এভাবে ঘুম থেকে উঠার আগে পোঁ পোঁ ইত্যাদি শব্দ চিৎকারের নতুন উপনিবেশে জীবনে নতুন মাত্রা এনে দিল, আমাদের কয়েকজন বন্ধু প্রথম কয়েকদিন এমনি এমনি বাসে উঠতো, তারপর গ্রামের শেষমাথায় এসে “ড্রাইভার লামাও! ও ড্রাইভার” বলে তড়িৎ গতিতে নেমে যেতো আর ফিরে আসার পথ হাত-পা শরীর দুলিয়ে “মেরা পিয়া ঘর আয়া...” গাইতে গাইতে ...
পার্শ্ববর্তী তিলকপুরের জনৈক ব্যক্তির শ্রাদ্ধে যোগ দেবার উদ্দেশ্যে নতুন ফেইচুম পাঞ্জাবী পরিহিত কুঞ্জ খুড়া দৌড়াতে দৌড়াতে সড়কে উঠে কোনরকম বাসে উঠার জন্য পা তোলার সময় ফেইচুমের কোণায় পা দিয়ে ফেললেও সম্ভাব্য লজ্জাকর দুর্ঘটনা থেকে এ যাত্রায় রেহাই পেয়ে যান। তবে স্বল্পবয়সী এক তরুণী যে প্রায় ড্রাইভারের কাছ ঘেঁষে বসেছিল, সে খুড়ার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসি দিতেই কুঞ্জ খুড়া ভেতরে ভেতরে জ্বলে উঠেন ‘নির্লজ্জ মেয়েছেলে, মিয়াঙের সাথে কেমন গা ঘেষে বসেছে, হুহ্!’। সিটে বসার পর হাতের বামপাশে বসা লালরাঙা নারীটিকে দেখে তিনি চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলেন (সেকথা পরে গল্পচ্ছলে আমাদের বলেছিলেন)। এমনই তিনি, এভাবেই বয়ান করে যান জীবনের ছোট বড় নানান অভিজ্ঞতার কথা; এর কিছুদিন বাদে আমাদের বুঝতে কষ্ট হয়না - তার বখে যাওয়া কুপুত্রকে এরকম একটি বাসের ড্রাইভার বানানোর স্বপ্ন দেখা শুরু করেছেন তিনি। আমরাও স্বপ্ন দেখা শুরু করি, তবে তার পুত্রকে নিয়ে নয়, আমাদের নিজেদের জন্যে, আচ্ছা আমরাও তো দেখতে পারি; আদমপুর বাজার টু মৌলভীবাজার বাসের ষ্টিয়ারিং ঘুরাতে ঘুরাতে “মেরা পিয়া ঘর আয়া...”, আহ্ !
কিন্তু বাসের চারটি চাকা আদমপুর থেকে ভানুগাছ, ভানুগাছ থেকে মৌলভীবাজার, মাঙখেইমাঙ থেকে তিলকপুর এবং তিলকপুর থেকে ঘোড়ামারা পৌঁছে দিচ্ছিল। মাত্র ৩/৪ টাকায় এই সেবার মাধ্যমে আমরা অর্থনৈতিকভাবে উপকৃত হলেও এ সেবার মাধ্যমে আমাদের আর কি কি উন্নয়ন ঘটতে পারে সে সম্বন্ধে প্রথম প্রথম আমাদের তেমন ধারনা ছিলনা। যদিও বাসস্ট্যান্ডে উঠতি তরুন সম্প্রদায়ের ব্যস্ততা দিন দিন বেড়েই চলেছিল, এবং কালো চশমা হাই হিল জুতাওয়ালী দু'একজন অচিনপুরের স্বর্গ থেকে ইন্দ্রাভিশপ্ত অপ্সরার মতো নেমে আসলে তাদের চোখের তারা কেঁপে উঠছিল। আমাদের কুমাড়া সেরকম একজনকে দেখার পর বাড়ী ফিরে জ্বর বাঁধিয়ে বসে। জ্বর তীব্র হলে তার মুখ থেকে নিঃসৃত আশ্চর্য রসদগ্ধ বাক্যরাশির লজ্জায় ও অপমানে, শিয়রে বসা জননী চোখে অন্ধকার দেখেন। আমরাও দেখি, আপসোসে, ইস কেন আমরা দেখলাম না , আমরা কয়েকজন তখন থেকে রোজকার ডিউটি ঠিক করে ফেলি পিয়া ঘর আয়া ... এবং আমাদের মধ্যে যাদের পুরোনো প্রেমিকা ছিল, নিঃসঙ্গ দুপুরে উরুৎ ফুরুৎ বাসগুলোর দিকে তাকিয়ে তারা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলা শুরু করলো।
