somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মুক্তিযুদ্ধে চুয়াডাঙ্গাঃ দ্বিতীয় পর্ব : অধ্যক্ষ হামিদুল হক মুন্সী

০২ রা ডিসেম্বর, ২০১১ সন্ধ্যা ৬:৪০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

২৬শে মার্চ আনুষ্ঠানিক ভাবে মেজর আবু ওসমান চৌধুরী চুয়াডাঙ্গাস্থ ইপিআর উইং এর কোয়ার্টার গার্ডে পাকিস্তানি পতাকা নামিয়ে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করেন। ঐ একই দিন স্বাধীনতার পক্ষে জনমত গঠনের জন্য চুয়াডাঙ্গা চৌরাস্তার মোড়ে বিরাট জনসভা হয়। এই জনসভায় পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহনের জন্য সকল ছাত্র যুবক, আনসার ও মুজাহিদদের প্রতি আহবান জানানো হয়। মাইকযোগে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা ও চুয়াডাঙ্গাকে রাজধানী ঘোষণার পাশাপাশি প্রচার করে সকল আনসার, মুজাহিদ ও স্বেচ্ছাসেবকদের একত্রিত হতে বলা হয় এবং দ্রুত এদের থাকা, খাওয়া ও প্রশিক্ষণের ব্যাবস্থা করা হয়। চৌরাস্তার মোড়ে মতিরাম আগরওয়ালার দোতলা ভবনে রাজধানীর কন্ট্রোল রুম খোলা হয় এবং শ্রীমন্ত টাউনহলে থাকা ও খাওয়ার ব্যাবস্থা করা হয়।

মির্জা সুলতান রাজা, দোস্ত মোহম্মদ আনসারি, মিসকিন আলী মিয়া, এডভোকেট জাকারিয়া এই সকল যোদ্ধাদের দেখাশোনা করতেন। ইউনিয়ন ও গ্রাম সংগ্রাম পরিষদের কর্মীরা গ্রাম থেকে চাল, ডাল, আটা, তরিতরকারী প্রভৃতি সরবরাহ করতো। বাংলাদেশের প্রথম রাজধানী চুয়াডাঙ্গাতে সদর দপ্তর স্থাপন করে যুদ্ধ পরিচালনা করতে যেয়ে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জিনিসের প্রয়োজন দেখা দেয়। এমনি একটি প্রয়োজন মেটাতে নেতৃবৃন্দের অনুরোধে চুয়াডাঙ্গার সন্তান শ্রী এন এন সাহা রাষ্ট্রীয় মনোগ্রাম ও সিলমোহর তৈরী করেন। যা একই শিল্পীর দ্বারা সামান্য পরিবর্তন করে আজও ব্যাবহার হচ্ছে।

যুদ্ধে জয়লাভের জন্য ভারতীয় সাহায্য প্রয়োজন, এই উপলব্ধি থেকে অন্যতম উপপ্রধান উপদেষ্টা ব্যারিস্টার বাদল রশীদ ২৭শে মার্চ “দক্ষিণ পশ্চিম কমান্ডের” সিলমোহর যুক্ত পরিচয় পত্র নিয়ে ভারতে রওনা হন। ২৭শে মার্চ অবাঙ্গালী ক্যাপ্টেন সাদেক চুয়াডাঙ্গা ইপিআর উইং এর আওতাধীন মাছলিয়া বিওপিতে যেয়ে বাঙ্গালী সেনাদের নিরস্ত্র করার চেষ্টা করলে দুপক্ষের মধ্যে গুলি বিনিময় হয়। কিন্তু বাঙ্গালী সেনাদের কাছে পেরে উঠতে না পেরে ক্যাপ্টেন সাদেকের নেতৃতাধীন পাক সেনারা পিছু হটতে শুরু করে। এদিকে যাদবপুর বিওপির বাঙ্গালী সেনারা পাকিস্তানি সেনাদের গতিরোধ করেন। ফলে দুপক্ষের মাঝে প্রচন্ড গুলি বিনিময় হয়। এ যুদ্ধে সঙ্গী পাকসেনাদের সাথে ক্যাপ্টেন সাদেক নিহত হয়। এই যুদ্ধে বাঙ্গালী সিপাহী আশরাফ শহীদ হন। এটিই হচ্ছে চুয়াডাঙ্গা অঞ্চলের প্রথম সশস্ত্র সম্মুখ যুদ্ধ।

