somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সিলেটের মণিপুরীপল্লী মাছিমপুরে রবীন্দ্রনাথ

১৫ ই আগস্ট, ২০০৯ দুপুর ১২:৩১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

১৯১৯ সালে শিলংয়ে বেড়াতে আসেন রবীন্দ্রনাথ। শিলং থেকে সিলেট বেশি দুরের পথ নয়। ৫ নভেম্বর ১৯১৯ বুধবার খুব ভোরে তিনি সিলেটে পৌঁছান। তাঁর সঙ্গে ছিল কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও পুত্রবধু প্রতিমা দেবী। আগমনের সঙ্গে সঙ্গে ছেলেরা আতশবাজি ফোটায়। সুরমা নদীর ঘাট থেকে কবিকে শঙ্খধ্বনি বাজিয়ে শোভাযাত্রাসহ সিলেট শহরে আনা হয়। তিনি উঠেছিলেন শহরের নয়াসড়ক টিলার ওপরে ফাদার টমাসের বাংলোয়।

পর দিন ৬ নভেম্বর বৃহস্পতিবার সকাল আটটায় কবিকে টাউন হল প্রাঙ্গণে শ্রীহট্টবাসী জনসাধারণের পক্ষ থেকে সংবর্ধনা জানানো হয়। ওই অনুষ্ঠানে হাজার পাঁচেক মানুষের সমাগম ঘটে। কবিকে রাজোচিত সংবর্ধনা দেওয়া হয়। (আমাদের কালের কথা−সৈয়দ মুর্তজা আলী, চট্টগ্রাম ১৩৮২)। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে কবি ‘বাঙ্গালীর সাধনা’ শীর্ষক দেড় ঘণ্টাব্যাপী বক্তৃতা করেন। ওইদিন দুপুরে রবীন্দ্রনাথ অধ্যাপক নলিনীমোহন শাস্ত্রী মহাশয়ের আমন্ত্রণে তাঁর বাসভবনে যান। বেলা দুটোর সময় ব্রাহ্মসমাজ গৃহে শ্রীহট্ট মহিলা সমিতি কর্তৃক তাঁকে সম্মাননা জানানো হয়।

অনুষ্ঠানস্থলে কবির টেবিলে মোড়ানো ছিল মণিপুরি মেয়েদের তৈরি টেবিলক্লথ। কাপড়খানি তাঁর ভালো লাগে। মেয়েদের বয়ন-নৈপুণ্য দেখে কবি মণিপুরিদের তাঁত ও জীবনাযাত্রা দেখতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। ওইদিন অনুষ্ঠান শেষে তাঁকে সিলেট শহরের কাছে মাছিমপুরে নিয়ে যাওয়া হয়। মণিপুরি বস্তিতে কবির আগমন ঘটবে এ জন্য বস্তিবাসী তাৎক্ষণিকভাবে রাস্তায় সারি সারি কলাগাচ পুঁতে তোরণ নির্মাণ করেন। প্রতি গাছের গোড়ায় মঙ্গলঘট ও আমপাতার শোভন সজ্জা করেন। সে তোরণদ্বার দিয়ে কবিকে নিয়ে যাওয়া হয় মাছিমপুর পূর্বমন্ডপের গোপীনাথ জিউরত মন্দিরে। কবির উদ্দেশে মণিপুরি ছেলেমেয়েরা রাখাল নৃত্য পরিবেশন করে। রাধা-কৃষ্ণের প্রেম নিয়ে রাখাল নৃত্যের কাহিনী। এটি বিষ্ণুপ্রিয়াদের পার্বণিক আচারেরই অংশ। কবির ইচ্ছা ছিল রাসনৃত্য দেখার, কিন্তু ক্লান্তিবোধ করায় মণিপুরি ছেলেমেয়েদের সন্ধ্যায় তার বাংলোয় আসতে বলেন। তিনি আসার সময় মণিপুরি মেয়েদের তৈরি তাঁতের কাপড় কিনে নিয়ে আসেন।

