রাসলীলা, নটপালা, বাসকসহ অন্যান্য কাব্যগীতাশ্রয়ী পালার মতোই মনশিক্ষা বা দেহতত্ত্বের গানগুলোর দার্শনিক ভিত্তি বৈষ্ণবিজম। তবে এই গানগুলোর বিশেষত্ত্ব হলো ধর্মীয় আচারের বাইরে এসে মণিপুরী চিন্তক ও সাধারনের লোকাচার চর্চার নিজস্বতার মধ্য দিয়ে স্বাতন্ত্র্য রূপ লাভ। এগুলোর সাথে আবহমান বাংলার বাউল, সুফী ও মারফতী ধারার যথেষ্ঠ মিল খুঁজে পাওয়া যায়।
পুরাণ ও ধর্মগ্রন্থের শিক্ষাকে লোকাচারের সাথে সমন্বয় ঘটিয়ে মাতৃভাষার বাইরে বাংলা বা বৈষ্ণব পদাবলী ও কীর্ত্তন রচনার ধারাটি বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরীরা আজো অক্ষত রেখেছে। এসব পদকর্তা বা পালাকারের বেশীর ভাগেরই কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই, নেই বাংলা বা ব্রজবুলি ব্যকরনের উপর প্রাথমিক ধারনা। তাই ভাষাগত সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও কেবল গুরুপরম্পরায় প্রাপ্ত জ্ঞানের উপর ভিত্তি করে তারা মণিপুরী সুরের উপর ভাব-রস-ছন্দ অব্যহত রেখে অবলীলায় লাইনের পর লাইন বাংলা ও ব্রজবুলি কথামালা যেভাবে সাজিয়ে যান, ভাবতে অবাক লাগে। এখানে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী 'ইসালপা' বা পালাকার গোপীচাঁদ সিংহের একটি মনশিক্ষা ও একটি দেহতত্ত্বের গান হুবহু পত্রস্থ করা হলো।
মনশিক্ষা - ২১
ধনী কি গরীব সুখী বুঝা অতি বিষম দায়।
কোন ধনেতে কেবা সুখী অভাবে কেবা দুঃখী হায়।।
ধনে সুখী বিদ্যায় সুখী পুত্রে সুখী বিশ্বময়।
চিরসুখের চিন্তাধারা করিছে সেই সুখী সর্বদা নয় ।।
ভবের মুক্ত সুখী গুরু শ্রীহরির চরন লভিছে যেই।
আপন ভোলা জন্ম মৃত্যু এই জগতে সত্য সুখী সেই।।
দীন গোপীচাঁদে কহে মানব জন্মে পড়িল ছায়।
মানবাকৃতি ধরি জীবে হায় সাজ'তে বিষম দায়।।
দেহতত্ত্ব - ১৪
রংমহল কল কব্জার ঘর দেহ কলেবর।
দেখনা চেয়ে পর্দা খুলে কিবা আছে তার ভিতর।।
লক্ষ নাড়ি সারি সারি, মাংস পেশী জড়াজড়ি।
রাঙা রোধির তার ভিতরে স্রোতে বৈছে নিরন্তর।।
অস্থি মজ্জা জোড়াজাড়া, মধ্যে আছে পেরাক মারা।
কব্জায় কব্জায় নারা-চারা তারি মধ্যে কারিগর।।
ব্রহ্মান্ডেরই দুই জ্যোতিস্ক অতি যত্নে করে দৃষ্ট।
নাসারন্দ্রে রেচক কুম্ভক সাধনেতে রূপান্তর।।
হৃদি পদ্ম সিংহাসনে বসে আছেন নিরঞ্জন।
যোগী ঋষি মুনিগনে না পায় ভজে নিরন্তর।।
দীন গোপীচাঁদে বলে গণার দিন ফুরায়ে গেলে।
কল কব্জা সব অচল হবে দেহ হবে স্থানান্তর।।
_____________________________________________
গোপীচাঁদ সিংহের জন্ম মৌলবীবাজার জেলার কমলগঞ্জের ডালুয়া নামের প্রত্যন্ত গ্রামে, বাংলা ১৩৩৮ সনে। ছোটবেলা থেকেই নাটকের প্রতি প্রবল আগ্রহ ছিল তাই নাটকের দল গড়েছেন। নিজে নাটক লিখেছেন, অভিনয় করেছেন। ১৯৭১ সালের পর বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও পাকিস্তানিদের বর্বরতার চিত্র তুলে ধরে লিখেন "বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ" নামের পালাগীতির পুস্তিকা। প্রকাশিত গ্রন্থ: গীতিকাব্য (২০০৫)। বৈষ্ণব পদাবলী, পালা, কীর্ত্তনের গান রচনা ও সুরারোপে সমান দক্ষ এই গুণী শিল্পীর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই বললেই চলে। কেবল পিতা ভদ্র সিংহ ও পিতামহ দঙ্গ সিংহের কাছ থেকে পাওয়া জ্ঞান ও বিদ্যাটাই পুঁজি।
তথ্যসূত্রঃ
* Dr M. Kirti singh / Religious Developments in Manipur,1980
* N. Tomba Singha / Bhakti Rasa Numbumari, Imphal, 1969
* তরুন কুমার সিংহ / মণিপুরী নৃত্য প্রবেশিকা, ১৯৬৮
* গায়ত্রী চট্টোপাধ্যায় / ভারতের নৃত্যকলা, ১৯৯৫
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই মে, ২০০৯ রাত ১:০৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


