আমার প্রিয় পোস্ট

প্রান্তিক জনগোষ্ঠিগুলোর ভাষা ও জাতিগত অস্তিত্বের সাংবিধানিক স্বীকৃতি ও সমমর্যাদা দাবী করছি

ষোড়শ শতকের একটি বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী বৃষ্টি ডাকার গান ও তার বাংলা অনুবাদ

৩১ শে জানুয়ারি, ২০০৯ ভোর ৫:৫৯

শেয়ারঃ
0 0 0

দল বেঁধে এ গান করলে খরার সময় দেবতাদের রাজা সরালেল বৃষ্টি নামিয়ে দেবেন এটা মণিপুরীদের প্রাচীন লৌকিক বিশ্বাস। লৌকিক ধর্মের বিভিন্ন দেবতার স্তুতি করে বৃষ্টি আবাহন করার এ গানটি বরন ডাহানির এলা নামে পরিচিত। মণিপুরীদের বৈষ্ণবধর্ম গ্রহনের বহু আগে, ষোড়শ থেকে সপ্তদশ শতকের প্রথম ভাগ পর্যন্ত সময়ের মধ্যে রচিত ও গীত হতে শুরু করেছে। এই গীতিকাব্যে বৈদিক বা ভারতীয় দেবদেবীর কোন উল্লেখ নেই, ঘুরে ফিরে কেবল প্রাচীন লোকধর্মের দেবদেবীদের নামই এসেছে। কৃষিভিত্তিক সমাজের সাথে সংশ্লিষ্ট এ গানটিকে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী কাব্যসাহিত্যের প্রাচীনতম নির্দশন হিসাবে ধরা হয়। এই গানের নিজস্ব সুর রয়েছে যা বর্তমান মণিপুরী কীর্ত্তন বা পালার সুর থেকে ভিন্ন।

গানটির পটভুমি এরকম - মণিপুরীদের আদিভূমি মণিপুরের খুমোল বংশের রাজা মৈরাং বংশের রাজার নিকট যুদ্ধে পরাজিত হয়ে পুনরায় শক্তি পরীক্ষার আহবান জানালে খুমোল রাজার ছোট ভাই চমেই তাতে আপত্তি জানায়। এতে খুমোলের রাজা তাকে রাজ্য থেকে বের করে দেন। দুঃখে অপমানে চমেই রাজ্য ছেড়ে বের হয়ে যায়। সাথে পিছু নেয় তার বেটি বা চাকরানি। পরবর্তী তিন বছর খুমোল রাজ্যে দেখা দেয় তীব্র খরা। চারিদিকে নেমে আসে দুর্ভিক্ষ। জ্যোতিষিরা অনুমান করেন, চমেই এর অপমান দেখে দেবতা পাহাংপা ক্রুদ্ধ হয়ে বৃষ্টি বন্ধ করে দিয়েছেন। চমেই ও পাহাংপা-কন্যা বেটিকে সন্তুষ্ট করলেই তবে বৃষ্টি হবে ইত্যাদি । জ্যোতিষিদের কথা শুনে প্রজারা চমেই বেটিকে সন্তুষ্ট করে রাজ্যে ফিরিয়ে আনে। পাহাংপাও খুশি হয়ে দীর্ঘ তিন বছর পর বৃষ্টি নিয়ে আসেন। খুমল রাজ্যে চলে কৃষিকাজ ও লসু দিয়ে মাছ ধরার আয়োজন।

৯টি পদো তে বিভক্ত গানটির প্রথম ৬টি পদো বাংলায় অনুবাদ করার চেষ্টা করলাম।

বরন ডাহানির এলা

১.
সরালেলতে রাজারো লেইপাক কুমৌ কইলো ।
লেইপাকে মাড়ায় মাখঙে খইমুরে জাঙাল দিলো।
খুমলর মাটি হুকেইলো, বরন দিয়াদে দৌরাজা ।
লুকোঙ মাহেই লুকুলিল, বরন দিয়াদে দৌরাজা ।

