![]()
এ্যাডভোকেট মোঃ জাহাঙ্গীর আলম
সবেমাত্র যাত্রা শুরু হলো রংপুর বিভাগের। বাংলাদেশের অন্যসব বিভাগের গতানুগতিক পথে যাত্রা না করে হয়ে উঠুক এক সমৃদ্ধ বিভাগ এই প্রত্যাশা নব গঠিত রংপুর বিভাগের ৮ জেলার প্রতিটি মানুষের। বাংলাদশের অন্যসব জেলার চেয়ে পিছিয়ে থাকা এই বিভাগের ৮টি জেলা (দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, নীলফামারী, লালমনির হাট, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা ও রংপুর) দীর্ঘ কাল ধরে বিরামহীন বঞ্চনা ও বৈষম্যের কারণে কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, অন্ন, বাসস্থান, কৃষি, শিক্ষা, সেবাখাত, জ্বালানী, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ, পরিবহন, ঋণ, ব্যবসার সুযোগ, চাকুরী, বিদেশে কর্মসংস্থান ও কর্মীপ্রেরণ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানী প্রাপ্তি, বাজেট বরাদ্দ, সাহায্য, শিল্প, সাহিত্য সংস্কৃতি, খেলাধুলা, বিনোদনসহ সকল েেত্র সমস্যার সম্মুখীন।
বিরামহীন বঞ্চনা ও বৈষম্যের কারণে এই জনপদ পিছিয়ে পড়লেও এখানে রয়েছে অপার সম্ভাবনা। দরকার সরকারী ও বেসরকারী উদ্যগে আশু পদপে গ্রহণ। একটু উল্লেখ করা দরকার, বিশ্বের বিশতম মেগাসিটি ঢাকার সৃষ্ট জলাবদ্ধতা, যানজট, ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপ ও ভয়াবহ পরিবেশ দূষণের কারনে আজ প্রায় বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। তাই ঢাকার উপর চাপ না বাড়িয়ে সময় এসেছে বাংলাদেশের প্রত্যেকটি সেক্টর বিকেন্দ্রীকরনের। এজন্য নবগঠিত এই রংপুর বিভাগ হতে পারে বাংলাদেশের ঢাকার বিকল্প ও প্রয়োজনতুল্য এক নতুন নগরী। শুধু নতুন বিভাগ ঘোষনা ও নামেমাত্র সিটি করপোরেশন তৈরী করলেই হবে না, সৃষ্টি করতে হবে এমন এক নগরী যা আগামীর ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নে রাখতে পারে অগ্রণী ভূমিকা।
প্রথমত, নবগঠিত এই বিভাগের সাথে রাজধানী ঢাকা পর্যন্ত চারলেন বিশিষ্ট সড়ক পথ নির্মাণ করতে হবে। এছাড়া প্রত্যেকটি জেলার সাথে আন্তঃ নগর ট্রেন সংযোগ দিতে হবে। প্রতিদিন কম পে দুইটি করে ট্রেন চলার ব্যবস্থা করে দিতে হবে। এছাড়া রংপুর বিভাগীয় শহর হতে চট্রগ্রাম পর্যন্ত আন্তঃনগর ট্রেন সার্ভিস চালু করতে হবে। এতে করে মানুষ স্বল্প খরচ ও কমসময়ে গোটা বাংলাদেশের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করতে সম হবে। প্রসার ঘটবে শিল্পায়ণ ও বাণিজ্যের।
দ্বিতীয়ত এই এলাকার ব্যবসায় বাণিজ্যের প্রসার এর প্রেক্ষিতে ইমিগ্রেশন সুবিধাসহ সকল স্থলবন্দর চালু করার এখুনি সময়। মাল পরিবহন ও বৈদেশিক বাণিজ্য সৃষ্টিতে সৈয়দপুর বিমানবন্দর, ঠাকুরগাঁও বিমানবন্দর ও লালমনির হাট বিমানবন্দর সংস্কার ও চালু করতে হবে। সেই সাথে আন্তর্জাতিক ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য নির্মিত স্থলবন্দরগুলোর যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা দরকার।
