somewherein... blog badh bhangar awaaj recent posts http://www.somewhereinblog.net http://www.somewhereinblog.net/config_bangla.htm copyright 2006 somewhere in... আপোকপা

মণিপুরি ধর্মে সর্ব্বোচ্চ গুরুত্ব পাওয়া বিষয়টি হলো আপোকপা উপাসনা। এজন্য মণিপুরীদের আদিধর্মকে অনেকে 'আপোকপা ধর্ম' হিসাবেও চিনে থাকেন। আপোকপা শব্দটি এসেছে মণিপুরি মৈতৈ ভাষার 'পোকপা' শব্দ থেকে, যার আক্ষরিক অর্থ হলো ‘যিনি জন্ম দিয়েছেন’ বা ‘যার কাছ থেকে আমি সৃস্ট হয়েছি’। আদিধর্মে স্পস্ট ভাষায় পুর্বপুরুষকে দেবতা জ্ঞানে আরাধনা করার কথা বলা হয়েছে [১]।

মানবসভ্যতার ইতিহাস থেকে আমরা জানতে পারি প্রাক-শ্রেনীসমাজে পৃথিবীর অনেক জাতির মধ্যেও পুর্বপুরুষকে দেবতা জ্ঞানে পুজা করার এই সংস্কৃতিটি (Ancestor Worship) প্রচলিত ছিল। বিষু বা বছরের শেষ দিনটিতে রাস্তায় পুর্বপুরুষের স্মরণে খাবারের ভোগ দেয়ার রীতিটির মুলে রয়েছে আপোকপা সংস্কৃতি। বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরিদের মধ্যে আপোকপা পুজা প্রায় অবশ্যকর্তব্য। গোষ্ঠি বা শিংলুপগুলো বছরে কমপক্ষে একবার হলেও আপোকপা পুজার আয়োজন করে থাকে। মণিপুরী পুরাণগুলোতে তিন ধরনের আপোকপার উল্লেখ পাওয়া যায়[২]-

ইমুঙপোকপা (Family Ancestors):
ঘরের আপোকপা। মৃত পুর্ব্বতন তিনপুরুষকে ইমুঙপোকপা বা গরর দৌ বলে ধরা হয়। সাধারনত নতুন ধান ঘরে তোলার সময় এর পুজা দেয়া হয়। পুজার উপকরন হচ্ছে চিনিমাখা খই, মুড়ি/চিড়া/তিলের তৈরী মোয়া, কলা, মিস্টিআলু, পেঁপে, কাঁঠাল ইত্যাদি।

সাগেইপোকপা (Group Ancestors):
গোষ্ঠির আপোকপা বা কুলদেবতা। কোন সাগেই/গোষ্ঠির পুর্বপুরুষকে ঐ গোষ্ঠির আপোকপা বলা হয়। গোষ্ঠিভেদে এরা ভিন্ন তাই, এক গোষ্ঠির আপোকপা পুজায় অন্য গোষ্ঠি অংশ নেয় না। সাধারনত ফাল্গুন-চৈত্র মাসে বড় পরিসরে কুলদেবতা আপোকপার পুজা হয়ে থাকে। পুজার উপকরন গোষ্ঠিভেদে নিরামিষ-ভাত, টাকিমাছ, শোলমাছ, বোয়ালমাছ ইত্যাদি।

য়েকপোকপা (Clan Ancerstor )
গোত্রের আপোকপা। মুলগোত্র বা আদিম কৌমদের ভিন্ন ভিন্ন আপোকপা রয়েছে। মণিপুরিদের সাতটি গোত্রের সাতজন ভিন্ন আপোকপা আছেন। যেমন- আঙম গোত্রের আপোকপা হলেন পুরেইরঙবা, লুয়াঙ গোত্রের আপোকপার নাম পৈরৈতন, খুমন গোত্রের থাঙগরেন ইত্যাদি [৩]। পুজার অন্যান্য উপকরন হলো ফুল, ধূপ, সরিষার দানা, চাল, চালের গুড়া, পানপাতা, সুপারি, মাটির কলস, কাপড়, তামার পয়সা ইত্যাদি।



আপোকপা উপাসনার মূল উদ্দেশ্য কেবল পুর্বপুরুষকে স্মরন নয়। এই সংস্কৃতি থেকে বুঝা যায় মনিপুরিরা আত্মার অমরত্বে বিশ্বাস করে থাকে। তাদের বিশ্বাস করে মানুষ মারা গেলে কেবল শরীরটাই ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়, তার আত্মা বেঁচে থাকে। মৃত্যুর পরেও পুর্বপুরষেরা কাছে কাছে থেকে আগের মতোই বংশধরদের প্রতিপালন ও রক্ষার দ্বায়িত্ব পালন করে চলেন। তাই দেবতা জ্ঞানে তাদেরকে উপাসনা করে তাদের সন্তুষ্টি বিধান করা সবারই দ্বায়িত্ব।



তথ্যনির্দেশ:
১. Saroj Nalini Parratt, Religion of Manipur, 1980. p 69
২. এন কুলচন্দ্র, আপোকপা থৌনিরল, ইম্ফল ১৯৩৭, পৃ ১৩
৩. T.C. Hudson, The Meitheis, Reprinted Edn 1989, p 100

আগের পর্বগুলো পড়ুন:
* মণিপুরি ধর্মের উৎস ও বিবর্তন
* বাংলাদেশের মণিপুরি সমাজ: তাদের আদিধর্ম ও ক্ষয়িষ্ণু সংস্কৃতি

পরবর্তী পর্ব: মণিপুরি মিথলজির দেবতারা]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/kungothangblog/29304162 http://www.somewhereinblog.net/blog/kungothangblog/29304162 2011-01-09 00:36:10
মণিপুরি ধর্মের উৎস ও বিবর্তন

মণিপুরি ধর্ম হলো মণিপুরিদের আদিধর্ম, মণিপুরিদের মধ্যে 'আপোকপা ধর্ম' বা 'সানামাহি ধর্ম' নামেও পরিচিত। ব্রিটিশ এবং ভারতীয় বিভিন্ন গবেষকের গবেষনা কর্মে এ ধর্মকে 'Manipuri Religion' বা 'Sanamahism' বলে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রাচীন এই ধর্মটি স্বাভাবিক ভাবেই তাদের আদিম সাম্যসমাজের সামগ্রিক জীবন-ভাবনা ও জীবনাচরনের অনুষঙ্গ হয়ে গিয়েছিল। প্রাক-শ্রেণীসমাজের সর্বপ্রানবাদের সাথে মণিপুরিদের ধর্মধারনার গভীর যোগাযোগ লক্ষ করা যায়। মণিপুরিরা প্রকৃতির বিভিন্ন প্রপঞ্চকে প্রানময় বলে বিশ্বাস করতো, এবং সে বিশ্বাস থেকেই তার প্রাকৃতিক বিভিন্ন শক্তিকে দেবতা হিসাবে কল্পনা করে তাদের উপাসনা করতো। দেবতাকে সন্তুষ্ট করার ধারনা থেকেই মণিপুরি নৃত্য, গীত, বাদ্য, মার্শাল আর্ট ইত্যাদি নানান শিল্পকলার শাখা বিকশিত হয়েছে।

অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের মতোই মণিপুরি ধর্মেরও রয়েছে অসংখ্য পবিত্র গ্রন্থ, প্রাচীন পুরাণ, শ্লোকসম্বলিত ধর্মীয় সাহিত্য। এগুলোকে বলা হয 'পুয়্যা'। প্রাচীন মণিপুরি মৈতৈ ভাষায় লিখিত পবিত্র গ্রন্থগুলোতে মহাবিশ্ব ও মহাবিশ্বের সৃষ্টি, জীবনের রহস্য, মানুষের শরীরের ভিতরে আত্মার স্বরূপ ও অস্তিত্ব, প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক বস্তু, মৃত্যূ, প্রকৃতির সাথে জীবনের সম্পর্ক ইত্যাদি বিষয়ে দার্শনিক আলোচনা করা হয়েছে। মণিপুরি ধর্মধারনায় দেবতাদের রাজা পরমপুরুষ 'আত্যিয়াকুরু শিদাবা', বা 'লাইনিঙথৌ সরাহাল'কে বিশ্বজগতের সৃস্টির মুল বলে বর্ণনা করা হয়েছে, এবং তাকে পিতৃজ্ঞানে উপাসনা করার কথা বলা হয়েছে। আর পরমনারী 'ইমা লেইমারেল সিদাবী' বা 'ইমাগিথানী'কে মানুষ থেকে শুরু করে জীবজগৎ, নদী, পাহাড়, সমুদ্র, গ্রহ, নক্ষত্রসব বিশ্বজগতের মাতা হিসাবে গন্য করা হয়েছে, এবং তাকে মাতৃজ্ঞানে আরাধনা করার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া পুয়্যাগুলোর বিশেষত্ব হলো এগুলোতে মনিপুরি মিথলজির অসংখ্য দেবদেবীর কথা, উপাখ্যান, তাদের উপাসনারীতি বা 'লেইনিং-লিচেত' আলোচনা করা হয়েছে।



প্রাচীন মনিপুরের ধর্ম-দর্শনের সাম্যবাদী দিকটি হলো মানবজাতি সম্বন্ধে এর সর্ব্বজনীন মতবাদ - সৃস্টিকর্তা নিজের প্রতিকৃতি অনুসারে মানবজাতিকে সৃস্টি করেছেন, মানুষের মধ্যে কোন ভেদাভেদ নেই কারণ প্রতিটি মানুষই সৃষ্টিকর্তার একেকটি ছায়া। মণিপুরি সমাজের আদিধর্মে আমরা দেখি ধর্ম, জীবনবোধ, বিজ্ঞান, শিল্পকলা ও নৈতিকতার ঐকত্রিক রূপ। মণিপুরিদের উৎপাদন ব্যবস্থা, জীবনের পদ্ধতিও সে প্রকল্পের সহায়ক ছিল। শ্রেনীসমাজের মতো ধার্মিক না হয়েও ধার্মিকতার ভান করা, বা ধর্মকে শোষনে বা স্বার্থ হাসিলের হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করার সুয়োগ এখানে নেই, কেননা প্রাচীন ধর্মে 'সালাই' ও 'সাগেই' ভিত্তিক যৌথ সামাজিক জীবনের বাইরে ধর্মচেতনার কোন স্থান নেই।

আধুনিক ধারনায় মণিপুরি ধর্মকে প্রাকৃত ধর্ম বলা হলেও মনিপুরি রিভাইভেলিস্টরা একে দক্ষিন-পুর্ব এশিয়ার প্রাচীনতম প্রাতিস্ঠানিক ধর্ম হিসাবে দাবী করেন। হিন্দুধর্মের শ্রেনীভিত্তিক সমাজচেতনা, আচারসর্বস্ব কাঠামো, উঠতি ব্রাহ্মনশ্রেনীর আধিপত্য ইত্যাদি কারণে বিংশ শতকের প্রথম দিকে পুরাতন ধর্মচেতনায় ফিরে যাবার জন্য রিভাইভেলিস্টদের আন্দোলন শুরু হয়। প্রাচীন ধর্ম নিয়ে গবেষনা, লেখালেখি এবং জনসংযোগ কার্যক্রম শুরু হয়। এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসাবে আঠারো শতকে হিন্দু মিশনারিদের প্ররোচনায় ধ্বংসসাধন করা ও নিষিদ্ধ ঘোষনা করা প্রাচীন ধর্মীয় পুস্তকগুলো মণিপুরের কৌব্রু, খোইবু, কোৱাথা, কাকচিং ইত্যাদি অঞ্চলের বিভিন্ন গোপন স্থান থেকে সংগ্রহ এবং পুনরুদ্ধার করার কাজ শুরু হয়। উল্লেখ্য যে ১৭৩২ খ্রীস্টাব্দের মণিপুরি মেরা মাসের ১৭ তারিখে কাংলা ফোর্টের সম্মুখে পুয়্যাগুলো পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়। মণিপুরি রিভাইভেলিস্টরা প্রতিবিছর ইতিহাসের অন্ধকারতম দিনটিকে 'পুয়্যা মেইথাবা ' দিবস হিসাবে পালন করে।

একথা সত্য যে মণিপুরিরা তাদের আদিধর্মে স্থির থাকতে পারেনি, কিন্তু এতে কোন সন্দেহ নেই যে অষ্টাদশ শতকে হিন্দুধর্মের বলয়ে আসার পুর্ব পর্যন্ত প্রাচীন ধর্মটি পুর্বপুরুষ পরম্পরায় গভীর মর্যাদার সাথে পালিত হয়ে আসছিল। হিন্দু হবার পরেও মণিপুরিদের সামাজিক বিন্যাসের বৈশিষ্ট্যগুলো অক্ষত রয়ে গেছে। মণিপুরের বাইরে এসেও পুর্বপুরুষের লকেই-সাগেই-শিংলুপ ভিত্তিক সমাজব্যবস্থা, জীবনযাত্রা, বাড়ীঘরের নমুনা, খাদ্যাভ্যাস, পরিধেয়, সামাজিক রীতি-আচার-অনুষ্ঠানের সাথে প্রাচীন ধর্মের আত্মীক সম্পর্কের সূত্রটি ছিঁড়তে পারেনি মনিপুরি মৈতৈ বা মণিপুরি বিষ্ণুপ্রিয়া কেউই। তাই রথযাত্রা, জন্মাস্টমী, রাসোৎসব, দোলযাত্রা ইত্যাদি হিন্দুধর্মীয় পর্বগুলোও পালিত হয় নিজস্ব আঙ্গিকে, আদিধর্মের আচার-কানুনের সাথে সমন্বয় ঘটিয়ে। এখনো আদিধর্মের দেবদেবীদের হিন্দুদেবদেবীদের সাথে সমান, কখনো কখনো অধিক মর্যাদার আসনে বসানো হয়। এখনো মনিপুরি মৈতৈদের একাংশ এবং মণিপুরি বিষ্ণুপ্রিয়াদের একটি ক্ষুদ্র অংশ আদিধর্মে স্থিত রয়েছে।

পরবর্তী পর্ব: আপোকপা (পুর্বপুরুষকে দেবতা জ্ঞানে আরাধনা)]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/kungothangblog/29266213 http://www.somewhereinblog.net/blog/kungothangblog/29266213 2010-11-03 16:03:08
বাংলাদেশের মণিপুরি সমাজ: তাদের আদিধর্ম ও ক্ষয়িষ্ণু সংস্কৃতি
ধর্মান্তরকরন প্রক্রিয়া ও ধর্মপ্রচারকদের চাতূর্য্য
মণিপুর রাষ্ট্রে একটি পূর্ণ বিকশিত জাতি হিসেবে গড়ে উঠেছিল মণিপুরিরা। দুই হাজার বছরেরও আগে থেকে নিজস্ব ভৌগলিক সীমানার মধ্যে রাজ্য, রাজধানী, মুদ্রাব্যবস্থা, শাসনব্যবস্থা, সৈন্য, আইন ও বিচারব্যবস্থা, সামাজিক ব্যবস্থা, ধর্ম, ভাষা, সাহিত্য, দর্শন, বর্ণমালা, লিখিত ইতিহাস ইত্যাদি নিয়ে মণিপুরি সভ্যতা গড়ে উঠেছিল। ষোড়শ শতকের দিকে ভারতীয় ধর্মপ্রচারকেরা মণিপুরে তাদের ধর্মমত প্রচার শুরু করে এবং তারা ঐ ভূখন্ডটিকে মহাভারতে বর্ণিত মণিপুর রাজ্য বলে দাবী করে। রাজনৈতিক সুবিধা, ক্ষমতার লোভ ও ব্যক্তিগত স্বার্থ সংশ্লিস্ট কারণে তারা তৎকালীন শাসকগোষ্ঠির বিপুল সমর্থন লাভ করে। এরপর অস্টাদশ শতকের দিকে শাসকগোষ্ঠি নিজেদের আদিধর্ম ত্যাগ করে বৈষ্ণবধর্ম গ্রহন করে এবং গোটা রাজ্যকে বৈষ্ণবরাজ্য হিসাবে ঘোষনা করে। নতুন ধর্মের সংষ্পর্শে মণিপুরিদের চিন্তা-চেতনায়, সংস্কৃতি, শিল্পকলা ও সামাজিক জীবনে বিপুল পরিবর্তন ঘটে। সহজিয়া বৈষ্ণব ধর্মটির ভাবনা ও দর্শনের সাথে প্রাচীন বিশ্বাসের অনেকাংশে মিল থাকায় সাধারন মানুষের কাছে নতুন ধর্মটি গ্রহনযোগ্য হয়ে উঠে।

আদিধর্মের নিদর্শন নিশ্চিহ্ন করার প্রচেষ্টা
তবে মণিপুরি আদিধর্মের একান্ত অনুসারিদের জন্য সে সময়টি ছিল ক্রান্তিকাল। ঐ সময় রাস্ট্রের উদ্যোগে প্রাচীন ধর্মের যাবতীয় গ্রন্থ, পুরাণ ও ঐতিহাসিক দলিলপত্র সংগ্রহ করে পুড়িয়ে ফেলা হয়। রাস্ট্রীয়ভাবে প্রাচীন ধর্মের আচার-অনুষ্ঠান পালনে বাধা দেয়া হয়। প্রাচীন ধর্মের যাবতীয় চিন্তা, দর্শন ও দেবদেবীর ধারনাকে হিন্দুধর্মে আত্মীকরন করা হয় এবং প্রাচীন মণিপুরি সংস্কৃতি ও শিল্পকলার সাথে ভারতীয় সংস্কৃতির সমন্বয় সাধন করা হয়। বর্ণাশ্রমভিত্তিক হিন্দুধর্মে অন্যদের অনুপ্রবেশের কোন ব্যবস্থা না থাকায় বিকল্প ব্যবস্থা হলো গোটা একটি জাতিকে 'ট্রাইবকাস্ট' হিসাবে আত্মস্থ করে নেয়া। এ ব্যবস্থায় মণিপুরিদেরকে মহাভারতে বর্ণিত অর্জ্জুনের বংশধর অভিধা দিয়ে ক্ষত্রিয় বর্ণশ্রেনীতে অন্তর্ভূক্ত করা হয়। জানা যায় ধর্মান্তর করনের সময় মণিপুরি রাজাদের মস্তকমুন্ডন করিয়ে ভারতীয় সাধুদের "খোমজুং" বা চরণামৃত (পা ধৌত করা পানি) সেবন করিয়ে প্রায়শ্চিত্ত করানো হয়।


শিক্ষিতশ্রেণীর বর্ণহিন্দু হয়ে উঠার মরিয়া প্রচেষ্টা
বৈষ্ণব ধর্ম দর্শনের সাথে পরিচয়ের ঘটনাটি খুব বেশীদিন আগের না হলেও পরবর্তী সময়ে মণিপুরিদের, বিশেষ করে মণিপুরি বিষ্ণুপ্রিয়াদের বর্ণহিন্দু শ্রেণীতে অন্তর্ভূক্ত হবার প্রানান্তক প্রচেস্টা লক্ষ করার মতো। এই এর মুল কারণটি বোধকরি একের পর এক রাজনৈতিক এবং সামাজিক বিপর্যয়ের শিকার হয়ে অস্তিত্ব বাঁচিয়ে রাখার তাগিদে হিন্দুধর্মের নিকট এই আত্মসমর্পন। বিংশ শতকের প্রথম দিকে মণিপুরি বিষ্ণুপ্রিয়াদের মধ্যে যে শিক্ষিত শ্রেণীর উদ্ভব হয় তারা প্রধান লক্ষ্যই ছিল মহাভারতের অর্জ্জুন ও চিত্রাঙ্গদার সাথে নিজেদের যুক্ত করা এবং ক্ষত্রিয় বর্ণহিন্দু হিসাবে নিজেদের জাহির করা। তারা ঐ সময়কার বৃটিশ ভারতীয় সেন্সাসে মণিপুরিদের ট্রাইব কাস্টে অন্তর্ভূক্ত করার প্রতিবাদ করে এবং নিজেদেরকে হিন্দু ক্ষত্রিয় হিসাবে অন্তর্ভূক্ত করার দাবী জানায়। কিন্তু এরপর দীর্ঘসময় অতিবাহিত হয়েছে, সেই চিন্তার তেমন হেরফের হয়নি। এখনো মহাভারতের সেই ঘোড়ার পেছনে ছুটাছুটি অব্যাহত রয়েছে। আমাদের ইতিহাসবিদ গবেষকেরা এখনো মরিয়া নিজেদের সমস্ত কিছু বৈদিক হিন্দুধর্ম এবং মহাভারতের আলোকে ব্যাখ্যা করতে।

ক্ষয়িষ্ণু সংস্কৃতি, বিপন্ন ভাষা ও অস্তিত্ব
একথা অস্বীকার করার উপায় নেই, বৈষ্ণব ধর্ম তাদেরকে আধুনিক শিক্ষা ও সভ্যতার সাথে পরিচয় ঘটিয়ে দিয়েছে, নিজেদের ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশ ব্যাপক ভুমিকা রেখেছে। কিন্তু এর ফলে নিজেদের ঐতিহ্যময় এবং বিশেষ বৈশিস্ঠ্যপুর্ণ সংস্কৃতি কৃষ্টি হারানোর প্রক্রিয়া দ্রুততর হয়েছে। নব্য হিন্দু পরিচিতির সাথে সাথে আমাদের চিন্তা-মনন, আচার আচরনে পরিবর্তন ঘটতে থাকে, আমাদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক মনোভাব গড়ে উঠতে থাকে, মন ক্রমান্বয়ে সংকীর্ন থেকে সংকীর্ণতর হয়ে উঠতে থাকে। তরুনদের একটি বড় অংশের মধ্যে নিজ ঐতিহ্যের প্রতি বিপক্ষভাব তৈরী হতে থাকে। শিক্ষিতশ্রেনীর ঘরে ঠাঁই নিচ্ছে মাতৃভাষার বদলে বাংলা। এমনিতেই সমতলের ভৌগোলিক ও সামাজিক বাস্তবতার সূত্রে আমাদের মাতৃভাষাও রয়েছে চরম সংকটের মুখে। সেইসব নৃত্য গীত কলা শিল্পে সঞ্চালক হওয়ার প্রজন্ম তৈরি হচ্ছে না, সে প্রক্রিয়াটাই প্রায় অচল। শিক্ষিত শ্রেনীর মধ্যে আগের ক্ষত্রিয় বর্ণহিন্দু হবার যুক্তিহীন আত্মগর্বের সাথে এখন যুক্ত হয় 'বাঙালি বাবু' হবার ঐকান্তিক প্রচেস্টা। ফলে বিষূ, কাঙ, কার্ত্তিকা, রাসপূর্ণিমার মতো গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় উৎসবগুলোর স্থান দখল করে নিয়েছে দুর্গাপূজাসহ নানান হিন্দুয়ানি পূজা-পার্বন। সেই সাম্যের ধর্ম-শিল্প-সংস্কৃতি-যূথ বৈচিত্র্যপূর্ণ সামাজিক কাঠামো অনেক আগেই ভেঙে গেছে। তার বদলে স্থান করছে হিন্দুবাদী ধর্মীয় চেতনা। এর সাথে অবশ্যই জড়িত রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি ও সংকীর্ণতা। রাষ্ট্র এসব জাতিসত্তার ভেতরের এ সমস্যা ও সংকট নিয়ে কখনোই চিন্তিত নয়। বরং দেখা যায়, মণিপুরিদের মৈতৈ-বিষ্ণুপ্রিয়া দুটি অন্তর্বিভাগের মধ্যে অহেতুক বিবাদকে নানান কৌশলে উস্কে দিয়ে ফায়দা আদায় করে। আর রাস্ট্র নিজেই যখন ধর্ম ও ধর্মীয় মৌলবাদকে উৎসাহিত করে, তখন তার সাথে সবাইকেই পাল্লা দিতে হয় বৈকি।

ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার দাঁতাল শুয়োরের আলিঙ্গনে কোন পুর্ণ বিকশিত জাতি কি করুণভাবে পরগাছার মতো নিতান্তই ক্ষুদ্র একটি ধর্মসম্প্রদায়ে পরিণত হতে পারে, বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরিরা তার প্রকৃস্ট উদাহরন। একজন মণিপুরি হিসাবে 'খোংজুম' বা পা-ধুয়া পানি সেবনের ঘটনাটি যতো না মর্মযাতনাময়, এ ব্যাপারটি তার থেকেও বেশী পীড়াদায়ক।

মণিপুরি বিষ্ণুপ্রিয়াদের ধর্মাচরনে আদিধর্মের প্রভাব এবং সংস্কৃতির লৌকিক উপাদানগুলো নিয়ে বৃহৎ পরিসরে কোন গবেষণা হয়নি বললেই চলে। একমাত্র ভাষাবিদ ও গবেষক ড. কালিপ্রসাদ সিংহ তার কিছু লেখায় বিভিন্ন লৌকিক দেবদেবী, প্রাচীন চিকিৎসাশাস্ত্র, রহস্যবিদ্যা , প্রাকৃতিক তত্ত্ব ইত্যাদি বিষয় নিয়ে ক্ষুদ্র পরিসরে কিছু আলোচনা করেছেন। এর আগে প্রায় চল্লিশ বছর আগে শিলচর থেকে প্রকাশিত 'পাঞ্চজন্য অর্জ্জুনি' নামক পত্রিকায় আপোকপা ধর্ম সংক্রান্ত একটি লেখা প্রকাশিত হয়েছিল। গত দশ বছর ধরে নিজস্ব তাগিদ থেকে করা পঠনপাঠন, গবেষনা ও অনুসন্ধানের ভিত্তিতে মণিপুরি বিষ্ণুপ্রিয়াদের মধ্যে আদিধর্মের প্রভাব, মিথলজির বিভিন্ন দেবদেবী ও তাদের উপাসনাপদ্ধতি, মণিপুরি ধর্মদর্শনের বিভিন্ন দিক এবং অন্যান্য ভারতীয় ধর্মদর্শনের সাথে তুলনা, বিভিন্ন লৌকিক বিশ্বাস ইত্যাদি বিষয় এই লেখায় আলোকপাত করার চেস্টা করেছি।


পরবর্তী পর্ব: মণিপুরি ধর্মের উৎস ও বিবর্তন ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/kungothangblog/29265413 http://www.somewhereinblog.net/blog/kungothangblog/29265413 2010-11-02 05:26:31
মণিপুরি বর্ষপঞ্জি সম্বন্ধে কিছু তথ্য
ইতিহাস
মণিপুর রাজ্যটির দুই হাজার বছরের পুরোনো লিখিত ইতিহাস রয়েছে। এরমধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো মণিপুরি রাজবংশের ইতিহাস 'চৈথারোল খুম্বাবা', যেখানে স্মরনাতীত কাল থেকে মণিপুরের রাজাদের কার্যক্রম এবং রাজ্যটির যাবতীয় ঘটনাবলী লিপিবদ্ধ করা। 'চৈথারোল খুম্বাবা' র ভাষ্য অনুসারে মণিপুরি বর্ষপঞ্জীর প্রচলন হয়েছিল খ্রীষ্টপূর্ব ১৩৫৯ সালে মহারাজ মারি ফামবলচা কৈকৈ (খ্রীঃপূঃ ১৩৬৯-১৩২৯) এর শাসনামলে। মনিপুরি বর্ষপঞ্জীর নাম হলো মারি-ফাম যা তাঁর নামের প্রথমাংশ। মণিপুরীরা ‘বছর’কে বলে থাকে ‘মারি’, সেটির উৎসও ঐ রাজার নাম। মারি ফামবলচা রাজ্যভার গ্রহন করেন ২৫ বছর বয়সে খ্রীষ্টপূর্ব ১৩৫৯ সালে, সেই হিসাবে খ্রীষ্টপূর্ব ১৩৫৯ অব্দ হচ্ছে মারি-ফাম ২৫ বা ০০২৫ মণিপুরাব্দ। কাজেই ২০১০ খ্রীষ্টাব্দ হলো মারিফাম ৩৩৪৪ বা ৩৩৪৪ মণিপুরাব্দ।

মণিপুরি মাস
মণিপুরী চন্দ্রবছরে মোট ১২টি মাস। মাসগুলির নাম দেয়া হয়েছে বারোটি নক্ষত্রের নাম থেকে। মণিপুরিদের মিথলজিতে এবং প্রাচীন ধর্মের পুরাণগুলোতে গ্রহ এবং নক্ষত্রগুলোকে দেবতার সম্মান দেয়া হয়েছে। প্রতি মাসে দিনের সংখ্যা ত্রিশ। বারোটি মাসের নাম হচ্ছে -

১. শাজিবু (এপ্রিল-মে)
২. কালেন (মে-জুন)
৩. ইঙা (জুন-জুলাই)
৪. ইঙেন (জুলাই -আগষ্ট)
৫. থওয়ান (আগষ্ট-সেপ্টেম্বর)
৬. লাংবন (সেপ্টেম্বর - অক্টোবর)
৭. মেরা (অক্টোবর-নভেম্বর)
৮. হিয়াঙ্গৈ (নভেম্বর-ডিসেম্বর)
৯. পোইনু (ডিসেম্বর-জানুয়ারি)
১০. ওয়াকচিং (জানুয়ারি -ফেব্রুয়ারি)
১১. ফাইরেল (ফেব্রুয়ারি -মার্চ)
১২. লমতা (মার্চ-এপ্রিল)

মণিপুরি সাতবারের নাম
মণিপুরি বর্ষপঞ্জি অন্যান্য সনের মতোই সপ্তাহে সাত দিনকে গ্রহণ করেছে এবং নামকরন অন্যান্য সনের মতোই গ্রহ ও তারকামন্ডলীর উপর ভিত্তি করেই করা মণিপুরি মৈতৈ ভাষায়। নামগুলো মণিপুরি বিষ্ণুপ্রিয়া ভাষায় এসে কিছুটা বিবর্তিত হয়েছে। সাতটি বার [মৈতৈ>বিষ্ণুপ্রিয়া (উৎস) এই ফরমেটে] হচ্ছে -

১. নঙমাইজিং > লাইমংসিং (সুর্যের নাম অনুসারে )
২. নিঙথৌকাবা > নিংথৌকাপা (চন্দ্রের নাম অনুসারে )
৩. লৈপাকপোকপা > লৈপাপোকপা (মঙ্গল গ্রহের নাম অনুসারে )
৪. য়ামসাকেইসা > ইমসাইসনা (বুধ গ্রহের নাম অনুসারে )
৫. সাগলসেন > সাঙনসেন (বৃহস্পতি গ্রহের নাম অনুসারে )
৬. ইরাই > ইরেই (শুক্র গ্রহের নাম অনুসারে )
৭. থামজা > থাঙচা (শনি গ্রহের নাম অনুসারে )

মণিপুরি মিথলজিতে এই সাতটি তারকার সাথে সাতজন লাইরেম্বী বা নারীদেবতার বিবাহের কথা পাওয়া যায়। এই সাতজন নারীদেবতা মণিপুরীদের সাতটি গোষ্ঠীর উপাস্য এবং তারা গোষ্ঠিগুলোকে প্রতিনিধিত্ব করে থাকেন। যেমন লুয়াঙ গোষ্ঠীর দেবী থৈনু হচ্ছেন মঙ্গলের স্ত্রী, খুমন গোষ্ঠির দেবী তনথাঙনু বুধের স্ত্রী ইত্যাদি। এছাড়া মিথলজি অনুসারে সুর্য ও চন্দ্র বাদে অন্য তারকাগুলোর মুখগুলো নানান জীবজন্তুর আকৃতি পরিগ্রহ করেছে। যেমন, মঙ্গলের মাথা হলো মহিষের মতো, বুধের হাতির মতো , বৃহস্পতির হরিণের মতো ইত্যাদি।

আজ ৭ অক্টোবর ২০১০, বৃহস্পতিবার মণিপুরি বর্ষপঞ্জির হিসাবে ৩০ লাংবন, ৩৩৪৪ মারি-ফাম, সাগলসেন


তথ্যসূত্র:
১. মুতাম ঝুলন সিংহ, ‘মণিপুর ইতিহাস’, ইম্ফাল ১৯৪৭, পৃষ্ঠা ৬
২. http://imarthar.blogspot.com
৩. Click This Link
৪. Click This Link
৫. Saroj Nalini Parratt,‘The Religion of Manipur’, 1980, page 35
৬. মঙ্গলবাবু সিংহ,‘বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষাতত্তর সমীক্ষা’ (৩য় খন্ড), পৃষ্ঠা ৮৯
৭. ড. কালীপ্রসাদ সিংহ, ‘প্রবন্ধমালা’ (১ম খন্ড), ১৯৮৩, পৃষ্ঠা ৩৫
৮. Cheitharol Kumbaba edited by L. Ibungohal Singh and N. Khelachandra Singh, Imphal, 1967 page 2, 45, 176, 178


মণিপুরি বর্ষপঞ্জির ডাউনলোড করতে পারেন এখান থেকে। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/kungothangblog/29250722 http://www.somewhereinblog.net/blog/kungothangblog/29250722 2010-10-07 04:31:13
শব্দকরদের বাঁচাতে এগিয়ে আসুন
শব্দকরেরা ভারতবর্ষের কুল, ভীল, সাঁওতাল, শবর, মুন্ডা ইত্যাদির মতোই একটি প্রাচীন অনার্য জনগোষ্ঠি যারা বৈদিক বর্ণাশ্রম ধর্মের শিকার হয়ে যুগে যুগে সভ্য সমাজের হাতে নিগৃহীত হয়ে আসছে। বর্তমানে তারা সনাতন হিন্দু সম্প্রদায়ের শরীক হলেও বৃহত্তর হিন্দু সমাজের কাছে তারা অচ্ছ্যুত এবং অস্পৃশ্য হিসাবে গন্য। বাঙালি বর্ণহিন্দুরা ডুকলাদের হাতে জল খায় না, নিজেদের চেয়ারে বা বিছানায় ডুকলাদের বসতে দেয় না, শব্দকরেরা বাঙালিদের সাথে বড়জোড় প্লে­ট ছাড়া বিশেষ কাপে চা খেতে পারে। দোকানে বা অন্য কোথাও সবার সাথে বসে কোনো কিছু খাওয়া বারণ, এমনকি ধর্মীয় বা সামাজিক উৎসবগুলোতেও। তাদের সাথে একঘরে ঘুমালে, একসাথে উঠলে বসলে, একসাথে খেলে, হাতের রান্না বা জল খেলে বাঙালি বর্ণহিন্দুর নাকি জাত চলে যায়!