২.
হরিয়ো রামো লেইমেলতে কুংগই পিত করে ।
লেইমেল মানা নুংশিপা দনলো বেনুর আতে দিলো ।
যুকর ধ্যান করেরনায় লসমনে ফুলর লেইরাঙ দিলো ।
লেইকেইরো কালারো ডাহিয়াউ দেই কাদিয়াউ খেয়নায়ে ।

৩.
তাম্ফারো আপারো হরেইগা দলে দুমেয়ে য়েইচিল কইল ।
হিলঙ লালরে হিলরো সরা গঙ্গায় লালইলীয়ে ।
না যেইগা গাটে বুলিয়াহো কারঙ্গ লেইমায়া ধরিয়া থামেইলো ।
হাবি দৌয়ে হুনো মইরাঙ পাচায় নাহুনকা নুংশিয়ে হয়ো ।

৪.
আনতারা গিরিরো জিলক য়েইমাপীরে আনতারা ।
তাম্পাকে নুনা পেইতেগা লেইতেঙে নুনা চায়োরে ।
লেইতেঙরে হিরিয়ো মেঙকো কইলো ।
জমজমাদে যেইরিগা ধনর কইরেঙরে ।

৫.
ফিজাপিনা লাঙজাপি মাদই ওয়াঙখেলে।
মাদই ওয়াঙখেলে হো হুনার লাংচাক বেড়র জ্বালাত থইলে।

৬.
চমেইয়ো বেটী থকুরারে।
কহনিগো দিবঙতা ঘরে জনম আরো।
কালা কালা আঙারা দলা দলা লেঙোলো হয়ো।
দনতো চারি চিলালো পাহাঙপায় বারিয়া নাদিলো।


বৃষ্টি ডাকার গান (বাংলা অনুবাদে যা দাঁড়ায়)

১.
সরালেল তুমি দেবতাদের রাজা, একটু দয়া করো
খইমু ঘাসে আর নানান জিনিষে তৈরী করেছে বাঁধ
খুমোলের মাটি খরায় ফেটে যায়, বৃষ্টি দাও হে দেবরাজ
খা খা করে আজ খুমোলের ভুমি, বৃষ্টি দাও হে দেবরাজ

২.
তুমি বলো এ নিদানে কে পারবে কিছু খেতে বা ঘুমাতে
[আমি] আমরা সকল আনন্দ-শোক সপেঁছি বেণুর হাতে
হে কালা, চির প্রতিবেশী আমাদের, সবাইকে দাও ডাক
এসো এইখানে একত্রে সবে কাঁদি সবকিছু পড়ে থাক

৩.
ও বাবা তাম্ফা, দেখেছো দুমেই জোতিষবিদ্যা গুনে
গঙ্গা আসছে, তবু পাহাংপা-কন্যা কারঙ্গ বাধা দেয় শুনে
সকল দেবতা জানে নিশ্চয় দুর্দশা আমাদের
শুধু অনুরোধ মইরাঙ যেন পায়নাকো কিছু টের

৪.
জ্যোতিষিরা বলে এ অনাবৃষ্টি পাহাংপার কারণে
চমেইয়ের অপমানে যে ক্ষুব্ধ হয়েছে দারুন মনে
চমেই ও বেটিকে ফিরিয়ে নিয়ে যাও রাজ্যে
যথারীতি কন্যা পৌঁছায় ওই সুবিশাল প্রান্তরে
মঙ্গলকর বার্তাধ্বনিতে জগৎমুখর করে

৫.
মাদই পরিধেয় বুননের জন্য হয়েছে বহিস্কৃত
বেটির কাছে সে নানান সময়ে হয়েছে অপমানিত।

৬.
চমেই আসতে করছে ইতস্তত
মেয়েরা মিলে সবে তার সাথে হয়েছে দুর্বিনীত
ক্রুদ্ধ বয়সী লোকেরা তাদের বলছে স্বাগত নয়
বরং কয়লা আর বালু দিক ছিটিয়ে সে পথময়
এটাই ভাগ্য পাহাংপা প্রভু
দেয়নি তাদের শান্তি এখনো, কভু।


