somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমাদের slumdog –রা

০১ লা ফেব্রুয়ারি, ২০০৯ রাত ৮:১৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


*** ভূমিকা : intro ***

এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। পত্রিকায়, অফিসে, বন্ধুদের আড্ডায় এমনকি ব্লগেও- সবাই আলোচনায় মাতোয়ারা; কেউ বলছে, ”অনেক দিন পর একটা ভাল সিনেমা দেখলাম”, কেউ বলছে ,”দারুণ একটা মুভি”, আবার কেউ বলছে, ”দেখার মত ছবি” । আর তাই দেখতেই হলো - slumdog millionaire ।

*** light, camera, action ***

এক বিপণী বিতানে কেনাকাটা শেষে মূল্য পরিশোধের মুহূর্তে পাশ থেকে হাত বাড়িয়ে দেয়া তরুণের দিকে দ্বিতীয়বার দৃষ্টিপাত করি। তরুণের হাতে ল্যামিনেটিং করা একটি আবেদন পত্র ; পড়ার ধৈর্য্য হয় না অবশ্য । এক পা আর এক লাঠি হলো তরুণের চলার পাথেয়; ডান পা শুধু হাঁটু পর্যন্ত, তাও কেমন সরু হয়ে এসেছে জায়গাটা! একটি প্লাস্টিকের পা কেনার জন্য চলছে তরুণের ভিক্ষাবৃত্তি।

ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় ট্র্যাফিক সিগন্যাল বা যানজটের ফাঁকে উঁকি দেয় দশ থেকে বারো বছরের এক কিশোর । দু’খানা নয়, দেড়খানা পা আর একটি লাঠিতে ভর করে শরীরটাকে টেনে এনে, থেমে থাকা গাড়িগুলোর জানালায় হাত বাড়িয়ে দেয় জীবিকার খোঁজে।

বছর দুয়েক আগে একটি আট-নয় বছরের মেয়েকে বাসে ভিক্ষা করতে দেখতাম। তবে মেয়েটি শুরুতেই টাকা চাইতো না, বরং এক জায়গায় দাঁড়িয়ে স্পষ্ট, সুউচ্চ ও সুরেলা কণ্ঠে কোন মারফতী ধরনের গান শোনাতো। গানের শেষে যাত্রীদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ শুরু হতো। যতদূর মনে পড়ছে মেয়েটি অন্ধ ছিল।

গত রোজার মাসের সময়; আট-দশ বছর বয়সী এক মেয়েকে দেখলাম চুপচাপ বাসের প্রতিটা যাত্রীর কাছে চিরকুট বিলিয়ে গেল একাধারে। আমার কাছেও চিরকুট এলো । চিরকুটের লেখা অনেকটা এরকম ছিল , ”সংসারের সব ব্যয়ভার আমার উপর, আমি চকলেট বিক্রী করে সংসার চালাই, কিন্তু রোজার মাস বলে কেউ চকলেট কিনছে না, তাই অনুগ্রহ করে কিছু টাকা সাহায্য করার আবেদন জানাই” । যাত্রীদের অনেকেই এক-দু’টাকা সহকারে চিরকুট ফেরৎ দিতে দেখি।

ঠিক একই রুটের বাসে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে দেখলাম। তবে প্রতিদিন চেহারা বদলাতে লাগল, চিরকুটের শেষে নাম বদলাতে থাকল - কখন বেলী কখনও মালা আবার কখনও শেফালী; বেশীর ভাগই মেয়ে। একদিন তের-চৌদ্দ বছরের এক মেয়েকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলাম। মেয়েটির সাজ-পোষাকের সাথে বিলানো চিরকুটে বর্ণিত দূরাবস্থা মেলানো যায় না। হতে পারে এই কিশোরী হয়ত হুট করে আর্থিক দূরাবস্থার সম্মুখীন হয়ে সাহায্য প্রার্থনা করছে। কিন্তু প্রতিদিন বিভিন্ন নামে একই রকম চিরকুট পড়তে পড়তে সন্দেহ দানা বাঁধে- নিত্যদিনের এই মিল কোন দৈবযোগ নয়, বরং একটি সংঘবদ্ধ চক্রের ব্যবসা বুঝতে বেগ পেতে হয়না মোটেও।

ছোটবেলায় এলাকায় দলগত ভিক্ষাবৃত্তি দেখতাম মাঝে মাঝে। তিন থেকে আট জনের একেকটি দলের বেশীর ভাগই পঙ্গু ; কেউ গড়িয়ে, কেউ রাস্তায় ছেঁচড়ে নিয়ে চলেছে নিজেদের। সেই সাথে তীক্ষ্ণ কণ্ঠে চলতো মিলিত সংগীত , ”আমার আল্লাহ-নবীর নাম...”; গানের মাঝে মাঝে কেউ কেউ একটা হেঁচকি তুলে টান দিত। আজকাল অবশ্য এধরনের ভিক্ষুকের দল দেখি না এলাকায়।

