somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

কুঙ্গ থাঙ
আমার মাতৃভাষার নাম বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি । পৃথিবীর মাত্র তিন লক্ষ মানুষ এই ভাষায় কথা বলে । ভাষাটিকে ইউনেস্কো এনডেঞ্জার্ড ল্যাঙ্গুয়েজ হিসাবে ঘোষনা করেছে ।

মাতৃবন্দনা - গোকুলানন্দ গীতিস্বামীর একটি গীতিকবিতার বাংলা অনুবাদ

০৮ ই জানুয়ারি, ২০০৯ রাত ১২:০৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

এই কবিতাটি রচিত হয়েছে আজ থেকে প্রায় ১০০ বছর আগে বাংলাদেশের একটি অবিকশিত আদিবাসী ভাষায়। ভাষাটির নাম বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী এবং রচয়িতার নাম গোকুলানন্দ গীতিস্বামী। গোকুলানন্দ গীতিস্বামীকে (১৮৯৬-১৯৬২ খ্রীঃ) ধরা হয় বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী সাহিত্যের পথিকৃৎ হিসাবে। তিনিই সর্বপ্রথম বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরীদের ভেতর জাতীয়তাবোধ ও মাতৃভাষার প্রতি চেতনা জাগ্রত করেন।

মাতৃবন্দনা
রচনাকালঃ ১৯২০ খ্রীস্টাব্দ

মাগো তোমার মহিমা কিভাবে প্রকাশি
অবোধ শিশু এই আমি
থাকে যতো দোষ সন্তানগুনে করিও ক্ষমা
মা -
তোমার মহিমা বেদেও অসীমা
করুনারূপীনি তুমি
কী গুণ গাইব আমি
গয়া তীর্থ কাশি বারানসী
শাস্ত্রের মতো পবিত্র সবই জানি
সবারও তবু থাকে কলংক,
শুধু মা শব্দটি আজো অকলংকীনি।

গর্ভে ধরেছো তুমি জননী দশমাস দশদিন
জন্ম দিয়েছো আলো দেখিয়েছো, কী অপূর্ব ঋণ!
দাড়াতে পারিনি খেতেও পারিনি কিছু
বাচিঁয়েছো তুমি, জ্ঞানপর থেকে আমরা তোমার পিছু
হিংসামুর্তি মাতা যে বাঘিনী সে তার স্বভাবমতো
কখনো নিজ সন্তানদেরে ভক্ষন করে নাতো
পাঁচ সন্তান যদিও তোমার আলাদা আলাদা সবে
লোকে যা বলুক, তোমার কাছে মা সকলি সমান রবে

... ... ...

এ মায়ের স্নেহসিন্ধুর একবিন্দু শুধিব বলে
দেশে দেশে আমি গুণ তার গেয়ে একা একা যাই চলে
এই আশা নিয়ে বেঁচে থাকি মাগো দিও নাকো দুরে ঠেলে
তোমার গানে ও কীর্ত্তনে থাকি বিভোর তোমার ছেলে!


মুল কবিতা (বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষায়)


গোকুলানন্দ গীতিস্বামী সম্বন্ধে
গোকুলানন্দের জন্ম বর্তমান মৌলবীবাজার জেলার কমলগঞ্জের মাধবপুর ইউনিয়নের জবলারপার নামের এক প্রত্যন্ত গ্রামে, ১৮৯৬ সালের ২৬ নভেম্বর তারিখে। দরিদ্র ঘরের এই মেধাবী ছেলেটি মাধবপুরে নিম্নবাংলা পাশ করার পর ইংরেজী পড়ার জন্য ত্রিপুরায় চলে যান। সেখানে অস্টম মান পর্যন্ত পড়েছিলেন। এরপর ১৯২৫ সালে ত্রিপুরার রাতাছড়া গ্রামে ব্যক্তিগত উদ্যোগে একটি প্রাইমারী স্কুল প্রতিষ্টা করেন এবং সেখানে নিজে শিক্ষক হয়ে পাঠদান শুরু করেন। পাশাপাশি শুরু করেন মাতৃভাষা বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরীতে গান, নাট্যপালা লিখতে।

