somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

কুঙ্গ থাঙ
আমার মাতৃভাষার নাম বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি । পৃথিবীর মাত্র তিন লক্ষ মানুষ এই ভাষায় কথা বলে । ভাষাটিকে ইউনেস্কো এনডেঞ্জার্ড ল্যাঙ্গুয়েজ হিসাবে ঘোষনা করেছে ।

আদিবাসী শিশুর কি অধিকার নেই নিজ মাতৃভাষায় পড়ার?

২৮ শে এপ্রিল, ২০০৯ রাত ১০:৫০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বিজু পার্বত্য জনপদের প্রধান উৎসব। বিজু উৎসবেও শিশুদের স্কুলে যেতে হয়েছে, ওদের বাবা-মাকে অফিস করতে হয়েছে। পরীক্ষার মতো ভয়কাতুরে বিষয়েও ছাড় পায়নি অনেক পাহাড়ি শিশু। রাষ্ট্রের সব উৎসবে সবাই ছুটি পায়, তবে কেন নিজেদের প্রধান উৎসবে ছুটি পাবে না পাহাড়ি শিশুরা? ঈদ বা পূজার দিন কি কোনো বাঙালি শিশু স্কুলে যায়? শুধু প্রধান উৎসবের ছুটিই নয়, পাহাড়ি শিশুরা আরও একটি ব্যাপারে চরম বৈষম্যের শিকার; তাদের মাতৃভাষায় শিক্ষালাভের অধিকার এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

পাহাড়ি আদিবাসী শিশুরা ঘরে যে ভাষায় কথা বলে স্কুলে গিয়ে সে ভাষার দেখা পায় না। স্কুলকে ভিনদেশি ভুবন মনে হয়। পাঠ্যসুচিকে মনে হয় ‘দুরের শোনা গল্প’। তাদের হাতে তুলে দেওয়া বইতে নিজের চারপাশের পরিচিত কোনো কিছুর দেখা তারা পায় না। বইগুলো তাদের কাছে হয়ে ওঠে অচেনা সংস্কৃতির আধার; নিজের ভাষার কথাবার্তা নেই সেখানে, নেই সহপাঠী বন্ধুদের চেহারা।

বাংলাদেশে কমবেশি ৪৫টি আদিবাসী ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর বাস। এর মধ্যে পার্বত্য অঞ্চলে রয়েছে চাকমা, মারমা ত্রিপুরাসহ ১১টি আদিবাসী পাহাড়ি জনগোষ্ঠী। রাষ্ট্রীয়ভাবে পার্বত্য অঞ্চলটি (রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান) ‘উপজাতি’ বা আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চল হিসেবে স্বীকৃত। ১৯৯৭ সালের পার্বত্য শান্তি চুক্তিতেও (খন্ড ক, ধারা-১) এর উল্লেখ রয়েছে। পার্বত্য শান্তিচুক্তি অনুযায়ী পাহাড়ি শিশুদের মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষাদানের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে (পার্বত্য চুক্তি, খন্ড: খ, ধারা: ৩৩-খ-২)। পার্বত্য শান্তিচুক্তির এক যুগ পূর্তি হতে যাচ্ছে। ১৯৯৭ সালে যে শিশুর জন্ন হয়েছে, এখন তার বয়স ১২ বছর। নীতিনির্ধারকদের অবহেলায় ১২ বছরেও কেন পার্বত্য অঞ্চলের শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষা নিশ্চিত করা গেল না, এ প্রশ্নের কী জবাব দেবে ক্ষমতার কেন্দ্রে বসে থাকা বাঙালি শাসক দল? নিজের মাতৃভাষা রক্ষার জন্য যে বাঙালি লড়াই করেছে, তারাই কেন আবার নিজের দেশের অন্য ভাষাভাষীর মর্যাদা দিতে অনাগ্রহী? অনাদর আর অবহেলায় বাংলাদেশে অনেক ক্ষুদ্র জাতি-গোষ্ঠীর মানুষের মাতৃভাষা হারিয়ে যেতে বসেছে।

শিক্ষার যাত্রাপথকে মসৃণ করতে হবে। শিশুশিক্ষার প্রধান বাহন হচ্ছে মাতৃভাষা। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার শুরুতেই মাতৃভাষা ব্যবহারের অন্যতম লক্ষ্য, শিশুকে নিজের ভাষায় বলতে ও বুঝতে সক্ষম করে তোলা। মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ পেলে একজন শিশুকে নতুন ভাষা শেখার চাপ সইতে হয় না। সে সহজেই সবকিছু রপ্ত করতে পারে। মাতৃভাষায় যেটা সম্ভব, নতুন কোনো ভাষায় তা সম্ভব নয়। ‘নানান দেশের নানান ভাষা/বিনে স্বদেশী ভাষা, পুরে কি আশা’? মধ্যযুগের কবি রামনিধি গুপ্তের এই কথার আবেদন ও উপযোগিতা এখনো কি প্রাসঙ্গিক নয়?