আর রাস্তাঘাটে এপথ বেয়ে নতুন নতুন চিন্তা-গল্প-হা-হুতাশের বাতাস বয়ে যায় আর আমরা ক্রমশ সমাজবিবর্তনের সেবক, প্রকাশক, প্রচারক হয়ে উঠি। আমাদের দু’একজনের মামাবাড়ী ডালুয়া বা এরকম বাস-যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন কিছূ প্রত্যন্ত গ্রামে হওয়ার কারণে আরো কিছু জিনিষ পরিস্কার হয়ে আসে। তাদের অনেকে পুরোনো দিনে মামাবাড়ী যাবার পথে পায়ে হাঁটার, রিকশায় চড়ার দারিদ্রিক ব্যবস্থার নস্টালজিক মহত্ত্বের তত্ত্ব তুলে আমাদেরকে খোঁচা দেয়- সত্যি বলতে কি ওদিকে কোনদিন বাস যায়নি, বলা ভাল বাসস্ট্যান্ড বলে কিছু নেই সে গ্রামগুলোতে। বাস থামলে নতুন নতুন উপনিবেশের মালপত্র, ল্যাগেজ, ঘড়ি, চশমা, পারফিউম কিছুই নামেনা সে পথগুলোতে। পোঁ পোঁ শব্দ নেই, উথাল পাথাল বাতাসও নেই; আমরা যারা ‘পোঁ পোঁ’র কাছে, ‘পিয়া ঘর আয়া’র কাছে বিনোদিত হই, রক্তের ভেতরে আরেকর রক্তের নাচনে শিহরিত হই, তাদেরকে রহস্যময় আলো-আধারের ধোঁয়ায় তীরবিদ্ধ করে তারা বলে- “মামাবাড়ীর উঠোনে পা রাখতেই চারপাশে থেকে বন্ধু বান্ধবদের ছুটে আসার সে কী নমুনা, আত্মীয় পরিজনদের যেভাবে কুশলাদি জিজ্ঞাসা করার সে কী নমুনা, কী মায়া, কী টান, কী আনন্দ আহ্ ...... ।”
ততোদিনে আমাদের সামনের রাস্তাটি বাস সড়কে বিবর্তনের অনেক দিন কেটে যায়। আর আমাদের মধ্যে যাদের মগজে আঁচড় কাটতে কাটতে হঠাৎ হঠাৎ সাদা সাদা কাগজেও আঁচড় কাটার অভ্যাস ছিল, তাদের পঞ্চেন্দ্রিয়ের বাইরে আরেক ইন্দ্রিয় যেটি ইশ্বরের কাছ থেকে গোপনে তথ্য পাচার করতো সম্ভবত তারই কল্যানে বুঝতে শুরু করলো, সমাজ জীবনে কিছু একটা ঘটে চলেছে। ২০/৩০ হাতের তুচ্ছ এই যানবাহনগুলো কিভাবে এই জনপদে নতুন অবতার হিসাবে আবির্ভুত হলো... অবশ্য খুশী কিম্বা আনন্দেরও কমতি নেই, পথগুলো দিন দিন ছোট হয়ে আসলে চারিদিকে সব চেনা-অচেনা রেখাগুলো ঝাপসা হয়ে আসে, আমাদের নিজেদের মধ্যে দেখাসাক্ষাতের হার কমে যায়। আর কষ্ট কম আর সময় বাঁচে বলে আমরা কাটাঁঘেরা বাগানে গোলাপের রূপ গন্ধসুধায় বিভোর হয়ে বাসের স্পীকারের সাথে সুর মিলিয়ে যাই ... দিল নে ধড়কে লাগা ....
