পর দিন ৬ নভেম্বর বৃহস্পতিবার সকাল আটটায় কবিকে টাউন হল প্রাঙ্গণে শ্রীহট্টবাসী জনসাধারণের পক্ষ থেকে সংবর্ধনা জানানো হয়। ওই অনুষ্ঠানে হাজার পাঁচেক মানুষের সমাগম ঘটে। কবিকে রাজোচিত সংবর্ধনা দেওয়া হয়। (আমাদের কালের কথা−সৈয়দ মুর্তজা আলী, চট্টগ্রাম ১৩৮২)। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে কবি ‘বাঙ্গালীর সাধনা’ শীর্ষক দেড় ঘণ্টাব্যাপী বক্তৃতা করেন। ওইদিন দুপুরে রবীন্দ্রনাথ অধ্যাপক নলিনীমোহন শাস্ত্রী মহাশয়ের আমন্ত্রণে তাঁর বাসভবনে যান। বেলা দুটোর সময় ব্রাহ্মসমাজ গৃহে শ্রীহট্ট মহিলা সমিতি কর্তৃক তাঁকে সম্মাননা জানানো হয়।
অনুষ্ঠানস্থলে কবির টেবিলে মোড়ানো ছিল মণিপুরি মেয়েদের তৈরি টেবিলক্লথ। কাপড়খানি তাঁর ভালো লাগে। মেয়েদের বয়ন-নৈপুণ্য দেখে কবি মণিপুরিদের তাঁত ও জীবনাযাত্রা দেখতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। ওইদিন অনুষ্ঠান শেষে তাঁকে সিলেট শহরের কাছে মাছিমপুরে নিয়ে যাওয়া হয়। মণিপুরি বস্তিতে কবির আগমন ঘটবে এ জন্য বস্তিবাসী তাৎক্ষণিকভাবে রাস্তায় সারি সারি কলাগাচ পুঁতে তোরণ নির্মাণ করেন। প্রতি গাছের গোড়ায় মঙ্গলঘট ও আমপাতার শোভন সজ্জা করেন। সে তোরণদ্বার দিয়ে কবিকে নিয়ে যাওয়া হয় মাছিমপুর পূর্বমন্ডপের গোপীনাথ জিউরত মন্দিরে। কবির উদ্দেশে মণিপুরি ছেলেমেয়েরা রাখাল নৃত্য পরিবেশন করে। রাধা-কৃষ্ণের প্রেম নিয়ে রাখাল নৃত্যের কাহিনী। এটি বিষ্ণুপ্রিয়াদের পার্বণিক আচারেরই অংশ। কবির ইচ্ছা ছিল রাসনৃত্য দেখার, কিন্তু ক্লান্তিবোধ করায় মণিপুরি ছেলেমেয়েদের সন্ধ্যায় তার বাংলোয় আসতে বলেন। তিনি আসার সময় মণিপুরি মেয়েদের তৈরি তাঁতের কাপড় কিনে নিয়ে আসেন।
সন্ধ্যায় মণিপুরি শিল্পীরা আসেন টমাস সাহেবের বাংলোয়। কবি তাঁদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। সেখানে মণিপুরি শিল্পীরা কবিকে বিখ্যাত রাসনৃত্য দেখান ও গান গেয়ে শুনান। কবি নৃত্য দেখে মুগ্ধ হয়ে তাঁদের ২০ টাকা পুরস্কার দেন। তিনি স্থির করেন, শান্তিনিকেতনের ছাত্রদের মণিপুরি নৃত্যশিক্ষার জন্য একজন শিক্ষক সঙ্গে নিয়ে যাবেন। কিন্তু দেশ ছেড়ে কোনো মণিপুরি নৃত্যগুরু তখন শান্তিনিকেতনে যেতে সম্মত হননি। পরে তিনি ত্রিপুরার মহারাজা বীরেন্দ্রমাণিক্য বাহাদুরকে অনুরোধ জানিয়ে নৃত্যগুরু বুদ্ধমন্ত সিংহকে শান্তিনিকেতনে নিয়ে যান। ১৯২০ সালের ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে বুদ্ধমন্ত সিংহ শান্তিনিকেতনে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। আশ্রমের শিক্ষার্থীরা আগ্রহ নিয়ে বুদ্ধমন্ত্রের কাছে নাচ শেখেন। তখন আশ্রমের মাসিকপত্র শান্তিনিকেতন-এর ১৩২৬ সালের ফাল্গুন সংখ্যায় সংবাদ প্রচার হয়, ‘ত্রিপুরাধিপতি মহারাজ বাহাদুরের দরবার হইতে দুইজন কলাবিদ আশ্রমে আসিয়াছেন। আশ্রম বালকেরা তাঁহাদিগের নিকট হইতে মৃদঙ্গ সহযোগে সাঙ্গীতিক ব্যায়াম শিক্ষা করিতেছে।’ এ সংবাদের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়, নৃত্যশিক্ষাকে অনেকেই ভালোভাবে নেয়নি। এ জন্য নৃত্যশিক্ষাকে ‘সাঙ্গীতিক ব্যায়াম শিক্ষা’ হিসেবে প্রচার করা হয়।
বাঙালির নৃত্যকলার উন্নয়নে কবি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯২৬ সালে স্বতন্ত্র নৃত্যকলা বিভাগ চালু করেন। পরবর্তী পর্যায়ে রবীন্দ্রনাথ তাঁর চিত্রাঙ্গদা, চন্ডালিকা, মায়ার খেলা, নটীর পূজা, শাপমোচন নৃত্যনাট্যে মণিপুরি নৃত্যের স্থান দেন। মণিপুরি নৃত্যকে তিনি বিশেষ পছন্দ করতেন। তাঁর পৃষ্ঠপোষকতার জন্য মণিপুরি নৃত্যকলা আজ ধ্রুপদী নৃত্য হিসেবে পৃথিবীব্যাপী প্রচারিত হয়েছে।
রবীন্দ্রনাথ মাছিমপুর পূর্বমন্ডপে গোপীনাথ জিউরত মন্দিরেই প্রথমবারের মতো মণিপুরি নৃত্য দেখেছিলেন। এ মন্দিরে প্রতিবছর রাসলীলাসহ অন্যান্য পার্বণিক উৎসব উদযাপন করা হয়। আজও মন্দিরটি আগের মতোই রয়ে গেছে। প্রায় দেড় শ বছরের পুরোনো চারচালা টিনের ছাউনি দেওয়া একখানি সাধারণ ঘর।
এখানে কবির স্মৃতি ধরে রাখতে বাংলাদেশ মণিপুরি সমাজকল্যাণ সমিতির বর্তমান সভাপতি গোপাল সিংহ কবি রবীন্দ্রনাথের একটি ভাস্কর্য স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছেন। ইতিমধ্যে বোম্বাই থেকে আবক্ষমূর্তি তৈরি করে আনা হয়েছে। ভাস্কর্যটি স্থাপনের জন্য ২০০২ সালে রমেন্দ্র সিংহ, বরেন্দ্র সিংহ, রথীন্দ্র সিংহ, রিংকু সিংহ মন্দিরের জন্য ১ শতাংশ জমি দান করেছেন। মন্দিরের সামনে একটি ভিতও তৈরি হয়েছে। গোপাল সিংহ জানিয়েছেন, মাত্র দুই লাখ টাকার সহযোগিতা পেলে আবক্ষমূর্তিটি স্থাপন করা সম্ভব হবে। রবীন্দ্রনাথের এ স্মৃতিটুকু সংরক্ষণ করতে পারলে মাছিমপুর রবীন্দ্রভক্তদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ স্থান হতে পারে।
সুত্র: দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত শেখ মেহেদী হাসানের রিপোর্ট
আরো পড়ুন: মণিপুরী নৃত্যকলার প্রসারে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অনবদ্য ভুমিকা, রবীন্দ্রনাথের গানে মণিপুরী সুর এবং অন্যান্য প্রসংগ
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই আগস্ট, ২০০৯ দুপুর ১:১৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