একবারও কি আমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালিরা ভাবতে পারি, আমার শিশুটিকে ভিনদেশি অচেনা কোনো ভাষায় (ধরা যাক জাপানি, চীনা, জার্মান বা রুশ ভাষায়) ফুল পাখির নাম কিংবা ছড়া পড়তে হচ্ছে? নিশ্চয় নয়। নিজের সন্তানের জন্য যা সত্য, অন্যের জন্য তা কেন আমরা মানতে চাইব না। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই কথা তো বহুল উচ্চারিত ‘আগে চাই মাতৃভাষার গাঁথুনি, তারপর...’।

বৈসু-সাংগ্রাই-বিজু উপলক্ষে স্থানীয় একটি অনুষ্ঠানে ত্রিপুরা ও বাংলায় চমৎকার সব গান পরিবেশন করলেন মৌসুমী ত্রিপুরা। তিনি কমলছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। মাতৃভাষা ভিন্ন অন্য ভাষায় যোগাযোগ যে একজন শিশুর জন্য কতটা পীড়াদায়ক হতে পারে, তা তা জানা গেল মৌসুমী ত্রিপুরার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার একটি গল্প থেকে। “ক্লাসে আমি একটা ছড়া পড়াচ্ছিলাম। এক পাহাড়ি শিশু কাছে এসে বলল, ‘আমি প্রচেষ্টা করিবো’। চেষ্টা করবে তো ভালো কথা, করো। ছেলেটি আবার বলল, ‘প্রচেষ্টা করিবো’। বুঝলাম কোথাও সমস্যা হচ্ছে। বললাম, তোমার নিজের ভাষায় বলো। ছেলেটি ত্রিপুরা। ত্রিপুরাদের মাতৃভাষা অর্থাৎ ককবরক ভাষায় বলার পরে বুঝলাম ‘প্রচেষ্টা’ নয়, ছেলেটি আসলে ‘প্রস্রাব’ করতে চায়।”

স্কুলে এসব ছোটখাটো সমস্যার কথাও একজন পাহাড়ি শিশু ঠিকভাবে বলতে পারে না, কারণ সে তো বাড়িতে বাংলায় কথা বলে না, ফলে সে তখন স্কুলের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। কিছুদিন পরে সে স্কুল থেকে ঝরে পড়ে।

এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ভাষাগত সমস্যার কারণে আদিবাসী শিশুরা প্রাথমিক শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ে প্রায় ৬০ শতাংশ, যেখানে জাতীয়ভাবে ঝরে পড়ার হার ৩০ শতাংশ। শিক্ষার প্রধানতম মাধ্যম ভাষা। শিক্ষাজীবনের শুরুতে কোমলমতি শিশুদের দুর্বোধ্য ও অচেনা ভাষায় পড়াশোনা করতে হলে তা সহজে তাদের বোধগম্য হয় না। এতে করে শিশুর মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। তার মধ্যে স্কুলের প্রতি এক ধরনের অনীহা তৈরি হয়।

পার্বত্য জনপদের মানুষ নানাভাবে বৈষ্যমের শিকার। বৈষম্য আর পশ্চাৎপদতার দেয়াল ভাঙতে পারে কেবল শিক্ষা। কিন্তু সেই শিক্ষার শুরুটা যদি হয় অন্য ভাষায়, তাহলে তাতে আনন্দ থাকে না, থাকে না সঠিক মনোযোগ।


একই বিষয়ে আরেকটি পোস্টঃ আদিবাসীদের মাতৃভাষাকে টিকিয়ে রাখতে সরকারসহ সকলের আন্তরিকতা প্রয়োজন

_____________________________________________
ফিরোজ জামান চৌধুরীর পাহাড়ে শিশুশিক্ষা: আগে চাই মাতৃভাষার গাঁথুনি লেখা থেকে সংক্ষেপিত।
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা মে, ২০০৯ রাত ১২:১৪
১০৬টি মন্তব্য ২৮টি উত্তর পূর্বের ৫০টি মন্তব্য দেখুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×