এই কবিতাটি রচিত হয়েছে আজ থেকে প্রায় ১০০ বছর আগে বাংলাদেশের একটি অবিকশিত আদিবাসী ভাষায়। ভাষাটির নাম বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী এবং রচয়িতার নাম গোকুলানন্দ গীতিস্বামী। গোকুলানন্দ গীতিস্বামীকে (১৮৯৬-১৯৬২ খ্রীঃ) ধরা হয় বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী সাহিত্যের পথিকৃৎ হিসাবে। তিনিই সর্বপ্রথম বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরীদের ভেতর জাতীয়তাবোধ ও মাতৃভাষার প্রতি চেতনা জাগ্রত করেন।
মাতৃবন্দনা
রচনাকালঃ ১৯২০ খ্রীস্টাব্দ
মাগো তোমার মহিমা কিভাবে প্রকাশি
অবোধ শিশু এই আমি
থাকে যতো দোষ সন্তানগুনে করিও ক্ষমা
মা -
তোমার মহিমা বেদেও অসীমা
করুনারূপীনি তুমি
কী গুণ গাইব আমি
গয়া তীর্থ কাশি বারানসী
শাস্ত্রের মতো পবিত্র সবই জানি
সবারও তবু থাকে কলংক,
শুধু মা শব্দটি আজো অকলংকীনি।
গর্ভে ধরেছো তুমি জননী দশমাস দশদিন
জন্ম দিয়েছো আলো দেখিয়েছো, কী অপূর্ব ঋণ!
দাড়াতে পারিনি খেতেও পারিনি কিছু
বাচিঁয়েছো তুমি, জ্ঞানপর থেকে আমরা তোমার পিছু
হিংসামুর্তি মাতা যে বাঘিনী সে তার স্বভাবমতো
কখনো নিজ সন্তানদেরে ভক্ষন করে নাতো
পাঁচ সন্তান যদিও তোমার আলাদা আলাদা সবে
লোকে যা বলুক, তোমার কাছে মা সকলি সমান রবে
... ... ...
এ মায়ের স্নেহসিন্ধুর একবিন্দু শুধিব বলে
দেশে দেশে আমি গুণ তার গেয়ে একা একা যাই চলে
এই আশা নিয়ে বেঁচে থাকি মাগো দিও নাকো দুরে ঠেলে
তোমার গানে ও কীর্ত্তনে থাকি বিভোর তোমার ছেলে!
মুল কবিতা (বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষায়)
গোকুলানন্দ গীতিস্বামী সম্বন্ধে
গোকুলানন্দের জন্ম বর্তমান মৌলবীবাজার জেলার কমলগঞ্জের মাধবপুর ইউনিয়নের জবলারপার নামের এক প্রত্যন্ত গ্রামে, ১৮৯৬ সালের ২৬ নভেম্বর তারিখে। দরিদ্র ঘরের এই মেধাবী ছেলেটি মাধবপুরে নিম্নবাংলা পাশ করার পর ইংরেজী পড়ার জন্য ত্রিপুরায় চলে যান। সেখানে অস্টম মান পর্যন্ত পড়েছিলেন। এরপর ১৯২৫ সালে ত্রিপুরার রাতাছড়া গ্রামে ব্যক্তিগত উদ্যোগে একটি প্রাইমারী স্কুল প্রতিষ্টা করেন এবং সেখানে নিজে শিক্ষক হয়ে পাঠদান শুরু করেন। পাশাপাশি শুরু করেন মাতৃভাষা বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরীতে গান, নাট্যপালা লিখতে।
গোকুলানন্দ মুলত ছিলেন একজন চারণকবি। বৃটিশভারতে তৎকালীন মণিপুরী সমাজের শিক্ষিত একটি বৃহদাংশ যখন সাহেবি এবং বাঙালি চালচলন রপ্ত করতে ব্যস্ত, ঠিক সেই সময় মাতৃভাষায় নানান কবিতা, গান, গীতিপালা লিখে সেগুলোর পরিবেশনা নিয়ে ঘুরতেন গ্রাম থেকে গ্রামে। নিজস্ব ভাষা সংস্কৃতি আচার নিয়ম সবকিছু বিস্মৃত হয়ে এই সমাজ যখন প্রায় নিশ্চিহ্ন হবার দ্বারপ্রান্তে, তখন গীতিস্বামী সক্রেটিসের মতো নতুন আশার, নতুন সম্ভাবনার বাণী ঘরে ঘরে ফেরী করে বেড়িয়েছেন ক্লান্তিহীনভাবে। তিনি দেখিয়ে দিয়েছিলেন, অবহেলায় ফেলে দেয়া এই ভাষা এই সংষ্কৃতির ভেতরেও বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। শুধুমাত্র লোকমুখে প্রচারিত এই দরিদ্র ভাষাটি দিয়েও রচিত হতে পারে উৎকৃষ্ট সাহিত্য, শিল্পরস।
গান গেয়ে সমাজকে জাগানোর দ্বায়িত্বে স্বেচ্ছায় কাঁধে তুলে নেন, পাশাপাশি চলে নাট্যপালা মঞ্চায়ন। সমাজ রাজনীতি বিষয়ে গোকুলানন্দের জ্ঞান ও মতাদর্শ ছিল স্বচ্ছ ও শক্তিশালী। গোঁড়ামি ও পশ্চাৎপদতার বিরুদ্ধে তার অবস্থান গানে গানে স্পষ্ট করেন। এজন্যে কম লাঞ্ছনা গঞ্জনা সইতে হয়নি গোকুলানন্দকে। সমাজের উচ্চশ্রেণীর ব্যক্তিরা যারা তাকে একসময় 'পাগল', 'কাক' ইত্যাদি বিশেষনে অভিহীত করেছে, তারাই একসময় তাকে "গীতিস্বামী" নামক সম্মানসূচক উপাধিতে ভূষিত করতে বাধ্য হয়েছে।
বাংলাদেশ ভারত দুদেশেই মণিপুরী সমাজে ব্যাপক জনপ্রিয় এই গীতিকবি ১৯৬২ সালের ১০ জুলাই মৃত্যুবরন করেন, সেদিন ত্রিপুরা সরকার গোটা রাজ্যে সাধারন ছুটি ঘোষনা করেন। বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী সমাজ নিয়ে অসংখ্য সমাজ-সংস্কারমুলক গান, কবিতা এবং নাটকের পাশাপাশি নীতিশাস্ত্র বা চরিত্র গঠনমুলক নানান বাণী রেখে গিয়েছেন এই সমাজবিপ্লবী। একটি অনগ্রসর কৌম সমাজের জন্য তাঁর এসব আধুনিক বাণী কাজ করেছে শানিত অস্ত্রের মতো।
অনুবাদ: শুভাশিস সিনহা।
বাংলা উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
লিংক:
* বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী উইকিপিডিয়াতে গোকুলানন্দ গীতিস্বামীর জীবনি
* Gokulananda Gitiswami - Father of BM Community
* November 26 birth anniversary of Geetiswami
গোকুলানন্দ গীতিস্বামীর গান
ইউটিউবে গোকুলানন্দ গীতিস্বামীর গান

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