শব্দকরদের সমৃদ্ধ ও বৈচিত্রপুর্ণ অতিপ্রাচীন সাংস্কৃতির উপাদান রয়েছে। এমনিতে তাদের সংস্কৃতি ভোগপ্রবল। তারা অদৃস্টবিশ্বাস প্রবল এবং প্রতিদিনের দুঃখ ও কষ্ট থেকে মুক্ত হতে না পারলেও তারা গান-বাজনায় মত্ত থাকে। তাদের উপাস্য দেবতা হচ্ছে শিব বা মহাদেব। তারা বাদ্য বাজিয়ে শিবের গান, রাজার গান গেয়ে থাকে। ঢোল, ঢাক, করতাল, বাঁশি এগুলো তাদের জীবনের অংশ। চড়কপুজা ও গাঁজন উৎসব তাদের প্রধান উৎসব। বছরের শেষে চড়কপুজা হয়ে থাকে। শরীরের পেছনের অংশে বিশালাকার বরশি গেঁথে চড়কিতে ঘুরা তাদের কাছে পূণ্যের অংশ, অন্য সমাজের কাছে যা চিত্তবিনোদন। চড়কপূজা প্রক্রিয়ার সাথে নানান গান ও নাচ জড়িত। এ জাতীয় একটি গানের অংশ -

ও শিব আওরে জগত জটা
জগত জটারে শিব পাগলা বেটা
শিব আইলা সিনান করি
গেরি দিলা সিদ্ধি ভারি

ও মাই ও মাই ও মাইগো
অউনি গৌরির জামাইগো

খাইয়া ভাঙের গুড়া
গৌর করিয়া চায়
তারে দেখি উমার মা
উল্টা পাকে ঘরে যায়
খাওয়ায় বেনি কামাই গো
লেমটা বেটা, জগত জটা।

এছাড়াও আছে আগুনে হাঁটার গান, গাঁজার গান, জামাইষষ্ঠীর গান, ভাইফোঁটার গান, বিয়ের গান, তিননাথের গান, কালীনাচের গান ইত্যাদি। সবগুলো গানই তাদের জীবন ও জীবিকার সাথে সম্পর্কিত।

শব্দকর সমাজের ছেলেমেয়েরা বরাবরই নানান দৃশ্য ও অদৃশ্য বাধার সম্মুখীন হয়ে, বৃহৎ সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ও অবহেলিত হয়ে হীনমন্যতাবোধে নিয়ে বড় হতে থাকে। বেশীর ভাগ শিশুই প্রাথমিক বিদ্যালয় শেষ করতে পারেনা। বয়স্করা এখনো ১০০ পর্যন্ত গুনতে পারেনা। শব্দকর সমাজ আজন্ম দারিদ্রকে নিয়তি বলে মেনে নিয়েছে। তাদের পিতামাতা ও সন্তানদের চোখে কোন স্বপ্ন নেই। সবাই অবধারিত ধরে নেয় মা-বাবারা যেভাবে নিদারুন দারিদ্র ও হতাশার মধ্যে জীবন কাটায়, তারাও সেভাবে জীবন কাটাবে। একটা অদ্ভুত সত্য এদের বিশ্বাসে গেঁথে থাকে যে, তাদের এই দুর্দশার জন্য বিশেষ কোন দেবতার অভিশাপ দায়ী, অথবা ঈশ্বর নিজেই চান না তারা ভাল থাকুক। রাস্ট্রে জনসংখ্যা দমন যখন একটা প্রধান সমস্যা, তখন শব্দকরদের জন্মের চেয়ে মৃত্যুহারই বেশী।

১৯০৫ সালে বি.সি. এলেন সম্পাদিত Assam District Gazeteers -এর সিলেট খন্ডে শব্দকরদের জনসংখ্যার হিসেব দেয়া হয়েছিল ১০,১০৩ জন। অধ্যক্ষ রসময় মোহান্তের লেখা একটি সমীক্ষা গ্রন্থ থেকে জানা যায় মৌলবীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলায় ১৯৯৫ সালে শব্দকরদের জনসংখ্যা ছিল সর্বমোট ৪,০৭৩ জন। এদের মধ্যে ২০৭৭ জন পুরুষ এবং ১৯৯৬ জন মহিলা। মোট পরিবার সংখ্যা ৯০০ এবং গ্রামসংখ্যা ৩৫। বিদ্যালয়গামী ছাত্রসংখ্যা ৩০৯, বাল্যবিবাহ ৩৪৩টি এবং বসতভিটা সাকুল্যে তাদের জমির হিসাব সর্বমোট ১০১৮৬ শতক যার মধ্যে উৎপাদনশীল জমি প্রায় শুন্যের কোঠায়।

এতটা মুল্যহীন, স্বপ্নহীন ও সম্পদহীন হয়ে কোন জনগোষ্ঠীর বেঁচে থাকা কি সম্ভব?

আমাদের রাষ্ট্রের বড় বড় নথিপত্রে বাঙালিভিন্ন অন্য সকল জাতির কোন তথ্য নেই। কে কোথায় বাঁচলো বা মরলো তা নিয়ে রাষ্ট্রের কোন মাথাব্যাথা নেই; রাষ্ট্র ও তার সুবিধাভোগী মানুষজন ব্যস্ত আইনের প্যাঁচে ফেলে বিপন্নপ্রায় মানুষের ভূমি আর পাহাড়ের দখল নিয়ে। সেটা যদি ১০০ কিম্বা ১০০০ লাশের বিনিময়ে হয় তাও সমস্যা নেই। শব্দকরদের খবরও সেভাবেই রাষ্ট্র রাখেনা, রাখার দরকারও মনে করে না কোন কালে। অবহেলা ও বৈষম্যের এ ধারা অব্যাহত থাকে, আর নিজভুমে পরবাসী ডুকলারা হারাতে থাকে নিজেদের অস্তিত্ব, জীবন, জীবিকা, সংস্কৃতি, গানবাজনা, ঢোল, বাদ্য সবকিছু। নিশ্চিহ্ন হতে থাকে মানুষ আর মানুষের জনপদ, মানুষেরই দাপটে!

মুলসূত্র:
১. প্রাবন্ধিক ও গবেষক আহমদ সিরাজের লেখা 'শব্দকর একটি চরমবিপন্ন জনগোষ্ঠি'। মণিপুরী থিয়েটারের পত্রিকা, ৭ম সংখ্যা।
২. পাভেল পার্থের লেখা 'ডুকলাদের সকল ঢোল বেজে ওঠুক বর্ণদাপটের বিরুদ্ধে'। মৃত্তিকা, ২য় সংখ্যা।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/kungothangblog/29198357 http://www.somewhereinblog.net/blog/kungothangblog/29198357 2010-07-13 01:27:42
ভুমির মালিকানা, স্বাধীন গারো রাজ্য এবং আধিপত্যবাদের কাছে গারোদের আদিম সাম্যবাদী সমাজের পতন
কিরাত জনগোষ্ঠির অন্তর্গত মান্দিরা এই সেদিন পর্যন্ত জুম চাষ করেই জীবিকা নির্বাহ করতো। জুম চাষের যৌথ কৃষিপদ্ধতি আদিম সাম্যবাদী সমাজের অংশ। জমিতে তাদের কোন ব্যক্তিমালিকানা ছিলনা, একটি এলাকার সব জমিতেই ছিল সমগ্র গোত্রের যৌথ অধিকার। এই ধারনায় যে বনভূমি প্রকৃতির অংশ, তার কোন মালিকানা হয় না। প্রাকৃতিক বনভূমিকে যৌথ প্রয়াসে বাসভূমি ও চাষভূমিতে পরিণত করে গারোরা তার উপর সকলে সমান অধিকার বিস্তার করতো। জুম চাষের সরল উৎপাদন প্রথায় ভোগ ও বন্টনও সাম্যভিত্তিক। এখানে ব্যক্তিকে ছাপিয়ে যৌথ চেতনাই প্রবল হয়ে উঠে; পরস্পরের প্রতি সাহায্য সহযোগিতা ছিল একেবারেই ব্যক্তিস্বার্থ বিবর্জিত। গারোদের সেই স্বয়ংসম্পূর্ণ সমাজব্যবস্থা আজ আর নেই, কিন্তু ব্যক্তিস্বার্থ ভিত্তিক সমৃদ্ধ শ্রেণীসমাজেও তারা উত্তরিত হয়নি। সেই যৌথ চেতনা আজো বিলুপ্ত হয়ে যায়নি, এখনো খেতখামার বা গেরস্তালি কাজে কিংবা ঘরদোর তৈরীতে তারা বিনা পারিশ্রমিকে পরস্পরকে সাহায্য করে থাকে, নির্বান্ধব বা নিঃসহায় মানুষকে সকলে মিলে তারা বাঁচতে ও বাড়তে দেয়। এ সমাজে ব্যক্তিচেতনা যৌথচেতনাকে গ্রাস করেনি। একজন গারো ব্যক্তিগতভাবে নিজেকে স্বতন্ত্র ব্যক্তিসত্তার অধিকারী দাবী করতে পারেনা। পিতা, পুত্র, মাতা, কন্যা, স্বামী, স্ত্রী বা আত্মীয় হিসাবে সে সবসময় সমাজের নিকট দায়বদ্ধ। গারোদের আদিধর্ম 'সাংসারেক' বা 'দাকবেওয়াল' কঠোরভাবে এই যৌথচেতনার অনুষঙ্গী।



গারোদের সহজ জীবনব্যবস্থায় বাইরের কারো সাথে দ্বন্দের কোন সুযোগ নেই, কিন্তু আমরা যাদের সভ্যসমাজের মানুষ বলি তারা এদের নিরুপদ্রবে থাকতে দেয়নি। তাদের লোলুপ দৃষ্টি গারোদের বাসভূমি ও চাষভূমির উপর পড়েছে, হামলা চালিয়ে তারা নানান সময়ে তাদের বাস্তুচ্যুত করেছে, জীবিকা বিপর্যস্ত করেছে, জীবনের ছন্দ ব্যহত করেছে। গারোরা এই হামলাকারীদের রুখে দাঁড়িয়েছে ঠিকই, কিন্তু আদিম সাম্যসমাজসুলভ সারল্য দিয়ে শ্রেণীসমাজের কুটকৌশলতে তারা পরাস্ত করতে পারেনি। সেই ত্রয়োদশ-চতুর্দশ শতাব্দিতেই গারো পাহাড়ের পাদদেশে বিরাট ভুভাগ দখল করে নেয় উত্তর ভারত থেকে আসা শ্রেণীসমাজের প্রতিভুরা।

এরপর ইংরেজ শাসনামলে যখন শোষনসহযোগী জমিদার গোষ্ঠীর উত্থান ঘটে, তখন গারোরা খুব সহজেই তাদের শিকারে পরিণত হয়। সুসং ও শেরপুরর জমিদাররদের সাথে শোষকের ভুমিকায় অবতীর্ণ হয় মহাজন শ্রেণী। সরলতার সুযোগে জুমের ধান ও তুলা তারা স্বল্প তেল ও লবনের বিনিময়ে হাতিয়ে নিত। আর জমিদাররা ভুমি ও পণ্যের উপর উচ্চহারে কর চাপিয়ে গারোদের মালামাল ছিনিয়ে নিত আর তাদের নিগৃহীত করতো । সভ্যদের ধূর্ততা ও বিদেশী উপনিবেশবাদীদের সম্মিলিত উৎপীড়ন চরমে উঠলে গারোরা সংঘবদ্ধ হয়ে যুদ্ধ ঘোষনা করতে বাধ্য হয়। উৎপীড়ন ও নিগ্রহের প্রতিশোধ নিতে গারোরা দলবদ্ধ হয়ে সমতলভুমিতে পাল্টা হামলা চালাতে থাকে। এর ফলে অনিবার্যভাবেই সভ্যসমাজের পন্ডিতদের কাছে গারোরা নৃশংস এবং 'নৃমুন্ড-শিকারী' হিসাবে পরিগনিত হয়।

আমরা জানি আদিম সাম্যসমাজের ধারনায় ভূমি প্রকৃতির অংশ হিসেবে বিবেচিত এবং ভূমির উপর ব্যক্তির মালিকানা থাকেনা। কাজেই এদের মধ্যে জমিদার ও প্রজার ভেদ ছিলনা, খাজনা বা করের কথা এই ধারনার সাথে মেলেনা। যখন যৌথ ভূমিমালিকানার উপর আঘাত আসলো,স্বাভাবিকভাবেই গারোদের কাছ থেকে তার প্রত্যাঘাত এলো। যৌথচেতনার আদিধর্ম 'দাকবেওয়াল' সেই প্রত্যাঘাতের শক্তি যোগালো। এরমধ্যে করমশাহ নামে এক ফকিরের পাগলপন্থা মতবাদের প্রতি গারোরা আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। করমশাহ সুসং পরগনায় এসেছিলেন ১৭৭৫ সালে।পাগলপন্থা মতবাদের মুলকথা ছিলো - সকল মানুষ আল্লাহর বান্দা, আল্লার জমিনের মালিক কোন জমিদার বা রাজা হতে পারেন না, কেউ কারো অধীন নয় ইত্যাদি। স্বাভাবিকভাবেই গারোরা এর প্রতি আকৃস্ট এবং হলো শত্রুর মোকাবেলা করতে পাগলপন্থা সংগঠনে সমবেত হতে লাগলো। ১৮১৫ সালে করমশাহর মৃত্যু হলে তার পুত্র টিপু পাগলপন্থীদের নেতৃত্ব দেন এবং গারোদের মধ্যে ধর্মীয় আলোড়ন তুলেন।

১৮২৫ সালে করভারে জর্জরিত গারোরা জমিদারের খাজনা প্রদান বন্ধ করে দেয়। এর ফলে জমিদারগোষ্ঠীর সাথে গারোদের সশস্ত্র যুদ্ধ হয়, সেই যুদ্ধে জমিদারগোস্ঠী পরাজিত হয়ে পালিয়ে কোনরকমে আত্মরক্ষা করে। সাতশত গারো বিদ্রোহী শেরপুর শহর অধিকার করে এবং সেখানে একটি স্বাধীন গারো রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে। এরপর পরবর্তী দুই বছর গারোরা ইংরেজ বাহিনীকে লড়াই করে দমিয়ে রাখে। ১৮২৭ সালে টিপু ইংরেজদের হাতে বন্দী হন এবং মারা যান। টিপুর মৃত্যুর পর ১৮৩৩ সালে দ্বিতীয় পাগলপন্থী বিদ্রোহ হয়। সেই বিদ্রোহ ব্যর্থ হলে ১৮৩৭ থেকে ১৮৮২ সাল পর্যন্ত অনেকগুলো বিদ্রোহ পরিচালিত হয়। চরম ধূর্ততা ও নৃশংশতায় এসব বিদ্রোহ দমিত হয়। এরপরথেকেই গারোদের যৌথসমাজ ছিন্নভিন্ন হতে থাকে। বিপ্লবী আদিধর্মের বিকাশ রুদ্ধ হয়ে যায়, আর এ সুযোগে খৃস্টান মিশনগুলোর তৎপরতায় গারোরা বিপুলভাবে ধর্মান্তরিত হতে থাকে। কিন্তু তাতে শ্রেণীসমাজের মনোভাবের কোন পরিবর্তন ঘটেনি। ইংরেজরা নানান পন্থায় শোষন করে তাদেরকে সর্বহারা শ্রেণীতে পরিনত করে। ইংরেজরা চলে গেলে শোষন শেষ হয়না, কেবল শাসকশ্রেনীর পরিবর্তন ঘটে। রাস্ট্র আর রাস্ট্রের অধিপতি সভ্যলোকেরা পরবর্তী সময়ে সাফল্যের সাথে ভূমিদখল, উচ্ছেদ, নিপীড়ন ও অত্যাচার চালিয়ে তাদের জীবনিশক্তি শোষন করে নিজেদের চিকনাই বাড়িয়ে চলে। আজো সে প্রক্রিয়ার অবসান হয়নি। এখন বরং প্রতিকুলতা এতোখানি বেড়েছে যে, গারোসহ এদেশের সকল আদিবাসী জনগোষ্ঠির সামনে কোন স্বপ্ন নেই।

১৮২৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল গারোদের যে স্বাধীন রাজ্যটি, সেটি যদি টিকে থাকতে পারতো, যদি শেরপুরের সীমা ছাড়িয়ে সেই স্বাধীন রাজ্যের সম্প্রসারন ঘটতো গারোজন অধ্যুষিত জনপদে, যদি স্বাধীন গারোরা উৎপাদন পদ্ধতির বিকাশ ঘটিয়েও বহাল রাখতে পারতো আদিম সাম্যসমাজটি, তাহলে কি রাস্ট্রের ভুগোল একইরকম থাকতো? তাহলে কি তাদেরকে শাসক ও অধিপতি জনদের পদদলিত হয়ে, করুনার পাত্র হয়ে কাটাতে হতো এই দুর্বিসহ নিজভূমে পরবাস জীবন?



তথ্যসূত্র:
১. যতীন সরকার - বাংলাদেশের গারো সমাজ: আদিধর্ম ও বর্তমান ধর্ম
২. সুভাষ জেংচাম - গারো উপজাতি: তাদের সামাজিক লোকধর্ম
৩. Major A. Plafair - The Garos, 1891
৪. সুপ্রকাশ রায় - ভারতের কৃষকবিদ্রোহ ও গনতান্ত্রিক সংগ্রাম, ১৯৭২
৫. বিধি পিটার দাংগ সম্পাদিত স্মরনিকা, বিরিশিরি ১৯৮৫]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/kungothangblog/29161484 http://www.somewhereinblog.net/blog/kungothangblog/29161484 2010-05-24 00:14:20
কয়েকটি মজার ছবি ও একটি কৌতুক (১৮+)
































ছবি তো দেখলেন এবার কৌতুক শুনেনঃ
রাঙামাটির পুলিশ সুপার মাসুদুল হাসান বিবিসিকে বলেন, "আমি ঘটনাস্থলে ছিলাম না। যতটুকু জানতে পেরেছি সেনাবাহিনী এবং পাহাড়িদের মধ্যে গোলাগুলি হয়েছে।" কোন পরিস্থিতিতে সেনা সদস্যরা গুলি করতে বাধ্য হয়েছে- প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, "নিশ্চয় দরকার ছিল বলে গুলি করা হয়েছে। ওই খানে ঘরবাড়ি যেহেতু পোড়া যাচ্ছিল এটা নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্যই গুলি করা হয়েছে।" অর্থ্যাৎ ভিক্টিম, মানে যাদের ঘরবাড়ি পুড়ে যাচ্ছিল, তাদেরকে উদ্দেশ্য করে গুলী ছোঁড়া হচ্ছিল! একেই বলে বাঘের বাচ্চা!!


কয়েকটি হাস্যকর লিংকঃ
* স্বজন হারিয়ে দিশেহারা আদিবাসীরা, দিন কাটছে অনাহারে
* বাঘাইছড়িতে আরেকটি লাশ উদ্ধার
* 32 houses torched in Rangamati clash
* Trouble flares in hills again
* Bangladesh military attacks Indigenous Jumma People
* সেনাবাহিনীর গুলিতে ৫ পাহাড়ি নিহত
* পাহাড়ে সেনা অবস্থান জরুরি: বিএনপি
* পাহাড় থেকে সেনা প্রত্যাহার করে ভুল করেছে সরকার : বিএনপি


কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ এসপি চাকমা জেনন
ছবিঃ ফেসবুক ও ফ্লিকার থেকে]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/kungothangblog/29103608 http://www.somewhereinblog.net/blog/kungothangblog/29103608 2010-02-23 01:34:45
ধর্মান্তরিত আদিবাসীরা ভালো নেই
জাতীয় আদিবাসী পরিষদ ও আদিবাসী উন্নয়ন সংস্থার হিসাবে, দেশের প্রায় ৩০ লাখ আদিবাসীর অর্ধেকের বাস উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলায়। জাতীয় আদিবাসী পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রবীন্দ্রনাথ সরেন ও আদিবাসী উন্নয়ন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ভাগবত টুডু জানান, উত্তরাঞ্চলের ১৫ লাখ আদিবাসীর মধ্যে ছয় লাখেরও বেশি এরই মধ্যে ধর্মান্তরিত হয়েছে। এ অঞ্চলের আড়াই লাখ সাঁওতালের মধ্যে দুই লাখই তাদের নিজ ধর্ম 'সর্বপ্রাণবাদ' ছেড়ে খ্রিস্টান হয়েছে। এদের মধ্যে অতিদরিদ্র সাঁওতালদের সংখ্যাই বেশি। ধর্মান্তরিত অন্য আদিবাসীদের মধ্যে রয়েছে ওঁরাও, মাহালি, মুণ্ডা, মালপাহাড়ি, মালো, কোচ, পালিয়া ও রাজবংশী। রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জ আঞ্চলিক ব্যাপ্টিস্ট চার্চ সংঘের পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত রেভারেন জোনা মুর্মু জানান, ধর্মান্তরে ইচ্ছুকদের প্রথমে সাদা কাগজে আবেদন করে পরে আদালতে এফিডেভিটের মাধ্যমে খ্রিস্ট ধর্মে দীক্ষিত হতে হয়।

'কোনো প্রলোভন দেখানো হয় না'
রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জ আঞ্চলিক ব্যাপ্টিস্ট চার্চ সংঘের পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত রেভারেন জোনা মুর্মু জানান, তানোর উপজেলায় ধর্ম প্রচার ও পালনের জন্য ২১টি গির্জা রয়েছে। এগুলোর আওতায় বিভিন্ন ধর্ম থেকে এরই মধ্যে এক হাজার ৩০০ ব্যক্তি খ্রিস্ট ধর্ম গ্রহণ করেছে। এটি কোনো বিদেশি নয়, দেশি মিশন। তিনি জানান, ধর্মান্তরে ইচ্ছুকরা প্রথমে সাদা কাগজে আবেদন করেন এবং পরবর্তী সময়ে আদালতে এফিডেভিটের মাধ্যমে তাঁদের খ্রিস্ট ধর্মে দীক্ষিত হতে হয়। রাজশাহীর তানোর উপজেলার মণ্ডুমালার রোমান ক্যাথলিক সাধু জন মেরি ভিয়ান্নি গির্জার ফাদার নির্মল কস্তা দাবি করেন, আদিবাসীদের খ্রিস্ট ধর্ম গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করতে তাঁরা কোনো প্রলোভন দেখান না।



আদিবাসীদের ভিন্ন কথা
কিন্তু আদিবাসীদের মুখে শোনা গেছে ভিন্ন কথা। তানোর উপজেলার পাঁচন্দর ইউনিয়নের কচুয়া গ্রামের নরেশ মুর্মু অভিযোগ করে বলেন, 'ফেলোশিপ চার্চের মিশনারিদের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আর্থিকসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার আশায় পাঁচ বছর আগে আদি সাঁওতাল থেকে আমি খ্রিস্ট ধর্ম গ্রহণ করি। ওই সময় মিশনারিরা আমার ছেলেমেয়েদের বিনা খরচে লেখাপড়ার সুযোগ দেওয়ার কথা বললেও এখন এ খাতে আমাদেরই মোটা অঙ্কের অর্থ ব্যয় হয়। তাঁদের কথামতো ধর্মাচার পালন ও ছেলেমেয়ের বিয়ে দিতে হচ্ছে। চার্চের ধর্ম প্রচারকরা আমাদের সাঁওতালি আদি প্রথা ঢোল, মাদল বাজানো ও সাঁওতালি ভাষায় গান করা নিষেধ করে দিয়েছেন। এমনকি প্রতিবেশী আদিবাসীদের সঙ্গে মেশামিশিতে সতর্ক করে দিচ্ছেন।'

জাতীয় আদিবাসী পরিষদের সভাপতি খ্রিস্ট ধর্মে দীক্ষিত অনিল মারাণ্ডি অনুতাপের সুরে বলেন, 'না বুঝে ও লোভে পড়ে বাপ-দাদার আদি ধর্ম ত্যাগ করে বড় ভুল করেছি। এখন প্রতি মুহূর্তেই অনুশোচনা বোধ করি। আদি ধর্ম ও সত্তা বিলীন হওয়ায় আমার মতো অনেকেই আজ মানসিক যন্ত্রণায় ভুগছে।' তিনি আদি ধর্ম ও সংস্কৃতিতে ফিরে আসার চেষ্টা করছেন বলেও জানান।

একই গ্রামের আদিবাসী গ্রামপ্রধান রমেশ হাসদা ও দুরবিন কিসকু বলেন, আদিবাসী সাঁওতালরা খ্রিস্ট ধর্ম গ্রহণ করলেও তারা প্রাচীন ধর্মাচার, চিরায়ত প্রথা-উৎসবের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ বাদ্য, বাঁশি, মাদল, তীর-ধনুক, সরাই, দুল বাজাতে চায়। কিন্তু তা নিষেধ করা হচ্ছে বলে শুনেছি। রমেশ হাসদা বলেন, আদিবাসী সমাজে শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য প্রতি গ্রামে সাত সদস্যের একটি করে পরিচালনা কমিটি (বিচারিক) থাকলেও এর বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন মিশনারিরা। এমনকি নতুন খ্রিস্টানদের আদিবাসী কমিটির বিচার অমান্য করতেও বলা হচ্ছে। এটা আদিবাসীরা মেনে নিতে পারছে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ধর্ম ও সংস্কৃতি নিয়ে নব্য খ্রিস্টানদের সঙ্গে আদিবাসীদের দূরত্ব না কমলে সংঘাতের আশঙ্কা আছে। এরই মধ্যে খ্রিস্টান ও আদিবাসীদের মধ্যে শ্রেণীগত বৈষম্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
নওগাঁ জেলার মহাদেবপুর উপজেলার আদিবাসী সুফল হাসদা ও জয়পুরহাটের পাঁচবিবির কামিনী মুর্মু বলেন, 'খ্রিস্টান হলে প্রতি মাসে ৫০০ থেকে দুই হাজার টাকা পর্যন্ত পাওয়ার আশায় এ অঞ্চলের আদিবাসীরা ধর্মান্তরিত হয়েছে। তবে প্রথম দুই-এক মাসে কিছু অর্থ পাওয়া গেলেও এখন কিছুই না পাওয়ায় আমরা হতাশ। অনেকেই এখন প্রাচীন ধর্মে ফিরতে আগ্রহী হয়ে উঠছে।'

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, উত্তরাঞ্চলের দিনাজপুর জেলায় ১৮৮০ সালে ব্যাপ্টিস্ট মিশনের কাজ প্রথম শুরু হয়। এ মিশনের প্রধান জেন এন দত্ত ১৯০৭ সালে প্রথম চেষ্টায় ২৩ জন সাঁওতালকে খ্রিস্টান ধর্মে দীক্ষিত করেন। এরপর থেকে এ প্রক্রিয়া চলে আসছে।


বিস্তারিত পড়ুন: দৈনিক কালের কন্ঠের প্রতিবেদন
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/kungothangblog/29082767 http://www.somewhereinblog.net/blog/kungothangblog/29082767 2010-01-21 10:26:24
বীরগাঁথা ৭১ : বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে অবদান রাখা কয়েকজন বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী মুক্তিযোদ্ধা, সংগঠক ও সংস্কৃতিকর্মী কৃষক আন্দোলন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ উভয় সংগ্রামে সক্রিয়ভাবে ভুমিকা রেখেছিল সিলেটের একটি ক্ষুদ্র জাতিসত্তা বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী সম্প্রদায়। সংখ্যাতাত্ত্বিক বিচারে তাদের ত্যাগ, তিতীক্ষা ও অবদানের কথা ক্ষুদ্র হলেও বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচনায় তাদের কথা বিবেচনায় আনা প্রয়োজন - যদিও মুক্তিযুদ্ধে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরীসহ দেশের ক্ষুদ্র-ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীগুলোর অসামান্য ভূমিকা ও অংশগ্রহনের কথা রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রের প্রচারযন্ত্রে আজো উপেক্ষিত।

