অনেকে ক্ষমা বা সরি বলতে এসে এমন ভাবে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলেন যে বোঝাই যায় না আসলে তিনি অনুতপ্ত কিনা। একধরণের আত্মাভিমান বেশ যুৎসই কুটনৈতিক ভাষায় ব্যক্ত করেন।
আমি এসব ভনিতার মধ্যে যাচ্ছি না। আমি নিশ্চিত আমার কিছু কিছু লেখা বা মন্তব্যে অনেক ধর্মপ্রাণ ব্লগার আহত হয়েছেন। যদিও গড়ে একটা পোস্টে আমার পাঠক একশও না। তারপরেও তাদের আহত হওয়ায় আমি অনুতপ্ত। আমি এজন্য ক্ষমা চাই।
মূলত ব্লগ যখন শুরু হয় সেসময় এর একধরণের উম্মাদনা ছিলো, অপার স্বাধীনতার ক্ষেত্র ছিলো - কখনও কল্পনা করা যায় নি এর লেখা সাধারণ মানুষের কাছে পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। আমি ব্যক্তিগত জীবনে আমার পরিবার-পরিজন-আত্মীয়স্বজন কারো সাথে ধর্ম বিষয়ক কোনো অমর্যাদাকর কথা বলিনি। ধর্মের নানা বিষয় সম্বন্ধে প্রশ্ন ছিলো - কিন্তু সেসব কৌতুহল মিটিয়েছি বই পড়ে, মানুষের সাথে আলাপ করে।
ব্লগে ধর্ম বিষয়ক নানা প্রশ্ন, সমালোচনা, উগ্র-সমালোচনার একধরণের সুযোগ ছিলো। এই নিয়ন্ত্রনহীন স্বাধীনতার যথেচ্ছা ব্যবহারও হয়। কখনও আমিও এমন মন্তব্য করেছি, ব্লগ লিখেছি - এর একধরণের ব্লগিও মিথস্ক্রিয়ার আকর্ষণ ছিলো বলে। কোন ধরণের শব্দ/ভাষা ব্যবহার করলে ধর্মপ্রাণ মানুষ আহত হয় এর বাইরের বাস্তবতা আর ব্লগের বাস্তবতা একসময় একদমই ভিন্ন ছিলো। বাইরে কোনো মানুষ ধর্ম সম্বন্ধে কটুক্তি করার সাহস রাখে না প্রকাশ্যে, কিন্তু ব্লগে সেটা করতে পারে অনায়েসে। কারণটা রিয়েলিটি ও ভার্চুয়ালিটির পার্থক্য আছে বলে। ফলে ভার্চুয়ালিটি যখন রিয়েলিটি হয়ে ওঠে বা রিয়েলিটিতে বিলিন হয়ে যায় ভার্চুয়ালিটি - ব্লগের ভাষা ও প্রতিক্রিয়ারও পরিবর্তন হতে থাকে। একসময় যা বাইরে বলা যায় না - তা ব্লগেও বলা যায় না - এমন একটা সমরেখায় এসে উপস্থিত হয়।
ধর্মের নানা গোঁড়ামি সম্পর্কে আমি কথা বলতে পছন্দ করি - যা যেকোনো সাধারণ শিক্ষিত মুসলমান করে থাকে। গ্রামে-গঞ্জে অনেক মানুষই ধর্মের নানারকম অপব্যাখ্যা করে, মাদ্রাসায় ঠিকমত পড়াশুনা করেনি - কিন্তু কিছু সুরা-কেরাত মুখস্থ করে সাধারণ মানুষের সামনে বিশাল আলেম হিসাবে জাহির করে। এসব চোখে দেখা। এমন সব আজগুবি গল্প তৈরী করে যার কোন রেফারেন্স পাওয়া যায় না। এসব বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের এক চরম সত্য।
আমাদের ধর্মজ্ঞান - যারা মাদ্রাসায় পড়েনি, তাদের দৌড় একদমই সীমিত ছিলো একসময়। আরবী না বুঝে, কুরআন শরীফ ও হাদিস শরীফের মর্ম না বুঝে কেবল কিছু ওয়াজ শুনে যে ধর্মজ্ঞান তৈরী হয় তা দিয়ে ইসলাম বোঝা সত্যিই অসম্ভব। তাছাড়া, মাদ্রাসায় যারা ধর্মজ্ঞান লাভ করেন - তাদের মধ্যেও ভালো ছাত্র, খারাপ ছাত্র রয়েছে। সবাই সমানভাবে ধর্মশাস্ত্র, ফিকাহশাস্ত্র ভালোমতো রপ্ত করতে পারবে এমনটি ভাবাও যায় না। তাদের কাছ থেকে সব সময় সঠিকভাবে ইসলামের শিক্ষাও সম্ভব হয় না।
ইন্টারনেটে, ব্লগে/ওয়েবে ধর্মের নানা বিষয় সহজলভ্য হওয়ায়, অনুবাদ হাতের কাছে থাকায় অনেক মানুষই ধর্মের নানা বিষয় নিয়ে আগের তুলনায় বেশী পড়া ও বোঝার সুযোগ পায়। এই একই মাধ্যমে ধর্মের সমালোচনার ক্ষেত্রও বিস্তৃত হবে এটাও স্বাভাবিক।
ব্লগে আমার ধর্ম বিষয়ক লেখায় মূলত আমি ধর্মের নানা গোঁড়ামিকে চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছি, এসব চেষ্টায় অনেক ভাষা প্রয়োগ অসংযমী ছিলো। কিন্তু কালক্রমে আমি সচেতন হয়েছি - যে ভাষার ব্যবহারে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে ফেলে মানুষের সাথে, তা সংশোধনের চেষ্টা করেছি।
