somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

কুঙ্গ থাঙ
আমার মাতৃভাষার নাম বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি । পৃথিবীর মাত্র তিন লক্ষ মানুষ এই ভাষায় কথা বলে । ভাষাটিকে ইউনেস্কো এনডেঞ্জার্ড ল্যাঙ্গুয়েজ হিসাবে ঘোষনা করেছে ।

গোপীচাঁদ সিংহের মনশিক্ষা ও দেহতত্ত্বের গান

১২ ই মে, ২০০৯ রাত ১২:৪৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

মনশিক্ষা বা দেহতত্ত্বের গানগুলো বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী কাব্যসাহিত্যের মুল্যবান নিদর্শন। অষ্টাদশ শতকে বৈষ্ণব ধর্মের বলয়ে আসার পর থেকে মণিপুরী দের সাহিত্য, সংস্কৃতি ও শিণ্পকলা প্রবলভাবে বৈষ্ণবদর্শন দ্বারা প্রভাবিত হয়। শ্রীচৈতন্যর ভক্তি আন্দোলন মণিপুরে পৌঁছলে তৎকালীন বাংলা অঞ্চল থেকে বঙ্গদেশ-পালা নামে একশ্রেণীর কীর্ত্তনভিত্তিক নৃত্যগীত সেখানে বিস্তার লাভ করে। এর সাথে মণিপুরীদের নিজস্ব সুর, তাল, রাগ-রাগিনী এবং তারসাথে নিজস্ব বাদ্যযন্ত্র যেমন পুঙ, করতাল, মঞ্জিলা, মাঙকাঙ, সেলবঙর, মইপঙ ইত্যাদির সমন্বয় সাধন করে মণিপুরী পালার নিজস্ব একটি ফর্ম প্রবর্তিত হয়েছিল। বৈষ্ণবধর্মের প্রভাবে জয়দেব, গোবিন্দদাস, জ্ঞানদাস, কৃষ্ণদাস প্রমুখের রচিত বৈষ্ণবপদাবলী তুমুল জনপ্রিয়তা পায়। সে সময় ব্রজবুলি, মধ্যযুগীয় বাংলা, সংস্কৃত বা মৈথিলী ভাষায় রচিত এসব পদাবলী কীর্ত্তনগুলো সাধারন মণিপুরী শিল্পী ও পালাকারেরা অর্থ না বুঝেই গাইতো। বৈষ্ণব সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে পৃষ্ঠপোষকতায় এগিয়ে আসেন মণিপুরী রাজারা । বৈষ্ণবধর্ম মণিপুরের রাজধর্মের মর্যাদা লাভ করে। পরবর্তীতে মণিপুরী 'অজা' বা গুরুরাও নিজেদের ভাষা বাদ দিয়ে বাংলা- ব্রজবুলিতে পালা ও গীতরচনা শুরু করেন। বর্তমানে মণিপুরী রাসলীলা য় যেসব গান গীত হয় সেগুলোর অধিকাংশ বাঙালী বৈষ্ণবপদকর্তাদের রচিত গান - মধ্যযুগের বাংলা, ব্রজবুলি নয়তো মৈথিলী ভাষায়। বিংশ শতকের প্রথমভাগে মণিপুরীদের মধ্যে জাতিগত চেতনার পুনর্জাগরন ঘটলে মণিপুরী গুরুরা আবার নিজেদের ভাষায় গীতরচনার দিকে মনোযোগ দেয়।

রাসলীলা, নটপালা, বাসকসহ অন্যান্য কাব্যগীতাশ্রয়ী পালার মতোই মনশিক্ষা বা দেহতত্ত্বের গানগুলোর দার্শনিক ভিত্তি বৈষ্ণবিজম। তবে এই গানগুলোর বিশেষত্ত্ব হলো ধর্মীয় আচারের বাইরে এসে মণিপুরী চিন্তক ও সাধারনের লোকাচার চর্চার নিজস্বতার মধ্য দিয়ে স্বাতন্ত্র্য রূপ লাভ। এগুলোর সাথে আবহমান বাংলার বাউল, সুফী ও মারফতী ধারার যথেষ্ঠ মিল খুঁজে পাওয়া যায়।