পাকিস্তান আমলে রাষ্ট্রযন্ত্র কর্তৃক সীমাহীন অবহেলা, উপেক্ষা, বঞ্চনা ও নিপীড়ন মণিপুরীদের চরম অস্তিত্বসংকটে ফেলে দেয়। এর সাথে যোগ হয়েছিল দেশমাতৃকার টান এবং অন্যায় আর শোষনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর চিরন্তন মণিপুরী ঐতিহ্য। স্কুলে পড়া তরুণ থেকে শুরু করে ক্ষেতে খামারে কাজ করা অশিক্ষিত মণিপুরী কৃষক হাতে তুলে নেয় অস্ত্র। কেউ নেয় সংগঠকের ভূমিকা। কেউ সীমান্তে বাস্তুহারা মানুষ পারাপারের কাজে নিজেকে নিয়োজিত করে। সম্ভ্রম বাঁচাতে দীর্ঘ নয়মাস মণিপুরী নারীকে গ্রাম থেকে গ্রামে পালিয়ে বেড়াতে হয়। মণিপুরী বৃদ্ধা মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয়দান ও সহযোগিতা করে। মণিপুরী গৃহবধু আহত মুক্তিযোদ্ধার সেবা শুশ্রুষার দ্বায়িত্ব নেয়। যারা সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে জড়িত, তারা সীমান্তের ওপারের আসাম ত্রিপুরা হাইলাকান্দি আগরতলায় গান গেয়ে নেচে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য তহবিল সংগ্রহে নামে। এরা সবাই নিজেদের মতো মাতৃভুমি রক্ষার সংগ্রামে অংশ নিয়েছে, কারো অবদান কারো থেকে কম নয়।

এ লেখায় ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখা সিলেট বিভাগের বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী সম্প্রদায়ের উল্লেখযোগ্য কয়েকজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযোদ্ধা, সংগঠক ও সংস্কৃতিকর্মীর কথা ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরা হবে।


শ্রীকৃষ্ণকুমার সিংহ, পিতা : শ্রীরতন সিংহ, গ্রাম: উত্তর ভানুবিল, ডাকঘর: আদমপুর বাজার, থানা: কমলগঞ্জ, জেলা: মৌলবীবাজার
কৃষ্ণকুমার সিংহ এমন পরিবারের সন্তান যার পুর্বপুরুষরা ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভুমিকা রাখেন। ১৪ই আগস্ট ১৯৭১ তার বাড়িতে পাক বাহিনীর দোসররা হানা দিয়ে লুটপাট ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। পরদিনই রাগী এই তরুন দা হাতে বেড়িয়ে পড়েন এবং দীর্ঘপথ পায়ে হেঁটে ভারতের কৈলাশহরে পৌছান। হাতে দা থাকায় ভারতীয় পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। পরে কৈলাশহরের ভারতের আইবিএ'র জেরায় উত্তীর্ন হন এবং হাফলং এ ট্রেনিং নেন। কৃষ্ণকুমার মাইননিক্ষেপে দক্ষ ছিলেন। তিনি গুয়াইসনগর, ওয়াপাড়া, ভাড়াউড়া, ফুলবাড়ী. ধলাই ক্যাম্প এবং কামারছড়া ক্যাম্পের অভিযানে সাহসী ভুমিকা রাখেন।



১৬ই ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হলে কৃষ্ণকুমার শ্রীমংগলে সরকারের প্রতিনিধি দলের কাছে অস্ত্র জমা দেন। স্বাধীনতার পর সরকারের রেভিনিউ বিভাগে তিনি একটি ছোট চাকরি পান। তবে এরপরে তার শরীর ভেঙে পড়ে এবং কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন। বর্তমানে বাকশক্তি হারিয়ে কোনরকমে দিন কাটাচ্ছেন।

শ্রীসার্বভৌম শর্মা, গ্রাম: ভানুবিল, ডাকঘর: আদমপুর বাজার, থানা: কমলগঞ্জ, জেলা: মৌলবীবাজার
শ্রীসার্বভৌম শর্মা বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী সমাজের বিখ্যাত একজন পুরোহিত। তার পুর্বপুরুষ বৈকুণ্ঠনাথ শর্মা ছিলেন ১৯৩০ সালে পৃথিমপাশার জমিদার আলী আমজাদ খাঁর বিরুদ্ধে পরিচালিত কৃষক আন্দোলনের প্রথম সারির নেতা। মুক্তিযুদ্ধে তার অবস্থান এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করার অপরাধে ১২ ই আগষ্ট পাকিস্তানি সৈন্যরা তাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। এরপর চোখ বাধাঁ অবস্থায় ভানুবিলের পুর্বদিকে জংগলে তার লাশ পাওয়া যায়।


শ্রীসতীশচন্দ্র সিংহ, পিতা: মুরুলীচাঁন সিংহ, গ্রাম: তিলকপুর, ডাকঘর: কমলগঞ্জ, জেলা: মৌলবীবাজার
সতীশচন্দ্র ১৯৭১ সালে শ্রীমংগল কলেজে বি.এ ক্লাসের ছাত্র ছিলেন। শ্রীমংগলে পাকিস্তানি বাহিনীর প্রবেশের পরদিনই তিনি আসামের লোয়ার হাফলং চলে যান। সেখানে এম. ভি কৃষ্ণন নামের ভারতীয় সামরিক অফিসারের অধীনে তিনি গেরিলা ট্রেনিং গ্রহন করেন। জুলাই মাসে ক্যাপ্টেন ফখরুলের অধীনে মুজিববাহিনীর সদস্যরা বাংলাদেশের পাথরখোলায় প্রবেশ করেন। তারা ছিলেন ৩১ পলিটব্যুরোর। সতীশচন্দ্র শমশেরনগর বিমান ঘাঁটির অপারেশনে অংশ নেন। ঐদিন ত্রুটিপুর্ণ ডিরেকশনের কারণে হেলিকপ্টারের ব্রাশফায়ারে তিনি আহত হন, তবে তার ৫ জন সহযোদ্ধা নিহত হন। স্বাধীনতার পর মৌলবীবাজারে সতীশচন্দ্র অস্ত্র হস্তান্তর করেন।


শ্রীনীলকান্ত সিংহ, পিতা: চাউরেল সিংহ, গ্রাম: নয়াবালুনগর, থানা: কোম্পানীগঞ্জ, জেলা: সিলেট
ছাতক হাইস্কুলের প্রাক্তন ছাত্র নীলকান্ত যুদ্ধে যোগ দেবার জন্য এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহে কুইঘাট হয়ে ভারতের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন। পথে একটি শরনার্থী দলকে অসম সাহসিকতায় দস্যুদের হাত থেকে বাঁচিয়ে নিরাপদে শরনার্থী ক্যাম্পে পৌছে দেন। সেখানে তার সহপাঠী সাংবাদিক অতীশচন্দ্র দাসের সাথে দেখা হয় এবং কিছুদিন ক্যাম্প পরিচালনার দ্বায়িত্বে থাকেন। তারপর চন্দ্রনাথপুরে মি. বাগচী নামের সামরিক অফিসারের অধীনে প্রশিক্ষন নেন। সিলেটের বড়লেখার লাঠিটিলা বর্ডারে মেজর ডালিমের নেতৃত্বে কয়েকটি যুদ্ধ অংশ নেন। এরপর হাকালুকির হাওরে পাকিস্তানিদের সাথে ভয়াবহ একটি সংঘর্ষ হয়। এখানে মুক্তিযোদ্ধাদের বড় ধরনের পরাজয় বরন করতে হয়। নীলকান্তসহ মাত্র ৬ জন প্রানে রক্ষা পেয়ে ফিরে আসেন। স্বাধীনতার পর সিলেট জামিয়া মাদ্রাসায় মেজর সি আর দত্তের কাছে অস্ত্রসমর্পন করেন। বর্তমানে জৈন্তাপুর থানা হাসপাতালে একজন কর্মচারী হিসাবে কাজ করছেন।

শ্রীব্রজমোহন সিংহ, পিতা: শ্রীবটা সিংহ, গ্রাম: ছড়াপাথারি, ডাকঘর: পাত্রখোলা, থানা: কমলগঞ্জ, জেলা: মৌলবীবাজার
সহজ সরল কৃষক ব্রজমোহনকে জমিতে হালচাষ করা অবস্থায় রাজাকারেরা আটক করে এবং চোখ বেধেঁ মিলিটারি ক্যাম্পে নিয়ে যায়। সেখানে ব্যাংকার খনন করার কাজে লাগানো হলে তিনি কৌশলে পালিয়ে ত্রিপুরার কৈলাশহর চলে যান। ট্রেনিং নেয়ার পর ক্যাপ্টেন আব্দুস সালামের অধীনে সিলেট শহরে অপারেশনে অংশ নেন। পরবর্তীতে ক্যাপ্টেন সাজ্জাদুর রহমাদের অধীনে কৈলাশহর ও কমলপুর সীমান্তে কয়েকটি অপারেশনে অংশ নেন। স্বাধীনতার পর শ্রীমংগল ওয়াপদা অফিসে অস্ত্র জমা দেন। বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ আয়োজিত প্রথম ঢাকা সম্মেলনে তিনি উপস্থিত ছিলেন। কয়েক বছর আগে দারিদ্রের সাথে যুদ্ধ করতে করতে দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।

শ্রীগিরীন্দ্র সিংহ, গ্রাম: মাধবপুর(আউলেকি), ডাক কেরামতনগর, থানা: কমলগঞ্জ, জেলা: মৌলবীবাজার
মনিপুরী ঘোড়ামারা গ্রামের পেছনে নদী সংলগ্ন শ্বশানঘাট থেকে পাক বাহিনী ও তাদের দোসরদের সাথে যে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল তার সংগঠন ও নেতৃত্তে ছিলেন গিরীন্দ্র। সাধারন অস্ত্র লাঠি, বর্শা এবং আরো নানান প্রাচীন অস্ত্রকে সম্বল করে পরিচালিত হয় এই লড়াই। গিরীন্দ্র ছিলেন অসম সাহসি ও অসাধারন দৈহিক ক্ষমতার অধিকারী। যুদ্ধের পাশাপাশি মাধবপুর থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য খাবারদাবার সরবরাহের দ্বায়িত্ব ছিল তার উপর। মাধবপুরে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি অপারেশনের সময় শত্রুসৈন্যদের হাতে ধরা পড়েন । ধলাই ক্যাম্পে সপ্তাহখানেক আটকে রেখে নৃশংসভাবে শারীরিক নির্যাতন চালিয়েও তার কাজ থেকে কোন তথ্য বের করতে না পেরে তাকে হত্যা করে লাশ ধলাই নদীতে ভাসিয়ে দেয় পাকবাহিনী ও তার দোসররা। শহীদ গিরীন্দ্র সিংহ কে নিয়ে একটি লেখা পড়ুন - এখানে

মণি সিংহ, গ্রাম: মাঝের গাঁও, থানা: ছাতক, জেলা :সুনামগঞ্জ
ছাতক এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনী ও রাজাকার বাহিনীর হত্যা লুঠতরাজ শুরু হলে মণি সিংহ তার কয়েকজন বন্ধ ধের সিংহ, ব্রজ সিংহ, মনে সিংহ, হীরেন সিংহসহ আরো কয়েকজনকে নিয়ে সীমান্তবর্তী নামাইল ক্যাম্পে হাজির হল মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেবার উদ্দেশ্যে। বুটাং এবং শিলঙে প্রশিক্ষন গ্রহনের পর প্রথম অপারেশনে যান ৫ নং সেক্টরে ভোলাগঞ্জে। ১২ ডিসেম্বর সিলেটের শালুটিকর বিমান ঘাটিতে ৩ প্লাটুন সৈন্য নিয়ে শত্রুসেন্যদের আত্মসমর্পন করতে বাধ্য করা হয়, সেই অভিযানে অগ্রনী ভুমিকা রাখেন মণি সিংহ। দেশ স্বাধীন হবার পর সিলেট আলীয়া মাদ্রাসায় কর্ণেল শওকত আলীর কাছে অস্ত্র হস্তান্তর করেন। যুদ্ধের সুখস্মৃতি নিয়ে মণি সিংহ এখন কৃষিকাজ করে জীবন চালান।

ভুবন সিংহ, গ্রাম: ঘোড়ামারা, ডাক: আদমপুর বাজার, থানা: কমলগঞ্জ, জেলা: মৌলবীবাজার
ভুবন সিংহকে যুদ্ধকালীন সময়ে জরুরি বার্তা সংগ্রহের কাজ করতেন। কৈলাশহর, আগরতলা এবং ভানুগাছ ছিল তার কর্মক্ষেত্র। বাড়ীতে পরিবার পরিজন রেখে একাই ভারতে চলে গিয়েছিলেন। এরপর সংবাদ সংগ্রহ এবং শরনার্থী পারাপারের কাজে নিয়মিত সীমান্তের এপার -ওপারে যাতায়াত করতে থাকেন। সেপ্টেম্বর মাসে পাথরখোলা বর্ডারে পাকছাউনির কাছে তিনি শত্রুসৈন্যের হাতে ধরা পড়েন। তারপর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তার হাত পা বেঁধে শমসেরনগর ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। পথে জোড়ামন্ডপের রাস্তার সামনে এক বৃদ্ধকে দেখে তিনি শেষবারের মতো চিৎকার করে তার পরিবারের কথা জানতে চান। শমসেরনগর ক্যাম্পে নির্যাতনের পর তাকে মেরে ফেলে লাশ নদীতে ভাসিয়ে দেয়া হয়।

রবীন্দ্র কুমার সিংহ, পিতা: ফাল্গুনী সিংহ, গ্রাম: তিলকপুর, ডাক: কমলগঞ্জ, থানা: কমলগঞ্জ, জেলা: মৌলবীবাজার
১৯৭১ সন সিলেট এম সি কলেজের গণিত বিভাগের একজন মেধাবী ছাত্র ছিলেন রবীন্দ্র কুমার সিংহ। যুদ্ধ শুরু হবার সাথে সাথেই ভারতে চলে যান মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিতে। সেখানে স্বল্পকালীন ট্রেনিং শেষ করে শমশেরনগর ও কামারছড়া এলাকায় বেশ কয়েকটি সফল অভিযানে অংশ নেন। মুক্তিযোদ্ধা কৃষ্ণকুমার সিংহের বয়ান থেকে জানা যায় কামারছড়া অঞ্চলের পাঞ্জাবি ছাউনিতে গেরিলা আক্রমনের সময় তিনি ঐ অঞ্চলের ম্যাপ রবীন্দ্র কুমার সিংহের হাতে হস্তান্তর করেন। যুদ্ধের পাশাপাশি স্হানীয় রাজাকার ও পাক বাহিনীর দোসরদের চিহ্নিত করে তাদের খুজেঁ বের করার কাজ করতেন।



স্বাধীনতার পর অনার্স ও মাস্টার্স ১ম শ্রেনীতে পাশ করার পর তিনি সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় উত্তীর্ন হয়ে যোগাযোগ মন্ত্রনালয়ে সেকশন অফিসার এবং পরে তার সততার কারণে তিনি বাংলাদেশ সরকারের উপপ্রধানমন্ত্রীন একান্ত সচিব হিসাবে পদোন্নতি পান। ১৯৭৯ সনের ২৭ আগষ্ট ঢাকার আজিমপুরে স্বাধীনতাবিরোধী চক্রের সশস্ত্র হামলায় তিনি নিহত হন।


থইবা সিংহ, গ্রাম: তেঁতইগাও, ডাক: আদমপুর বাজার, থানা: কমলগঞ্জ, জেলা: মৌলবীবাজার
স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় সুনামগঞ্জের মহকুমা সদরে কাঠমিস্ত্রীর কাজ করতেন। তিনি মেঘালয়ের শিলং এর বালা ক্যাম্পে ১৫/২০ দিন থাকার পর ভারতীয় মেজর বাথ সিং এর তত্ত্বাবধানে ট্রেনিং নেন। প্রথম অপারেশন ছিল ঢাউকির মুক্তাপুরে, তারপর তাহেরপুর রাতাছড়ায়। মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিনগুলোতে কমান্ডার মানিক চৌধুরীর অধীনে দিরাই, কর্ণফুলী. শাল্লা ও জয়কলস এ গেরিলাযুদ্ধে অংশ নেন। বর্তমানে কৃষিকাজ করে সংসার চালান।

নন্দলাল সিংহ. গ্রাম: নয়াবালুচর, থানা: কোম্পানিগঞ্জ, জেলা: সিলেট
১৯৭১ যু্দ্ধ শুরু হবার পরপরই নন্দলাল সিংহ সপরিবারে ভারতে আশ্রয় নেন। সেখানে পরিবারের সদস্যদের ইছামতি ডিঙরায় শরনার্থী ক্যাম্পে রেখে মেঘালয়েল জোয়াই তে প্রশিক্ষনের জন্য চলে যান। প্রথম অপারেশন ছিল ভোলাগঞ্জের বিলাজোড়ে। তারপর বাদঘাটে এবং পরে প্লাটুন কমান্ডার মুসলিম মিয়ার অধীনে গোয়মারায় যুদ্ধ করেন। শালুটিকর বিমান ঘাটি ও তেলিঘাটে মুক্তিযোদ্ধাদের বিজয়ে অগ্রনী ভুমিকা রাখেন নন্দলাল। স্বাধীনতার পর সিলেট আলিয়া মাদ্রাসায় কর্ণেল শওকত আলীর কাছে অস্ত্র জমা দেন। পুলিশ বাহিনীতে চাকরি পেয়েছিলেন কিন্তু তা ছেড়ে বাড়ীতে কৃষিকাজ করছেন।

বিদ্যাধন সিংহ, গ্রাম: ভানুবিল, ডাক: আদমপুর বাজার, থানা: কমলগঞ্জ, জেলা মৌলবীবাজার
১৯৭১ সালের এপ্রিলে বিদ্যাধন সিংহের বাড়ীতে পাকবাহিনী ও তাদের দোসররা হামলা চালায়। সেদিন সন্ধ্যায় ত্রিপুরার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়ে ভোররাতে ডলুগাও পৌছান। সেখানে স্বেচ্ছায় ডিআইবির হাতে আটক হন। তারপর নিজের ইচ্ছার কথা জানালে তাকে ট্রেনিং এর জন্য হাফলং পাঠানো হয়। বিদ্যাধন সিংহ কমলপুরের বালিগাও ক্যাম্পে এবং পরে গুরুত্তপুর্ন ধলাই ক্যাম্পের একটি অপারেশনে অংশ নেন। ভারতীয় সীমান্ত থেকে চরাশ গজ দুরের এই আউটপোস্টে মুক্তিবাহিনী ও পাকিস্তানীবাহিনীর মধ্যে কয়েকদফা সংঘর্ষ হয়েছিল। এই ধলাই আউপোস্ট শত্রুমুক্ত করতেই প্রাণ দিয়েছিলেন বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান। দেশ স্বাধীন হলে বিদ্যাধন শ্রীমঙ্গল ওয়াপদায় এসে অস্ত্র জমা দেন। ১৯৯১ সালে তিনি ২ পুত্র ও ১ কন্যা রেখে মারা যান।

ব্রজমোহন সিংহ, গ্রাম: মাঝের গাঁও, থানা: কোম্পানিগঞ্জ, জেলা: সিলেট
টেইলার ব্রজমোহন সিংহ পেশাগত কাজের জন্যে আগরতলায় থাকতেন। যুদ্ধ শুরু হলে বাড়ীতে বাবা-মাকে দেখার জন্য দেশে আসেন এবং সিদ্ধান্ত নেন যুদ্ধে যাবেন। তারপর মেঘালয়ের শিলং এ ভারতীয় সামরিক অফিসার রলরাম সিং এবং ইম্ফালের কুঞ্জ সিং এর তত্ত্বাবধানে ট্রেনিং রাভ করেন। জৈন্তা অঞ্চলের মুক্তাপুর এবং কালাইনছড়ি ছিল ব্রজমোহন সিংহের প্রথম অপারেশন। এরপর কমান্ডার আলমগীরের নেতৃত্বে ভোলাগঞ্জে কয়েকটি অপারেশনে অংশ নেন। বর্তমানে হতদরিদ্র হয়ে অন্যের জমি বর্গাচাষ করে দিনযাপন করছেন।

নিমাই সিংহ, গ্রাম: মাধবপুর, ডাকঘর: পাত্রখোলা, থানা: কমলগঞ্জ, জেলা: মৌলবীবাজার
ছাত্রাবস্থায় নিমাই সিংহ ছিলেন ছাত্রলীগ কর্মী। প্রথমে ভারতে একটি শরনার্থী শিবিরের জীপগাড়ীর হেলপার হয়ে কাজ করতেন। পরে হাফলং লোয়ার বনে ভারতীয় সামরিক অফিসার হনুমান সিং এর কাছে ৩ মাস ২১ দিন প্রশিক্ষন নেবার পর ৪ নং সেক্টরে ক্যাপ্টেন সাজ্জাদুর রহমানের অধীনে কমলপুর সীমান্তে নিয়োজিত হন। এরপর কমান্ডার আবুল কাশেমের অধীনে কুমারঘাট, শ্রীমঙ্গল, আখাউরা এবং খোয়াই এ কয়েকটি অভিযানে অংশ নেন। দেশ স্বাধীন হবার পর শ্রীমঙ্গলে অস্ত্র জমা দেন। পরে ১৫ দিনের মিলিশিয়া ট্রেনিং এ অংশ নেন। বর্তমানে আনসার বাহিনীর সাথে যুক্ত আছেন।

বিশ্বম্ভর সিংহ, গ্রাম: বালিগাঁও,ডাকঘর: কেরামতনগর, থানা: কমলগঞ্জ, জেলা: মৌলবীবাজার
স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তার ভাই কৃপাময় সিংহকে নিয়ে শরনার্থী শিবিরে উঠেন। তারপর নৌমুজা মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে মুক্তিবাহিনীতে নাম লেখান।সেখান থেকে শিলচরের লোয়ারবন ট্রেনিং সেন্টারে ১ মাস ১০ দিন ট্রেনিং নেন। ক্যাপ্টেন ধীর সিং এর তত্ত্বাবধানে ট্রেনিং সমাপ্তির পর কমান্ডার হাবিবুর রহমানের অধীনে চাতলাপুর বর্ডার অপারেশন ডিফেন্সে কাজ করেন। বিওপি, কামারছড়া চাতলাপুরে তিনি অপারেশনে ডিফেন্সে গুরুত্তপূর্ন দ্বায়িত্ব পালন করেন। স্বাধীনতার পর মৌলবীবাজার ডেভেলপমেন্ট সেন্টারে অস্ত্র জমা দেন। ১৯৭৪ সালে শ্রীমঙ্গল কলেজ থেকে এইচ.এস.সি পাশ করার পর চেস্টা করেও একটি চাকুরি জুটাতে না পেরে মনক্ষুন্ন হয়ে কৃষিকাজে মন দেন।

দীনমনি সিংহ, গ্রাম: পুরান বালুচর, থানা: কোম্পানিগঞ্জ, জেলা: সিলেট
'৭১ এ দীনমনি ছিলেন ৯ম শ্রেনীর ছাত্র। মে মাসে কোম্পানিগঞ্জে পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রথম প্রতিরোধ যুদ্ধ দীনমনিকে উৎসাহিত করে তোলে। বাড়ীর কাউকে না জানিয়ে তিনি তার বন্ধু স্বপন, মণি ও নন্দলালের সাথে সীমান্ত পাড়ি দেন। ইছামতি ইয়ুথ ক্যাম্পে তার ট্রেনিং হয়। ট্রেনিং শেষে ভোলাগঞ্জ ৫নং সাবসেক্টরে অপারেশনে যোগ দেন। কমান্ডার ফখরুলের নেতৃত্বে পরিচালিত ঐ অভিযানে ৩৫ জন মুক্তিযোদ্ধা ছিল এবং তারা সারারাত জেগে ভোলাগঞ্জের মোরায় শত্রুসৈন্যদের ঘাটিতে হামলা করেন। সেদিন গোলবারুদ ও অস্ত্রস্বল্পতার কারণে তারা ব্যাক করেন কিন্তু পরদিন শত্রুসৈন্যদের ঐ ক্যাম্পটি শুণ্য হতে দেখা যায়। তার স্মৃতিচারন থেকে জানা যায়, ঐদিন মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা সুরমা নদীর পাড়ে কিছু রাজাকারকে ধরে ফেলে। কিন্তু মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা এদের প্রাণে না মেরে সামান্য উত্তমমধ্যম দিয়ে ছেড়ে দেন এবং 'জয়বাংলা' শ্লোগান দিয়ে বাড়ি ফিরে যেতে বাধ্য করান। বর্তমানেছাতক থানার লাকেশ্বর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক পদে কর্মরত আছেন।

বাপ্পী সিংহ, গ্রাম: বালিগাঁও, ডাকঘর: কেরামতনগর, থানা: কমলগঞ্জ, জেলা: মৌলবীবাজার
সঙ্গীত শিল্পী বাপ্পী সিংহ এলাকার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দেশের গান গেয়ে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলে ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে ত্রিপুরায় আমতলী অস্থায়ী ক্যাম্পে ১৫ দিন কাটান। তারপর হাফলং এ ট্রেনিং নেন ও পরে হবিগঞ্জের কমান্ডার মানিক চৌধুরীর অধীনে কয়েকটি অপারেশনে যোগ দেন। যুদ্ধকালীন সময়ে সহযোদ্ধাদের দেশাত্তবোধক গান গেয়ে উদ্বুদ্ধ করতেন। তিনি জে এল উইং এ ফাস্ট নেলস পাওয়ার, সিলেটের মাইন কালেকশন, আর্মস এন্ড এমুনিশন সাপ্লাই ইত্যাদির কাজ করেন। স্বাধীনতার পর অস্ত্র জমা দেন শ্রীমঙ্গলের ওয়াপদাতে। বর্তমানে নানান সামাজিক সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে জড়িত আছেন।


চলবে...


তথ্যসূত্রঃ
১.দৈনিক সিলেট বাণী (নভে:-ডিসেম্বর '৯৩) - জহিরুক হক চৌ: সম্পাদিত
২. স্বা: সংগ্রামে বা: মণিপুরী সমাজ (১৯০১ -১৯৭১)- রণজিত সিংহ, ১৯৯৭
৩. ইথাক (বিঃ মঃ পত্রিকা), ডিসেম্বর ১৯৯৭ সংখ্যা
৪. বৃহত্তর সিলেটের দুইশত বছরের আন্দোলন - তাজুল মোহাম্মদ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/kungothangblog/29055858 http://www.somewhereinblog.net/blog/kungothangblog/29055858 2009-12-09 06:05:11
বঙ্গে শ্রীরাধার ক্রমবিকাশ প্রসংগে কিছু তথ্য ভাগবৎ পুরানের কোথাও রাধা নামের কাউকে পাওয়া যায় না। কৃষ্ণের প্রণয়িনী হিসাবে রাধাকে পাওয়া যায় খ্রীষ্ঠিয় দ্বিতীয় শতকের প্রাকৃতকাব্য ‌'গাহাসত্যসঈ' তে। পরবর্তী সময়ে পদ্মপুরাণ, ব্রহ্মবৈবর্ত্তপুরাণ ইত্যাদিসহ নানান সংস্কৃত-প্রাকৃত-অপভ্রংশ কাব্যে শ্রীরাধার উল্লেখ পাওয়া যায়। দ্বাদশ শতাব্দিতে কবি জয়দেবের গীতগোবিন্দ এবং বড়ু চণ্ডিদাসের শ্রীকৃষ্ণকীর্ত্তনে রাধাকে কৃষ্ণের পরম প্রনয়িনী হিসাবে আমরা পাই। জন্মসূত্রে সাধারন একজন গোপনারী হলেও কৃষ্ণলীলায় সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ চরিত্র হিসাবে তাঁকে পাওয়া যায়।

রাধা: বাংলার কল্পনা
শ্রীকৃষ্ণের প্রতি শ্রীরাধার গভীর অনুরাগ পৃথিবীর ভালোবাসার গল্পে এক আশ্চর্য কোমল অধ্যায় বলেই বোধ হয়; যে অনুরাগ জৈবিক তাড়নার সীমানা ছাড়িয়ে আরও ব্যাপক অর্থময় ও ব্যাঞ্জনাময় হয়ে উঠেছে। প্রাচীন কাল থেকেই ভারতবর্ষে মথুরা-বৃন্দাবনের কৃষ্ণের কল্পনা চলে আসছে। কারও কারও মতে কৃষ্ণ ছিলেন ঐতিহাসিক ব্যাক্তি। পৌরাণিক জগতে কৃষ্ণ অবশ্য একজন নন; বেশ কয়েকজন কৃষ্ণকেই আমরা পাই। কিন্তু কৃষ্ণের যুগল রাধার কল্পনা যিনি করেছিলেন বাংলারই এক কবি, তিনি কবি জয়দেব। এরপর থেকে অষ্টাদশ শতক পর্যন্ত রাধা বাংলা পদাবলী সাহিত্যের এক বিরাট অংশ জুড়ে রয়েছেন। এই রাধার উপাস্য কৃষ্ণই যুগে যুগে ভারতবর্ষজুড়ে একাধারে প্রেমিক ও উপাসকের কৌতূহলের বস্তু হয়েছেন [১]। তাহলে দেখা যাচ্ছে রাধা বাংলার কবিদেরই কল্পনা।

চৈতন্যপরবর্তী বৈষ্ণব সাহিত্যেই শ্রীরাধা আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে আসেন। নবদ্বীপের শ্রীচৈতন্যদেবকে কৃষ্ণের অবতার বলে বিশ্বাস করেন বৈষ্ণবরা, রাধা ছিলেন তাঁর আরাধ্য। শ্রীচৈতন্যদেব বলতেন আমার অন্তরে রাধা, বহিরাঙ্গে কৃষ্ণ। এই উক্তির ব্যাখ্যা খুবই গভীর। শ্রীচৈতন্যদেব ছিলেন পুরুষ। ‘আমার অন্তরে রাধা’ - মানে, আমার অন্তরে নারীর অনুভূতি। নারীর অনুভূতিই যাবতীয় শিল্পের ভিত। শিল্প-সঙ্গীত পাশাপাশি থাকে। বাংলা গানের ভিতটি শ্রীচৈতন্যদেবের হাতেই গড়ে উঠেছিল। আমরা যে কীর্তনের কথা জানি- সেই কীর্তনের সঙ্গে শ্রীচৈতন্যদেবের নাম জড়িত।



রাসলীলা প্রসংগে
বৈষ্ণব দর্শনে ভক্তের সাথে শ্রীকৃষ্ণের অপ্রাকৃত লীলাকেই বলা হয় রাস। মণিপুরীরা অষ্ঠাদশ শতকে বৈষ্ণবধর্মের বলয়ে আসার পর তাদের প্রাচীন নৃত্যগীতের সাথে বৈষ্ণবধর্মের রাধাকৃষ্ণ দর্শনের সমন্বয় ঘটিয়ে মণিপুরী রাসলীলা প্রবর্তিত হয়। রাসলীলা অনেক ধরনের হয় - যেমন কুঞ্জরাস, বসন্তরাস, নিত্যরাস, মহারাস, দিবারাস ইত্যাদি। দিনের বেলায় যে রাস হয় সেটা দিবারাস। প্রতি বছর শারদীয় পূর্ণিমায় হয় মহারাস।

রাসলীলার সাথে নরনারীর ইহজাগতিক সম্পর্কের কোন যোগসূত্র নেই। ভাগবৎ পুরাণে বলা হয়েছে, "রস্যতে আস্ব্যাদস্য অনেনেতি রাসঃ" - অর্থাৎ রাস হলো কৃষ্ণপ্রেমের রস আস্বাদন। পুরাণে নরনারী দু'প্রকারের ভক্তের সাথেই শ্রীকৃষ্ণের রাসলীলার বিবরন রয়েছে। পুরুষদের রাসকে গোপরাস বা রাখুয়াল বলা হয়ে থাকে। বিষ্ণুপুরাণের ভাষ্য অনুযায়ী রাসলীলার সময়ে শ্রীকৃষ্ণ ছিলেন নিতান্তই শিশু, বয়স ছিল মাত্র ৮ বৎসর ২ মাস। আর রাধা তো লোকসাহিত্যের একটি প্রতীকি চরিত্রের নাম যিনি লোকমুখে ক্রমবিবর্তিত হয়ে একাধারে হয়ে উঠেছেন একজন নারী, কুলবধু, কৃষ্ণভক্ত ও প্রেমিকার প্রতীক। বলা হয় কল্পনার রাধাই মিথলজির কৃষ্ণকে জনপ্রিয় করে তুলেছেন। এই শুন্য শতকে এসেও মণিপুরী কবি তাই লিখে চলেন শ্রীরাধার গাঁথা- তুমি ছাড়া কৃষ্ণকে আমি চিনতাম না হে রাধা!


