-কাজিন এর বাসায়; কেন ?
- যেখানেই থাকো , আজকে চাঁদ দেখবে কিন্তু । আজ পূর্ণিমা, এই চাঁদ আবার দু’হাজার ষোলতে দেখতে পাবে...
- কেন, কেন !
- আজ রাতের চাঁদ নাকি এমনি পূর্ণিমার চাঁদের থেকে চৌদ্দ গুণ বড় আর অনেক উজ্জ্বল হবে ...
- তাই নাকি ! তাহলে তো দেখতেই হয়...
- হুমম ... । (হেসে ফোনটা রেখে দেয় রিন)
রিন বেশ ছুটোছুটি করল- এ বারান্দা, ও বারান্দা, গ্রীলের গায়ে মাথা সেধিঁয়ে রাতের আকাশ যতটা দেখা যায় ; কিন্তু দেখা তো যাচ্ছেনা ! বাবাকে বলে সাথে মোবাইল ক্যামেরাটা নিয়ে ছাদে রওয়ানা দিল, কিন্তু ছোট্ট তালা ঝুলছে ছাদের দরজায়। নতুন বাসার ছাদে এখনও এমনি এমনি কখনও যাওয়া হয়নি বলে চাবি না নিয়ে ভুলই করেছে মেয়েটা। প্রায় পৌণে ন'টার সময় নীচের দাড়োয়ানকে ফোন করে চাবি চাওয়াটাও বেমানান হয়ে যাবে। একবার ভাবল নীচের রাস্তায় হেঁটে আসলে হয়; কিন্তু তাতে আবার মা বাধ সাধতে পারেন। ”ধুউউর ! তারচেয়ে কিছু একটা লেখা যাক” – রিনের আবার টুকটাক লেখালেখির ব্যামো আছে, সেই সাথে একটু গান পাগলও বটে। অর্ণবের একটা গান গুনগুন করতে করতে ল্যাপটপ খুলে বসে রিন –
চাঁদ দেখে কেউ থুড়থুড়ে ষাট বুড়ো
চাঁদ দেখে কেউ টাটকা তরুণ খোকা
চাঁদ দেখে কেউ প্রখর বুদ্ধিমান
চাঁদ দেখে কেউ ভ্যাবাচ্যাকা, কেউ বোকা...
***
গুটিশুটি মেরে শীতের রাতে বাড়ির ছাদে বসে আছে শফিক। সামান্য ফোঁপাচ্ছেও বোধহয়। চোখ লাল, চুল উস্কখুস্ক । আভিজাত্য আর আবেগের বিশাল ফাড়াক আজকে শিখেছে সে। রত্না কি বিশাল অপমানই না করল তাকে সবার সামনে! চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিল শফিকের সামাজিক অবস্থান, আথির্ক দৈন্যতা। শফিকের নাকি পরম সৌভাগ্য ছিল যে রত্না তাকে বন্ধু ভেবেছিল, আর শফিক বিত্তের মোহে সেই বন্ধুত্বকে প্রেম হিসেবে প্রচার করে ফায়দা লুটতে চেয়েছিল। ”উফ! ...” লজ্জা, ক্ষোভ আর অপমানের মিশ্রিত অনুভূতিতে কাতরাতে থাকে শফিক।
রত্নার বিয়ের জমজমাট উৎসব চলছে শেরাটনে। চোখ ধাঁধানো আলোকসজ্জায় ফিকে হয়ে যায় আজকের পূর্ণিমা।
***
- আরে, আরে ! করছ কি !
- উহু ! আরেকটু হাঁটো। ভয় কি ! আমি তো আছিই ...