এর পরে রাজধানী সদর দপ্তরকে নিরাপদ রাখার স্বার্থে কুষ্টিয়া শহরকে শত্রুমুক্ত করার পরিকল্পনা নেয়া হয়। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য ও বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের পক্ষে প্রচার, বিভিন্ন নেতৃবৃন্দের সাথে যোগাযোগ ও প্রয়োজনীয় সামরিক ও বেসামরিক সাহায্য পাবার প্রত্যাশায় বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহন করা হয়। এ পদক্ষেপের ফলে ২৭শে মার্চ দর্শনার নিকটে বিএসএফ এর প্রধান কর্নেল চক্রবর্তীর সাথে নেতৃবৃন্দের দিপাক্ষিক বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। এই আলোচনার ফলশ্রুতিতে রসদ, পেট্রল, ডিজেল প্রভৃতি পাওয়া যায়। সীমান্তের সকল ইপিআর জওয়ান দের চুয়াডাঙ্গায় জড়ো করা হয় ২৮ তারিখে।

যুদ্ধে আহতদের পাশে থেকে চিকিৎসা সুবিধা প্রদানের জন্য চুয়াডাঙ্গাতে বাংলাদেশ রেডক্রশের জন্ম দেয়া হয়। এর সভাপতি হন ডাঃ আসহাবুল হক এবং মহাসচিব হন ডাঃ সামসুজ্জোহা কোরেসী। এছাড়াও ইউনুস আলী এডভোকেট কে সভাপতি ও ডাঃ সাইদুর রহমান কে সচিব করে রেডক্রশের দক্ষিণ পশ্চিম শাখা গঠন করা হয়। ২৮শে মার্চেই বহির্বিশ্বের সাংবাদিক ও রাজনৈতিক ব্যাক্তিবর্গের সাথে যোগাযোগের প্রয়োজনীওয়তা উপলব্ধি করে টেলিফোন বিভাগ চালু করা হয়। এই টেলিফোনের সদর দপ্তরের সাংকেতিক নাম রাখা হয় “জয় বাংলা”!

ডাঃ আসহাবুল হক ও মেজর আবু ওসমান চৌধুরী পালাক্রমে কলকাতায় সাংবাদিকদের যুদ্ধের খবরাখবর পরিবেশন করেন এবং স্বাধীন বাংলার মুক্ত অঞ্চল দেখার জন্য সাংবাদিকদের আমন্ত্রন জানান। ২৯শে মার্চ ভোর ৪টায় কুষ্টিয়া শহর আক্রমণ করে শত্রুমুক্ত করার পরিকল্পনা থাকলেও প্রস্তুতিতে ত্রুটি থাকার কারণে ৩০শে মার্চ ভোরে আক্রমণের সময় পিছিয়ে দিতে হয়। ২৮ তারিখে এক কোম্পানি সৈন্য ঝিনাইদহ পাঠিয়ে যশোর ঝিনাইদহ সড়ক অবরোধ করা হয়, যশোর ক্যান্টনমেন্ট থেকে যাতে কোন সৈন্য কুষ্টিয়াতে আসতে না পারে সেই উদ্দেশ্যে। আর এক কোম্পানি সৈন্য ক্যাপ্টেন আজম চৌধুরীর নেতৃত্বে চুয়াডাঙ্গা-পোড়াদহ কাঁচা রাস্তা দিয়ে পোড়াদহে পাঠানো হয়।


লেখক পরিচিতিঃ ইতিহাসবিদ, শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবী।

সূত্রঃ আন্দোলন সংগ্রামে চুয়াডাঙ্গা
একমুঠো রোদ্দুর প্রকাশনী
সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে আগস্ট, ২০১৫ রাত ১:০৯
১৭টি মন্তব্য ১৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×