এক পরমপুরুষ, বাকী সব রাধা
সেই রাধার সাথে কৃষ্ণের প্রনয়কাহিনীর ভেতর আরেক উচ্চমার্গের দর্শন। কৃষ্ণকে মনে করা হয় ভারতীয় মিথলজির পরমপুরুষ বিষ্ণু। কৃষ্ণ/বিষ্ণু হচ্ছেন পরমাত্মা আর সব জীবাত্মা। পরমাত্মা হচ্ছেন পুরুষ, আর জীবাত্মা হচ্ছে প্রকৃতি বা নারী; জীবাত্মার সর্বদা আকাঙ্খা পরমাত্মার সাথে মিলিত হওয়া। বৈষ্ণব দর্শনে রাধারাণীকে সকল জীবাত্মার প্রতীক হিসাবে ধরা হয়, কৃষ্ণকে ধরা হয় পরমাত্মারূপে। পরমাত্মায় বিলীন হবার জন্য জীবাত্মার যে আকুতি - শ্রীরাধার প্রনয়যন্ত্রনা যেন তারই প্রতীক হয়ে উঠেছে।

শাস্ত্রের অকাট্যতা ও জাতিভেদ প্রথাকে অস্বীকার করে শ্রীচৈতন্য পদাবলী সাহিত্যের কোন একটি পাতা থেকে লৌকিক শ্রীরাধাকে তুলে এনে ভাগবৎ পুরাণের কৃষ্ণের সাথে সম্পর্ক গড়ে দিয়েছিলেন, উদ্দেশ্য ছিল সকল মানুষ যেন নিজেকে রাধা ভাবে, তন্ত্রমন্ত্র যাগযজ্ঞ নয়, শ্রীরাধা যেভাবে তার ভক্তি ও প্রেম দিয়ে কৃষ্ণের কাছে পৌঁছে যান, সবাই যেন সেভাবেই তাকে পাবার সাধনা করে। বামুন-চণ্ডাল- বৈশ্য-ক্ষত্রিয় সবাই রাধা হয়ে গেলেতো আর জাতপাতের বিভেদ থাকেনা। সেকারণে শ্রীকৃষ্ণের রাসলীলায় জাতি-বর্ণ-লিঙ্গ নির্বিশেষে সবাই রাধা হয়ে যান; রাধাভাব নিয়ে এক পরমপুরুষের প্রেমে বিলীন হয়ে স্থাপন করেন মানুষে মানুষে সাম্যতার অনন্য দৃস্টান্ত।


সবাইকে মহা রাসপূর্ণিমার অনেক শুভেচ্ছা।


তথ্যসূত্র:
১. ইমন জুবায়ের এর ব্লগ, রাধা: বাংলার কল্পনা
২. ভক্তি-রসনাম্বুমারি - এন তম্বা সিংহ, ইম্ফাল, ১ম সং, ১৯৬৮
৩. A Brief description of manipuri dance - Sharma, Atombapu & Singh, Amubi, 1960
৪. শ্রীরাধার ক্রমবিকাশ - শশীভূষন দাসগুপ্ত
৫. বাঙালীর ইতিহাস - নীহাররঞ্জন রায়]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/kungothangblog/29037312 http://www.somewhereinblog.net/blog/kungothangblog/29037312 2009-11-04 00:42:25
২ নভেম্বর মণিপুরীদের মহারাস উৎসব তারিখঃ ২ নভেম্বর ২০০৯, সোমবার
সময়ঃ বেলা ১১:০০ থেকে শুরু হয়ে পরদিন ভোর ৬:০০ টা পর্যন্ত
স্থানঃ মাধবপুর জোড়ামণ্ডপ ও আদমপুর সানাঠাকুর মণ্ডপ, কমলগঞ্জ, মৌলবীবাজার

বিস্তারিত তথ্যের জন্য গত বছরের এই পোস্টটি দেখুন -
মণিপুরীদের মহারাস উৎসবে সবাইকে আমন্ত্রন। কবে কখন কি অনুষ্ঠান,কিভাবে যাবেন বা কোথায় থাকবেন ইত্যাদি বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য

এবছর মণিপুরী মহারাসোৎসবের ১৬৭তম বর্ষপুর্তি। অনুষ্ঠানমালা এবং সময়সূচী গত বছরের মতোই। আগের বছরের কিছু ছবি ও ভিডিওলিংক দেখুন এখানে

ব্লগের সবাইকে শারদীয় রাসপূর্ণিমার অগ্রীম শুভেচ্ছা।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/kungothangblog/29031905 http://www.somewhereinblog.net/blog/kungothangblog/29031905 2009-10-26 01:05:42
নুয়া করে চিনুরি মেয়েক || শুভাশিস সিনহার কবিতা
সাধারন দুস্তবকের অক্ষরবৃত্তের হিসাব থেকে ইচ্ছে করেই দ্বিতীয় স্তবকে একটি লাইন কমালাম। চলনে একটি বিঘ্ন থাকুক, অসম্পুর্ণতা থাক; সেই এক লাইন আগামী সুন্দর ছন্দময় পৃথিবীর কাব্যাকাশে গিয়ে উড়ুক। কবিতাগুলো অনুবাদ নয়, যুগপৎ বাংলা এবং এবং আমার মাতৃভাষা বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষায়, একই চিন্তার ঔরসে দুটো গর্ভে প্রসববেদনা হয়েতোবা।

... বাঙালী পাঠককে অনুরোধ, সে না বুঝার ভাষাটিকেও যেন একটু কষ্ট করে পাঠ করেন। ধ্বনির ভেতর দিয়ে ভাষা তার সব অর্থ ও অনর্থ হয়ে ধরা দেবে। তাতে করে ঐ অল্প মানুষের ভাষাটি ক্ষুদ্র পাঠকভান্ডারে সংখ্যাধন পাবে, ধন্যও হবে।


০১
যে ভাষায় কথা বলি, সেটাই কেবল ভাষা নয়
অক্ষরে অক্ষরে ফুটে ওঠে যে ভাষাটি, তার চেয়ে
আরেকটি ভাষা থাকে ভেতরে ভেতরে ভাঙাচোরা
প্রকাশ্যে যায় না আনা শৃংখলার দুনিয়ার ভয়ে
এ চোখ দেখে সে ভাষা, কান শোনে সে ভাষার ধ্বনি
আলাদা ধমনিপথে নিয়ত ভাষার আনাগোনা
চুপ হয়ে থাকলেও থাকি কোনো নীরব ভাষায়
আমার এ দেহ নিজে মুর্তিমান ভাষাভগবান।

অক্ষরের দাগে দাগে সেজেগুজে যে অর্থ প্রকাশ করে
পায়, শুধু তাই অর্থ নয়, জনমজঞ্জালে, ঘামে,
রক্তে রক্তে হারায় যে চিহ্নগুলো তার, থেকে থেকে
ভাসে চিৎকারে, বাজে নতুন ভাষার রিনিঝিনি
ভেতরে প্রবেশি তার অক্ষর নতুন করে চিনি।

≈≈≈≈≈≈≈≈≈≈≈≈≈≈≈≈≈≈≈≈≈≈≈≈≈≈≈≈≈≈≈≈≈
যে ঠারে মাতুরি কথা, অহানই ঠারহান নাবে
মেয়েকে মেয়েকে শাত'পারের যে ঠার তার জিঙে
আরাক আহান থার বিতরে বিতরে - বাগাচুরা
ফঙেদে হাজানি নার শৃংখলার দুনিয়ার ডরে
আহিগি দেহের ঠার, কানহানি হুনের ঠার, প্রানে
তঙাল ধমনিপথে নিয়ত ঠারর আনাগোনা
ইংগ ইয়া থাইলেউ থাউরি গোপন ঠারে ঠারে
মোর দেহ এগ নিজে মুর্তিমান ঠারভাগবান।

মেয়েকর দাগে দাগে হাজিয়া যে অর্থ নিকুলের
অহানই নাবে অর্থহান; জনমজঞ্জালে, ঘামে
রকতে রকতে তার যে চিন মাঙর, থায়া থায়া
ফঙর তা চিকারিনো, ইকরের নুয়া করপেখ
মি তার বিতরে গিয়া নুয়া করে চিনুরি মেয়েক।


০২
মহাত্মা সকাল, জানি আঁধারের স্তন্য পান করে
শৌর্যে আর বীর্যে আজ উপচে পড়ে সব আপনার
উজ্জল আলোতে রঙে আয়নাটি সাজিয়ে দিলেন
নিজরূপ দেখে দেখে মানুষেরা মজে গেল রসে
তাদের চোখের তলে হারালো আধাঁর, - এসো এসো
সূর্যকে প্রণাম করি, আলোধোয়া জলে স্নান সেরে
নিজেকে পবিত্র করি, অশুদ্ধ রাতের যত ছাপ
মন্ত্র শ্লোকে মুছে দেই নিজের ভেতর থেকে সব...

মহাত্মা সকাল ওহে, তাই বলে আপনি আবার
যাবেন না ভুলে সব, যে আধাঁরস্তন্য ভরো প্রাণ
ঋণ তার শোধবার কালে পিছু নাহি তাকাবেন
পেছনেও রক্ষা নেই, চোখ মেলে চায় যত লাশ
বর্তমানে, -চারিদিকে ছড়ায়ে রেখেছে ইতিহাস।

≈≈≈≈≈≈≈≈≈≈≈≈≈≈≈≈≈≈≈≈≈≈≈≈≈≈≈≈≈≈≈≈≈
ডাঙরিয়া বিয়ানহান, আধারর বুনি পিতে পিতে
বলিয়ে পাংকালে আজি মারংকাইছে হাবি তোর
ইঙাল মিঙালে রঙে হাজায়িলে মেঙসেল অহান
নিজ শাত চেয়া চেয়া মানু এতা কালাকপেলুইলা
তাঙর আহির তলে মাঙুইল আধার, -আহেই নে
বেনিগরে হমাদিক, মাঙপা রাতির যত ছাপ
মন্তরোনো মুকাদিক বিতরেত আকিহান করে।

ডাঙরিয়া হে বিয়ানহান, অতা বুলিয়া হাবি না
পাহুরেবেলিস, যে আধারস্তন্যে খৌনুগ বুজিলে
তার দান হুজানির কালে বার পিছবুলা নাদিছ
পিছেদেউ রক্ষা নেই, আহি মেলিতারা যত লাশ
বর্তমানে -চারিয়বারাদে তার থ'ছে ইতিহাস।


০৩.
তুমি ছাড়া কৃষ্ণকে তো আমি চিনতাম না হে রাধা
তোমার অন্তরপথে হেঁটে হেঁটে তার ঘরে যাওয়া
উঠার বারান্দা যদি আমাকে না চিনে চেয়ে থাকে
তখন প্রবোদ দেই, তুমিও তো পধরুদ্ধকালে
চেনো নাই তাকে, ডাকাতের বেশ ধরে যে তোমার
সব কেড়ে নিল, সবকিছু নিয়ে এসে সে তোমার
ভেতরেই জন্ম নেয়, আর তাকে জন্ম দিতে দিতে
রচিলে তারই সাথে অভিসার মিলন বিরহ...

নিজের সাথে আমার বিরহ মিলন অভিসার
শুধু এই ধুলি-মাটি-হিসাবের সংসারে হে রাধা
দূরকৃষ্ণকে আমার সাজালে এ হৃদয়মন্ডপে
চিনি আমি, তোমার ঐ হাতে তার পরশি চরন
তুমি হলে গোপীচান আমি হই হরিনারায়ণ।

≈≈≈≈≈≈≈≈≈≈≈≈≈≈≈≈≈≈≈≈≈≈≈≈≈≈≈≈≈≈≈≈≈
তি ছাড়া কৃষ্ণরে মিতে নাউ চিনলু অউস হে রাধা
তোর অন্তরর পথে আতে আতে তার গরে যানা
উঠান মাংকল নাচিনিয়া চেয়া থাইলে মরে
দেউরি প্রবোধ -তিয়ৌ পথরুদ্ধকালে তারে নাউ
চিনেছিলে, ডাকাইতগো মালুয়া যেগই হাবি তোর
কারুনিয়া নিলগা, তা হাবিতানো আয়া বারো তোর
বিতরেই নেরগা জরম, তার জন্ম দিতে দিতে
রচিলে তি তার লগে অভিসার মিলন বিরহ...

নিজর লগেই মোর বিরহ মিলন অভিসার
হুদ্দা এরে ধুলি মাটি হিসাবর সংসারে তি রাধা
দুরিপা কৃষ্ণরে মোর হাজয়িলে হৃদয়মান্ডপে
মি তারে চিনুরি, দোর আতলো তার সকুরি চরণ
দি ইলে গোপীচান অউরি মি হরিনারায়ণ।

________________________________________________
শুভাশিস সিনহা বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষার কবি, গণ্পকার ও নাট্যকার। জন্ম বাংলাদেশের মৌলভীবাজার জেলায়। প্রকাশিত গ্রন্থাবলী : ছেয়াঠইগির যাদু(২০০২), সেনাতম্বীর আমুনিগৎতো সেম্পাকহান পড়িল অদিন (২০০৩), নুয়া করে চিনুরি মেয়েক (২০০৫), রবীন্দ্রনাথের রুদ্রচন্ড(২০০৭), মণিপুরী সাহিত্য সংগ্রহ -১ম ও ২য় খন্ড(২০০৭) ইত্যাদি।
সুত্রঃ নুয়া করে চিনুরি মেয়েক, পৌরি, ২০০৮
ছবিঃ বারীন ঘোষের ফেসবুক থেকে ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/kungothangblog/29028218 http://www.somewhereinblog.net/blog/kungothangblog/29028218 2009-10-19 01:59:06
হিল্লো মিলেবো জুমত যায় দে, জুমত যায় দে, যাদে যাদে পধত্তুন পিছ্যা ফিরি রিনি চায়, শস্য ফুলুন দেঘিনে বুক্কো তার...
পাহাড়ে জুম ক্ষেতে এখন পাকা ফসল তোলার ভর মৌসুম। জুমিয়াদের ঘরে উঠছে জুমের সেই সোনালি ফসল। আর ফলানো ফসল ঘরে তুলতে পেরে জুমিয়া নারী-পুরুষের মুখে ফুটেছে হাসি। চোখে আশার আলো। জুম্ম নারীরা উৎফুল্ল মনে ব্যস্ত জুমের পাকা ধান কাটতে।

তিনটি পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানের আদিবাসীদের জুম ক্ষেতে সবেমাত্র শুরু হয়েছে পাকা ধান কাটা। ধুম পড়েছে মারফা, বেগুন, ধানি মরিচ, ঢেঁড়শ, কাকরোল, কুমড়াসহ ইত্যাদি ফসল তোলার কাজ। এরপর ঘরে উঠবে তিল, যব এবং সব শেষে তোলা হবে তুলা। জুমে বীজ বপনের ৫ মাস পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণের পর ফলিত ফসল দেখে হাসি ফুটে ওঠে জুম চাষীদের মুখে। এ মৌসুমে জুম ক্ষেত থেকে ফসল ঘরে আনতে শুরু হয় উৎফুল্ল জুমিয়া নারী-পুরুষের। কিছু কিছু জুমিয়া ঘরে নবান্ন উৎসবের আয়োজনও শুরু হয় এসময়। গত কয়েক বছর ধরে পাহাড়ে বন্যা এবং ইঁদুরের উপদ্রবে জুমের পাকা ফসল ঘরে তুলতে পারেনি জুমিয়ারা। ফলে অভাব-অনটনে কেটেছিল সাম্প্রতিক বছরগুলো। এ মৌসুমে উপযুক্ত জলবায়ু ও বৃষ্টিপাতের কারণে এবং ইঁদুরের উৎপাত কমে যাওয়ায় ভালো ফলন হয়েছে। জুমের সোনালি ফসল ঘরে তুলতে পারায় জুম্ম নারী-পুরুষ ফিরে পেয়েছে মুখের হাসি। চোখে ফুটে উঠেছে আশার আলো।


জুম চাষের ইতিহাস কয়েক হাজার বছরের পুরনো। পার্বত্য আদিবাসীদের জীবিকার আদিম ও প্রধান উৎস এই জুম চাষ পদ্ধতি বেশ কষ্টসাধ্য। চাষের মৌসুমে প্রথমে নির্বাচিত পাহাড়টির জঙ্গল ও আগাছা বিশেষ কৌশলে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। বৃষ্টির পর নির্বাচিত জুমের জমিতে পুড়ে যাওয়া জঙ্গল ও আগাছার ছাই সারের কাজ করে। এর পর ছোট্ট ছোট্ট গর্তে একই সঙ্গে কয়েক ধরণের ফসল বোনা হয়। ধান, গম, ভূট্টা, আলু, কলা, তরমুজসহ জুমের জমিতে প্রায় সব ধরণের খাদ্য শষ্য ও শাক-সব্জি চাষ করা হয়।


জুম চাষে বন পোড়ানো নিয়ে বনজ-প্রানীজ সম্পদ ধ্বংস, ভূমি ক্ষয় ইত্যাদি সংক্রান্ত নানান ভ্রান্ত ও অতিরঞ্জিত ধারণা রয়েছে। এখানে জুমচাষের কিছু বিশেষত্ব উল্লেখ করছি -

১. জুমের আগুনে কখনো আগাছা বাদে কোনো বনজ বা প্রাণীজ সম্পদ নষ্ট করা হয়না।

২. বিশেষ কৌশলে আগুন ধরানো হয় বলে বনাঞ্চলে এই আগুন ছড়িয়ে পড়েনা।

৩. নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থেই পাহাড়িরা জুম চাষ করতে গিয়ে বন ও চাষ এলাকার কোনো বড় বা দামি গাছের ক্ষতি করেন না।

৪. জুম চাষে লাঙ্গল বা কোদাল ব্যবহৃত হয় না। জুমিয়ারা পাহাড়ে একটি ছোট্ট গর্ত খুঁড়ে একই গর্তে নানা রকম বীজ এক সঙ্গে বপন করেন বলে ভূমি ক্ষয় হওয়ারও প্রশ্ন আসে না।

৫. জুমের ফসলের বীজ সমতলের চেয়ে ভিন্ন। এসব ফসল উৎপাদনে কোনো ধরণের সার ও কীটনাশক ব্যবহার করা হয়না।

৬. জুমের শষ্য, ফল-মূল ও তরি-তরকারির আকার-আকৃতি সমতলের উৎপাদিত কৃষিজ পণ্যের চেয়ে ভিন্ন; এগুলো খেতে খুবই সুস্বাদু।


_______________________________________________
মুল লেখা: সুশীলপ্রসাদ চাকমা: পাহাড়ে জুমিয়াদের মুখে হাসি, ঘরে উঠছে...
তথ্যসুত্র; বিপ্লব রহমান: পাহাড়ে বিপন্ন জনপদ (তিন)
ছবির জন্য কৃতজ্ঞতা: http://www.flickr.com ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/kungothangblog/29006471 http://www.somewhereinblog.net/blog/kungothangblog/29006471 2009-09-07 23:43:23
সিলেটের মণিপুরীপল্লী মাছিমপুরে রবীন্দ্রনাথ
পর দিন ৬ নভেম্বর বৃহস্পতিবার সকাল আটটায় কবিকে টাউন হল প্রাঙ্গণে শ্রীহট্টবাসী জনসাধারণের পক্ষ থেকে সংবর্ধনা জানানো হয়। ওই অনুষ্ঠানে হাজার পাঁচেক মানুষের সমাগম ঘটে। কবিকে রাজোচিত সংবর্ধনা দেওয়া হয়। (আমাদের কালের কথা−সৈয়দ মুর্তজা আলী, চট্টগ্রাম ১৩৮২)। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে কবি ‘বাঙ্গালীর সাধনা’ শীর্ষক দেড় ঘণ্টাব্যাপী বক্তৃতা করেন। ওইদিন দুপুরে রবীন্দ্রনাথ অধ্যাপক নলিনীমোহন শাস্ত্রী মহাশয়ের আমন্ত্রণে তাঁর বাসভবনে যান। বেলা দুটোর সময় ব্রাহ্মসমাজ গৃহে শ্রীহট্ট মহিলা সমিতি কর্তৃক তাঁকে সম্মাননা জানানো হয়।

অনুষ্ঠানস্থলে কবির টেবিলে মোড়ানো ছিল মণিপুরি মেয়েদের তৈরি টেবিলক্লথ। কাপড়খানি তাঁর ভালো লাগে। মেয়েদের বয়ন-নৈপুণ্য দেখে কবি মণিপুরিদের তাঁত ও জীবনাযাত্রা দেখতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। ওইদিন অনুষ্ঠান শেষে তাঁকে সিলেট শহরের কাছে মাছিমপুরে নিয়ে যাওয়া হয়। মণিপুরি বস্তিতে কবির আগমন ঘটবে এ জন্য বস্তিবাসী তাৎক্ষণিকভাবে রাস্তায় সারি সারি কলাগাচ পুঁতে তোরণ নির্মাণ করেন। প্রতি গাছের গোড়ায় মঙ্গলঘট ও আমপাতার শোভন সজ্জা করেন। সে তোরণদ্বার দিয়ে কবিকে নিয়ে যাওয়া হয় মাছিমপুর পূর্বমন্ডপের গোপীনাথ জিউরত মন্দিরে। কবির উদ্দেশে মণিপুরি ছেলেমেয়েরা রাখাল নৃত্য পরিবেশন করে। রাধা-কৃষ্ণের প্রেম নিয়ে রাখাল নৃত্যের কাহিনী। এটি বিষ্ণুপ্রিয়াদের পার্বণিক আচারেরই অংশ। কবির ইচ্ছা ছিল রাসনৃত্য দেখার, কিন্তু ক্লান্তিবোধ করায় মণিপুরি ছেলেমেয়েদের সন্ধ্যায় তার বাংলোয় আসতে বলেন। তিনি আসার সময় মণিপুরি মেয়েদের তৈরি তাঁতের কাপড় কিনে নিয়ে আসেন।

সন্ধ্যায় মণিপুরি শিল্পীরা আসেন টমাস সাহেবের বাংলোয়। কবি তাঁদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। সেখানে মণিপুরি শিল্পীরা কবিকে বিখ্যাত রাসনৃত্য দেখান ও গান গেয়ে শুনান। কবি নৃত্য দেখে মুগ্ধ হয়ে তাঁদের ২০ টাকা পুরস্কার দেন। তিনি স্থির করেন, শান্তিনিকেতনের ছাত্রদের মণিপুরি নৃত্যশিক্ষার জন্য একজন শিক্ষক সঙ্গে নিয়ে যাবেন। কিন্তু দেশ ছেড়ে কোনো মণিপুরি নৃত্যগুরু তখন শান্তিনিকেতনে যেতে সম্মত হননি। পরে তিনি ত্রিপুরার মহারাজা বীরেন্দ্রমাণিক্য বাহাদুরকে অনুরোধ জানিয়ে নৃত্যগুরু বুদ্ধমন্ত সিংহকে শান্তিনিকেতনে নিয়ে যান। ১৯২০ সালের ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে বুদ্ধমন্ত সিংহ শান্তিনিকেতনে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। আশ্রমের শিক্ষার্থীরা আগ্রহ নিয়ে বুদ্ধমন্ত্রের কাছে নাচ শেখেন। তখন আশ্রমের মাসিকপত্র শান্তিনিকেতন-এর ১৩২৬ সালের ফাল্গুন সংখ্যায় সংবাদ প্রচার হয়, ‘ত্রিপুরাধিপতি মহারাজ বাহাদুরের দরবার হইতে দুইজন কলাবিদ আশ্রমে আসিয়াছেন। আশ্রম বালকেরা তাঁহাদিগের নিকট হইতে মৃদঙ্গ সহযোগে সাঙ্গীতিক ব্যায়াম শিক্ষা করিতেছে।’ এ সংবাদের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়, নৃত্যশিক্ষাকে অনেকেই ভালোভাবে নেয়নি। এ জন্য নৃত্যশিক্ষাকে ‘সাঙ্গীতিক ব্যায়াম শিক্ষা’ হিসেবে প্রচার করা হয়।

বাঙালির নৃত্যকলার উন্নয়নে কবি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯২৬ সালে স্বতন্ত্র নৃত্যকলা বিভাগ চালু করেন। পরবর্তী পর্যায়ে রবীন্দ্রনাথ তাঁর চিত্রাঙ্গদা, চন্ডালিকা, মায়ার খেলা, নটীর পূজা, শাপমোচন নৃত্যনাট্যে মণিপুরি নৃত্যের স্থান দেন। মণিপুরি নৃত্যকে তিনি বিশেষ পছন্দ করতেন। তাঁর পৃষ্ঠপোষকতার জন্য মণিপুরি নৃত্যকলা আজ ধ্রুপদী নৃত্য হিসেবে পৃথিবীব্যাপী প্রচারিত হয়েছে।

রবীন্দ্রনাথ মাছিমপুর পূর্বমন্ডপে গোপীনাথ জিউরত মন্দিরেই প্রথমবারের মতো মণিপুরি নৃত্য দেখেছিলেন। এ মন্দিরে প্রতিবছর রাসলীলাসহ অন্যান্য পার্বণিক উৎসব উদযাপন করা হয়। আজও মন্দিরটি আগের মতোই রয়ে গেছে। প্রায় দেড় শ বছরের পুরোনো চারচালা টিনের ছাউনি দেওয়া একখানি সাধারণ ঘর।

এখানে কবির স্মৃতি ধরে রাখতে বাংলাদেশ মণিপুরি সমাজকল্যাণ সমিতির বর্তমান সভাপতি গোপাল সিংহ কবি রবীন্দ্রনাথের একটি ভাস্কর্য স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছেন। ইতিমধ্যে বোম্বাই থেকে আবক্ষমূর্তি তৈরি করে আনা হয়েছে। ভাস্কর্যটি স্থাপনের জন্য ২০০২ সালে রমেন্দ্র সিংহ, বরেন্দ্র সিংহ, রথীন্দ্র সিংহ, রিংকু সিংহ মন্দিরের জন্য ১ শতাংশ জমি দান করেছেন। মন্দিরের সামনে একটি ভিতও তৈরি হয়েছে। গোপাল সিংহ জানিয়েছেন, মাত্র দুই লাখ টাকার সহযোগিতা পেলে আবক্ষমূর্তিটি স্থাপন করা সম্ভব হবে। রবীন্দ্রনাথের এ স্মৃতিটুকু সংরক্ষণ করতে পারলে মাছিমপুর রবীন্দ্রভক্তদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ স্থান হতে পারে।


সুত্র: দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত শেখ মেহেদী হাসানের রিপোর্ট
আরো পড়ুন: মণিপুরী নৃত্যকলার প্রসারে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অনবদ্য ভুমিকা, রবীন্দ্রনাথের গানে মণিপুরী সুর এবং অন্যান্য প্রসংগ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/kungothangblog/28994115 http://www.somewhereinblog.net/blog/kungothangblog/28994115 2009-08-15 12:31:43
পাবর্ত্য চট্টগ্রাম থেকে এক ব্রিগেড সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত
পাবর্ত্য শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে সেপ্টেম্বরের মধ্যে তিনটি পদাতিক ব্যাটালিয়নসহ একটি সম্পূর্ণ ব্রিগেড প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। একই সময়ে সেখানে স্থাপিত নিরাপত্তা বাহিনীর ৩৫টি ক্যাম্প প্রত্যাহার হবে।

বুধবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের বরাত দিয়ে আন্ত:বাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ কথা জানানো হয়।

সেনা প্রত্যাহার প্রসঙ্গে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরের পর পাবর্ত্য চট্টগ্রাম থেকে বিভিন্ন ধাপে নিরাপত্তা বাহিনীর মোট ২০০ টি ক্যাম্প প্রত্যাহার করা হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় সেখানকার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যালোচনা সাপেক্ষে সরকার আরও ৩৫টি ক্যাম্প ও ৩টি পদাতিক ব্যাটালিয়নসহ একটি সম্পূর্ণ ব্রিগেড প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয় এ প্রক্রিয়া 'অনতিবিলম্বে' শুরু হবে এবং চলতি বছরের সেপ্টেম্বরের মধ্যে শেষ হবে।

এতে আরো উল্লেখ করা হয়, ১৯৯৭ সালে শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরের পর এ পর্যন্ত পাবর্ত্য চট্টগ্রাম থেকে এটিই হবে সর্ববৃহৎ ও উল্লেখযোগ্য সেনা প্রত্যাহার।

আওয়ামী লীগ সরকারের এর আগের মেয়াদে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পাবর্ত্য শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর হয়।

আইএসপিআর এর সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে নিরাপত্তা বাহিনীর আসন্ন প্রত্যাহার পাবর্ত্যবাসীর কাছে সরকারের প্রতিশ্র"তি বাস্তবায়নে একটি 'মাইলফলক' হিসেবে বিবেচিত হবে বলে আশাবাদ প্রকাশ করা হয়। পাবর্ত্য শান্তি চুক্তির পূর্নাঙ্গ বাস্তবায়নে সরকার দেশবাসী বিশেষ করে পাবর্ত্যবাসীর আন্তরিক সহযোগিতা চেয়েছে জানিয়ে এতে বলা হয়, সরকার শান্তি চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নে বদ্ধপরিকর।


প্রতিক্রিয়া
এ বিষয়ে শান্তিবাহিনীর রাজনৈতিক সংগঠন 'জনসংহতি সমিতির' চেয়ারম্যান সাবেক গেরিলা নেতা সন্তু লারমার সঙ্গে তার রাঙামাটির বাসভবনে ঢাকা থেকে যোগাযোগ করা হলে তার সচিব জানান, 'তিনি বিশ্রাম নিচ্ছেন।'