নীলার চোখ বেঁধে তাকে বাড়ির লনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে রায়হান । কি নাকি সারপ্রাইজ দেবে! নীলা খুব রেগে আছে। বাসায় একটা অনুষ্ঠান চলছে। রায়হানের অনেক আগে ফেরার কথা। মেহমানরা বারবার জিগেষ করছে ওর কথা। আর রায়হান মাত্র এসে এই রকম ছেলেমানুষী খেলা করছে । ”কোন মানে হয় এগুলোর ...!” , মনে মনে ভাবে নীলা ।
রায়হান নীলাকে লনের এক পাশের সুইমিং পুলের ধারে দাঁড় করিয়ে দিয়ে ধীরে ধীরে চোখের বাঁধন খুলে দিয়ে তাকাতে বলল। নীলা চোখ কচলে বিরক্তিমাখা মুখে একবার রায়হানের দিকে তাকিয়ে পুলের দিকে তাকাতেই প্রথমে বিস্মিত তারপর মুগ্ধ আর তারপর হেসে ফেলল । অনেকগুলো ছোট ছোট প্রদীপ ভেসে বেড়াচ্ছে পুলের পানিতে, কিন্তু ঠিক মাঝখানটা দখল করে রয়েছে আজকে রাতের বিশাল গোল চাঁদটা । নীলা একটু আহ্লাদি ভঙিতে রায়হানের দিকে তাকাতেই রায়হান একটা দুষ্টু হাসি দিয়ে ফিসফিসিয়ে বলে উঠল , ”হ্যাপী ম্যারেজ এ্যনিভার্সিরি” ।
***
গ্রাজুয়েশন শেষ । ছাত্রবস্থার সেই মধুর, বাঁধনহারা দিনগুলোতে ভাটা পড়তে যাচ্ছে মনে হতেই দমে গেল ওরা ছ’জন - ইউনিভার্সিটি মাতিয়ে রাখা ছয় তরুণ। প্রায় সবাই চাকরী করার সিদ্ধান্তই নিল। শুধু জয়ন্ত ঠিক করল বিদেশ যাবে। লেখাপড়ায় ভালই ছিল, তাই খুব সহজেই স্কলারশীপ যোগাড় হয়ে গেল; সামনের মাসেই উড়াল দিতে যাচ্ছে সে।
সবাই বুঝতে পারছে এখন আর আগের মত সেই ক্ষণে ক্ষণে আড্ডা হবেনা । কঠিন একটা জীবনে প্রবেশের আগে তাই সবাই একটা হৈ-হুল্লোড় করবে বলে ঠিক করল। যেই ভাবা সেই কাজ । কক্সবাজার না গেলে নাকি আড্ডা জমবেনা !
আজকে নাকি বিশেষ এক পূণির্মা। তাই দেখতে এই মধ্যরাতেও ওদের চোখে ঘুম নেই। হোটেলের বাইরে এক জায়গায় গোল হয়ে বসে আকাশ-পাতাল গল্প, হাসি-ঠাট্টা। সুমন খুব ভাল গিটার বাজাতে পারে, গানের গলাও ভাল। সেই একটা গান ধরে বসল - কফি হাউজের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই, আজ আর নেই । গানটা সবাইকে ছুঁয়ে গেল যেন, বাকিরাও গলা মেলালো ।
জয়ন্ত কেমন যেন আনমনা হয়ে যায়। এক ফাঁকে উঠে গেলেও কেউ খেয়াল করলনা ওকে। আনমনে হাঁটতে হাঁটতে সৈকতের দিকে চলে আসে। বন্ধুদের ছেড়ে যেতে খুব কষ্ট হবে তার। চৈতি এতোদিন তার জন্য অপেক্ষা করবে কিনা তা নিয়েও সে যথেষ্ট বিচলিত ।
দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মাথা উপড়ে তুলে চাঁদ দেখতে দেখতে হাঁটছে জয়ন্ত। খেয়াল করেনি সাগরের পানিতে নেমে গেছে সে। একটা ঢেউ এসে ধাক্কা দিতেই জয়ন্ত পড়ে যায় পানিতে। নিজেকে সামলাতে গিয়ে আরো যেন দেবে গেল সে, আটকে গেল পা। হাতে ভর দিয়ে উঠতে চেষ্টা করতেই আরেকটু দেবে যায় শরীরটা নরম বালিতে। পানি বারবার আছড়ে পড়ে জয়ন্তকে সোজা হতেও দিচ্ছে না।
সাগরের এদিকটা লোক চলাচলের জন্য নিষিদ্ধ। জয়ন্ত আনমনেই চলে এসেছে এদিকে। এমনকি কোন গার্ডের নজরেও পরেনি!
নি:শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে জয়ন্তের- -ভয়ে কিনবা ঠাণ্ডায়। সে সাঁতারও জানে না ! গলা দিয়ে কোন শব্দও কেন জানি বের হতে চাইছেনা জয়ন্ত'র। ও যতই চেষ্টা করছে চোরাবালি থেকে মুক্ত হতে ততই দেবে যাচ্ছে, পানির তোড়ে ঠান্ডায় জমে যাচ্ছে শরীর।
পানি বাড়ছে ধীরে ধীরে। ভরা পূর্ণিমায় সাগরে আজ প্রবল জোয়ার। অনেক দূরে আবছা ভাবে অট্টহাসি আর গিটারের সুর নোনা বাতাসে ভেসে এসেই মিলিয়ে যাচ্ছে...