সরালেল - দেবতাদের রাজা। মণিপুরী মিথলজীতে তাকে জগতসংসারের সৃস্টিকর্তা হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
পাহাংপা - মতান্তরে পাখাংবা। সরালেলের পুত্র এবং প্রলয়কারি দেবতা।
পদো - বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী গানের পংক্তির হিসাব

বরন-ডাহানির-এলার ইংরেজী ভার্সন এখানে দেখুন

ছবি: রাজকুমার চন্দ্রজিৎ সিংহের পেইন্টিং

তথ্যসুত্র :
১. The BpM Language / Dr. K.P. Sinha, MA Phd, D Lit,1984
২. বি.ম. ভাষাতত্ত্বর সমীক্ষা / শ্রীমংগলবাবু সিংহ, বি.ম.সা.প. ১৯৯০
৩. মণিপুরী সাহিত্য সংগ্রহ / শুভাশিস সিনহা, ঐতিহ্য ২০০৭

 

লেখাটির বিষয়বস্তু(ট্যাগ/কি-ওয়ার্ড): বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী লোকসাহিত্যবরন ডাহানির এলা ;
প্রকাশ করা হয়েছে: বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী সাহিত্য  বিভাগে । সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে জানুয়ারি, ২০০৯ বিকাল ৪:৩৭ | বিষয়বস্তুর স্বত্বাধিকার ও সম্পূর্ণ দায় কেবলমাত্র প্রকাশকারীর...

 

১. ৩১ শে জানুয়ারি, ২০০৯ ভোর ৬:২১
গেওর্গে আব্বাস বলেছেন: লসু দিয়ে মাছ ধরার আয়োজন।
-------------------------------------
লসু'র আরেকটি বাংলা কি হেসু?
-------------------------------------------------------------------

চমেই আসতে করছে ইতস্তত
মেয়েরা মিলে সবে তার সাথে হয়েছে দুর্বিনীত
ক্রুদ্ধ বয়সী লোকেরা তাদের বলছে স্বাগত নয়
বরং কয়লা আর বালু দিক ছিটিয়ে সে পথময়
এটাই ভাগ্য পাহাংপা প্রভু
দেয়নি তাদের শান্তি এখনো, কভু।



------------------সুন্দর এবং সুন্দর।
৩১ শে জানুয়ারি, ২০০৯ সকাল ৮:২৫

লেখক বলেছেন: ষোড়শ শতকে এ ভাষাটি মধ্যস্তরে ছিল। কিছু কিছু বাক্যের পাঠোদ্ধার সম্ভব হয়নি। সেগুলোতে ভাব ধরে নিয়ে এগুতে হয়েছে।








পড়ার জন্য অশেষ ধন্যবাদ কবি।

২. ৩১ শে জানুয়ারি, ২০০৯ সকাল ৭:৪১
মে ঘ দূ ত বলেছেন: বাহ! চমৎকার এই তথ্যভরা পোষ্টটার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ জানাই। একটা প্রশ্ন উকিঁ দিচ্ছে, গানটিতে গঙ্গার উল্লেখ আছে। এই জনগোষ্ঠীর ভৌগুলিক অবস্থান কি আপনার জানা আছে?

পোষ্টে +

৩১ শে জানুয়ারি, ২০০৯ সকাল ৮:২০

লেখক বলেছেন: জায়গাটার নাম মণিপুর। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্য। আর জনগোষ্ঠীর নাম বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী। বাংলাদেশের মৌলবীবাজার, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ এবং সিলেট জেলার বিভিন্ন জায়গায় এ জনগোষ্ঠির মানুষ বাস করে।

... এখানে গঙ্গা বলতে বৃস্টিধারার বুঝানো হয়েছে। ষোড়শ শতকের দিকে ভারত থেকে কিছু হিন্দু ধর্মগুরু সেখানে যান ধর্মপ্রচারের উদ্দেশ্যে। তাদের প্রভাবেই হয়তো গঙ্গা নামটির অনুপ্রবেশ ঘটেছে।