শান্তি চুক্তির বিরোধিতাকারী ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্্রন্ট সমর্থিত বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের সভাপতি রিকো চাকমা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, "সরকার অনেক কিছুই করছে। তবে এসবই লোক দেখানো। যতদিন না পর্যন্ত কাজে বাস্তবায়িত না হচ্ছে ততদিন বিশ্বাস করা যায় না।"

তিনি বলেন, "আমরা মনে করি আওয়ামী লীগ সরকার যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিষয়টি যেভাবে জিইয়ে রেখেছে এ বিষয়টিও তেমনিভাবে জিইয়ে রাখবে।"


ঢাকা, জুলাই ২৯ (বিডিনিউজ টায়েন্টিফোর ডটকম )]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/kungothangblog/28985910 http://www.somewhereinblog.net/blog/kungothangblog/28985910 2009-07-29 23:20:52
অণুগল্প || জোনাকি
ভাবতে ভাবতে সে বিছানায় যায়, শুয়ে পড়ে। একটু পরেই স্বপ্নে দেখা যায় বোতলের জোনাকিরা ছেড়ে দেবার জন্য আকুলি বিকুলি করছে। দলং রাজী হয় না। তারপর ঘটে যায় কান্ড। ঝাঁক ঝাঁক জোনাকি এসে বোতলের চারপাশে জড়ো হয় ঝলমলে আলো নিয়ে। তারা বোতলের চারপাশে একবার চক্কর দেয়, তারপর উড়ে যায় আকাশের দিকে, দুগ্ধধারার মতো।

তারা দেবতাদের রাজার কাছে গিয়ে বোতলবন্দি জোনাকিদের মুক্তি দাবী করে। খানিকক্ষন পরেই দেখা যায় রাজা বৃষ্টির দেবতাকে দিয়ে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামাচ্ছেন। শীত শীত লাগে দলং এর। কোনদিন যা হয়নি, সেই অভিজ্ঞতা হয় তার। কেমন একটা উষ্ণ ভেজা ভেজা ভাব জাগে শরীরে।

চমকে উঠে সে ঘুম ছেড়ে বিছানায় উঠে বসে। মাকে জাগিয়ে বলে, মা জোনাকির দল বিছানা ভিজিয়ে দিয়েছে। মা উঠে দেখে গায়ে চাদর নেই। পরনের কাপড় আর চাদর ভিজে গেছে। মা মুচকি হেসে বলে, তোকে না বলেছি জোনাকিপোকা ধরতে নেই. দেবতাদের অভিশাপ লাগে।

এবার উঠে পড়ে সে। ধীরে ধীরে বোতলটা বের করে মুখ খুলে দেয়। একটার পর একটা বের হতে থাকে জোনাকির দল । দলং চেয়ে থাকে অপলক।


________________________________________________
সংক্ষিপ্ত লেখক পরিচিতিঃ শ্রীকান্ত সিংহ একই সঙ্গে একজন চিত্রশিল্পী, কবি ও গল্পকার। জন্ম ১৯৫৭ সালে করিমগঞ্জের শিংলায়। প্যারবল বা অণুগল্প লিখে থাকেন। চিত্রকল্পের দিকেই তার মনোযোগ বেশী। মিথ নিয়ে কাজ করেন এবং গল্পের মধ্যে কবিতা ও চিত্রকল্পের মোটিফ ব্যবহার করেন। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থাবলী - নংকুপীর জুরন(১৯৮৬), জঙা বেলী(১৯৯৫)।

বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষায় মুল গল্পটির নাম 'জিনজিনি'।

সূত্র: মণিপুরী সাহিত্য সংগ্রহ / শুভাশিস সিনহা
অনুলিখন: কুঙ্গ থাঙ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/kungothangblog/28984758 http://www.somewhereinblog.net/blog/kungothangblog/28984758 2009-07-27 22:55:22
সত্তর দশকের বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী কবিতা ধনঞ্জয় রাজকুমার
আ মা র ক বি তা

এক.
নিজেদের নিষ্ঠুর যন্ত্রনার অস্তিত্ব আমরা অস্বীকার করতে পারিনা। এবার তাহলে আমাদের হৃৎপিন্ড ফালি করা ফোটা ফোটা রক্ত দিয়ে কবিতা লিখবো। গভীর রাতে দুঃস্বপ্নের ভেতরে আমরা চিৎকার করে উঠি। কবিতা তুমি বিশুদ্ধ, তুমি পবিত্র, তুমি আমার ঘৃণা - মৃত্যু - পাপ - ঈশ্বর। ঈশ্বরের সাথে তুলনা করতে যেয়ে দেখি আমি কতখানি নিম্নজ, কতখানি অসহায়। আমাকে অংহকারী কর। আমি লিখি কবিতা, আমার জন্যে চাঁদের জোৎস্নার মতো সহস্র রমনী দরকার। তাদের নিয়ে থাকার বিলাসভুমি - প্রেম, পবিত্রতা, আমার নবতর পুণর্জন্ম। হ্যালো - হ্যালো - হ্যালো - লাইন আউট অব অর্ডার...

দুই.
ট্রেনের হুইশেল, মোটরের হর্ণ, প্লেনের শব্দ, ঘড়ির এলার্ম, তিনশ এগারো টাইপ রাইটারের খটখটখটখটখট, হাত থেকে পড়ে ভেঙে যাওয়া কাপ, রেডিওর ষ্টেশন খুঁজার শব্দ, আত্মহত্যার আগের নিঃশব্দতা, রক্তের কণায় অসহ্য চিৎকার মুক্তি মুক্তি, উত্তরন উত্তরন, হাজার হাজার বছরের কবিদের কবিতা পড়া আমার বুকে লাবডাব - লাবডাব - লাবডাব -

তিন.
ঈশ্বরের সাথে তুলনা করে দেখি আমি এখনো নিম্নজ। লাবডাব - লাবডাব - লাবডাব। সিস্টার দয়া করে আমার মুখে থার্মোমিটার দিন, আমার বুকে একবার কান পেতে শুনুন, হাতের নাড়ী দেখুন, কতখানি কষ্ট পেয়েছি আমি, কতখানি যন্ত্রনার মৃত্যুর হাতে ধরে আমি কবিতার কাছে আত্মসমর্পন করেছি - সব লিখে রাখুন। আমার নিঃসঙ্গতার কবিতায় কার কঠিন নিয়তির মতোন স্থির নিস্তব্ধ মুখ, নিরুত্তাপ হাত? কি করলে - কি করলে আমার যন্ত্রনা এবং নারী এবং ঈশ্বরের সাথে তাবৎ কথোপকথন কবিতায় বিকশিত হবে? হে ঘড়ির কাঁটা, তুমি তো টিকটিকটিকটিকটিক - একটু জিরোও - আমাকে একটু সময় দাও, আমি কবিতার সাথে একটু সময় ঘুমোবো...

চার.
হে আমার নিঃসঙ্গতা! আমার আত্মা! আমার পবিত্রতা! আমার পূণ্য! আমার পাপ! আমার ঈশ্বর! আমার কবিতা।

|| ধনঞ্জয় রাজকুমার আধুনিক বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী কবিতার জনক। লেখালেখি করছেন ষাটের দশক থেকে। আশির দশক এবং তৎপরবর্তী কবিদের অধিকাংশ অনুসরন করেছেন তার পদাংক। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ : "হপনর বাবুয়ানি", "ডিগল হাতহানল মোরে", "ভিক্ষা দেনে এর আহিগিতৌ", "হমাজি গাটর পানি", "বিরহী যক্ষর এলা" ইত্যাদি। এই কবিতাটি ১৯৬৭ সালে প্রকাশিত "ডিগল হাতহানল মোরে" কাব্যগ্রন্থ থেকে নেয়া ||
_____________________________________________

মদনমোহন মুখোপাধ্যায়
অ নু রো ধ

ফুলের বসন্ত এলে তোমার দুয়ারে
নিমন্ত্রন দিয়ো না আমাকে।

আজকের ভ্রমরটি সেদিন অবধি
সেদিনের গান করতে গিয়ে
তাল-ছন্দ চমৎকার কিছু গীতিকায়
যদি তার ভুল হয়ে যায়
ক্ষমা করে দিয়ো ভালবেসে
ভালবেসে তার গান শুদ্ধ করে দিয়ো

ফুলের বসন্ত এলে তোমার দুয়ারে
নিমন্ত্রন দিয়ো না আমাকে।
তোমার ঐ বসন্তের কালে
আমার সম্মানে রাখা আসনখানির কথা ভাবতেই
অন্য এক ভয় ঢুকে গোপনে শরীরে
তবুও তোমার কাছে আকুল প্রার্থনা
ঘৃণার ওপারে গিয়ে তবুও ভোলো না

ফুলের বসন্ত এলে তোমার দুয়ারে
নিমন্ত্রন দিয়ো না আমাকে।

|| কবি মদনমোহন মুখোপাধ্যায়ের জন্ম আসামের শিংলায়। গত শতাব্দীর চল্লিশের দশকে লেখালেখি শুরু । উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ: রঙ ফিরক, তেন্না ককক্ , ঠইগ। কবিতাটি অক্টোবর, ১৯৬৫ সালে প্রকাশিত 'ঠইগ' কাব্যগ্রন্থ থেকে নেয়া ||
_____________________________________________

সেনারূপ সিংহ
ফো টা র তৃ ষ্ণা য়

তোমার উদ্যানে আমি ফোটে উঠবো সখী
শেফালি ও বকুলের মতোন
আলো কিবা অন্ধকারে দেখো অন্তহীন
ডালি ভরে ঝরবো অবিরত।

তোমারই আলোয় আমি আলোকিত মালা
গলায় শরীরে বেঁধে রেখে
মোহিত করে তুলবো তোমাকে ধীরে ধীরে
ঘ্রান মেখে হৃদয়পদ্মের ।

|| সেনারূপ সিংহ বিষ্ণুপ্রিয়া ষাটের দশকে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী কাব্য আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা। জন্ম কাছাড়ের মোহনপুর। কবিতার পাশাপাশি গানও লিখেছেন প্রচুর। প্রকাশিত কাব্যগন্থ: চিরবিরি বৌ খা, শাতনির তৌরাঙ, আনৌপী। এই কবিতাটি জুন, ১৯৬৮ সালে প্রকাশিত 'শাতনির খৌরাঙ' কাব্যগ্রন্থ থেকে নেয়া ||
_____________________________________________

ছবিঃ শক্তিকুমার সিংহের স্কেচে মণিপুরী রাসের শ্রীরাধিকা

আরো কিছু বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী কবিতার অনুবাদ
* সাতজন সমকালীন বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী কবির কবিতা
* ধনঞ্জয় রাজকুমারের তিনটি বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী কবিতার অনুবাদ
* তিনটি বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী কবিতার অনুবাদ ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/kungothangblog/28960823 http://www.somewhereinblog.net/blog/kungothangblog/28960823 2009-06-06 02:09:01
সুহাসিনী দাস আর নেই
গত শতাব্দীর ত্রিশের মধ্যভাগ সিলেটের যে সাধারণ গৃহবধূটি পারিবারিক গন্ডি অতিক্রম করে যুক্ত হন অহিংস গান্ধীবাদী ধারার সাথে, সেই সাধারণ বধূটিই পরবর্তীকালে বিপ্লবী আন্দোলনের অগ্নিকন্যা সুহাসিনী দাস। ১৯৪২ সালে কংগ্রেসের নেতৃত্বে 'ভারত ছাড়' আন্দোলনে কারাবরণ করেছেন এই মহিয়সী নারী। ১৯৪৬ সালে সাধারণ নির্বাচনে কংগ্রেসের প্রার্থীদের পক্ষে কাজ করলেন। নোয়াখালীর দাঙ্গা উপদ্রুত এলাকায় মহাত্মা গান্ধীর সাহচর্য লাভ করার সুযোগও হয়েছে তাঁর। ১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগের পর তাঁর সুযোগ ছিল ভারতের নাগরিকত্ব নিয়ে সেখানে স্বাধীনতা সংগ্রামী হিসেবে নানা সুবিধা লাভের। কিন্তু তা না করে দেশের টানে রয়ে গেলেন সে সময়ের দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্র পাকিস্তানে।

১৯৪৭ উত্তর পাকিস্তানে কংগ্রেস রাজনীতির ক্ষীণধারাকে বেগবান রাখার ক্ষেত্রে তিনি বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করলেন। উল্লেখ্য ভাষা আন্দোলনে রাজনৈতিকভাব কংগ্রেস ধারার অবদান আছে। পার্লামেন্টে বাংলা ভাষার পক্ষে প্রথম যুক্তিপূর্ণ বক্তব্য রাখেন কংগ্রেস নেতা ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। আপন প্রতিভায় সুহাসিনী সাধারণ এক গৃহবধূ থেকে সক্রিয় কংগ্রেস কর্মী এবং পরবর্তীকালে নেত্রী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। কুলাউড়ার রঙ্গিরকুল পাহাড়ে ইংরেজ আমলে কংগ্রেস কর্মীরা এক আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এই আশ্রমের সাথে যুক্ত ছিলেন পূর্নেন্দু কিশোর সেনগুপ্ত, নিকুঞ্জ বিহারী গোস্বামী, দুর্গেশদেব প্রমূখ। এরা সবাই এক কালের প্রথিতযশা কংগ্রেস নেতৃবৃন্দ। কালক্রমে সুহাসিনী দাস সেই আশ্রমেরই অধ্যক্ষার দায়িত্ব নেন। বিশেষ করে ১৯৭১ সাল মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন দুর্যোগময় দিনগুলোতে তিনি তাঁর প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়ে আশ্রমটিকে রক্ষা করেছিলেন। স্বাধীনতার পর সক্রিয় রাজনীতি ছেড়ে যুক্ত হন সমাজ সেবায়। বিশেষ করে নারীদের স্বাবলম্বী করার ক্ষেত্রে পালন করেন বিশেষ ভূমিকা। ১৯৭৩ সালে তিনি ভারতের রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে স্বাধীনতা সংগ্রামী হিসেবে সংবর্ধিত হন। তখনো তাঁর সুযোগ ছিল সসম্মানে সেখানে থেকে যাওয়ার। কিন্তু তা-না করে তিনি ছুটে এসেছেন দেশের দু:খী অসহায় মানুষদের পাশে। বঞ্চিত নিপীড়িত মানুষকে শুনিয়েছেন অভয়বাণী। বিশাল বিষয় সম্পত্তির অধিকাংশই বিলিয়ে দিয়েছেন মানুষের কল্যাণে। দেশ ও দেশের মানুষের জন্য উত্‍সর্গ করেছেন তাঁর সারাজীবন।

স্যালুট অগ্নিকন্যা সুহাসিনী দাসকে।


সহায়ক লিংক:
অগ্নিকন্যা সুহাসিনী দাসের সংক্ষিপ্ত জীবনী
ভানুবিল কৃষক প্রজা বিদ্রোহ - অগোচরে থেকে যাওয়া প্রান্তিক লড়াই এর ইতিহাস
ছবির জন্য কৃতজ্ঞতাঃ দীন মোহাম্মদ শিবলী]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/kungothangblog/28958016 http://www.somewhereinblog.net/blog/kungothangblog/28958016 2009-05-31 00:49:37
গোপীচাঁদ সিংহের মনশিক্ষা ও দেহতত্ত্বের গান বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী কাব্যসাহিত্যের মুল্যবান নিদর্শন। অষ্টাদশ শতকে বৈষ্ণব ধর্মের বলয়ে আসার পর থেকে মণিপুরী দের সাহিত্য, সংস্কৃতি ও শিণ্পকলা প্রবলভাবে বৈষ্ণবদর্শন দ্বারা প্রভাবিত হয়। শ্রীচৈতন্যর ভক্তি আন্দোলন মণিপুরে পৌঁছলে তৎকালীন বাংলা অঞ্চল থেকে বঙ্গদেশ-পালা নামে একশ্রেণীর কীর্ত্তনভিত্তিক নৃত্যগীত সেখানে বিস্তার লাভ করে। এর সাথে মণিপুরীদের নিজস্ব সুর, তাল, রাগ-রাগিনী এবং তারসাথে নিজস্ব বাদ্যযন্ত্র যেমন পুঙ, করতাল, মঞ্জিলা, মাঙকাঙ, সেলবঙর, মইপঙ ইত্যাদির সমন্বয় সাধন করে মণিপুরী পালার নিজস্ব একটি ফর্ম প্রবর্তিত হয়েছিল। বৈষ্ণবধর্মের প্রভাবে জয়দেব, গোবিন্দদাস, জ্ঞানদাস, কৃষ্ণদাস প্রমুখের রচিত বৈষ্ণবপদাবলী তুমুল জনপ্রিয়তা পায়। সে সময় ব্রজবুলি, মধ্যযুগীয় বাংলা, সংস্কৃত বা মৈথিলী ভাষায় রচিত এসব পদাবলী কীর্ত্তনগুলো সাধারন মণিপুরী শিল্পী ও পালাকারেরা অর্থ না বুঝেই গাইতো। বৈষ্ণব সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে পৃষ্ঠপোষকতায় এগিয়ে আসেন মণিপুরী রাজারা । বৈষ্ণবধর্ম মণিপুরের রাজধর্মের মর্যাদা লাভ করে। পরবর্তীতে মণিপুরী 'অজা' বা গুরুরাও নিজেদের ভাষা বাদ দিয়ে বাংলা- ব্রজবুলিতে পালা ও গীতরচনা শুরু করেন। বর্তমানে মণিপুরী রাসলীলা য় যেসব গান গীত হয় সেগুলোর অধিকাংশ বাঙালী বৈষ্ণবপদকর্তাদের রচিত গান - মধ্যযুগের বাংলা, ব্রজবুলি নয়তো মৈথিলী ভাষায়। বিংশ শতকের প্রথমভাগে মণিপুরীদের মধ্যে জাতিগত চেতনার পুনর্জাগরন ঘটলে মণিপুরী গুরুরা আবার নিজেদের ভাষায় গীতরচনার দিকে মনোযোগ দেয়।

রাসলীলা, নটপালা, বাসকসহ অন্যান্য কাব্যগীতাশ্রয়ী পালার মতোই মনশিক্ষা বা দেহতত্ত্বের গানগুলোর দার্শনিক ভিত্তি বৈষ্ণবিজম। তবে এই গানগুলোর বিশেষত্ত্ব হলো ধর্মীয় আচারের বাইরে এসে মণিপুরী চিন্তক ও সাধারনের লোকাচার চর্চার নিজস্বতার মধ্য দিয়ে স্বাতন্ত্র্য রূপ লাভ। এগুলোর সাথে আবহমান বাংলার বাউল, সুফী ও মারফতী ধারার যথেষ্ঠ মিল খুঁজে পাওয়া যায়।

পুরাণ ও ধর্মগ্রন্থের শিক্ষাকে লোকাচারের সাথে সমন্বয় ঘটিয়ে মাতৃভাষার বাইরে বাংলা বা বৈষ্ণব পদাবলী ও কীর্ত্তন রচনার ধারাটি বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরীরা আজো অক্ষত রেখেছে। এসব পদকর্তা বা পালাকারের বেশীর ভাগেরই কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই, নেই বাংলা বা ব্রজবুলি ব্যকরনের উপর প্রাথমিক ধারনা। তাই ভাষাগত সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও কেবল গুরুপরম্পরায় প্রাপ্ত জ্ঞানের উপর ভিত্তি করে তারা মণিপুরী সুরের উপর ভাব-রস-ছন্দ অব্যহত রেখে অবলীলায় লাইনের পর লাইন বাংলা ও ব্রজবুলি কথামালা যেভাবে সাজিয়ে যান, ভাবতে অবাক লাগে। এখানে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী 'ইসালপা' বা পালাকার গোপীচাঁদ সিংহের একটি মনশিক্ষা ও একটি দেহতত্ত্বের গান হুবহু পত্রস্থ করা হলো।


মনশিক্ষা - ২১

ধনী কি গরীব সুখী বুঝা অতি বিষম দায়।
কোন ধনেতে কেবা সুখী অভাবে কেবা দুঃখী হায়।।
ধনে সুখী বিদ্যায় সুখী পুত্রে সুখী বিশ্বময়।
চিরসুখের চিন্তাধারা করিছে সেই সুখী সর্বদা নয় ।।
ভবের মুক্ত সুখী গুরু শ্রীহরির চরন লভিছে যেই।
আপন ভোলা জন্ম মৃত্যু এই জগতে সত্য সুখী সেই।।
দীন গোপীচাঁদে কহে মানব জন্মে পড়িল ছায়।
মানবাকৃতি ধরি জীবে হায় সাজ'তে বিষম দায়।।


দেহতত্ত্ব - ১৪

রংমহল কল কব্জার ঘর দেহ কলেবর।
দেখনা চেয়ে পর্দা খুলে কিবা আছে তার ভিতর।।
লক্ষ নাড়ি সারি সারি, মাংস পেশী জড়াজড়ি।
রাঙা রোধির তার ভিতরে স্রোতে বৈছে নিরন্তর।।

অস্থি মজ্জা জোড়াজাড়া, মধ্যে আছে পেরাক মারা।
কব্জায় কব্জায় নারা-চারা তারি মধ্যে কারিগর।।
ব্রহ্মান্ডেরই দুই জ্যোতিস্ক অতি যত্নে করে দৃষ্ট।
নাসারন্দ্রে রেচক কুম্ভক সাধনেতে রূপান্তর।।

হৃদি পদ্ম সিংহাসনে বসে আছেন নিরঞ্জন।
যোগী ঋষি মুনিগনে না পায় ভজে নিরন্তর।।
দীন গোপীচাঁদে বলে গণার দিন ফুরায়ে গেলে।
কল কব্জা সব অচল হবে দেহ হবে স্থানান্তর।।

_____________________________________________



গোপীচাঁদ সিংহের জন্ম মৌলবীবাজার জেলার কমলগঞ্জের ডালুয়া নামের প্রত্যন্ত গ্রামে, বাংলা ১৩৩৮ সনে। ছোটবেলা থেকেই নাটকের প্রতি প্রবল আগ্রহ ছিল তাই নাটকের দল গড়েছেন। নিজে নাটক লিখেছেন, অভিনয় করেছেন। ১৯৭১ সালের পর বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও পাকিস্তানিদের বর্বরতার চিত্র তুলে ধরে লিখেন "বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ" নামের পালাগীতির পুস্তিকা। প্রকাশিত গ্রন্থ: গীতিকাব্য (২০০৫)। বৈষ্ণব পদাবলী, পালা, কীর্ত্তনের গান রচনা ও সুরারোপে সমান দক্ষ এই গুণী শিল্পীর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই বললেই চলে। কেবল পিতা ভদ্র সিংহ ও পিতামহ দঙ্গ সিংহের কাছ থেকে পাওয়া জ্ঞান ও বিদ্যাটাই পুঁজি।

তথ্যসূত্রঃ
* Dr M. Kirti singh / Religious Developments in Manipur,1980
* N. Tomba Singha / Bhakti Rasa Numbumari, Imphal, 1969
* তরুন কুমার সিংহ / মণিপুরী নৃত্য প্রবেশিকা, ১৯৬৮
* গায়ত্রী চট্টোপাধ্যায় / ভারতের নৃত্যকলা, ১৯৯৫]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/kungothangblog/28949521 http://www.somewhereinblog.net/blog/kungothangblog/28949521 2009-05-12 00:48:20
আদিবাসী শিশুর কি অধিকার নেই নিজ মাতৃভাষায় পড়ার?
পাহাড়ি আদিবাসী শিশুরা ঘরে যে ভাষায় কথা বলে স্কুলে গিয়ে সে ভাষার দেখা পায় না। স্কুলকে ভিনদেশি ভুবন মনে হয়। পাঠ্যসুচিকে মনে হয় ‘দুরের শোনা গল্প’। তাদের হাতে তুলে দেওয়া বইতে নিজের চারপাশের পরিচিত কোনো কিছুর দেখা তারা পায় না। বইগুলো তাদের কাছে হয়ে ওঠে অচেনা সংস্কৃতির আধার; নিজের ভাষার কথাবার্তা নেই সেখানে, নেই সহপাঠী বন্ধুদের চেহারা।

বাংলাদেশে কমবেশি ৪৫টি আদিবাসী ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর বাস। এর মধ্যে পার্বত্য অঞ্চলে রয়েছে চাকমা, মারমা ত্রিপুরাসহ ১১টি আদিবাসী পাহাড়ি জনগোষ্ঠী। রাষ্ট্রীয়ভাবে পার্বত্য অঞ্চলটি (রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান) ‘উপজাতি’ বা আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চল হিসেবে স্বীকৃত। ১৯৯৭ সালের পার্বত্য শান্তি চুক্তিতেও (খন্ড ক, ধারা-১) এর উল্লেখ রয়েছে। পার্বত্য শান্তিচুক্তি অনুযায়ী পাহাড়ি শিশুদের মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষাদানের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে (পার্বত্য চুক্তি, খন্ড: খ, ধারা: ৩৩-খ-২)। পার্বত্য শান্তিচুক্তির এক যুগ পূর্তি হতে যাচ্ছে। ১৯৯৭ সালে যে শিশুর জন্ন হয়েছে, এখন তার বয়স ১২ বছর। নীতিনির্ধারকদের অবহেলায় ১২ বছরেও কেন পার্বত্য অঞ্চলের শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষা নিশ্চিত করা গেল না, এ প্রশ্নের কী জবাব দেবে ক্ষমতার কেন্দ্রে বসে থাকা বাঙালি শাসক দল? নিজের মাতৃভাষা রক্ষার জন্য যে বাঙালি লড়াই করেছে, তারাই কেন আবার নিজের দেশের অন্য ভাষাভাষীর মর্যাদা দিতে অনাগ্রহী? অনাদর আর অবহেলায় বাংলাদেশে অনেক ক্ষুদ্র জাতি-গোষ্ঠীর মানুষের মাতৃভাষা হারিয়ে যেতে বসেছে।

শিক্ষার যাত্রাপথকে মসৃণ করতে হবে। শিশুশিক্ষার প্রধান বাহন হচ্ছে মাতৃভাষা। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার শুরুতেই মাতৃভাষা ব্যবহারের অন্যতম লক্ষ্য, শিশুকে নিজের ভাষায় বলতে ও বুঝতে সক্ষম করে তোলা। মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ পেলে একজন শিশুকে নতুন ভাষা শেখার চাপ সইতে হয় না। সে সহজেই সবকিছু রপ্ত করতে পারে। মাতৃভাষায় যেটা সম্ভব, নতুন কোনো ভাষায় তা সম্ভব নয়। ‘নানান দেশের নানান ভাষা/বিনে স্বদেশী ভাষা, পুরে কি আশা’? মধ্যযুগের কবি রামনিধি গুপ্তের এই কথার আবেদন ও উপযোগিতা এখনো কি প্রাসঙ্গিক নয়?