এই চেষ্টাটা আমার নিজে থেকে ছিলো - তবে কখনও মনে হয়নি এটা পরিস্কার করে ঘোষণা দেয়ার দরকার আছে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে বাংলা ব্লগের শুরু থেকে এমন সব নানান তর্ক-বিতর্ক, ধর্মকে অবমাননা করে এমন কিছু নিদৃষ্ট ভাষা, শব্দ, বাক্য ব্যবহার চোখের সামনে দেখে নীরব থাকাও একধরণের অপরাধ। অনেকেই আমাকে সামহোয়ারইনব্লগের মডারেটর মনে করে থাকেন সেই ২০০৬ সাল থেকে, যা সম্পূর্ণ ভুল। সিনিয়র ব্লগার হিসাবে ব্লগের বিভিন্ন ইস্যুতে, ইভেন্টে থেকেছি বা পরামর্শ দিয়েছি হয়তো - কিন্তু কারো ব্যক্তিগত ব্লগিংয়ের পছন্দের বিষয় নিয়ে আমার মাথাব্যথা ছিলো না। এ বিষয়ে নাক গলানো আমার কাছে অযাচিত মনে হয়েছে। তাছাড়া ব্লগারদের একটা স্বাধীনচেতা মনোভব তৈরী হয়েছিলো - কে কি করলো, কিছু যায় আসে না, কৈফয়েত দেয়ার কি আছে বা কেনো এসবে নাক গলাবো - এটা আমার ইস্যু নয়, ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু কমিউনিটির অংশ হিসাবে এটা যে বিভিন্ন সময়ে মানুষকে আন্দোলিত করে, সংঘবদ্ধ করে সে বাস্তবতা মাথায় রেখেও আমরা নানা গ্রুপ ও পছন্দের মানুষদের সাথে ঐক্য বা ডিফেন্ড করার চেষ্টা করেছি। এসবই মূলত ব্লগের কিছু অবশ্যম্ভাবী গ্রাউন্ড রুল সেট করার ক্ষেত্রে অন্তরায় হিসাবে কাজ করেছে।
আমার কোনো লেখায় ধর্মপ্রাণ মানুষ এজন্য আহত হলে আমি অবশ্যই ক্ষমা প্রার্থণা করি। তবে তার চেয়ে বড় যে কারণে ক্ষমা চাওয়া জরুরী মনে করি তা হলো একজন সিনিয়র ব্লগার হিসাবে অন্যান্যদের ধর্ম নিয়ে গুরুতর অবমাননাকর বিষয়গুলোতে নির্লিপ্ত থাকা। কখন যে দায়িত্ব এসে পড়েছিলো নিজের ঘাড়ে সেটা নিজেই অনুধাবন করতে না পারার অপারগতা।
আমি এজন্যও ক্ষমা চাই যে আমাদের অসতর্কতার কারণে - আমাদের সম্মিলিত উদ্যোগের অভাবে ব্লগের এত এত মানবিক উদ্যোগ থাকা স্বত্ত্বেও আমরা ধর্মের মত স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে মানবিক হতে পারিনি। এ উদ্যোগ নেয়া যেতেই পারতো। জামাত-শিবিরের ধর্ম বিষয়ক প্রোপাগান্ডার জবাব দিতে দিতে আমরা গড়ভাবে ধর্ম সম্বন্ধে একটা প্রশ্নবোধক সমীকরণ তৈরী হবার সুযোগ দিয়েছি।
আমি ব্যক্তিজীবনে পরমতসহিষ্ণু এবং বিশ্বাস করি নাস্তিকতা চর্চা যার যার নিজস্ব বিষয়, কিন্তু ধর্ম সম্বন্ধে যে ভাষা ও উক্তি ব্যবহার সাধারণ মানুষকে আহত করে - তা ব্লগেও ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকা উচিত।
আমি খুব কম সময় অন্যের ব্লগ পড়েছি জীবনে এবং আমার নিজের ব্লগের কমেন্টের খুব কম উত্তর দিয়েছি। কেউ খারাপ শব্দ বা গালি না দিলে আমি কখনও খারাপ ব্যবহার করিনি। তবে এটা স্বীকার করতেই হবে জামাত-শিবিরকে আমি গালি দিয়েছি, এটা তাদের প্রাপ্য বলেই।
কোনো ধর্মপ্রাণ মানুষ যদি আমার ব্যবহারে রুষ্ট হন, কষ্ট পেয়ে থাকেন তবে আন্তরিকভাবে দু:খ প্রকাশ করছি। তবে খুব বেশী ব্লগে থাকা হয় না বলে ব্লগের সকল বিষয় ও বিতর্ক সম্বন্ধেও আমার জানা থাকে না। কিন্তু কেউ যদি ধর্মকে অসম্মানজনকভাবে আক্রমন করে, ধর্মের স্মারক কোনো বিষয়কে কদর্য শব্দে প্রকাশ করে সেজন্য আমাকে জানালে আমি অবশ্যই প্রতিবাদ করবো।
আপনাদের সবার সম্মিলিত চেষ্টা ও অবদানের কারণে ব্লগিং বাংলাদেশে এখন জাতিয় একটা বিষয়। এইখানে ভুল স্বীকারের চর্চা ও দায়িত্ব গ্রহণের নজির স্থাপন করে আমরা আমাদের দেশের প্রচলিত রাজনৈতিক চর্চাকেও পাল্টে দিতে পারবো একদিন।
সবার মঙ্গল কামনা করছি।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