পুরাণ ও ধর্মগ্রন্থের শিক্ষাকে লোকাচারের সাথে সমন্বয় ঘটিয়ে মাতৃভাষার বাইরে বাংলা বা বৈষ্ণব পদাবলী ও কীর্ত্তন রচনার ধারাটি বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরীরা আজো অক্ষত রেখেছে। এসব পদকর্তা বা পালাকারের বেশীর ভাগেরই কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই, নেই বাংলা বা ব্রজবুলি ব্যকরনের উপর প্রাথমিক ধারনা। তাই ভাষাগত সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও কেবল গুরুপরম্পরায় প্রাপ্ত জ্ঞানের উপর ভিত্তি করে তারা মণিপুরী সুরের উপর ভাব-রস-ছন্দ অব্যহত রেখে অবলীলায় লাইনের পর লাইন বাংলা ও ব্রজবুলি কথামালা যেভাবে সাজিয়ে যান, ভাবতে অবাক লাগে। এখানে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী 'ইসালপা' বা পালাকার গোপীচাঁদ সিংহের একটি মনশিক্ষা ও একটি দেহতত্ত্বের গান হুবহু পত্রস্থ করা হলো।


মনশিক্ষা - ২১

ধনী কি গরীব সুখী বুঝা অতি বিষম দায়।
কোন ধনেতে কেবা সুখী অভাবে কেবা দুঃখী হায়।।
ধনে সুখী বিদ্যায় সুখী পুত্রে সুখী বিশ্বময়।
চিরসুখের চিন্তাধারা করিছে সেই সুখী সর্বদা নয় ।।
ভবের মুক্ত সুখী গুরু শ্রীহরির চরন লভিছে যেই।
আপন ভোলা জন্ম মৃত্যু এই জগতে সত্য সুখী সেই।।
দীন গোপীচাঁদে কহে মানব জন্মে পড়িল ছায়।
মানবাকৃতি ধরি জীবে হায় সাজ'তে বিষম দায়।।


দেহতত্ত্ব - ১৪

রংমহল কল কব্জার ঘর দেহ কলেবর।
দেখনা চেয়ে পর্দা খুলে কিবা আছে তার ভিতর।।
লক্ষ নাড়ি সারি সারি, মাংস পেশী জড়াজড়ি।
রাঙা রোধির তার ভিতরে স্রোতে বৈছে নিরন্তর।।

অস্থি মজ্জা জোড়াজাড়া, মধ্যে আছে পেরাক মারা।
কব্জায় কব্জায় নারা-চারা তারি মধ্যে কারিগর।।
ব্রহ্মান্ডেরই দুই জ্যোতিস্ক অতি যত্নে করে দৃষ্ট।
নাসারন্দ্রে রেচক কুম্ভক সাধনেতে রূপান্তর।।

হৃদি পদ্ম সিংহাসনে বসে আছেন নিরঞ্জন।
যোগী ঋষি মুনিগনে না পায় ভজে নিরন্তর।।
দীন গোপীচাঁদে বলে গণার দিন ফুরায়ে গেলে।
কল কব্জা সব অচল হবে দেহ হবে স্থানান্তর।।

_____________________________________________



গোপীচাঁদ সিংহের জন্ম মৌলবীবাজার জেলার কমলগঞ্জের ডালুয়া নামের প্রত্যন্ত গ্রামে, বাংলা ১৩৩৮ সনে। ছোটবেলা থেকেই নাটকের প্রতি প্রবল আগ্রহ ছিল তাই নাটকের দল গড়েছেন। নিজে নাটক লিখেছেন, অভিনয় করেছেন। ১৯৭১ সালের পর বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও পাকিস্তানিদের বর্বরতার চিত্র তুলে ধরে লিখেন "বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ" নামের পালাগীতির পুস্তিকা। প্রকাশিত গ্রন্থ: গীতিকাব্য (২০০৫)। বৈষ্ণব পদাবলী, পালা, কীর্ত্তনের গান রচনা ও সুরারোপে সমান দক্ষ এই গুণী শিল্পীর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই বললেই চলে। কেবল পিতা ভদ্র সিংহ ও পিতামহ দঙ্গ সিংহের কাছ থেকে পাওয়া জ্ঞান ও বিদ্যাটাই পুঁজি।

তথ্যসূত্রঃ
* Dr M. Kirti singh / Religious Developments in Manipur,1980
* N. Tomba Singha / Bhakti Rasa Numbumari, Imphal, 1969
* তরুন কুমার সিংহ / মণিপুরী নৃত্য প্রবেশিকা, ১৯৬৮
* গায়ত্রী চট্টোপাধ্যায় / ভারতের নৃত্যকলা, ১৯৯৫
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই মে, ২০০৯ রাত ১:০৪
৪টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×