***
আরজ আলী আজ প্রায় দশ বছর ধরে তিনটে গ্রামের চেয়ারম্যান। লোকটা আসলেই যথেষ্ট সৎ এবং নীরিহ গোছেরও বটে। তাকে দু’চোখে দেখতে পারেনা কেবল রমিজ মিঞা। অবাক হওয়ার কিছু নেই। রমিজ মিঞার টাকা-পয়সার অভাব নেই কিন্তু তারপরও তার চেয়ারম্যান হওয়ার খায়েশ পূরণ হচ্ছেনা এই আরজ আলীর জন্যই। রমিজ মিঞা বুঝতে পারে, এই লোকের জীবদ্দশায় তার চেয়ারম্যান হওয়া কোন ভাবেই সম্ভব না।
প্রতি বছরের শেষ পূর্ণিমায় ভবানীপুর গ্রামে সাত দিনের মেলা বসে। তিন গ্রামের মানুষজনই সেখানে যায়। মেলা বরাবরই উদ্বোধন করেন আরজ আলী চেয়ারম্যান এমনকি শেষ দিনও আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘোষনা করেন।
আজ সেই মেলার উদ্বোধনী ছিল। মেলা ঘুরে ঘুরে দেখতে দেখতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। ভবানীপুরের পাশের গ্রামেটাই আরজ আলীর গ্রাম। সাথে কেউ না থাকায় একাই ফিরতি পথ ধরলেন আরজ আলী। গ্রামের শেষের দিকে বেশ গাছগাছালি; মাঝ দিয়ে সরু রাস্তা গিয়ে মিশেছে তার গ্রামের সাথে। কাছেপিঠে কোথাও একটা পুকুরও আছে । আজকে পূর্ণিমা থাকায় পথ চলতে কোন অসুবিধা হচ্ছেনা । একমনেই দ্রুত হেঁটে চলেছেন বলে আশেপাশের কোন নড়াচড়া চোখে পড়লনা আরজ আলী'র।
পথের একটা বাঁক নিতেই পেছন থেকে কে যেন জাপটে ধরল আরজ আলীকে। এমন আচমকা ঘটনায় আরজ আলী শুরুতে একটু বেসামাল হলেও পরক্ষণে সামলে নিয়ে শরীর মোচড়াতে শুরু করলেন। শরীরটা একটু বাঁকা করতেই আরেকটা বিশাল শরীর সামনে এসেই একটা বস্তা গলিয়ে দিল তার মাথায়। আরজ আলী যথেষ্ট সুঠাম দেহের হলেও দু’জন পালোয়ানদেহীর সাথে পেরে ওঠার কথা না। পেছনের জন তাকে ধাক্কা মেরে শুইয়ে দিয়ে মুখ চেপে ধরল । আরেক জন তার হাত-পা বেঁধে ফেলছে । বড় হাঁশফাঁশ অবস্থা আরজ আলীর। ঠিক এসময় একটা কণ্ঠস্বর শুনলেন। তৃতীয় কোন ব্যক্তি যেন বলে উঠল, ”ওই, এই শালারে, পুকুর পাড়ের দিকে নিয়া আয় তোরা” । গলার আওয়াজ যেন আরজ আলীর চেনা-জানা ঠেকল!
পুকুর পাড়ের পাশে রমিজ মিঞা ভ্রু কুঁচকে দাঁড়িয়ে। এই শীতেও কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। শরীর কাঁপছে উত্তেজনায়।
বস্তার উপর দিয়ে একজন আরজ আলীর মুখ চেপে ধরে আছে। আরেকজন তার পা’দুটো ধরে ছেঁচড়ে নিয়ে চলেছে। আরজ আলী গোঙাচ্ছেন। চেষ্টা করছেন চিৎকার করার, নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়ার; কিন্তু ততই দূর্বল হয়ে পড়ছে শরীর। হঠাৎ ঠাণ্ডা অনুভূত হলো তার। বস্তা এবং সেই সাথে পরনের কাপড় আর শরীর ভিজে যেতে লাগল। চারটা হাত তাকে চেপে ধরে আছে। তাকে ডুবিয়ে মারা হচ্ছে! আরজ আলী আরেকবার শরীরের সব বল প্রয়োগ করেন।
আকাশে তখনও চাঁদ । নীচে পুকুরের পানিতে আলো-আঁধারিতে তখনও চলছে তিনটে শরীরের হুটোপুটি।
***

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