হঠাৎ কোনদিন দুর্ঘটনায় দু’একজন আহত হলে বেশ চিন্তায় পড়ে যাই, ভাবি আমাদের মতো ধীরগতির সমাজে বাসগুলোর এতো দ্রুত চলা মনে হয় ঠিক নয়। যতই দিন যায় এভাবে আলাদীন বাসগুলোতে চড়তে চড়তে আশ্চর্য মানুষ, পোকামাকড়, যাদু, বিষ, মধু, শব্দ, সুর, বর্ণ, গন্ধ আমাদের ঘরে ঘরে মনে মনে মগজে মগজে প্রবেশ করা শুরু করে। রক্তের কোষে মগজের কোষে চোখের দৃস্টিতে তা ছড়িয়ে পড়লে আমার আরো গভীর চিন্তায় পড়ে যাই – এ কিভাবে সম্ভব? আমাদের ফসলের রঙ বদলে যায়, গানের সুর বদলে যায়, কথার শব্দ, ভালবাসার নমুনা বদলে যায়, আমাদের ফাগুনের বাতাসে অচেনা স্পর্শ । আমাদের রাত্রির গল্পগুলোতে অন্যরকম গল্পের অনুপ্রবেশ ঘটে। আমাদের জমি হাওরের কাদায় পড়ে থাকে মাছের লাশ, আমাদের ভিটায় পাখীরা আর ডাকেনা, আমাদের বৃদ্ধা কৃষাণীর কোমরে গামছার বাঁধন খুলে গেলে আমরা ভাবতে বসি, কষ্ট করে কোমরে গামছা বাঁধার আবশ্যকতা কি?
একদিন 'ক' নগরে ৩ জন মানুষ মারা গেলে 'খ' নগরে মারা যায় ৭ জন। একদিন 'গ' নগরে কোন নারী লাঞ্ছিত হলে 'ঘ' নগরে কোন অফিস পুড়িয়ে ফেলা হয়। একদিন 'ঙ' দেশের কেউ চ দেশে গিয়ে সোনার পদক জিতে এলে 'ঞ' দেশের লোকজন সেই পদক দুর থেকে দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে, আর আমাদের গোয়ালঘরে বিকেলের ছায়া পড়ে। দোকানগুলোতে টেবিলের আকার বাড়ে, টেবিলে চায়ের কাপের সংখ্যাও বাড়ে। অনেকে আবার চা’য়ে চিনি কম দেবার কথা বলা শুরু করে “চিন্তায় চিন্তায় ডায়াবেটিস বাধিয়ে ফেলেছি, সাবধান না হয়ে উপায় আছে?”