আপনাকে ধন্যবাদ।

৩১ শে জানুয়ারি, ২০০৯ সকাল ৮:৩৯

লেখক বলেছেন: জবাব দিতে গিয়ে মুছে গিয়েছিল... । ভাল থাকবেন।

৪. ৩১ শে জানুয়ারি, ২০০৯ সকাল ৮:২২
পথিক!!!!!!! বলেছেন: সংগ্রহে রাখলাম পোষ্টটা
০১ লা ফেব্রুয়ারি, ২০০৯ রাত ১:২৪

লেখক বলেছেন: আপনাকে অনেক ধন্যবাদ পথিক। ... প্রোফাইলে যে বইটির প্রচ্ছদ দেখা যাচ্ছে তার মধ্যে কোন গল্প কি এই ব্লগে আছে?

৫. ৩১ শে জানুয়ারি, ২০০৯ সকাল ৮:২৯
মে ঘ দূ ত বলেছেন: ধন্যবাদ উত্তরের জন্য। আপনার এখানে মন্তব্য করেই আপনার আরেকটি পোষ্টে (সমাজ বই নিয়ে) আরো তথ্য পেলাম।
৩১ শে জানুয়ারি, ২০০৯ সকাল ৮:৪৩

লেখক বলেছেন: ধন্যবাদ আবারো .... আগ্রহের জন্য। মাঝে মধ্যে অধমের ব্লগ ঘুরে গেলে খুশী হই।

৩১ শে জানুয়ারি, ২০০৯ সকাল ৯:০২

লেখক বলেছেন: আপনাকে অনেক ধন্যবাদ...

৩১ শে জানুয়ারি, ২০০৯ বিকাল ৪:১৭

লেখক বলেছেন: অনেক ধন্যবাদ... আর শুভকামনা।

৮. ৩১ শে জানুয়ারি, ২০০৯ সকাল ১০:১৭
পারভেজ বলেছেন: প্রশংসনীয় পোস্ট।
৩১ শে জানুয়ারি, ২০০৯ বিকাল ৪:২৮

লেখক বলেছেন: পড়ার জন্য... এবং কমেন্টের জন্য অনেক ধন্যবাদ।

৯. ৩১ শে জানুয়ারি, ২০০৯ বিকাল ৪:২৮
সালাহ্ উদ্দিন শুভ্র বলেছেন: প্রিয়তে রাখলাম-পরে মেনাযোগ দিয়ে পড়বো সেই আশায়।

তারপর না হয় আবার কথা হবে।

কৃতজ্ঞতা রইলো।
৩১ শে জানুয়ারি, ২০০৯ বিকাল ৪:৫৭

লেখক বলেছেন: অশেষ ধন্যবাদ ... রাংলাই ম্রোকে নিয়ে লেখা আপনার অসাধারন লেখাটি পড়েছি। আরো আশা করি আপনার কাছ থেকে। ভাল থাকুন।

১০. ০৮ ই ফেব্রুয়ারি, ২০০৯ ভোর ৬:৫৩
গেওর্গে আব্বাস বলেছেন: নতুন লেখা সংযোজিত হোক।

পাঠের অপেক্ষায় ...

 

মোট সময় লেগেছে ০.৯৪৮৭ সেকেন্ড

 

সামহোয়‍্যার ইন...ব্লগ বাঁধ ভাঙার আওয়াজ, মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর...
© সামহোয়্যার ইন...নেট লিমিটেড | ব্যবহারের শর্তাবলী | গোপনীয়তার নীতি
প্রান্তিক জনগোষ্ঠীগুলোর ভাষা ও জাতিগত অস্তিত্বের সাংবিধানিক স্বীকৃতি দাবী করছি...
আর এস এস ফিড

পোস্ট আর্কাইভ

আমার লিঙ্কস

আমার বিভাগ