একবারও কি আমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালিরা ভাবতে পারি, আমার শিশুটিকে ভিনদেশি অচেনা কোনো ভাষায় (ধরা যাক জাপানি, চীনা, জার্মান বা রুশ ভাষায়) ফুল পাখির নাম কিংবা ছড়া পড়তে হচ্ছে? নিশ্চয় নয়। নিজের সন্তানের জন্য যা সত্য, অন্যের জন্য তা কেন আমরা মানতে চাইব না। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই কথা তো বহুল উচ্চারিত ‘আগে চাই মাতৃভাষার গাঁথুনি, তারপর...’।

বৈসু-সাংগ্রাই-বিজু উপলক্ষে স্থানীয় একটি অনুষ্ঠানে ত্রিপুরা ও বাংলায় চমৎকার সব গান পরিবেশন করলেন মৌসুমী ত্রিপুরা। তিনি কমলছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। মাতৃভাষা ভিন্ন অন্য ভাষায় যোগাযোগ যে একজন শিশুর জন্য কতটা পীড়াদায়ক হতে পারে, তা তা জানা গেল মৌসুমী ত্রিপুরার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার একটি গল্প থেকে। “ক্লাসে আমি একটা ছড়া পড়াচ্ছিলাম। এক পাহাড়ি শিশু কাছে এসে বলল, ‘আমি প্রচেষ্টা করিবো’। চেষ্টা করবে তো ভালো কথা, করো। ছেলেটি আবার বলল, ‘প্রচেষ্টা করিবো’। বুঝলাম কোথাও সমস্যা হচ্ছে। বললাম, তোমার নিজের ভাষায় বলো। ছেলেটি ত্রিপুরা। ত্রিপুরাদের মাতৃভাষা অর্থাৎ ককবরক ভাষায় বলার পরে বুঝলাম ‘প্রচেষ্টা’ নয়, ছেলেটি আসলে ‘প্রস্রাব’ করতে চায়।”

স্কুলে এসব ছোটখাটো সমস্যার কথাও একজন পাহাড়ি শিশু ঠিকভাবে বলতে পারে না, কারণ সে তো বাড়িতে বাংলায় কথা বলে না, ফলে সে তখন স্কুলের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। কিছুদিন পরে সে স্কুল থেকে ঝরে পড়ে।

এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ভাষাগত সমস্যার কারণে আদিবাসী শিশুরা প্রাথমিক শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ে প্রায় ৬০ শতাংশ, যেখানে জাতীয়ভাবে ঝরে পড়ার হার ৩০ শতাংশ। শিক্ষার প্রধানতম মাধ্যম ভাষা। শিক্ষাজীবনের শুরুতে কোমলমতি শিশুদের দুর্বোধ্য ও অচেনা ভাষায় পড়াশোনা করতে হলে তা সহজে তাদের বোধগম্য হয় না। এতে করে শিশুর মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। তার মধ্যে স্কুলের প্রতি এক ধরনের অনীহা তৈরি হয়।

পার্বত্য জনপদের মানুষ নানাভাবে বৈষ্যমের শিকার। বৈষম্য আর পশ্চাৎপদতার দেয়াল ভাঙতে পারে কেবল শিক্ষা। কিন্তু সেই শিক্ষার শুরুটা যদি হয় অন্য ভাষায়, তাহলে তাতে আনন্দ থাকে না, থাকে না সঠিক মনোযোগ।


একই বিষয়ে আরেকটি পোস্টঃ আদিবাসীদের মাতৃভাষাকে টিকিয়ে রাখতে সরকারসহ সকলের আন্তরিকতা প্রয়োজন

_____________________________________________
ফিরোজ জামান চৌধুরীর পাহাড়ে শিশুশিক্ষা: আগে চাই মাতৃভাষার গাঁথুনি লেখা থেকে সংক্ষেপিত।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/kungothangblog/28943836 http://www.somewhereinblog.net/blog/kungothangblog/28943836 2009-04-28 22:50:20
বিষু উৎসবঃ বর্ষবরণ নানান জাতিতে নানান রূপে আগামীকাল সূর্যোদয়ের পরপরই শুরু হবে মণিপুরীদের বিষু উৎসব। বাংলাদেশের মৌলবীবাজার, সিলেট, হবিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জ জেলার মণিপুরী বসতিগুলোতে চৈত্র মাসের শেষ দিন থেকে সাতদিন ব্যাপী এই উৎসব পালিত হয়। এই উৎসবের মাধ্যমে পুরাতন বছরকে বিদায় এবং নতুন বছরকে স্বাগত জানানো হয়। মণিপুরী বিষ্ণুপ্রিয়ারা বছরের শেষ দিনটিতে 'বিষু' বা 'চেরৌ' আর মণিপুরী মৈতৈরা 'শাজিবু চৈরৌবা' উৎযাপন করে। আর এ দিনটিই পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমাদের কাছে 'বিঝু', মারমাদের নিকট 'সাংগ্রাই', ত্রিপুরাদের 'বৈসুক' এবং অসমীয়াদের 'বিহু' এবং বাঙালীদের কাছে 'চৈত্র সংক্রান্তি'।

মণিপুরীদের বিষু উৎসব
বছরের শেষ দিনটিতে মণিপুরীরা সুর্যোদয়ের আগেই ঘরদোর, ঘরের চারপাশ এবং ঘরের যাবতীয় ব্যবহার্য বস্ত্র আসবাবপত্র পরিস্কার পরিচ্ছন্নতার কাজ সেরে ফেলে। তুলসীপাতা ভেজানো পানি ছিটিয়ে ঘর এবং বসতভিটা 'পবিত্র' করার পর রান্নাবান্না শুরু হয়। রান্না মানে অসংখ্য পদের নিরামিষ রান্না। এরপর লৌকিক দেবতা "আপোকপা" এবং কুলদেবতা "লামরদৌ" এর উদ্দেশ্যে ভোগ নিবেদন করাতে হয়। আগে একশ আটটি রান্না ভোগ দেয়ার প্রচলন ছিল, এখন সবক্ষেত্রে তা সম্ভব হয়না। ভোগ নিবেদনের পর চলে সম্প্রীতির নিদর্শন হিসাবে ঘর থেকে ঘরে রান্না করা খাবার বিনিময়ের পালা। সন্ধ্যায় তৈরী হয় নানান জাতের পিঠা। মণিপুরী লেইসাঙ বা মন্দিরগুলো আরতি, পালা, কীর্তন ও মৃদঙ্গের শব্দে মুখরিত হয়ে উঠে। কোথাও কোথাও বসে ঐতিহ্যবাহী নৃত্য এবং গানের আসর। রাতভর চলে তরুণ তরুনীদের ঐতিহ্যবাহী নিকন (বিশেষ ধরনের পাশাখেলা), গিল্লা, লাকাটি ইত্যাদি নানান খেলা। বিষুর দিনটিতে যারা গ্রামের বাড়ীর বাইরে থাকেন তাদেরকে বাড়ী ফিরে আসতে হয়, আর যারা গ্রামের বাড়ী থাকেন তাদের বাইরে যাওয়া বারন। বিষুর দিনে কারো কাছ থেকে ধারকর্জ করা নিষেধ, অন্যথায় বছরের বাকী দিনগুলো ধারদেনার ডুবে থাকতে হতে পারে বলে মণিপুরীদের বিশ্বাস।



চাকমাদের বিঝু
চৈত্র মাসের শেষ দুইদিন ও বৈশাখ মাসের প্রথম দিন, এই তিনদিন চাকমা সমাজে বিঝু উৎসব পালিত হয়। বিঝু উৎসবের প্রথম দিনটি হলো ফুল বিঝু। এদিন ছোট বড় সবাইকে ভোরে ঘুম থেকে উঠে স্নান করতে হয়। ছোটরা পাহাড় থেকে ফুল পাতা লতা সংগ্রহ করে নিজের বাড়ীঘর সাজায়। তরুণ তরুণীরা বয়োবৃদ্ধদের স্নান করিয়ে আশীর্বাদ গ্রহন করে। বৌদ্ধমন্দিরে বুদ্ধমুর্ত্তি স্নান করানো হয় এবং মন্দিরের চারপাশে আলোকবর্ত্তিকা সাজিয়ে পুজা দেয়া হয়। এদিন চাকমারা অন্য কোন কাজ করেনা। বছরের শেষ দিন হলো মুল বিঝু। এদিন ঘরে ঘরে পাজন রান্নার আয়োজন চলে। এছাড়া চালের পিঠা, বিরনধানের খই, তিলের মোয়া ইত্যাদিও তৈরী করা হয়। সবাই বাড়ী বাড়ী ঘুরে বিঝুর খাবার খেয়ে আসে। এজন্যে কোন নিমন্ত্রনের দরকার পড়ে না। বিকেলে ঐতিহ্যবাহী নৃত্যগীত ও খেলাধুলার আসর থাকে। আর বিঝু উৎসবের শেষ দিনটি অর্থাৎ নতুন বছরের প্রথম দিনটি হলো গোজ্যাই-পোজ্যা দিন। গোজ্যাই পোজ্যা মানে গড়াগড়ি খাওয়া। এদিন হলো বিঝুর খাবার খেয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তুলতে তুলতে বিছানায় গড়াগড়ি খাওয়া, মানে বিশ্রাম। বছরের প্রথম দিনটি ভাল ভাল খাবার খেয়ে আনন্দে আরাম আয়েসে কাটানো গেলে বছরের বাকী দিনগুলোও ভালভাবে কাটবে বলে চাকমাদের বিশ্বাস। বিঝুর তিন দিনে চাকমারা কোন প্রাণীহত্যা করেনা।



ত্রিপুরাদের বৈসুক
পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের ত্রিপুরা জনগোষ্ঠি পুরোনো বছরেকে বিদায় এবং নাতুন বছরকে স্বাগত জানায় বৈসুক উৎসবের মাধ্যমে। ভুড়ি ভোজের আসরের মধ্যে নাচ গানের মাধ্যমে ধর্মীয় দেবতা শিবের অনুগ্রহ মাগে ত্রিপুরারা। বৈসুক উৎসবের তিনটি পর্ব - ১. হারি বৈসুক, ২. বিষুমা বৈষুক ও ৩. বিসিকাতাল। হারি বৈসুক বছরের শেষ দিনের আগের দিন। এদিন গরু, মহিষ, ছাগল ইত্যাদি গৃহপালিত পশুর গলায় ফুলের মালা পরানো হয়। এদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে ফুল সংগ্রহ করে পুজা এবং শুভেচ্ছা বিনিময়ের পালা চলে। পরদিন হলো বৈসুক উৎসবরে মুলপর্ব বিষুমা বৈসুক। এদিন 'কচুই পানি' বা পবিত্র পানি দিয়ে ঘরদোর পরিস্কার করা হয়। ঘরে ঘরে মদ, পিঠাপুলি ও নানান পদের রান্নার আয়োজন এবং অতিথি আপ্যায়নের চলে। বছরের প্রথম দিনটিতে বিসিকাতাল। ছোটরা বয়োজ্যেষ্টদের স্নান করিয়ে প্রনাম করে আশীর্বাদ নেয়। বৈসুক উৎসবের ছয়-সাতটি দিন গ্রামে গ্রামে পরিবেশিত হয় ত্রিপুরাদের ঐতিহ্যবাহী 'গরাইয়া নৃত্য'।



মারমাদের সাংগ্রাই
পুরাতন বছরের শেষ তিনদিন এবং নতুন বছরের প্রথম দিন এই চারদিন মারমা জনগোষ্ঠি সাংগ্রাই উৎসব পালন করে। চারদিনের পর্ব্বগুলো হলো যথাক্রমে - সাংগ্রাউ আকিয়ানিহ্ , সাংগ্রাই আক্রাইনিহ্, সাংগ্রাই আতানিহ্ এবং লাছাইংতারা। প্রথম দিনে ছোটবড় সবাই শোভাযাত্রা করে বুদ্ধমুর্তিকে নদীর ঘাটে নিয়ে আসে। তারপর কলাপাতার তৈরী ভেলায় বুদ্ধমুর্তিকে চন্দনসিক্ত পানি ও দুধ দিয়ে স্নান করানো হয়। সাংগ্রাই উৎসবের পরবর্তী দুইটি দিন মারমা সমাজের পাড়ায় পাড়ায় আয়োজন করা হয় পানি খেলা। একে অন্যেকে পানি ছিটিয়ে মারমারা পুরোনো বছরের সব দুঃখ গ্লানিকে ধুয়ে মুছে শেষ করতে চায়। নতুন বছরের প্রথম দিনটি মারমারা হাসি আনন্দে তাদের ঐতিহ্যবাহী সাংগ্রাই আকা নৃত্যগীত দিয়ে বরন করে। এদিন পানিখেলা হয়না।



অসমীয়াদের বিহু
বিহু হলো অসমীয়া বা অহম জনগোষ্ঠির সর্ববৃহৎ উৎসব। বিহু উৎসবের সাথে অসমীয়াদের কৃষিনির্ভর সমাজ ব্যবস্থার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। বছরে তিনটি বিহু পালিত হয় - বোহাগবিহু, কাতিবিহু ও মাঘবিহু। বোহাগবিহুর সময় ধানের বীজ বোনা হয়, কাতিবিহুতে চারগাছ রোয়া হয় আর মাঘবিহুতে ধান কেটে গোলায় তোলা হয়। তিনটির মধ্যে বোহাগবিহু সবচেয়ে বেশী গুরুত্বপুর্ণ। একে রঙালীবিহুও বলা হয়। চৈত্র মাসের শেষ দিন থেকে শুরু হয় রঙালিবিহু। এদিন গৃহপালিত গরুকে বাড়তি আদরযত্ন করা হয়। গরুকে হলুদ আর তেল দিয়ে মাখিয়ে ফুলের মালা পরিয়ে সাজানো হয় এবং খোলা মাঠে ছেড়ে দেয়া হয়। ছোটরা বড়দের জন্য লাল পাড়ের গামছা উপহার দেয়। পুরো বৈশাখ মাস জুড়ে অসমীয়া সমাজে চলে বিখ্যাত এবং জনপ্রিয় বিহুর গান ও নাচ।



বিষুর উৎপত্তি ও বিকাশ
সংস্কৃত "মহাবিষুব" শব্দ হতে "বিষূ" শব্দটির উৎপত্তি বলে ধারন করা হয়। আসামের প্রখ্যাত পুরাতত্ত্ববিদ রাজমোহন নাথের ভাষ্য অনুসারে "দ্বিষু" অর্থ্যাৎ যেদিন বিষুবরেখা সূর্যালোক দ্বারা দ্বিধাবিভক্ত হয় সেই দিনটি বিষু। আর ড. প্রফুল্ল দত্ত গোস্বামীর মতে সংস্কৃত শব্দ বিষুবন থেকে শব্দটির উৎপত্তি। বিষুর আভিধানিক অর্থ সাম্য বা সমতা। বিষুবরেখার সমবিভক্তি ও দিনরাত্রির দৈর্ঘ্যের সমতা বাংলাদেশের প্রান্তিক ও অবহেলিত জনদের জীবনধারায় এসে সামাজিক সংহতি ও সাম্যের রূপ নিয়েছে। বিষু সবার দু:খ-কস্ট আনন্দ-বেদনা হতাশা-বঞ্চনা ভাগাভাগি করার দিন। ভারতবর্ষের পশ্চিমে পাঞ্জাবে "বৈশাখী" উৎসব, দক্ষিনে কেরালায় গিয়ে "ভিজু", এরপর দেড়হাজার কিলোমিটার পথ পেরিয়ে বাঙালীর "চৈত্র সংক্রান্তি", আসামে এসে অসমীয়াদের "বিহু", মণিপুরী বিষ্ণুপ্র্রিয়াদের "বিষু", চাকমাদের নিকট "বিঝু" এবং ত্রিপুরীদের নিকট "বৈসুক" হবার নেপথ্যে কারণ অবশ্যই কাকতালীয় হতে পারেনা। তবে কি সুদুর অতীতে ইতিহাসের কোন এক সময়ে এইসব জাতিগোস্টির পুর্বপুরুষদের মধ্যে কোনরূপ পারস্পরিক নৈকট্য বা যোগাযোগ ছিল?

সবাইকে বিষু উৎসবের শুভেচ্ছা। নতুন বছর সবার জীবনে আনন্দ ও আশার বার্তা বয়ে আনুক।



ছবি ( ক্রম অনুসারে):
১. বিষু বা চৈরৌবা উৎসবে বিভিন্ন পদের রান্না
২. লৌকিক দেবতার উদ্দেশ্যে ভোগ
৩. চাকমাদের ঐতিহ্যবাহী বিঝু নৃত্য
৪. বৈসুক উৎসবকালীন ত্রিপুরাদের ঐতিহ্যবাহী গরাইয়া নৃত্য
৫. মারমাদের পানি খেলা
৬. অসমীয়াদের বিহু নাচ
৭. মণিপুরীদের নিকনখেলা নিয়ে আর.কে. চন্দ্রজিৎ সিংহের পেইন্টিং

সহায়তাঃ
১. R.M. Nath, The Background of Assamese culture, 2nd Edn, 1978
২. G.K. Ghosh, Tribals and their culture in Manipur and Nagaland, 1985

বিষু উৎসব সম্বন্ধে আরো পড়ুন:
* The festival of Bishu
* The Biggest Festival of Bishnupriya Manipuri: Bishu ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/kungothangblog/28937686 http://www.somewhereinblog.net/blog/kungothangblog/28937686 2009-04-13 21:12:19
বুড়ো-বুড়ি ও শেয়ালের গল্প : একটি বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী লোকগল্প
সামনে কচুমুখি লাগানোর সময়। বুড়োবুড়ি ঠিক করলো বাড়ির পেছনের ছোট্ট জমিতে মুখির চাষ করবে। বুড়োবুড়ি দুজনে কোদাল নিয়ে কাজে লেগে গেল। পাশের জঙ্গলের এক দুষ্ট শেয়াল সেদিন বাড়ির পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। বুড়োবুড়ির কচু লাগানো দেখে শেয়ালের মাথায় দুষ্ট বুদ্ধি খেলে গেল। সে বুড়োবুড়ির কাছে গিয়ে বলল, তোমরা করছো কি? এভাবে লাগালে তো বড়ো হতে মেলা সময় লাগবে। কচুমুখি একদিনে বড় করার নিয়মটাও দেখি শেখোনি! বুড়োবুড়ি আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইল, নিয়মটা কি? শেয়াল বিজ্ঞের মতো জবাব দিল, নিয়মটা হলো প্রত্যেক বীজের সাথে একটা করে টাকি মাছের মাথা, এক মুঠো ভাত আর একটা করে চ্যাপাশুটকি লাগাতে হবে। এমনি করে লাগালে একদিনেই দেখবে কচু কেমন বড়ো হয়ে গেছে। বুড়োবুড়ি ছিল খুব সরল প্রকৃতির। তারা শেয়ালের কথা বিশ্বাস করে তার কথামতো বাড়ী থেকে ভাত, টাকিমাছ ও শুটকি যা ছিল সব এনে বীজের সাথে লাগিয়ে খুশীমনে বাড়ী ফিরে গেল।

রাত গভীর হলে শেয়ালের দল জঙ্গল থেকে এসে কচুবীজের সাথে লাগানো সব খাবার চেটেপুটে খেয়ে নিল আর শিয়ালসর্দারের বুদ্ধির প্রশংসা করতে লাগলো। এরপর তারা জঙ্গল থেকে বড় বড় বুনো কচু উপড়ে এনে জায়গামতো লাগিয়ে চলে গেল। পরদিন ভোরে কচুক্ষেতে গিয়ে বুড়ো তো অবাক। এত বড় বড় কচু, তাও একরাতের মধ্যেই! বুড়ো দৌড়ে ছুটে গিয়ে বুড়িকে জানালো। দুজনেই শেয়ালের তারিফ করতে লাগলো।

বুড়ো কাস্তে দিয়ে কয়েকটা কচুশাক কেটে বুড়ির হাতে দিয়ে বলল, আজ নতুন কচুশাকের তরকারি রাধঁবে। আমি শেয়ালদের নেমতন্ন করে আসি। বুড়ো শেয়ালদের নতুন কচুশাক খাবার নিমন্ত্রন করতে গেলে শেয়ালসর্দার বলল, আজ থাক। তোমরাই খেয়ে নিও। বুড়ো গোসল করে বাড়ী এসে দেখে বুড়ির রান্না শেষ। দুজনে আয়োজন করে খেতে বসলো। বাড়ীতে পালিত বেড়াল এবং কুকুরকেও ভাগ দেয়া হলো। হঠাৎ কুকুর খেতে খেতে ঘেউ ঘেউ করে ডেকে উঠলো। বেড়ালও ম্যাঁও ম্যাঁও শুরু করে দিল। কি হয়েছে জিজ্ঞেস করার আগেই বুড়োর গলায় বুনো কচুশাকের কেরামতি শুরু হয়ে গেছে। বুড়িও চুলকানিতে অস্থির হয়ে জোরে জোরে চিৎকার করা শুরু করলো, ও মাগো ও বাবাগো, গলা চুলকাতে চুলকাতে মরে গেলাম গো! বুড়োবুড়ি অবশেষে বুঝতে পারলো দুষ্ট শেয়াল তাদেরকে ঠকিয়েছে । সবাই মিলে ঠিক করলো এর একটা বিহিত করতে হবে। দুষ্ট শেয়ালের দলকে সমুচিৎ শিক্ষা দিতে হবে।

পরের রাতে বুনো কচুশাক খেয়ে বুড়োবুড়ির কি দশা হলো দেখার জন্য শেয়ালের দল বাড়ির পাশে জড়ো হলো। টের পাওয়া মাত্র আগে থেকে করা পরিকল্পনা অনুসারে বুড়ো বাড়ির উঠোনের কোণে তুলসীতলায় মরার মতো শুয়ে পড়ে থাকলো আর বুড়ি, বেড়াল ও কুকুর তিনজনে মিলে বিকট স্বরে কান্না শুরু জুড়ে দিল। শেয়ালের দল প্রথম প্রথম ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেও পরে কৌতুহলী হয়ে কি হয়েছে কি হয়েছে বলে উঠোনে জড়ো হলো। বুড়োকে মরার মতো পড়ে থাকতে দেখে শেয়ালের সর্দার ভারিক্কি গলায় বলে উঠলো, হা করে দেখছিস কি? যা একটু সেবাযত্ন কর। শিয়ালের দল কাছে যেতেই হাতের কাছে লুকোনো লাঠি দিয়ে বুড়ো উঠে দাঁড়িয়ে হুংকার ছাড়লো, আমার যথেষ্ঠ সেবাযত্ন করেছো বাছারা, এবার তোমাদের একটু সেবাযত্ন করতে দাও! এই তোরা কে কোথায় আছিস? ...সংগে সংগে বুড়ি মগুর নিয়ে, বেড়াল আর কুকুর তাদের নোখ থাবা নিয়ে শেয়ালদের উপর ঝাপিয়ে পড়লো...

চতুর্মুখী আক্রমন চললো, - ডুপ ডাপ! ধাম ধুম! ঠুস ঠকাস! ঘেউ ঘেউ!

শেয়ালের দল কি আর সেখানে দাড়াঁয়? ঠ্যাং ভেঙে, ঘাড় ভেঙে যে যেদিকে পারে ছুট লাগালো। সবচেয়ে শোচনীয় অবস্থা শেয়ালসর্দারের। তার লেজ ছিঁড়ে গেছে আর লেজ ছিড়ে যাওয়া মানেতো শেয়ালসমাজে ভীষন লজ্জার কথা। অপমানে দুঃখে শেয়ালসর্দার দশগ্রাম পার হয়ে বিরাট এক গর্তে সেই যে ঢুকলো, আর বেরোয়নি।


* গল্পটি ছোটদের সামহোয়্যার ইন গ্রুপের জন্য

____________________________________________
বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী বাংলাদেশের প্রায় ষাট হাজার মানুষের মাতৃভাষা। এ ভাষায় যারা কথা বলে তাদের কাছে ভাষাটি ‘ইমার ঠার’ নামে পরিচিত যার অর্থ হলো ‘আমার মায়ের ভাষা’। ভাষাটির সমৃদ্ধ প্রাচীন ও আধুনিক সাহিত্য রয়েছে। মুলত শিশুদের বিনোদনের জন্য লোকমুখে রচিত লোকগল্পগুলো বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী প্রাচীন সাহিত্যের গুরুত্তপুর্ণ দিক। গল্পগুলো থেকে মণিপুরীদের প্রাচীন সমাজব্যবস্থা ও জীবনধারার পরিচয় পাওয়া যায়। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/kungothangblog/28933277 http://www.somewhereinblog.net/blog/kungothangblog/28933277 2009-04-03 23:05:50
আমাদের সামনের রাস্তায় যেদিন থেকে বাস চলা শুরু করলো...
এভাবে ঘুম থেকে উঠার আগে পোঁ পোঁ ইত্যাদি শব্দ চিৎকারের নতুন উপনিবেশে জীবনে নতুন মাত্রা এনে দিল, আমাদের কয়েকজন বন্ধু প্রথম কয়েকদিন এমনি এমনি বাসে উঠতো, তারপর গ্রামের শেষমাথায় এসে “ড্রাইভার লামাও! ও ড্রাইভার” বলে তড়িৎ গতিতে নেমে যেতো আর ফিরে আসার পথ হাত-পা শরীর দুলিয়ে “মেরা পিয়া ঘর আয়া...” গাইতে গাইতে ...

পার্শ্ববর্তী তিলকপুরের জনৈক ব্যক্তির শ্রাদ্ধে যোগ দেবার উদ্দেশ্যে নতুন ফেইচুম পাঞ্জাবী পরিহিত কুঞ্জ খুড়া দৌড়াতে দৌড়াতে সড়কে উঠে কোনরকম বাসে উঠার জন্য পা তোলার সময় ফেইচুমের কোণায় পা দিয়ে ফেললেও সম্ভাব্য লজ্জাকর দুর্ঘটনা থেকে এ যাত্রায় রেহাই পেয়ে যান। তবে স্বল্পবয়সী এক তরুণী যে প্রায় ড্রাইভারের কাছ ঘেঁষে বসেছিল, সে খুড়ার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসি দিতেই কুঞ্জ খুড়া ভেতরে ভেতরে জ্বলে উঠেন ‘নির্লজ্জ মেয়েছেলে, মিয়াঙের সাথে কেমন গা ঘেষে বসেছে, হুহ্!’। সিটে বসার পর হাতের বামপাশে বসা লালরাঙা নারীটিকে দেখে তিনি চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলেন (সেকথা পরে গল্পচ্ছলে আমাদের বলেছিলেন)। এমনই তিনি, এভাবেই বয়ান করে যান জীবনের ছোট বড় নানান অভিজ্ঞতার কথা; এর কিছুদিন বাদে আমাদের বুঝতে কষ্ট হয়না - তার বখে যাওয়া কুপুত্রকে এরকম একটি বাসের ড্রাইভার বানানোর স্বপ্ন দেখা শুরু করেছেন তিনি। আমরাও স্বপ্ন দেখা শুরু করি, তবে তার পুত্রকে নিয়ে নয়, আমাদের নিজেদের জন্যে, আচ্ছা আমরাও তো দেখতে পারি; আদমপুর বাজার টু মৌলভীবাজার বাসের ষ্টিয়ারিং ঘুরাতে ঘুরাতে “মেরা পিয়া ঘর আয়া...”, আহ্ !

কিন্তু বাসের চারটি চাকা আদমপুর থেকে ভানুগাছ, ভানুগাছ থেকে মৌলভীবাজার, মাঙখেইমাঙ থেকে তিলকপুর এবং তিলকপুর থেকে ঘোড়ামারা পৌঁছে দিচ্ছিল। মাত্র ৩/৪ টাকায় এই সেবার মাধ্যমে আমরা অর্থনৈতিকভাবে উপকৃত হলেও এ সেবার মাধ্যমে আমাদের আর কি কি উন্নয়ন ঘটতে পারে সে সম্বন্ধে প্রথম প্রথম আমাদের তেমন ধারনা ছিলনা। যদিও বাসস্ট্যান্ডে উঠতি তরুন সম্প্রদায়ের ব্যস্ততা দিন দিন বেড়েই চলেছিল, এবং কালো চশমা হাই হিল জুতাওয়ালী দু'একজন অচিনপুরের স্বর্গ থেকে ইন্দ্রাভিশপ্ত অপ্সরার মতো নেমে আসলে তাদের চোখের তারা কেঁপে উঠছিল। আমাদের কুমাড়া সেরকম একজনকে দেখার পর বাড়ী ফিরে জ্বর বাঁধিয়ে বসে। জ্বর তীব্র হলে তার মুখ থেকে নিঃসৃত আশ্চর্য রসদগ্ধ বাক্যরাশির লজ্জায় ও অপমানে, শিয়রে বসা জননী চোখে অন্ধকার দেখেন। আমরাও দেখি, আপসোসে, ইস কেন আমরা দেখলাম না , আমরা কয়েকজন তখন থেকে রোজকার ডিউটি ঠিক করে ফেলি পিয়া ঘর আয়া ... এবং আমাদের মধ্যে যাদের পুরোনো প্রেমিকা ছিল, নিঃসঙ্গ দুপুরে উরুৎ ফুরুৎ বাসগুলোর দিকে তাকিয়ে তারা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলা শুরু করলো।

আর রাস্তাঘাটে এপথ বেয়ে নতুন নতুন চিন্তা-গল্প-হা-হুতাশের বাতাস বয়ে যায় আর আমরা ক্রমশ সমাজবিবর্তনের সেবক, প্রকাশক, প্রচারক হয়ে উঠি। আমাদের দু’একজনের মামাবাড়ী ডালুয়া বা এরকম বাস-যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন কিছূ প্রত্যন্ত গ্রামে হওয়ার কারণে আরো কিছু জিনিষ পরিস্কার হয়ে আসে। তাদের অনেকে পুরোনো দিনে মামাবাড়ী যাবার পথে পায়ে হাঁটার, রিকশায় চড়ার দারিদ্রিক ব্যবস্থার নস্টালজিক মহত্ত্বের তত্ত্ব তুলে আমাদেরকে খোঁচা দেয়- সত্যি বলতে কি ওদিকে কোনদিন বাস যায়নি, বলা ভাল বাসস্ট্যান্ড বলে কিছু নেই সে গ্রামগুলোতে। বাস থামলে নতুন নতুন উপনিবেশের মালপত্র, ল্যাগেজ, ঘড়ি, চশমা, পারফিউম কিছুই নামেনা সে পথগুলোতে। পোঁ পোঁ শব্দ নেই, উথাল পাথাল বাতাসও নেই; আমরা যারা ‘পোঁ পোঁ’র কাছে, ‘পিয়া ঘর আয়া’র কাছে বিনোদিত হই, রক্তের ভেতরে আরেকর রক্তের নাচনে শিহরিত হই, তাদেরকে রহস্যময় আলো-আধারের ধোঁয়ায় তীরবিদ্ধ করে তারা বলে- “মামাবাড়ীর উঠোনে পা রাখতেই চারপাশে থেকে বন্ধু বান্ধবদের ছুটে আসার সে কী নমুনা, আত্মীয় পরিজনদের যেভাবে কুশলাদি জিজ্ঞাসা করার সে কী নমুনা, কী মায়া, কী টান, কী আনন্দ আহ্ ...... ।”

ততোদিনে আমাদের সামনের রাস্তাটি বাস সড়কে বিবর্তনের অনেক দিন কেটে যায়। আর আমাদের মধ্যে যাদের মগজে আঁচড় কাটতে কাটতে হঠাৎ হঠাৎ সাদা সাদা কাগজেও আঁচড় কাটার অভ্যাস ছিল, তাদের পঞ্চেন্দ্রিয়ের বাইরে আরেক ইন্দ্রিয় যেটি ইশ্বরের কাছ থেকে গোপনে তথ্য পাচার করতো সম্ভবত তারই কল্যানে বুঝতে শুরু করলো, সমাজ জীবনে কিছু একটা ঘটে চলেছে। ২০/৩০ হাতের তুচ্ছ এই যানবাহনগুলো কিভাবে এই জনপদে নতুন অবতার হিসাবে আবির্ভুত হলো... অবশ্য খুশী কিম্বা আনন্দেরও কমতি নেই, পথগুলো দিন দিন ছোট হয়ে আসলে চারিদিকে সব চেনা-অচেনা রেখাগুলো ঝাপসা হয়ে আসে, আমাদের নিজেদের মধ্যে দেখাসাক্ষাতের হার কমে যায়। আর কষ্ট কম আর সময় বাঁচে বলে আমরা কাটাঁঘেরা বাগানে গোলাপের রূপ গন্ধসুধায় বিভোর হয়ে বাসের স্পীকারের সাথে সুর মিলিয়ে যাই ... দিল নে ধড়কে লাগা ....

হঠাৎ কোনদিন দুর্ঘটনায় দু’একজন আহত হলে বেশ চিন্তায় পড়ে যাই, ভাবি আমাদের মতো ধীরগতির সমাজে বাসগুলোর এতো দ্রুত চলা মনে হয় ঠিক নয়। যতই দিন যায় এভাবে আলাদীন বাসগুলোতে চড়তে চড়তে আশ্চর্য মানুষ, পোকামাকড়, যাদু, বিষ, মধু, শব্দ, সুর, বর্ণ, গন্ধ আমাদের ঘরে ঘরে মনে মনে মগজে মগজে প্রবেশ করা শুরু করে। রক্তের কোষে মগজের কোষে চোখের দৃস্টিতে তা ছড়িয়ে পড়লে আমার আরো গভীর চিন্তায় পড়ে যাই – এ কিভাবে সম্ভব? আমাদের ফসলের রঙ বদলে যায়, গানের সুর বদলে যায়, কথার শব্দ, ভালবাসার নমুনা বদলে যায়, আমাদের ফাগুনের বাতাসে অচেনা স্পর্শ । আমাদের রাত্রির গল্পগুলোতে অন্যরকম গল্পের অনুপ্রবেশ ঘটে। আমাদের জমি হাওরের কাদায় পড়ে থাকে মাছের লাশ, আমাদের ভিটায় পাখীরা আর ডাকেনা, আমাদের বৃদ্ধা কৃষাণীর কোমরে গামছার বাঁধন খুলে গেলে আমরা ভাবতে বসি, কষ্ট করে কোমরে গামছা বাঁধার আবশ্যকতা কি?

একদিন 'ক' নগরে ৩ জন মানুষ মারা গেলে 'খ' নগরে মারা যায় ৭ জন। একদিন 'গ' নগরে কোন নারী লাঞ্ছিত হলে 'ঘ' নগরে কোন অফিস পুড়িয়ে ফেলা হয়। একদিন 'ঙ' দেশের কেউ চ দেশে গিয়ে সোনার পদক জিতে এলে 'ঞ' দেশের লোকজন সেই পদক দুর থেকে দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে, আর আমাদের গোয়ালঘরে বিকেলের ছায়া পড়ে। দোকানগুলোতে টেবিলের আকার বাড়ে, টেবিলে চায়ের কাপের সংখ্যাও বাড়ে। অনেকে আবার চা’য়ে চিনি কম দেবার কথা বলা শুরু করে “চিন্তায় চিন্তায় ডায়াবেটিস বাধিয়ে ফেলেছি, সাবধান না হয়ে উপায় আছে?”

