিয়েছে। শামীম তাদের মধ্যে একজন। এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। পাশ করতে আশাবাদী।
সুপারভাইজার মুস্তাফিজুর রহমান। ইতোমধ্যে এই জায়গাটায় মেয়ে নিয়ে এসে ফটকাবাজী করতে দেবার আব্দার পেয়েছে এলাকার নেতা-পাতি নেতাদের কাছ থেকে। ভাল টাকা-পয়সা দেবার অফার দিয়েছে। সারাদিন পরে থাকে বিরান। কয়েকজন জুয়া খেলতে চেয়ে স্পেস চেয়েছে। মুস্তাফিজ আশাবাদী, এমন সে কিছুতেই হতে দেবে না! সহব্লগার সৃজন সন্দেহ প্রকাশ করেছে, সামনের দিনগুলোতে এই নীতি ঠিক রাখা হয়তো সম্ভব হবে না।
ব্লগার অন্যমনস্ক শরৎ আর সৃজন রাত্রে থাকার সম্ভাবনা যাচাই করছে
আব্দুস সাত্তার ঢাকা এসেছেন খুলনার পাইকগাছা থেকে। আত্মীয়র বাসায় থাকার সমস্যার কারণে এখানে থাকছেন তিনটাকার বিনিময়ে।
ভবন সংলগ্ন টয়লেট ও পানির ব্যবস্থা রয়েছে।
রাত্রিনিবাসের প্রবেশ পথ।
গেট পেরুলেই চিত্রটা এমন।
আহসানিয়া মিশনের সেলিম রেজা এই পুরো প্রজেক্টটা দেখছেন। সম্ভবত উনি প্রোগ্রাম অফিসার। যোগাযোগের জন্য একটা নম্বর পাওয়া গেছে - ৯১২৩৪০২। আমি মুস্তাফিজকে জিজ্ঞেস করলাম, লোকজনকে আপনারা জানাচ্ছেন কিভাবে। মুস্তাফিজ বললো, স্টেডিয়ামসহ বিভিন্ন জায়গাতে যেখানে ছিন্নমুল মানুষ রাস্তার উপরে ঘুমায় সেখানে গিয়ে সে কয়েকদিন বলেছে। কিন্তু রেসপন্স তেমন ভাল না। একমাস হয়ে গেলো এখনও মাত্র ১০/১২ জন এখানে তিনটাকা দিয়ে থাকতে আসে। অথচ ঢাকা শহরে কয়েকহাজার ছিন্নমুল প্রতিদিন রাতে রাস্তায় ঘুমায়।
সরকারী অর্থায়নে নির্মিত এমন একটা স্থাপনার সাথে সমাজ কল্যান অধিদপ্তর সম্পৃক্ত নয় কেন, বুঝতে পারছি না। পরিচালনায় একটা বেসরকারী সংস্থা আহসানিয়া মিশনও বা কেন তাও স্পষ্ট নয়। একটা এস্টাবলিশমেন্ট দেখিয়ে ডোনারদের নিকট থেকে বৃহৎ কন্ট্রিবিউশন বাগানো আপাতদৃষ্টিতে প্রতীয়মান হচ্ছে। এমন একটা স্থাপনা ওয়ার্ডভিত্তিক তৈরী হওয়া কোন ব্যাপারই না। প্রত্যেক কমিশনার উদ্যোগ নিলে এমন নিশিযাপন কেন্দ্র হতে পারে এক মাসের মধ্যে একশ। যেখানে রাত্রে মাথা গোজার ঠাই পেতে পারে ঢাকার সব ছিন্নমুল। কিন্তু এই নিশিযাপন কেন্দ্রটি নিয়ে আহসানিয়া মিশনের প্রচারণা ও পরিচালনা একদমই যাচ্ছে তাই।
অনতিবিলম্বে এমন একটা চমৎকার আয়োজনকে ছিন্নমুলদের ব্যবহার-ঘনিষ্ঠ করে গড়ে তোলার আহবান জানাই।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