একেকদিন আবার আমাদের কেউ কেউ, নিজেদের বাড়ীঘরে চৌর্যশিল্প চর্চার কল্যানে নতুন পোষাক গায়ে দিয়ে বের হই আর বেদিশা বাসগুলোতে চড়ে বসি- তারপর ‘পিয়া ঘর আয়া’ শুনতে শুনতে আবারো একবার বেদিশা চক্কর দিয়ে আসার পর মনে হয় আমাদের চোখ মগজ জিভ যেন তিনবার এদিক-ওদিক পাক খেয়ে আসলো। পথে নানান কথাবার্তা জ্ঞানগর্ভ আলোচনার সূত্র ধরে ভাবতে বসি, ‘আমাদেরকে আসলে আধুনিকতায় দীক্ষা নিতে হবে’। ভাবতে ভাবতে আধুনিকতার উপরে বসানোর জন্য সেরকম রক্তসম্পর্কের আরেকটি শব্দ খুঁজে খুঁজে গলদঘর্ম হয়ে ভাবি, আসলে বাসের চারটি চাকার কাজ কি কি, আসলে বাসে চড়ে আমরা প্রকৃতপক্ষে কোথায় যাই, বাস কি প্রকৃতপক্ষে আমাদের গন্তব্যে যাচ্ছে নাকি আমরাই বাসের গন্তব্যে যাতায়াত করছি? ভাবতে ভাবতে একদিন ঘুম থেকে উঠে পথে বের হয়ে কিছুক্ষন হাঁটার পর রোজকার মতো সেদিন পোঁ পোঁ শব্দ না শুনে চিন্তায় পড়ে যাই, পড়তে পড়তে শুনি ‘আজ বাস বন্ধ’। বাসগুলো কেন বন্ধ হয়, কেন আমরা কোথাও যেতে চাইলে বাসগুলো আমাদের কথামতো পোঁ পোঁ শব্দে আমাদের সামনের রাস্তায় এসে দাঁড়ায় না, কেন জায়গায় জায়গায় থামেনা? আমরা গভীর চিন্তায় পড়ে যাই। তারপর একদিন এ রহস্য ভেদ করে ফেলি, কিন্তু ততোদিনে আমরা যাবতীয় পুরোনো চিন্তা মাথা থেকে বের করে দিয়ে আরেক চিন্তায় মগ্ন হয়ে পড়ি....
চিন্তা করতে করতে মান্ডপে যাই। পালির পুঁথিপাঠ শাস্ত্রতত্ত্ব মাথার একহাত উপর দিয়ে গেলে ঘরে ফিরে টেলিভিশন চালু করি। টেলিভিশনের ঝলমলে পর্দায় বাস এবং বাসের চেয়ে ২০/৩০ গুন লম্বা কোন ট্রেনের সর্পিল গতিতে আঁকাবাঁকা কুঁ.. উ.. উ.. ঝিক ঝিক.. কুঁ.. উ.. উ.. ঝিক ঝিক ছুটে চলা দেখে অতীতের সমস্তকিছুকে বিস্মৃত করে বিদ্যুচ্চমকের মতো আমাদের মগজের কোষে আরেক উত্তরাধুনিক চিন্তার উদয় হয়, নতুন আফসোস জাগে, “আহা! আমাদের সামনের রাস্তায় কোনদিন কি ট্রেন চলা শুরু হবে?”
* ফেইচুম - ধুতির মণিপুরী সংস্করন
* মিয়াঙ - অমণিপুরী
* কুমাড়া - জনৈক তরুনের নাম
* ডালুয়া - একটি গ্রামের নাম
* মান্ডপ- মণিপুরীদের সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানের কেন্দ্র
* পালি - ধর্মগ্রন্থ থেকে পাঠ ও বাখ্যার আসর
গণ্পকারঃ শুভাশিস সিনহা সমীর। বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষার কবি, গণ্পকার ও নাট্যকার। জন্ম বাংলাদেশের মৌলভীবাজার জেলায়। প্রকাশিত গ্রন্থাবলী : ছেয়াঠইগির যাদু(২০০২), সেনাতম্বীর আমুনিগৎতো সেম্পাকহান পড়িল অদিন (২০০৩), নুয়া করে চিনুরি মেয়েক (২০০৫), রবীন্দ্রনাথের রুদ্রচন্ড(২০০৭), মণিপুরী সাহিত্য সংগ্রহ -১ম ও ২য় খন্ড(২০০৭) ইত্যাদি।
বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী থেকে অনুবাদঃ কুঙ্গ থাঙ । মুল গল্পটি প্রকাশিত হয়েছিল বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষার লিটলম্যাগ গাওরাপা, নভেম্বর ১৯৯৯ সংখ্যায়। মুল গল্পের লিংক এখানে ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