একেকদিন আবার আমাদের কেউ কেউ, নিজেদের বাড়ীঘরে চৌর্যশিল্প চর্চার কল্যানে নতুন পোষাক গায়ে দিয়ে বের হই আর বেদিশা বাসগুলোতে চড়ে বসি- তারপর ‘পিয়া ঘর আয়া’ শুনতে শুনতে আবারো একবার বেদিশা চক্কর দিয়ে আসার পর মনে হয় আমাদের চোখ মগজ জিভ যেন তিনবার এদিক-ওদিক পাক খেয়ে আসলো। পথে নানান কথাবার্তা জ্ঞানগর্ভ আলোচনার সূত্র ধরে ভাবতে বসি, ‘আমাদেরকে আসলে আধুনিকতায় দীক্ষা নিতে হবে’। ভাবতে ভাবতে আধুনিকতার উপরে বসানোর জন্য সেরকম রক্তসম্পর্কের আরেকটি শব্দ খুঁজে খুঁজে গলদঘর্ম হয়ে ভাবি, আসলে বাসের চারটি চাকার কাজ কি কি, আসলে বাসে চড়ে আমরা প্রকৃতপক্ষে কোথায় যাই, বাস কি প্রকৃতপক্ষে আমাদের গন্তব্যে যাচ্ছে নাকি আমরাই বাসের গন্তব্যে যাতায়াত করছি? ভাবতে ভাবতে একদিন ঘুম থেকে উঠে পথে বের হয়ে কিছুক্ষন হাঁটার পর রোজকার মতো সেদিন পোঁ পোঁ শব্দ না শুনে চিন্তায় পড়ে যাই, পড়তে পড়তে শুনি ‘আজ বাস বন্ধ’। বাসগুলো কেন বন্ধ হয়, কেন আমরা কোথাও যেতে চাইলে বাসগুলো আমাদের কথামতো পোঁ পোঁ শব্দে আমাদের সামনের রাস্তায় এসে দাঁড়ায় না, কেন জায়গায় জায়গায় থামেনা? আমরা গভীর চিন্তায় পড়ে যাই। তারপর একদিন এ রহস্য ভেদ করে ফেলি, কিন্তু ততোদিনে আমরা যাবতীয় পুরোনো চিন্তা মাথা থেকে বের করে দিয়ে আরেক চিন্তায় মগ্ন হয়ে পড়ি....

চিন্তা করতে করতে মান্ডপে যাই। পালির পুঁথিপাঠ শাস্ত্রতত্ত্ব মাথার একহাত উপর দিয়ে গেলে ঘরে ফিরে টেলিভিশন চালু করি। টেলিভিশনের ঝলমলে পর্দায় বাস এবং বাসের চেয়ে ২০/৩০ গুন লম্বা কোন ট্রেনের সর্পিল গতিতে আঁকাবাঁকা কুঁ.. উ.. উ.. ঝিক ঝিক.. কুঁ.. উ.. উ.. ঝিক ঝিক ছুটে চলা দেখে অতীতের সমস্তকিছুকে বিস্মৃত করে বিদ্যুচ্চমকের মতো আমাদের মগজের কোষে আরেক উত্তরাধুনিক চিন্তার উদয় হয়, নতুন আফসোস জাগে, “আহা! আমাদের সামনের রাস্তায় কোনদিন কি ট্রেন চলা শুরু হবে?”



* ফেইচুম - ধুতির মণিপুরী সংস্করন
* মিয়াঙ - অমণিপুরী
* কুমাড়া - জনৈক তরুনের নাম
* ডালুয়া - একটি গ্রামের নাম
* মান্ডপ- মণিপুরীদের সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানের কেন্দ্র
* পালি - ধর্মগ্রন্থ থেকে পাঠ ও বাখ্যার আসর

গণ্পকারঃ শুভাশিস সিনহা সমীর। বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষার কবি, গণ্পকার ও নাট্যকার। জন্ম বাংলাদেশের মৌলভীবাজার জেলায়। প্রকাশিত গ্রন্থাবলী : ছেয়াঠইগির যাদু(২০০২), সেনাতম্বীর আমুনিগৎতো সেম্পাকহান পড়িল অদিন (২০০৩), নুয়া করে চিনুরি মেয়েক (২০০৫), রবীন্দ্রনাথের রুদ্রচন্ড(২০০৭), মণিপুরী সাহিত্য সংগ্রহ -১ম ও ২য় খন্ড(২০০৭) ইত্যাদি।

বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী থেকে অনুবাদঃ কুঙ্গ থাঙ । মুল গল্পটি প্রকাশিত হয়েছিল বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষার লিটলম্যাগ গাওরাপা, নভেম্বর ১৯৯৯ সংখ্যায়। মুল গল্পের লিংক এখানে ।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/kungothangblog/28924453 http://www.somewhereinblog.net/blog/kungothangblog/28924453 2009-03-15 01:24:46
বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরীদের ভাষা আন্দোলনের কথা বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী। তামিল ও কন্নাড়া ভাষাকে প্রাদেশিক ভাষা করার দাবীতেও আন্দোলন হয়েছে, তবে কেবল বাংলা ও বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষার আন্দোলন পুরোপুরিভাবে জাতিগত অস্তিত্তের সাথে সম্পর্কিত ছিল। বাংলার মতোই বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরীদেরকে তাদের মাতৃভাষার স্বীকৃতির জন্য কঠিন সংগ্রাম করতে হয়েছে। সেই সংগ্রামে অনেক রক্ত ও প্রাণ ঝরেছে এবং সে সংগ্রাম ছিল বাংলা ভাষা আন্দোলনের চেয়েও দীর্ঘতর। মাতৃভাষার সাংবিধানিক স্বীকৃতি ও মাতৃভাষায় শিক্ষার দাবীতে ভারতের আসাম ও ত্রিপুরা রাজ্যে গত শতকের পঞ্চাশের দশক থেকে প্রায় অর্ধশত বছর ধরে সংঘটিত হয়েছে এক রক্তক্ষয়ী আন্দোলন। সেই আন্দোলনের চরম পর্যায়ে পুলিশের গুলিতে আত্মাহুতি দিয়েছিল সুদেষ্ণা সিংহ নামের এক বিদ্রোহী তরুণী।

বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী নামে পরিচিত ভাষিক সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠির আদিভূমি হলো ভারতের উত্তর পুর্বাঞ্চলের মণিপুর নামের একটি রাজ্য। অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথম ভাগ থেকে নানান রাজনৈতিক এবং সম্প্রদায়গত সংঘর্ষের কারণে এবং বিশেষ করে ১৮১৯-১৮২৫ সনে সংঘটিত বার্মা-মণিপুর যুদ্ধের সময় ব্যাপক সংখ্যক মণিপুরীর অভিবাসন ঘটে পার্শ্ববর্তী রাজ্য আসামের কাছাড়, ত্রিপুরা এবং বাংলাদেশে। অভিবাসী মণিপুরীদের মধ্যে বলতে গেলে সবাই মৈতৈ, বিষ্ণুপ্রিয়া এবং পাঙন(মণিপুরী মুসলিম) সম্প্রদায়ের [১]। বিষ্ণুপ্রিয়াদের ভাষার নাম বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী এবং মৈতৈদের ভাষা মৈতৈ বা মীতৈ। মণিপুরে প্রায় ত্রিশটিরও বেশী বৈচিত্রময় জাতির মানুষের বাস হলেও সেখানে মৈতৈরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। মৈতৈ ভাষা সেখানে লিঙগুয়া ফ্রাংকা। ইমফাল, বিষ্ণুপুর ও নিংথৌখঙের বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী যারা ছিল তারা প্রায় সবাই মৈতৈ ভাষা গ্রহন করার ফলে মণিপুরে বিষ্ণুপ্রিয়া ভাষা প্রায় বিলুপ্তির পথে। তবে ভারতের সাম্প্রতিক সেন্সাস থেকে মণিপুরের জিরিবাম অঞ্চলে কয়েক হাজার বিষ্ণুপ্রিয়ার পরিসংখ্যান পাওয়া যায়।

ভারতের মণিপুরসহ বরাক ও ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় বরাবর একটি আন্ত:জাতিগত দ্বন্দ্ব আছে কে মণিপুরী আর কে মণিপুরী নয় তা নিয়ে। ভারতের মণিপুর অঞ্চলেই বিষ্ণুপ্রিয়া বা মৈতৈ পরিচিতির বা ভাষার উদ্ভব। যদিও বিষ্ণুপ্রিয়া এবং মৈতৈ এই দুইটি জাতিকে বরাবর রাষ্ট্রীয় নথিপত্র ও দলিল দস্তাবেজে ‘মণিপুরী’ হিসেবে দেখানো হয়। ভারতের ভাষানীতির ভিত্তি স্যার জর্জ গ্রিয়ারসনের ‘লিংগুস্টিক সার্ভে অব ইন্ডিয়া’ গ্রন্থে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরীদের স্পস্টভাবে ‘বিষ্ণুপুরীয়া মণিপুরী’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে [২]। তার পরেও এসব অঞ্চলগুলোর রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম বরাবর এই আন্তঃজাতিগত দ্বন্দ্ব থেকে নানান ফায়দা নিতে চায়। আর তা হচ্ছে কৌশলে ভাষিক সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ভাষা ও জাতিগত অস্তিত্বকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি ও সমমর্যাদা না দেয়া।


মাতৃভাষার আন্দোলন আর সেন্সাসের সহায়তায় রাস্ট্রের প্রতারনা
আসাম ও ত্রিপুরায় বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষার স্বীকৃতির আন্দোলন দানা বাঁধে ১৯৫০ সন থেকে। ১৯৫৫ সনে মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা চালুর দাবীর দাবীতে 'নিখিল বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী মহাসভা'র উদ্যোগে ভাষা পরিষদ গঠিত হয় এবং ভাষার অধিকারের দাবীতে আন্দোলন শুরু হয়। ভাষিক সংখ্যালঘু বিষয়ক কমিশনসহ নানান রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের সঙ্গে পত্র ও স্মারকলিপিসহ নিয়মতান্ত্রিক মাধ্যমে বারবার বৈঠক হয় বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী নেতৃবৃন্দের, পরবর্তীতে তা ব্যাপক গনআন্দোলনের রূপ নেয়[৩]। কিন্তু সরকারের ঔদাসীন্য, ছলচাতুরী ও নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার কারণে দুটি রাজ্যেই প্রাণের দাবী মুখ থুবড়ে পড়ে বারংবার। জনগনের নায্য দাবীকে ব্যর্থ করতে ভারত সরকার সেন্সাস রিপোর্টের গণনায় প্রতারনার আশ্রয় নেয় [৪]।



ক. ভারতের ১৯৫১ সনের সেন্সাস রিপোর্ট অনুযায়ী সমগ্র ভারতে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী জনসংখ্যা হলো ১১৪ জন (মণিপুর রাজ্য), অথচ এর ৬০ বছর আগে ১৮৯১ সনে স্যার জি.এ. গ্রীয়ার্সন মণিপুর রাজ্য এবং সিলেট জেলায় প্রায় ২৩,০০০ বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরীর অস্তিত্বের কথা উল্লেখ করেছিলেন।

খ. ১৯৬১ সনের ভারতীয় সেন্সাসে আসাম রাজ্যের বরাক উপত্যকার করিমগঞ্জের পাথারকান্দিতে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরীদের জনসংখ্যা মাত্র ১ জন নারী দেখানো হয়, অথচ সেখানে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরীদের জনসংখ্যা ছিল ২২,০০০ এরও বেশী। ত্রিপুরায় কমপক্ষে ২০,০০০ বিষ্ণু্প্রিয়া মণিপুরীর বিপরীতে গননা করা হয় মাত্র ১১ জন পুরুষ। আর বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরীদের ঘনবসতিপুর্ণ অঞ্চল কাছাড়ের প্রায় ৬৬,০০০ এর জায়গায় ধরা ১৫,১৫৫ জন।

গ. ১৯৭১ সালে পাথারকান্দির জনসংখ্যা দেখানো হয়েছে ১০,১৬৪ জন। অর্থাৎ ১ জন নারী ১০ বছরে কোন পুরুষের সহায়তা ছাড়াই ১০,১৬৪ জন্মদান করেছে! আবার নারীহীন ত্রিপুরায় ১৩ জন পুরুষ ১০ বছরে জন্ম দিয়েছে ৯৮৮৪ জনের!

রাষ্ট্রের এইসব উদ্ভট ও হাস্যকর জনপরিসংখ্যানিক দলিল থেকে আমরা ধারণা করতে পারি প্রান্তিক জাতি বিষয়ে রাষ্ট্র কি ধরনের মনোযোগ ও উদ্যোগ বহাল রাখে।


বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষা আন্দোলনের সংক্ষিপ্ত ঘটনাপঞ্জী (১৯৫৫-১৯৯৬)
সত্যাগ্রহ আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৯৬১ সালের ২ জুলাই ভাষা পরিষদ ভাষা দাবী দিবস পালন করে। ১৯৬৫ সালের ২-৮ জুলাই ভাষা দাবী সপ্তাহ পালন করা হয়। ১৯৬৭ সালের ২ জুলাই দাবী সপ্তাহ ১২ দিন দীর্ঘায়িত করা হয় এবং কাছাড় জেলার সর্বত্র পাবলিক সভা সমাবেশ করা হয়, এইসব সভায় সেন্সাসের জালিয়াতির বিরুদ্ধে জোরদার বক্তব্য রাখা হয়। ১৯৬৮ সালের মে মাস থেকেই স্কুল, কলেজসহ রাস্তা ঘাটে পিকেটিং, ধর্মঘট, গণশ্লোগানের কার্যক্রম শুরু হয়। ১৯৬৮ সালের জুলাই মাসেই পাবলিক সভা গুলো আরো ব্যাপক বিস্তৃত হয় এবং ১৯৬১ সনের উপনিবেশিক আদমশুমারী প্রতিবেদন পোড়ানো হয়। ১৯৬৯ সালের ১৫ অক্টোবর কাছাড়ের বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী শিক্ষার্থী ও যুবসমাজ রক্ত দিয়ে রক্তস্বার কর্মসূচি পালন করে। এর পরপরই ভাষা আন্দোলন আরো চূড়ান্ত গণ রূপ নেয় এবং ব্যাপক ধর্মঘট, ধরপাকড়, বন্ধ কর্মসূচি চলতে থাকে। ১৯৬৯ সালের ২২ অক্টোবর কাতিগড়া বন্ধ কর্মসূচি থেকে ৭ জন ভাষাবিদ্রোহীকে গ্রেফতার করা হয়। ৩০ অক্টোবর ২৬ জন, ৩১ অক্টোবর ৫ জন নারী আন্দোলনকারীসহ ৩ জন, ১ নভেম্বর ২৯ জন এবং ৩ নভেম্বর ১৯৬৯ গ্রেফতার হন ৩৮৫ জন। ১-৫ নভেম্বরের ভেতর তিন জেলার ডিসি অফিসে পিকেটিং করে চেয়ার দখল করে নেয়া হয়, ৪-৫ নভেম্বর ১৯৬৯ গ্রেফতার করা হয় ১১১ জনকে। রাষ্ট্রের ধরপাকড় ও নির্যাতনমূলক শাসনের বিরুদ্ধে ১১-১৩ নভেম্বর ১৯৬৯ তারিখে শিলচর শহরে বিশাল গণসমাবেশের আয়োজন হয়। শিলচর, নরসিংহপুর, হাইলাকান্দি ও পাথারকান্দিতে ১৪৪ ধারা ভেঙ্গে ফেলেন ভাষাবিপ্লবীরা, এই ঘটনায় সরকার ২৩৮ জনকে গ্রেফতার করে। ১৭ নভেম্বর ১৯৬৯ শিলচর বন্ধ থেকে ৩০০ জন সত্যাগ্রহীকে গ্রেফতার করা হয়। হাইলাকান্দির ওএসএ মাঠে বিশাল সমাবেশ ডাকা হয় একই সনের ২১ নভেম্বর, হাইলাকান্দি বন্ধ থেকে সবচেয়ে বড় ব্যাপক ধরপাকড় হয়, প্রায় ১৫০০ জন ভাষাবিদ্রোহীকে সরকার গনগ্রেফতার করে কারাগারে পাঠায়।

১৯৭০ সাল থেকে ভাষা আন্দোলন অন্য মোড় নেয়। ১৯৭০ সালের ১৯-৩০ এপ্রিলের ভেতর কাছাড়, ত্রিপুরা ও শিলং-এ ২৪ ঘন্টার গণঅনশণ করেন বিষ্ণুপ্রিয়া ভাষাবিদ্রোহীরা। ১৯৭২ সালের ১২ ডিসেম্বর কাছাড়ের সর্বত্র ৪৮ ঘন্টার গণঅনশণ, ১৯৭৪ সালের ৯ মার্চ কাছাড়ের সর্বত্র ৭২ ঘন্টার গণঅনশণ পালন করা হয়। ১৯৭৮ সালের ২ ডিসেম্বর করিমগঞ্জ ও কাছাড়ের সর্বত্র ‘সংখ্যালঘু বাঁচাও দিবস’ পালন করা হয়। একুশে ফেব্রুয়ারি যেদিন বাঙালির মাতৃভাষা দিবস, সেই তারিখে ১৯৭৯ সালে সমগ্র কাছাড়ে পালিত হয় অবস্থান ধর্মঘট।[৫]

আন্দেলনের মুখে ১৯৮৩ সালের ২৫ অক্টোবর আসামের রাজ্য সরকারের কেবিনেট মিটিং-এ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে, কাছাড় ও করিমগঞ্জ জেলার স্কুল গুলোতে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষাকে প্রাথমিক পর্যায়ে অন্তর্ভূক্ত করার। কিন্তু অজানা কারণে ৮ ডিসেম্বর ১৯৮৩ তারিখে তা স্থগিত করা হয়। আবারো ‘বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ছাত্র ইউনিয়ন’ আন্দোলনের ডাক দেয়। ১৯৮৫ সালের ২ জুলাই বিপুল অংশগ্রহনে পালিত হয় দাবীদিবস। এরপর আন্দোলন চলতে থাকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত। ১৯৮৯ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি পালিত হয় ১২ ঘন্টা ‘রেল রোকো কর্মসূচি’। ১৯৮৯ সালের পয়লা ডিসেম্বর বিধান সভা চলাকালীন সময়ে দিসপুরে সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত রিলে অনশন পালিত হয়। ১৯৮৯ সালের ২৭ জুলাই তারিখে সরকার আবারো বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষা চালুর জন্য আরো একটি নোটিফিকেশন করে এবং ৬ আগস্ট ১৯৮৯ তারিখে তা আবার স্থগিত করে। লড়াকু ছাত্ররা সম্মিলিতভাবে ১৯৯২ সালের ২১ সেপ্টেম্বর ১৫ দিনের ভেতর বিষ্ণুপ্রিয়া ভাষা চালু করার দাবী জানিয়ে চরমপত্র দেয়। ঐদিন শিলচর গান্ধিবাগ ময়দানে প্রায় দশহাজার মানুষের এক বিশাল জমায়েতের মাধ্যমে এই চরমপত্র দেয়া হয়। কিন্তু ঐ চরমপত্রকে কোনো গুরুত্ব না দেয়ায় ভাষা-আন্দোলন আরো দ্রোহী হয়ে উঠে এবং ১৯৯২ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর গঠিত হয় ‘বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী গণসংগ্রাম পরিষদ’। ১৯৯২ থেকে ১৯৯৫ সময়কালের মধ্যে অসংখ্যবার ২৪ ঘন্টা, ৩৬ ঘন্টা, ৪৮ ঘন্টা এবং ১০১ ঘন্টার রাজপথ রেলপথ অবরোধ, গনঅনশন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালিত হয়। এসব কর্মসূচির ফলে বরাক উপত্যকা কার্যত অচল হয়ে পড়ে।



অবশেষে আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৯৯৫ সালের ২৬ মে ত্রিপুরা রাজ্য সরকার ত্রিপুরা রাজ্যের প্রাথমিক স্কুল গুলোতে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষাকে অন্তর্ভূক্ত করে। কিন্তু আসামে এ দাবীটি তখনো সাফল্যের মুখ দেখেনি। আন্দেলন থেমে থাকেনা। সে আন্দোলনের সূত্র ধরে পাথারকান্দিতে, (যেখানে ১৯৬১ সালের সেন্সাসে ১ জন বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরীকে গননা করা হয়েছিল) ৫০১ ঘন্টার রেল অবরোধ কর্মসূচীর ঘোষনা দেয়া হয়। ১৯৯৬ সালের ১৬ মার্চ সেই কর্মসূচীতে পুলিশ গুলীতে সুদেষ্ণা সিংহ নামের এক ভাষাবিপ্লবী তরুণী শহীদ হলে গোটা আসাম বিক্ষোভে ভেঙে পড়ে। গনআন্দোলনের মুখে সরকার ন্যায্য দাবী মেনে নেয়। ২০০১ সালের ৭ ফেব্রুয়ারী বরাক উপত্যকার ১৫২টি স্কুলে তৃতীয় শ্রেণী থেকে চালু হয় বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষায় পাঠ্যবই 'কনাকপাঠ'।

কিন্তু থেমে থাকেনি রাস্ট্রের প্রতারনা ও দমননীতি। স্কুলগুলোতে ছাত্রছাত্রীদের জন্য শিক্ষক নিযুক্তি নেই, পাঠ্যবই নেই, নেই সরকারের ঐকান্তিকতা। প্রশাসনিক জটিলতার নামে চলে নানান টালবাহানা। কিন্তু মাতৃভাষার সম্মান রক্ষা করতে শিক্ষকরা মাসের পর মাস পড়িয়ে যান বিনা বেতনে। এর মধ্যে মণিপুরী-অমণিপুরী বিতর্ক সৃস্টি করে মৈতৈ ও বিষ্ণুপ্রিয়া সম্প্রদায়কে মুখোমুখি করা হয় ভ্রাতৃঘাতি যুদ্ধে। দীর্ঘদিন আইনি লড়াইয়ের পরে সব বিতর্কের অবসান ঘটায় গৌহাটি হাইকোর্ট এবং ভারতের সুপ্রীম কোর্ট। ২০০৬ সালের ৮ই মার্চ সুপ্রিমকোর্টের এক যুগান্তকারী রায়ের মাধ্যমে ‘বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী’ নামের জনমদুঃখীনি ভাষাটি রাষ্ট্রীয় অনুমোদন পায়।


তথ্যনির্দেশ:
১. Religious development in Manipur in the 18th and 19th Century/ Dr M Kirti singh,Imphal, 1980, page 12-13
২. Linguistic Survey of India, 1891. Compiled by Sir G. A. Greirson, Vol V, Page 419
৩. ফাগু (বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষার পত্রিকা), বর্ষ ২, সংখ্যা ১০, শিলচর ১৯৬২
৪. মণিপুরী জাতিসত্তা বিতর্ক: একটি নিরপেক্ষ পাঠ/ অসীমকুমার সিংহ, সিলেট, ২০০২
৫. Let History and Facts speak about Manipuris / NBMM, Assam, 1984

আরো পড়ুন:
১. বরাক উপত্যকার বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষা আন্দোলনের বিস্তারিত ঘটনাপঞ্জী (১৯৫৫-১৯৯৬) - পাভেল পার্থ
২. ভাষার জন্য শুধু বাংলাদেশের বাঙালীরাই প্রাণ দিয়েছে একথা সত্য নয় ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/kungothangblog/28921230 http://www.somewhereinblog.net/blog/kungothangblog/28921230 2009-03-08 01:58:08
সাতজন সমকালীন বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী কবির কবিতা সমরজিৎ সিংহ
মা তৃ ভা ষা

এ রাত তোমার নামে উৎসর্গ করলাম
এই রাতে আমার শিয়রে বসে থাকো
আমি মানি, ভুল হয়েছে আমার
ভুলে রেখে এসেছি তোমাকে
আহা জন্মভুমি
এই রাত আমার সঙ্গেই থাকো
কী নীরব রাত্রি, কথা বলার ভাষাটুকুও নেই

আমার অক্ষমতার জন্যে এই দশা
কপালই আমাকে বলে,
ওই যে পাথুরে ঘাটের ওপার থেকে
আমার দোষেই অভিশম্পাত দিচ্ছে ওরা
আকাশ থেকে ঝরছে আগুনে ফুলকি
কপালে, সব আমার দোষেই
আজকের রাতে তুমি আমাকে বাঁচাও
এ রাত তোমার নামে উৎসর্গ করলাম
তোমার নামেই।

* মুল কবিতার নাম ইমার ঠার। অষ্টাদশ শতাব্দী থেকে নানান নিপীড়ন ও আঘাতের শিকার হওয়া এই ভাষাটির জন্য মাতৃভুমিহারা বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরীদের লড়াই সংগ্রামের পটভুমিকায় লেখা।

|| সমরজিৎ সিংহের জন্ম ত্রিপুরার আগরতলায়। বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষায় ত্রিপুরা রাজ্য সরকারের পত্রিকা ত্রিপুরা চের সম্পাদনার কাজে ছিলেন দীর্ঘদিন। নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে আধুনিক ব্যক্তিরূপের ভেতর দিয়ে কবিতার অধরাতে ধরতে চেষ্টা করেন। আসাম ও কলকাতার বিভিন্ন ছোট কাগজে বাংলা কবিতা লিখে থাকেন। বাংলাতে তার লেখা 'মাধবীলতা' গ্রন্থটি গোটা পশ্চিমবঙ্গে আলোড়ন তুলেছিল একসময়। ||



রঞ্জিত সিংহ
আ জ ও সে আ সে

আর
বিধবা নদীটি এসেছিল
আমাদের উঠান পর্যন্ত।
মন্দ্রিত রৌদ্রের মতো কী শান্তি
স্বপ্ন দেখেছিল সে।
বিশ্রামহীন তিনরাস্তার কোন পুলিশপয়েন্টের মতো
উদভ্রান্ত এখন।
তৃষ্ণাথরথর বুক চাপরিয়ে কেঁদে কেঁদে
আমার কাছে চেয়েছিল দু'ফোটা জল
আমি নিরুপায় ভয়ে লজ্জায়
ঘরের ভেতর নিঃশব্দ বসেছিলাম
এখনও আমি ভিজে উঠি চোখে -
নিষ্তেজ আমি
এমন নিম্নজ!

আর
বিধবা নদীটি এসেছিল
আমাদের উঠান পর্যন্ত।

|| রঞ্জিত সিংহ নব্বই দশকের কবি। জন্ম ভারতের অসমে। অনন্য রুপকল্প ও শান্ত সমাহিত বয়ান ধরনের পাশাপাশি রাজনীতিশ্পর্শী এক গভীর হাহাকার তার কবিতায় ছুঁয়ে যায়। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ : 'মোর ইমারঠার মোর প্রেমর কবিতা' ||



দিল্স লক্ষীন্দ্র সিংহ
কো ন এ ক অ র্থ হী ন জী ব নে র প্র তি

বলেছিলে আমাকে কানে কানে
মনে মনে
গহিনে
এক জীবনের অর্থহীন ক্রোধ আর অহমিকাকে
নারকেলের খোসার মতো খুলে ফেলে দাও
ছুঁড়ে ফেলে দাও ব্যর্থ জন্মভার
দুরে
ছিঁড়ে ছিঁড়ে দেখছি এই আশ্চর্য জীবন
একটি নিগুঢ়, নরোম কবিতার গোপন আকঙ্খায়

হাতের তালুতে কার রক্ত
হৃদয়ের,
নাকি ভগবানের?

|| দিল্স লক্ষীন্দ্র সিংহের জন্ম অসমের করিমগঞ্জ জেলার দুল্লভছড়ায়। বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী কাব্য ও সামাজিক আন্দোলনের জন্যে প্রতিষ্ঠিত সংগঠন দিল্স (দুখীনি ইমার লেইরাপা শৌ) এর রূপকার। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থগুলোর মধ্যে 'থরো', 'মণি বিসারেয়া', 'ইমালাম', 'না কাদি তি লোকতাক' ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। নাটক লিখেছেন 'কল্লিঙ' এবং 'এরে হে টেইপাঙ নিদান'। বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষায় অনুবাদ করেছেন সফোক্লিসের 'আন্তিগোনে' এবং এলিয়টের 'ওয়েস্টল্যান্ড'।||



বিশ্বজিৎ সিংহ
কো থা য় আ ছো

কোথায় আছো তুমি, সুখে নাকি ক্ষুধায় ?
ভীষন ইচ্ছে দেখবো তোমাকে
দুহাতের ভেতর বন্দী করে নেবো
দেহের দরজা খুলে ঢুকতে চেয়েছি বলে
উপবাসী আমি বিন্দু থেকে সিন্ধু পেতে চাই, যাবার আগে
কোথাও হয়না যাওয়া আজকাল,
অনন্ত পথের মাঝখানে
দাঁড়িয়ে আছি জলের ছায়াতক না পড়া জঠরে
কাছাকাছি দাঁড়িয়ে অনেক গল্প হলো
সাদা-কালোয় উৎভ্রান্ত
নগ্ন সুখ একাকী রইলো প্রতীক্ষায়।

কোথায় আছো তুমি, সুখে নাকি ক্ষুধায়?
ক্ষুধাতো জন্মান্ধ
রক্তে স্নান নিয়েছে যাত্রার পথ
আরও দীর্ঘ হয়ে গেল বৃষ্টির আকাঙ্খা
আতঙ্কের মাঝে ভেঙে গেল উৎসব
ফেরার পথে যখন বৃষ্টি এলো -

ক্ষুধার ভেতরে আমি প্রতীক্ষায় আছি।

||বিশ্বজিৎ সিংহ বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী কাব্য জগতে পরিচিত নাম। জন্মস্থান মৌলবীবাজারের কমলগঞ্জে হলেও পেশাগত কারণে বর্তমানে ত্রিপুরায় স্থায়ী বসবাস করছেন। মার্কসিস্ট নান্দনিকতার জায়গা থেকে কবিতাকে দেখতে চেষ্টা করেন। মিতবাক ও চিত্রকল্পময় তার কবিতা। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ: 'ইশ্বর মাঙসে মেইথঙে' ||



অভয় কুমার সিংহ
বি চ্ছি ন্ন অ নু ভু তি সি রি জ - ৩

এক.
ইটখোলার পথে দেখা
দেখেও আমি দেখিনি
তবু তুমি ডেকেছিলে -অভয় !

কৌতুকের হাসি মৃত্যুময়।

দুই.
ঘরখানি ভরে আজ খনিজ আবহাওয়া।

তিন.
মুহুর্তে মুহুর্তে আমি হয়েছি অজ্ঞান
তোমার প্রতিটি স্পর্শে, এ কি মৃত্যু, এ কী অবসান !
বুঝেছি তখন
প্রেম মানে অনন্ত মরণ।

|| অভয় কুমার সিংহের আসল নাম চাম্পালাল সিংহ। জন্ম শিলচরের কচুধরমে। আশির দশকে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষায় মাতামে নামের একটি সাহিত্যপত্রিকা সম্পাদনার কাজ করতেন। দৃশ্যকল্প আর অনুভুতি নিয়ে শব্দ সাজিয়ে যান এজন্যে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী কবিতায় তিনি বৈশিষ্ঠ্যপুর্ণ। উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ: 'কাব্যময় এরে রাতিহান', 'হাবিত্তাউ ইতিহাস' ||



শুভাশিস সমীর
আ য় না

দু্ইজনে মিলে আমরা হয়েছি এক
একজনে করে, আরজন শুধু দ্যাখে
দুইধারে এক আয়না বসানো আছে
আরও একজন উঁকি দেয় থেকে থেকে ।

মাটি ক্ষয় হলে মাটিতে গিয়েও মাটি
আয়না তখন কোথায় মিলিয়ে যায়
তোমার নিকটে গেলে কেন তুমি মিছে
পাঠিয়ে দিয়েছো দুয়ের অন্তরায়?