তৃতীয়ত, নবগঠিত এই বিভাগের প্রতিটি জেলা কৃষির উপর নির্ভরশীল। তাই এখানে সরকারকে কৃষি ভিত্তিক শিল্প কলকারখানা সৃষ্টির উপর নজর দিতে হবে। কৃষি ক্ষেত্রের উন্নয়নের জন্য কৃষক ও কৃষি শ্রমিকের জীবনমান উন্নয়নকল্পে স্বল্প মূল্যে ও সহজ শর্তে সার, বীজ ও কীটনাশক সরবরাহ করতে হবে। এই এলাকার এক চিলতে মাটিও যেন অব্যবহৃত পড়ে না থাকে সে ব্যাপারে জনগনকে সচেতন করতে হবে। কৃষি যেহেতু এই এলাকার ভিত্তি তাই কৃষিকে বাদ দিয়ে এই এলাকার অর্থনৈতিক উন্নয়ন কখনই সম্ভব নয়।
চতুর্থত, নবগঠিত এই বিভাগ শিল্প কারখানা প্রতিষ্ঠার জন্য গ্যাস সরবরাহ করতে হবে। এরপর ইপিজেড ও বিসিক শিল্পনগরীগুলোকে পরিপূর্ণভাবে চালু করতে হবে। এছাড়াও আরও একাধিক ইপিজেড নির্মাণ এখণ সময়ের দাবি। এ ছাড়া ব্যক্তিগত উদ্যোগে সৈয়দপুরে প্রতিষ্ঠিত গার্মেন্টস শিল্পের উন্নয়নসহ এই এলাকায় গার্মেন্টস ভ্যালী নির্মাণের জন্য এখনই উদ্যোগ নিতে হবে। যাতে করে নবগঠিত এই বিভাগের শ্রমিকরা নিজেদের শহরেই কর্মের সন্ধান করে। এতে করে ঢাকা শহরে এই এলাকার মানুষের প্রবেশ আরও অনেকটা কমে আসবে। এছাড়া এই বিভাগে শিল্প কারখানা স্থাপনে আগ্রহ সৃষ্টির জন্য ১০ বৎসরের ট্রাক্স হলিডে সরকার ঘোষণা করতে পারে।
একটি বিষয় উল্লেখ না করলেই নয় সৈয়দপুরে যদি ব্যক্তিগত উদ্দোগে গার্মেন্টস শিল্প গড়ে উঠতে পারে তাহলে সরকার সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধি করলে কেন এই বিভাগে গার্মেন্টস ভ্যালী গড়ে উঠতে পারে না। আর আগামীর বিশ্বকে যদি আমরা কল্পনা করি তাহলে এশিয়ার দুই উঠতি শক্তির (ভারত ও চীন) সাথে যদি আমরা সমান তালে চলতে চাই তাহলে এখনই সময় এসেছে এসব বিষয় নিয়ে ভাববার।
পঞ্চমত, বাংলাদেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশী বেকার সমস্যা এই রংপুর বিভাগে। এজ্য এখানে কৃষি ও শিল্প ভিত্তিক কারখানা, গার্মেন্টস, ইপিজেড ও বন্দর ণির্মান করলে বিপুল সংখ্যক বেকার জনগণের জন্য কর্মসংস্থান করা যাবে। তাছাড়া বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের জন্য আর একটি সম্ভাবনাময় দিক হলো জনশক্তি রপ্তানি। এজন্য এখানে জনশক্তি রপ্তানী বিষয়ক একটি কর্পোরেশন ও প্রশিতি জনশক্তি তৈরীর জন্য একটি আধুনিক প্রশিণ কেন্দ্র ণির্মাণ করা যেতে পারে। আর এই প্রশিণ কেন্দ্রে প্রশিণ গ্রহন করবে আমাদের এই নবগঠিত রংপুর বিভাগের যুব পুরুষ ও মহিলারা। আইটি সেক্টরে বিশ্বেও অনেক দেশের সাথে পাল্লা দিয়ে এখানকার যুবরা এই বিভাগে বসে থেকে আনতে পারে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা।
ষষ্ঠত, দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন তরান্বিত করার জন্য সর্ব পর্যায়ে বিকেন্দ্রীকরনের যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে তা যদি আমরা আজ নাও করি অদূর ভবিষ্যতে এই বিকেন্দ্রীকরণের কোনো বিকল্প নাই। তাই আমাদের সামনে এখনই সময় নবগঠিত রংপুর বিভাগ দিয়েই আমরা এই কার্যক্রমের যাত্রা শুরু করতে পারি। সেক্ষেত্রে প্রথমেই আমরা চিকিৎসা ও প্রযুক্তি খাতকে এই বিভাগের আওতায় আনতে পারি। সরকারী ও ব্যক্তি মালিকানায় যদি আমরা এই বিভাগে কয়েকটি আন্তর্জাতিকমানের চিকিৎসা কেন্দ্র ও বিশেষায়িত হাসপাতাল স্থাপন করতে পারি এবং বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের কাজের পরিবেশ তৈরী করতে পারি এবং চিকিৎসা কার্যে