সন্ধ্যায় মণিপুরি শিল্পীরা আসেন টমাস সাহেবের বাংলোয়। কবি তাঁদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। সেখানে মণিপুরি শিল্পীরা কবিকে বিখ্যাত রাসনৃত্য দেখান ও গান গেয়ে শুনান। কবি নৃত্য দেখে মুগ্ধ হয়ে তাঁদের ২০ টাকা পুরস্কার দেন। তিনি স্থির করেন, শান্তিনিকেতনের ছাত্রদের মণিপুরি নৃত্যশিক্ষার জন্য একজন শিক্ষক সঙ্গে নিয়ে যাবেন। কিন্তু দেশ ছেড়ে কোনো মণিপুরি নৃত্যগুরু তখন শান্তিনিকেতনে যেতে সম্মত হননি। পরে তিনি ত্রিপুরার মহারাজা বীরেন্দ্রমাণিক্য বাহাদুরকে অনুরোধ জানিয়ে নৃত্যগুরু বুদ্ধমন্ত সিংহকে শান্তিনিকেতনে নিয়ে যান। ১৯২০ সালের ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে বুদ্ধমন্ত সিংহ শান্তিনিকেতনে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। আশ্রমের শিক্ষার্থীরা আগ্রহ নিয়ে বুদ্ধমন্ত্রের কাছে নাচ শেখেন। তখন আশ্রমের মাসিকপত্র শান্তিনিকেতন-এর ১৩২৬ সালের ফাল্গুন সংখ্যায় সংবাদ প্রচার হয়, ‘ত্রিপুরাধিপতি মহারাজ বাহাদুরের দরবার হইতে দুইজন কলাবিদ আশ্রমে আসিয়াছেন। আশ্রম বালকেরা তাঁহাদিগের নিকট হইতে মৃদঙ্গ সহযোগে সাঙ্গীতিক ব্যায়াম শিক্ষা করিতেছে।’ এ সংবাদের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়, নৃত্যশিক্ষাকে অনেকেই ভালোভাবে নেয়নি। এ জন্য নৃত্যশিক্ষাকে ‘সাঙ্গীতিক ব্যায়াম শিক্ষা’ হিসেবে প্রচার করা হয়।

বাঙালির নৃত্যকলার উন্নয়নে কবি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯২৬ সালে স্বতন্ত্র নৃত্যকলা বিভাগ চালু করেন। পরবর্তী পর্যায়ে রবীন্দ্রনাথ তাঁর চিত্রাঙ্গদা, চন্ডালিকা, মায়ার খেলা, নটীর পূজা, শাপমোচন নৃত্যনাট্যে মণিপুরি নৃত্যের স্থান দেন। মণিপুরি নৃত্যকে তিনি বিশেষ পছন্দ করতেন। তাঁর পৃষ্ঠপোষকতার জন্য মণিপুরি নৃত্যকলা আজ ধ্রুপদী নৃত্য হিসেবে পৃথিবীব্যাপী প্রচারিত হয়েছে।

রবীন্দ্রনাথ মাছিমপুর পূর্বমন্ডপে গোপীনাথ জিউরত মন্দিরেই প্রথমবারের মতো মণিপুরি নৃত্য দেখেছিলেন। এ মন্দিরে প্রতিবছর রাসলীলাসহ অন্যান্য পার্বণিক উৎসব উদযাপন করা হয়। আজও মন্দিরটি আগের মতোই রয়ে গেছে। প্রায় দেড় শ বছরের পুরোনো চারচালা টিনের ছাউনি দেওয়া একখানি সাধারণ ঘর।

এখানে কবির স্মৃতি ধরে রাখতে বাংলাদেশ মণিপুরি সমাজকল্যাণ সমিতির বর্তমান সভাপতি গোপাল সিংহ কবি রবীন্দ্রনাথের একটি ভাস্কর্য স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছেন। ইতিমধ্যে বোম্বাই থেকে আবক্ষমূর্তি তৈরি করে আনা হয়েছে। ভাস্কর্যটি স্থাপনের জন্য ২০০২ সালে রমেন্দ্র সিংহ, বরেন্দ্র সিংহ, রথীন্দ্র সিংহ, রিংকু সিংহ মন্দিরের জন্য ১ শতাংশ জমি দান করেছেন। মন্দিরের সামনে একটি ভিতও তৈরি হয়েছে। গোপাল সিংহ জানিয়েছেন, মাত্র দুই লাখ টাকার সহযোগিতা পেলে আবক্ষমূর্তিটি স্থাপন করা সম্ভব হবে। রবীন্দ্রনাথের এ স্মৃতিটুকু সংরক্ষণ করতে পারলে মাছিমপুর রবীন্দ্রভক্তদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ স্থান হতে পারে।


সুত্র: দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত শেখ মেহেদী হাসানের রিপোর্ট
আরো পড়ুন: মণিপুরী নৃত্যকলার প্রসারে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অনবদ্য ভুমিকা, রবীন্দ্রনাথের গানে মণিপুরী সুর এবং অন্যান্য প্রসংগ
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই আগস্ট, ২০০৯ দুপুর ১:১৮
৬টি মন্তব্য ৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

শিক্ষা খাতে শুরু হয়েছে তারেক রহমান ম্যাজিক

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১১:২৯


রাজনীতির মাঠে ক্ষমতার হাতবদল যেমনই হোক না কেন, সাধারণ মানুষের আসল নজর থাকে জীবনের মৌলিক জায়গাগুলোতে। আর একটি দেশের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো শিক্ষা ব্যবস্থা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এমন কেন?

লিখেছেন তাই-ফি, ০৯ ই জুন, ২০২৬ রাত ৩:৪৪

একটা গল্প দিয়ে শুরু করা যাক।

শেষ বিচারের পর নরকে শাস্তি ভোগ করছে পাপীরা। বিশাল বিশাল তেলের ড্রামে তাদের একবার ডুবিয়ে আবার ভাসিয়ে তোলা হচ্ছে। প্রতিটি ড্রামের সামনে একজন করে পাহারাদার... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×