গোকুলানন্দ মুলত ছিলেন একজন চারণকবি। বৃটিশভারতে তৎকালীন মণিপুরী সমাজের শিক্ষিত একটি বৃহদাংশ যখন সাহেবি এবং বাঙালি চালচলন রপ্ত করতে ব্যস্ত, ঠিক সেই সময় মাতৃভাষায় নানান কবিতা, গান, গীতিপালা লিখে সেগুলোর পরিবেশনা নিয়ে ঘুরতেন গ্রাম থেকে গ্রামে। নিজস্ব ভাষা সংস্কৃতি আচার নিয়ম সবকিছু বিস্মৃত হয়ে এই সমাজ যখন প্রায় নিশ্চিহ্ন হবার দ্বারপ্রান্তে, তখন গীতিস্বামী সক্রেটিসের মতো নতুন আশার, নতুন সম্ভাবনার বাণী ঘরে ঘরে ফেরী করে বেড়িয়েছেন ক্লান্তিহীনভাবে। তিনি দেখিয়ে দিয়েছিলেন, অবহেলায় ফেলে দেয়া এই ভাষা এই সংষ্কৃতির ভেতরেও বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। শুধুমাত্র লোকমুখে প্রচারিত এই দরিদ্র ভাষাটি দিয়েও রচিত হতে পারে উৎকৃষ্ট সাহিত্য, শিল্পরস।

গান গেয়ে সমাজকে জাগানোর দ্বায়িত্বে স্বেচ্ছায় কাঁধে তুলে নেন, পাশাপাশি চলে নাট্যপালা মঞ্চায়ন। সমাজ রাজনীতি বিষয়ে গোকুলানন্দের জ্ঞান ও মতাদর্শ ছিল স্বচ্ছ ও শক্তিশালী। গোঁড়ামি ও পশ্চাৎপদতার বিরুদ্ধে তার অবস্থান গানে গানে স্পষ্ট করেন। এজন্যে কম লাঞ্ছনা গঞ্জনা সইতে হয়নি গোকুলানন্দকে। সমাজের উচ্চশ্রেণীর ব্যক্তিরা যারা তাকে একসময় 'পাগল', 'কাক' ইত্যাদি বিশেষনে অভিহীত করেছে, তারাই একসময় তাকে "গীতিস্বামী" নামক সম্মানসূচক উপাধিতে ভূষিত করতে বাধ্য হয়েছে।

বাংলাদেশ ভারত দুদেশেই মণিপুরী সমাজে ব্যাপক জনপ্রিয় এই গীতিকবি ১৯৬২ সালের ১০ জুলাই মৃত্যুবরন করেন, সেদিন ত্রিপুরা সরকার গোটা রাজ্যে সাধারন ছুটি ঘোষনা করেন। বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী সমাজ নিয়ে অসংখ্য সমাজ-সংস্কারমুলক গান, কবিতা এবং নাটকের পাশাপাশি নীতিশাস্ত্র বা চরিত্র গঠনমুলক নানান বাণী রেখে গিয়েছেন এই সমাজবিপ্লবী। একটি অনগ্রসর কৌম সমাজের জন্য তাঁর এসব আধুনিক বাণী কাজ করেছে শানিত অস্ত্রের মতো।

অনুবাদ: শুভাশিস সিনহা।

বাংলা উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে



লিংক:
* বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী উইকিপিডিয়াতে গোকুলানন্দ গীতিস্বামীর জীবনি
* Gokulananda Gitiswami - Father of BM Community
* November 26 birth anniversary of Geetiswami

গোকুলানন্দ গীতিস্বামীর গান
ইউটিউবে গোকুলানন্দ গীতিস্বামীর গান
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে মে, ২০১৩ রাত ২:২০
৪টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×