সহায়তার জন্য আধুনিক যন্ত্রপাতি ক্রয়ে সরকারী সহায়তা দিতে পারি তাহলে ভারতের চেন্নাইয়ের মতো শংকর নেত্রালয়ের মতো আন্তঃর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন চিকিৎসা কেন্দ্র, হাসপাতাল ও কিনিক এই রংপুর বিভাগেও তৈরী করা সম্ভব। এতে একদিকে কমে যাবে রাজধানী ঢাকার উপর মানুষের চাপ অন্যদিকে কমখরচে দেশী বিদেশী নাগরিকরাও পাবে চিকিৎসা সহায়তা। এজন্য প্রয়োজন সরকারী ও বেসরকারী উদ্দ্যোগে এগিয়ে আসা এবং রংপুর মেডিক্যাল কলেজকে রংপুর মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপায়নসহ চিকিৎসা সংক্রান্ত আন্তর্জাতিকমান অর্জনের জন্য যাবতীয় বিষয়ে পদপে নেবার এখনই সময়।
এছাড়া নবগঠিত এই বিভাগে প্রয়োজন আন্তর্জাতিক মানের একটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনসহ পাশ্ববর্তী দেশ ভারতের বেঙ্গালর শহরের মতন প্রযুক্ত খাতে উন্নত শহর প্রতিষ্ঠিত করা যায় কিনা আজ এই বিষয়টিও ভাববার মতো সময় এসেছে। কারণ দেশের জনগণের নাগরিক সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধির জন্য প্রশাসনসহ সর্বস্তরে বিকেন্দ্রীকরণের প্রয়োজনীয়তা অনষীকার্য।
সেই সাথে এই বিভাগের মূল ভিত্তি সেই কৃষিকে যদি আমরা একটা আধুনিক কাঠামোয় নিতে চাই তাহলে অন্ততঃ পে কৃষি মন্ত্রনালয়কে রাজধানী ঢাকা থেকে স্থানান্তর করে এই নবগঠিত রংপুর বিভাগে স্থাপন করার এখনই উপযুক্ত সময়। এতে করে কৃষি মন্ত্রণালয় ফিরে পাবে তার আসল গতি।
সপ্তমত, রংপুর বিভাগের মধ্য দিয়ে অসংখ্য নদনদী প্রবাহিত। এই জনপদের অসংখ্য মানৃষ নদী ভাঙ্গনের শিকার। এই পরিবারগুলোকে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। এছাড়া এ নদীগুলো খনন, অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ, নদী ভাঙ্গন রোধ ও নদীর পানি দিয়ে সেচ সুবিধা প্রদান করে ফিরিয়ে আনতে হবে অবহেলিত নিঃস্ব মানুষগুলোর ভাগ্য। এজন্য সরকারকে উদ্দ্যোগি হয়ে প্রতিষ্ঠা করা দরকার এই বিভাগের সুযোগ সুবিধা ও সমস্যাদি নিয়ে একটি কার্যকর গবেষণা সেল। সেই গবেষণা সেল আগামী ২০ বৎসরে এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ন সিটি হিসেবে এই রংপুর বিভাগকে প্রতিষ্ঠিত করবে।
শুধু মাত্র কাগজে-কলমে নতুন বিভাগ সৃষ্টি করা সরকারের জন্য বড় কোনো অর্জন নয়। যেহেতু নবগঠিত বিভাগ তার কার্যক্রম শুরু করেছে এবং বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই বিভাগের যাবতীয় দায়িত্ব তাঁর নিজ হাতে তুলে নিয়েছেন তাই এই জনপদের মানুষের স্বপ্ন এখন অনেক বড়। সরকার যদি বর্তমান সময়ে উপরোক্ত ইস্যুগুলোতে বাস্তবমুখি কার্যকর পদপে নেয় তাহলে এই নবগঠিত রংপুর বিভাগ একটি রাইজিং সিটি হিসেবে এশিয়ার বুকে স্থান করে নিবে এবং আগামী ২০ বৎসর পরে এই সিটি যদি এশিয়ার বুকে স্বতন্ত্রস্থান করে নেয় তাহলে সে লাভ তো গোটা বাংলাদশেরই। আমরা চাই রংপুর বিভাগ খুলে দেক তার সম্ভাবনার অপার দুয়ার।
# আইনজীবী, জেলা আইনজীবি সমিতি, কুড়িগ্রাম , মোবাইল: ০১৭৩৭০৩৭১৭২, ০১৯১১৯৭১০২৯
# (এ লেখাটি কুড়িগ্রাম নিউজ ডট নেট-এ ফিচার বিভাগে প্রকাশিত)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