দুইজনে মিলে এক, তবু এক নই
আর কে সে করে মাঝখানে আনাগোনা
চোখ ঝিমুলেই পথখানি সোজা কতো
আয়নার নেই সাধ্য যে রেখা টানা।

|| শুভাশিস সমীরের জন্ম মৌলবীবাজার জেলার কমলগঞ্জে। বাংলা ও বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী দুই ভাষাতেই লিখে থাকেন। উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ ; সেনাতম্বীর আমুনগৎতো সেম্পাকহান পড়িল অদিন, নুয়া করে চিনুরি মেয়েক। বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষায় অনুবাদ করেছেন বড়ু চন্ডীদাসের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রুদ্রচন্ড। গত বছর সেরা নাট্যদল হিসাবে আরজু স্মৃতি পদকে ভূষিত নাট্য সংগঠন মণিপুরী থিয়েটারের সাথে যুক্ত আছেন জন্মলগ্ন থেকেই ||



সন্তোষ সান্তান
স ম্প র্ক সি রি জ - ২

ইস্কাপনের বিবির সাবঅল্টার্ন য়াবেরুনীর সৌন্দর্যে নিপুন এক কবিতা লিখে যাব, এমন সময় হাতের তালু দাবী করে রাজসুলভ ভাগ্যলিপি। যে শিল্পের টানে একজন জন্মকবি দারিদ্রের সাথে সংসার পাতে, সেই নির্বাক শিল্প ছড়িয়ে থাকে অতিচেতনায়, যুক্তির বাইরের কোন পৃথিবীতে। ইশ্বরের লীলা যেন মাকড়শার জাল। ইশ্বরও এখন বৃদ্ধ। তাকেও স্ট্রাগল করে বাঁচতে হয়। আকাঙ্খায় পূর্ণ আজ পিতলের বাটিখানা। প্রতি পদক্ষেপে বিধিনিষেধ, বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ট্যাবু সান্ধ্য আরতির মৃদঙ্গের তালে তালে নাচে নারীদের কন্ঠ। জয়দেবের গীত শুরু হলে আসরের বৈষ্ণব-নামাবলী থেকে নেমে আসেন অষ্টসখির প্রানধন কৃষ্ণ। কৃষ্ণ, ময়ুরকন্ঠী রঙের নামবাচক এ বিশেষ্যের দ্বিতীয় অক্ষরটি যুক্তবর্ণ; "ষ" ও "ণ", এ দুই ব্যঞ্জনের মাঝে ছোট্ট একটি ফাঁকও খুঁজে পেলাম না, যেখানে অনায়াসে ঢুকিয়ে দেতে পারব বর্ণিল কিছু মানবতা। এদিকে "ক" খুব একলা, তার সাথে মিশে আছে "ঋ" কার, একা থাকলে তার গায়ে মেখে দিতাম কনেরাঙা মমতা; আর কলঙ্কিনী রাইয়ের জন্য খয়েরি রঙের কিছু স্মৃতি। কলঙ্কিনী রাই আসলে এমন একটি নাম যার কোনো সর্বনাম নেই, আছে শুধু আকিঁবুকিহীন দুঃখীনি বিশেষন।আমরা জানি, বিশেষ্যের সাথে বিশেষনের ব্যবহার আত্মিক তৃপ্তি এনে দেয়।

ঘোমটার মতো শাদা কুয়াশা পৃথিবী মায়ের কোলে ছড়িয়ে পড়লে অবুঝ এ মন বৈষ্ণব-খড়ম, অহংকারী সানগ্লাস, অপরূপ কবিতা সব রেখে বৃন্দাবনের দিকে সরে পা বাড়ায়।

* য়াবেরুনী - কাঁচুলি বিশেষ। আগে মনিপুরী মেয়েরা শরীরের উর্ধ্বাংশে ব্যবহার করতো।
* জয়দেব - আষাঢ় মাসে মনিপুরীদের কাঙ উৎসবের সময় কবি জয়দেবের গীতগোবিন্দ গাওয়া হয়

|| সন্তোষ সান্তান নতুন শতাব্দীর কবি। প্রতিস্ঠান বিরোধিতার তার্কিক জায়গা থেকে হিউমারের মধ্য দিয়ে পেশ করেন কবিতা। বিষ্ণুপ্রিয়া মনিপুরী ভাষার মাসিক সাহিত্যপত্র "নুয়া এলা"য় নিয়মিত লেখেন ||

সূত্র: মনিপুরী সাহিত্য সংগ্রহ: শুভাশিস সিনহা। ঐতিহ্য, ঢাকা, ২০০৭।
ছবি: শক্তিকুমার সিংহের পেইন্টিং]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/kungothangblog/28908193 http://www.somewhereinblog.net/blog/kungothangblog/28908193 2009-02-08 06:54:36
ষোড়শ শতকের একটি বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী বৃষ্টি ডাকার গান ও তার বাংলা অনুবাদ লৌকিক ধর্মের বিভিন্ন দেবতার স্তুতি করে বৃষ্টি আবাহন করার এ গানটি বরন ডাহানির এলা নামে পরিচিত। মণিপুরীদের বৈষ্ণবধর্ম গ্রহনের বহু আগে, ষোড়শ থেকে সপ্তদশ শতকের প্রথম ভাগ পর্যন্ত সময়ের মধ্যে রচিত ও গীত হতে শুরু করেছে। এই গীতিকাব্যে বৈদিক বা ভারতীয় দেবদেবীর কোন উল্লেখ নেই, ঘুরে ফিরে কেবল প্রাচীন লোকধর্মের দেবদেবীদের নামই এসেছে। কৃষিভিত্তিক সমাজের সাথে সংশ্লিষ্ট এ গানটিকে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী কাব্যসাহিত্যের প্রাচীনতম নির্দশন হিসাবে ধরা হয়। এই গানের নিজস্ব সুর রয়েছে যা বর্তমান মণিপুরী কীর্ত্তন বা পালার সুর থেকে ভিন্ন।

গানটির পটভুমি এরকম - মণিপুরীদের আদিভূমি মণিপুরের খুমোল বংশের রাজা মৈরাং বংশের রাজার নিকট যুদ্ধে পরাজিত হয়ে পুনরায় শক্তি পরীক্ষার আহবান জানালে খুমোল রাজার ছোট ভাই চমেই তাতে আপত্তি জানায়। এতে খুমোলের রাজা তাকে রাজ্য থেকে বের করে দেন। দুঃখে অপমানে চমেই রাজ্য ছেড়ে বের হয়ে যায়। সাথে পিছু নেয় তার বেটি বা চাকরানি। পরবর্তী তিন বছর খুমোল রাজ্যে দেখা দেয় তীব্র খরা। চারিদিকে নেমে আসে দুর্ভিক্ষ। জ্যোতিষিরা অনুমান করেন, চমেই এর অপমান দেখে দেবতা পাহাংপা ক্রুদ্ধ হয়ে বৃষ্টি বন্ধ করে দিয়েছেন। চমেই ও পাহাংপা-কন্যা বেটিকে সন্তুষ্ট করলেই তবে বৃষ্টি হবে ইত্যাদি । জ্যোতিষিদের কথা শুনে প্রজারা চমেই বেটিকে সন্তুষ্ট করে রাজ্যে ফিরিয়ে আনে। পাহাংপাও খুশি হয়ে দীর্ঘ তিন বছর পর বৃষ্টি নিয়ে আসেন। খুমল রাজ্যে চলে কৃষিকাজ ও লসু দিয়ে মাছ ধরার আয়োজন।

৯টি পদো তে বিভক্ত গানটির প্রথম ৬টি পদো বাংলায় অনুবাদ করার চেষ্টা করলাম।

বরন ডাহানির এলা

১.
সরালেলতে রাজারো লেইপাক কুমৌ কইলো ।
লেইপাকে মাড়ায় মাখঙে খইমুরে জাঙাল দিলো।
খুমলর মাটি হুকেইলো, বরন দিয়াদে দৌরাজা ।
লুকোঙ মাহেই লুকুলিল, বরন দিয়াদে দৌরাজা ।

২.
হরিয়ো রামো লেইমেলতে কুংগই পিত করে ।
লেইমেল মানা নুংশিপা দনলো বেনুর আতে দিলো ।
যুকর ধ্যান করেরনায় লসমনে ফুলর লেইরাঙ দিলো ।
লেইকেইরো কালারো ডাহিয়াউ দেই কাদিয়াউ খেয়নায়ে ।

৩.
তাম্ফারো আপারো হরেইগা দলে দুমেয়ে য়েইচিল কইল ।
হিলঙ লালরে হিলরো সরা গঙ্গায় লালইলীয়ে ।
না যেইগা গাটে বুলিয়াহো কারঙ্গ লেইমায়া ধরিয়া থামেইলো ।
হাবি দৌয়ে হুনো মইরাঙ পাচায় নাহুনকা নুংশিয়ে হয়ো ।

৪.
আনতারা গিরিরো জিলক য়েইমাপীরে আনতারা ।
তাম্পাকে নুনা পেইতেগা লেইতেঙে নুনা চায়োরে ।
লেইতেঙরে হিরিয়ো মেঙকো কইলো ।
জমজমাদে যেইরিগা ধনর কইরেঙরে ।

৫.
ফিজাপিনা লাঙজাপি মাদই ওয়াঙখেলে।
মাদই ওয়াঙখেলে হো হুনার লাংচাক বেড়র জ্বালাত থইলে।

৬.
চমেইয়ো বেটী থকুরারে।
কহনিগো দিবঙতা ঘরে জনম আরো।
কালা কালা আঙারা দলা দলা লেঙোলো হয়ো।
দনতো চারি চিলালো পাহাঙপায় বারিয়া নাদিলো।


বৃষ্টি ডাকার গান (বাংলা অনুবাদে যা দাঁড়ায়)

১.
সরালেল তুমি দেবতাদের রাজা, একটু দয়া করো
খইমু ঘাসে আর নানান জিনিষে তৈরী করেছে বাঁধ
খুমোলের মাটি খরায় ফেটে যায়, বৃষ্টি দাও হে দেবরাজ
খা খা করে আজ খুমোলের ভুমি, বৃষ্টি দাও হে দেবরাজ

২.
তুমি বলো এ নিদানে কে পারবে কিছু খেতে বা ঘুমাতে
[আমি] আমরা সকল আনন্দ-শোক সপেঁছি বেণুর হাতে
হে কালা, চির প্রতিবেশী আমাদের, সবাইকে দাও ডাক
এসো এইখানে একত্রে সবে কাঁদি সবকিছু পড়ে থাক

৩.
ও বাবা তাম্ফা, দেখেছো দুমেই জোতিষবিদ্যা গুনে
গঙ্গা আসছে, তবু পাহাংপা-কন্যা কারঙ্গ বাধা দেয় শুনে
সকল দেবতা জানে নিশ্চয় দুর্দশা আমাদের
শুধু অনুরোধ মইরাঙ যেন পায়নাকো কিছু টের

৪.
জ্যোতিষিরা বলে এ অনাবৃষ্টি পাহাংপার কারণে
চমেইয়ের অপমানে যে ক্ষুব্ধ হয়েছে দারুন মনে
চমেই ও বেটিকে ফিরিয়ে নিয়ে যাও রাজ্যে
যথারীতি কন্যা পৌঁছায় ওই সুবিশাল প্রান্তরে
মঙ্গলকর বার্তাধ্বনিতে জগৎমুখর করে

৫.
মাদই পরিধেয় বুননের জন্য হয়েছে বহিস্কৃত
বেটির কাছে সে নানান সময়ে হয়েছে অপমানিত।

৬.
চমেই আসতে করছে ইতস্তত
মেয়েরা মিলে সবে তার সাথে হয়েছে দুর্বিনীত
ক্রুদ্ধ বয়সী লোকেরা তাদের বলছে স্বাগত নয়
বরং কয়লা আর বালু দিক ছিটিয়ে সে পথময়
এটাই ভাগ্য পাহাংপা প্রভু
দেয়নি তাদের শান্তি এখনো, কভু।


সরালেল - দেবতাদের রাজা। মণিপুরী মিথলজীতে তাকে জগতসংসারের সৃস্টিকর্তা হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
পাহাংপা - মতান্তরে পাখাংবা। সরালেলের পুত্র এবং প্রলয়কারি দেবতা।
পদো - বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী গানের পংক্তির হিসাব

বরন-ডাহানির-এলার ইংরেজী ভার্সন এখানে দেখুন

ছবি: রাজকুমার চন্দ্রজিৎ সিংহের পেইন্টিং

তথ্যসুত্র :
১. The BpM Language / Dr. K.P. Sinha, MA Phd, D Lit,1984
২. বি.ম. ভাষাতত্ত্বর সমীক্ষা / শ্রীমংগলবাবু সিংহ, বি.ম.সা.প. ১৯৯০
৩. মণিপুরী সাহিত্য সংগ্রহ / শুভাশিস সিনহা, ঐতিহ্য ২০০৭]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/kungothangblog/28904660 http://www.somewhereinblog.net/blog/kungothangblog/28904660 2009-01-31 05:59:58
বিশ্বাস : একটি বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী প্যারাবল
একটি ভাঙা কোদাল ফেলে রাখা হয়েছে রাস্তার পাশে, তার চারপাশে ফুল আর ফুল। লোকজন আসছে আর শ্রদ্ধাঞ্জলী দিয়ে যাচ্ছে। আর সেখানে একজন বৃদ্ধাকে দেখা যায় একটি শিশুর কাছে কোদাল ভাঙার গল্পটি বয়ান করতে।


মুল গল্পঃ শুভাশীষ সমীর (বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষায় "পৌরি পত্রিকা" জ্যৈষ্ঠ ১৪১৩ সংখ্যায় প্রকাশিত)]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/kungothangblog/28901248 http://www.somewhereinblog.net/blog/kungothangblog/28901248 2009-01-23 02:51:53
পৌরেই বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী সমাজের লোকমুখে প্রচলিত শ্লেষাত্মক বা হাস্যরসাত্মক উপমা বা তুলনাগুলোকে পৌরেই বলা হয়। পৌরেইগুলোকে বাংলা প্রবাদ প্রবচন বা বাগধারার সাথে মেলানোর একটা চেষ্টা করা যায়, কিন্তু সেটা সম্পূর্ণত মিলবে না। পৌরেই শব্দটির আক্ষরিক অর্থ হচ্ছে আগেকার কাহিনী। মানে ইতিহাস। প্রতিটি পৌরেই এর পেছনে কালিক ও স্থানিক নানান প্রেক্ষিত যুক্ত আছে। সম্পর্কিত আছে এক একটি ইতিহাস। পৌরেইগুলোকে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী জাতির লোকইতিহাস বলা চলে। ইতিহাসের কোন এক সময়ে ঘটে যাওয়া বিশেষ কোন ঘটনা কালক্রমে পৌরেই হিসাবে রূপ নিয়েছে। যেমন "স্বরূপার কীর্তন" - পৌরেইটি সেই ঘটনার কথা স্মরন করিয়ে দেয়, যখন স্বরূপা নামের এক ব্যক্তি কীর্তন (বৃহাদাকারের ধর্মীয় উৎসব) আয়োজন করেছে বলে সবাইকে নিমন্ত্রন করে শেষে দেখা যায় কোন আয়োজনই নেই। এখনও এরকম সমান্তরাল কোন ঘটনাকে "স্বরূপার কীর্তন" বলা হয়।

পৌরেইগুলোকে পরম্পরায় পাওয়া সমাজের অভিজ্ঞতা বলা যায়। এগুলো সাধারন ভাষায় বলা সাধারন মানুষের কথা নয়, অসাধারন মানুষগুলোর অসাধারন কথাগুলোকে সাধারন করে সহজ করে বলা হয়েছে। রচয়িতারা একেকজন বড় মাপের শিল্পকার। দীর্ঘ একটি গল্প বা বক্তৃতা দিয়ে যা বুঝানো সম্ভব নয় একলাইনের একটি পৌরেই তাকে পৌঁছে দেয় মগজে ও মননে। "দরায় লাম লইলা, চাকালায় বনে হমেইলা" ( ঢোরা সাপ রাজত্ব কিনলো, গোখরা বনবাসী হলো) - এই পৌরেইটি মণিপুরীদের আদিভুমি মণিপুরের আদিইতিহাসের একটি গুরুত্তপুর্ণ অধ্যায়ের কথা স্মরন করিয়ে দেয়, যখন খুমল রাজ্য ও রাজবংশ বেদখল হয়ে যায় নিংথৌজা রাজ্যের নিকট, যারা বরাবরই যুদ্ধে পরাজিত হত। পৌরেইগুলোতে ব্যপক সমাজচেতনার নিদর্শন পাওয়া যায়। যেমন " মি থাইতে মিয়াঙগই কিয়া বকসা বয়া হিমপেইতইতা" - এখানে নিজের হীনমন্যতাকে বিদ্রুপ করা হয়েছে, উদ্দেশ্য আঘাত দিয়ে সমাজকে সচেতন করা। এভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যায় পৌরেইগুলো দর্পনের মতো সমাজের নানান কাহিনী, ঘটনা, দর্শন, অভিজ্ঞতা, চেতনা ও রুচিবোধকে প্রতিফলিত করেছে। বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষাটি কতখানি প্রাচীন, কতখানি ব্যবহারিক ছিল তার পরিচয় আমরা পাই পৌরেই থেকে।



বহুমাত্রিক লেখক ব্রজেন্দ্রকুমার সিংহ ও কথাসাহিত্যিক বিমল সিংহ যৌথভাবে মণিপুরী জনপদগুলো চষে এসব পৌরেই সংগ্রহ ও সম্পাদনার কাজটি হাতে নিয়েছিলেন। তাদের সংগ্রহ করা প্রায় দুই সহস্রাধিক পৌরেই থেকে নির্বাচিত কয়েকটি এখানে মুল ভাষায় পেশ করা হলো। সাথে বাংলা অনুবাদ এবং সমার্থক বাংলা প্রবাদ অথবা অর্থ। আশা করি আপনাদের ভাল লাগবে।

ইমফামে দুকগাস উঠানি
অনুবাদঃ ভিটায় দুর্ব্বাঘাস গজানো
সমার্থকঃ ভিটায় ঘু ঘু চড়া

কৃষ্ণরে পেইলেউ লেইসি খানা
অনুবাদঃ সামনে পেলে শ্রীকৃষ্ণকেও ফর্মাস খাটানো
অর্থঃ চরম ধান্দাবাজি

এগদে আনলে হৌগতে নেই
অনুবাদঃ এদিকে আনতে ওদিকে খালি
সমার্থকঃ নুন আনতে পান্তা ফুরোয়

বলর বাপকর লাইমংসিং ঠেলানি
অনুবাদঃ বলর বাপের রবিবার দেখানো
অর্থঃ টাকা কর্জ নিয়ে দেবার সময় গড়িমসি করা

অঙার বার নঙারাং সেচানি
অনুবাদঃ অঙার দোষ নঙার উপর চাপানো
সমার্থকঃ উদোর পিন্ডি বুধোর ঘাড়ে

হরপগো দেখলেউ বিনি বুলানি
অনুবাদঃ সাপ দেখলেও দুলাভাই ডাকা
অর্থঃ অর্থলোভে অপাত্রে বিয়ে দেয়া

ইনচেল হানলো পানি থেৎকরানি
অনুবাদঃ জাল দিয়ে পানি আটকানো
অর্থঃ ভ্রান্ত নীতি গ্রহন করা

কাকাড়া ধরতেগা হরপ দরানি
অনুবাদঃ কাকড়া ধরতে গিয়ে সাপের গর্তে হাত
সমার্থকঃ কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরুনো

ধবারে ফুতিসুপানি বাগাদেনা
অনুবাদঃ ধোপাকে কাপড় কাঁচা শেখানো
সমার্থকঃ মার কাছে মামাবাড়ীর গল্প

বরনর ফুটার হাদিয়েদে দাপদানি
অনুবাদঃ বৃস্টির ফোঁটার মাঝখান দিয়ে পলায়ন
অর্থঃ চরম চালাকি

গরগো লেপ নেই দুয়ারর কৌলি
অনুবাদঃ ঘর ঠিক নেই, দরজা নিয়ে যুদ্ধ
অর্থঃ অকারণ আস্ফালন

কুকুরগই দলেইহাত চরলেউ গুচারি দেহিয়া ফালদের
অনুবাদঃ কুকুরকে পালকিতে উঠালেও মল দেখলে নামতে চায়
সমার্থকঃ কয়লা ধুইলেও ময়লা যায় না।

ডুফাই রাজা ডুফাই মন্ত্রী
অনুবাদঃ ডুফা (কল্পিত চরিত্র)র রাজা মন্ত্রী উভয় পদ গ্রহন
অর্থঃ এক ব্যক্তির সর্বময় ক্ষমতা



সহায়তাঃ
* পৌরেই। ব্রজেন্দ্রকুমার সিংহ ও বিমল সিংহ সম্পাদিত। আগরতলা, ১৯৮৬
* প্রবন্ধ-মালা (৩য় খন্ড)। ড. কালীপ্রসাদ সিংহ। শিলচর, ১৮৮৪ ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/kungothangblog/28899290 http://www.somewhereinblog.net/blog/kungothangblog/28899290 2009-01-19 01:01:51
উতং চাক

পৌষ সংক্রান্তিতে মণিপুরী দের প্রধান খাবার আইটেম হলো উতং-চাক। পৌষ মাসের শেষে এবং মাঘ মাসের প্রথম দিকে বিষ্ণুপ্রিয়া ও মৈতৈদের ঘরে ঘরে ঐতিহ্যবাহী উতং-চাক তৈরীর ধুম পড়ে। "উতং" হচ্ছে বাঁশের চোঙা আর "চাক" হলো ভাত। বাঁশের চোঙার ভেতর যে ভাত রান্না করা হয় তাই উতং-চাক। তবে উতং-চাকে সাধারনত সাধারন চালের পরিবর্তে বিরণ ধানের চাল ব্যবহার করা হয়। যে বাঁশের চোঙায় রান্নার কাজটি হয় সেটিও বিশেষ প্রজাতির বাঁশ। স্হানীয়ভাবে বেটু নামে পরিচিত এই বাঁশের চোঙাগুলো বেশ লম্বা ও পাতলা হয়ে থাকে। ভেতরে পরিমানমতো চাল ও পানি ঢুকিয়ে চোঙার মুখটি কলাপাতা বা খড় দিয়ে ভালোভাবে বন্ধ করা হয়। তারপর সেটা বিশেষ ব্যবস্থায় খরের বা কাঠের আগুনে পোড়ানো হয়। চাল ঠিকমতো সেদ্ধ হয়ে গেলে চোঙাটি বের করে ঠান্ডা করা হয়। তারপর বাঁশের পাতলা বাকলটি ছিলে উতং-চাক বের করা হয়।



উতং-চাক আখের রস, গুড়, মধু, দুধ ইত্যাদি দিয়ে খাওয়া যায়। উতং-এর ভেতর শাকশব্জিও রান্না করা যায়। মণিপুরীদের অন্যতম প্রিয় এই খাবারটি উৎসগতভাবে সহস্রাধিক বছর আগে থেকে মণিপুরের (বর্তমানে উত্তরপুর্ব ভারতের একটি রাজ্য) পার্বত্য অঞ্চলের বাসিন্দা তাংখুল আদিবাসীদের মধ্যে প্রচলিত ছিল। পরে এর জনপ্রিয়তা মণিপুরের সমতল অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। উতং চাকের আরেকটি বিশেষত্ব হচ্ছে এই খাবারটি সহজে নষ্ট হয় না, দীর্ঘদিন সংরক্ষন করে রাখা যায়। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/kungothangblog/28898462 http://www.somewhereinblog.net/blog/kungothangblog/28898462 2009-01-17 01:02:31
মাতৃবন্দনা - গোকুলানন্দ গীতিস্বামীর একটি গীতিকবিতার বাংলা অনুবাদ
এই কবিতাটি রচিত হয়েছে আজ থেকে প্রায় ১০০ বছর আগে বাংলাদেশের একটি অবিকশিত আদিবাসী ভাষায়। ভাষাটির নাম বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী এবং রচয়িতার নাম গোকুলানন্দ গীতিস্বামী। গোকুলানন্দ গীতিস্বামীকে (১৮৯৬-১৯৬৫ খ্রীঃ) ধরা হয় বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী সাহিত্যের পথিকৃৎ হিসাবে। তিনিই সর্বপ্রথম বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরীদের ভেতর জাতীয়তাবোধ ও মাতৃভাষার প্রতি চেতনা জাগ্রত করেন।

মাতৃবন্দনা
রচনাকালঃ ১৯২০ খ্রীস্টাব্দ

মাগো তোমার মহিমা কিভাবে প্রকাশি
অবোধ শিশু এই আমি
থাকে যতো দোষ সন্তানগুনে করিও ক্ষমা
মা -
তোমার মহিমা বেদেও অসীমা
করুনারূপীনি তুমি
কী গুণ গাইব আমি
গয়া তীর্থ কাশি বারানসী
শাস্ত্রের মতো পবিত্র সবই জানি
সবারও তবু থাকে কলংক,
শুধু মা শব্দটি আজো অকলংকীনি।

গর্ভে ধরেছো তুমি জননী দশমাস দশদিন
জন্ম দিয়েছো আলো দেখিয়েছো, কী অপূর্ব ঋণ!
দাড়াতে পারিনি খেতেও পারিনি কিছু
বাচিঁয়েছো তুমি, জ্ঞানপর থেকে আমরা তোমার পিছু
হিংসামুর্তি মাতা যে বাঘিনী সে তার স্বভাবমতো
কখনো নিজ সন্তানদেরে ভক্ষন করে নাতো
পাঁচ সন্তান যদিও তোমার আলাদা আলাদা সবে
লোকে যা বলুক, তোমার কাছে মা সকলি সমান রবে

... ... ...

এ মায়ের স্নেহসিন্ধুর একবিন্দু শুধিব বলে
দেশে দেশে আমি গুণ তার গেয়ে একা একা যাই চলে
এই আশা নিয়ে বেঁচে থাকি মাগো দিও নাকো দুরে ঠেলে
তোমার গানে ও কীর্ত্তনে থাকি বিভোর তোমার ছেলে!


মুল কবিতা (বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষায়)


গোকুলানন্দ গীতিস্বামী সম্বন্ধে
গোকুলানন্দের জন্ম বর্তমান মৌলবীবাজার জেলার কমলগঞ্জের মাধবপুর ইউনিয়নের জবলারপার নামের এক প্রত্যন্ত গ্রামে, ১৮৯৬ সালের ২৬ নভেম্বর তারিখে। দরিদ্র ঘরের এই মেধাবী ছেলেটি মাধবপুরে নিম্নবাংলা পাশ করার পর ইংরেজী পড়ার জন্য ত্রিপুরায় চলে যান। সেখানে অস্টম মান পর্যন্ত পড়েছিলেন। এরপর ১৯২৫ সালে ত্রিপুরার রাতাছড়া গ্রামে ব্যক্তিগত উদ্যোগে একটি প্রাইমারী স্কুল প্রতিষ্টা করেন এবং সেখানে নিজে শিক্ষক হয়ে পাঠদান শুরু করেন। পাশাপাশি শুরু করেন মাতৃভাষা বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরীতে গান, নাট্যপালা লিখতে।

গোকুলানন্দ মুলত ছিলেন একজন চারণকবি। বৃটিশভারতে তৎকালীন মণিপুরী সমাজের শিক্ষিত একটি বৃহদাংশ যখন সাহেবি এবং বাঙালি চালচলন রপ্ত করতে ব্যস্ত, ঠিক সেই সময় মাতৃভাষায় নানান কবিতা, গান, গীতিপালা লিখে সেগুলোর পরিবেশনা নিয়ে ঘুরতেন গ্রাম থেকে গ্রামে। নিজস্ব ভাষা সংস্কৃতি আচার নিয়ম সবকিছু বিস্মৃত হয়ে এই সমাজ যখন প্রায় নিশ্চিহ্ন হবার দ্বারপ্রান্তে, তখন গীতিস্বামী সক্রেটিসের মতো নতুন আশার, নতুন সম্ভাবনার বাণী ঘরে ঘরে ফেরী করে বেড়িয়েছেন ক্লান্তিহীনভাবে। তিনি দেখিয়ে দিয়েছিলেন, অবহেলায় ফেলে দেয়া এই ভাষা এই সংষ্কৃতির ভেতরেও বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। শুধুমাত্র লোকমুখে প্রচারিত এই দরিদ্র ভাষাটি দিয়েও রচিত হতে পারে উৎকৃষ্ট সাহিত্য, শিল্পরস।

গান গেয়ে সমাজকে জাগানোর দ্বায়িত্বে স্বেচ্ছায় কাঁধে তুলে নেন, পাশাপাশি চলে নাট্যপালা মঞ্চায়ন। সমাজ রাজনীতি বিষয়ে গোকুলানন্দের জ্ঞান ও মতাদর্শ ছিল স্বচ্ছ ও শক্তিশালী। গোঁড়ামি ও পশ্চাৎপদতার বিরুদ্ধে তার অবস্থান গানে গানে স্পষ্ট করেন। এজন্যে কম লাঞ্ছনা গঞ্জনা সইতে হয়নি গোকুলানন্দকে। সমাজের উচ্চশ্রেণীর ব্যক্তিরা যারা তাকে একসময় 'পাগল', 'কাক' ইত্যাদি বিশেষনে অভিহীত করেছে, তারাই একসময় তাকে "গীতিস্বামী" নামক সম্মানসূচক উপাধিতে ভূষিত করতে বাধ্য হয়েছে।

বাংলাদেশ ভারত দুদেশেই মণিপুরী সমাজে ব্যাপক জনপ্রিয় এই গীতিকবি ১৯৬৫ সালের ১৯ জুলাই মৃত্যুবরন করেন, সেদিন ত্রিপুরা সরকার গোটা রাজ্যে সাধারন ছুটি ঘোষনা করেন। বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী সমাজ নিয়ে অসংখ্য সমাজ-সংস্কারমুলক গান, কবিতা এবং নাটকের পাশাপাশি নীতিশাস্ত্র বা চরিত্র গঠনমুলক নানান বাণী রেখে গিয়েছেন এই সমাজবিপ্লবী। একটি অনগ্রসর কৌম সমাজের জন্য তাঁর এসব আধুনিক বাণী কাজ করেছে শানিত অস্ত্রের মতো।

বাংলা উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে



লিংক:
* বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী উইকিপিডিয়াতে গোকুলানন্দ গীতিস্বামীর জীবনি
* Gokulananda Gitiswami - Father of BM Community
* November 26 birth anniversary of Geetiswami

গোকুলানন্দ গীতিস্বামীর গান
ইউটিউবে গোকুলানন্দ গীতিস্বামীর গান]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/kungothangblog/28894443 http://www.somewhereinblog.net/blog/kungothangblog/28894443 2009-01-08 00:06:49