কয়েক মাস আগের কথা; স্কুটার থেকে নামতেই এক তরুণ সামনে দাঁড়িয়ে সাহায্য চাইলো। তরুণের এক হাত নেই, আরেক হাতও শারীরিকভাবে অক্ষম- সরু হয়ে এসেছে এবং খানিকটা বাঁকানো। তরুণের কাঁপুনি ধরনের কোন অসুখ ছিল , শরীর কাঁপছিল । আমার অবশ্য প্রথমে মনে হচ্ছিল মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য এ বুঝি কোন কৌশল । তারপরও শারীরিক অক্ষমতার কথা ভেবে টাকা দিতে গিয়ে দেখি ভাংতি নেই। ভাংতি ফেরৎ দিতে পারবে কি না জিগেষ করতে তরুণ মাথা নেড়ে অক্ষম হাত দিয়ে চেষ্টা করল পকেট থেকে টাকা বের করে আনতে। সমস্যা হলো তাতে তার হাত এবং শরীরের ঝাঁকুনি বাড়ছিল। হাতের আঙ্গুল পকেট স্পর্শ করেও ছুটে গেল দু’বার। ভাংতি টাকা ফেরৎ পাবার আশায় আমি একটু ভাবলেশহীনভাবে দৃশ্যটি দেখছিলাম । শরীরের তীব্র ঝাঁকুনিতে তৃতীয় বারের চেষ্টাতেও ব্যর্থ তরুণের মুখ দিয়ে একটি অস্ফুট আওয়াজ বার হলো। হয়ত নিজের অক্ষমতায় সামান্য ক্ষোভ, বিব্রতবোধ - কিছু একটা ছিল সেই আওয়াজে; আমি সংবিৎ ফিরে পাই, নিজের দাঁড়িয়ে থাকা নিয়ে নিজেই বিব্রত হই। ”আচ্ছা, থাক, ভাংতি লাগবে না”, সরে পরি তাড়াতাড়ি।

পপকর্ণ সংস্স্কৃতি খুব তাড়াতাড়ি ছেয়ে গেছে আমাদের দেশে। ট্রাফিক সিগন্যালে বা যানযটে, গাড়ি থামলেই একজনের পর একজন পপকর্ণের প্যাকেট বাড়িয়ে ধরে । ১০ টাকা দামের এই প্যাকেট চলতি পথে কতটা বিকিকিনি হয় তা জানিনা, তবে বহু কিশোর-কিশোরীদের ”পপ্পন, পপ্পন” ধ্বনিতে ব্যতিব্যস্ত হয়ে ওঠে প্রতিটা ট্র্যাফিক সিগন্যাল, নড়েচড়ে ওঠে যানযট ।

আমাদের এলাকার সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠদান সম্পূর্ণ অবৈতনিক বলেই জানি। অনেক ছোটবেলার কথা, আমি তখন স্কুল ছাত্রী; প্রায় রোজই এক ছেলেকে কাঁধে ব্যাগ নিয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যেতে দেখতাম। ছেলেটি তার সরু দু’পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়াতে পারতোনা । তাকে চলতে হতো জন্তুর মত চার হাত-পায়ে আর পিঠে থাকতো স্কুলের ব্যাগ। জানিনা ওই ছেলে কতদূর পড়াশুনা শেষ করেছে ।

গোলাপই চলে বেশী, তবে বর্ষাকালে কদম আর বেলীর মালা হাতেও ছুটে আসে উস্কখুস্ক চুলের কিশোর-কিশোরীরা, টোকা দেয় গাড়ির জানালায়। কেউ কেউ আবার চকলেট বিক্রী করে। এক সময় রাজনীতির মিছিলে টোকাইদের ঠেলে দেয়া হতো। পিকেটিং করানো হতো। বস্তির জীবনে বিচিত্র লোকের আনাগোনায় , অনেক কিশোর ভিড়ে যায় মাদক ব্যবসায়, নিজেই হয়ে যায় মাদকসেবী।



নাক চেপে ধরে রাস্তার ডাস্টবিনগুলোকে পাশ কাটানোর সময় চোখ-মুখ কুঁচকে একবার তাকালে চোখে পড়বে নেড়ি কুকুরের আশেপাশে কিছু শিশু-কিশোর ময়লা নাড়াচাড়া করছে; কারো কাঁধে বস্তা বা হাতে ব্যাগ । অবলীলায় দূর্গন্ধময় ময়লার স্তুপে দাঁড়িয়ে খুঁজে দেখে কোন খাবার পড়ে আছে নাকি ! নয়তো এমন কোন পুরনো জিনিস যা হয়ত একটু ঘষেমেজে বেচা যেতে পারে!

*** Interval-এ ভাবনা, ভাবনায় Interval ***



সিনেমার প্রভাব বেশ জাঁকিয়ে বসেছে মগজে।

slumdog -এর কাতারে দাঁড় করাই আমাদের পথকলি, টোকাইদের। আজকাল অন্ধ বা খোঁড়া কোন কিশোর-কিশোরী ভিক্ষুক দেখলে তাদের অন্ধত্ব, পঙ্গুত্বের পেছনের কাহিনী নিয়ে ভাবি ! এ জীবন কি বিধাতার অভিশাপে অভিশপ্ত নাকি দুষ্টুচক্রের ব্যবসায়িক ফন্দিতে অসহায় বন্দীত্ব ! স্যাঁতস্যাঁতে বস্তিতে কত বিচিত্র অভিজ্ঞতা! দারিদ্রতা আর পরিবেশ পরিচয় করিয়ে দেয় অন্ধকার জীবনের সাথে। গমনাগমন হয় অপরাধ জগতে, নিষিদ্ধ পল্লীতে! ”আজকের শিশু, আগামী দিনের ভবিষ্যৎ” , -কে তুড়ি মেরে ভুল প্রমাণিত করে কেউ কেউ হয়ে ওঠে পকেটমার, ছিনতাইকারী, মাদকসেবী, মাদক ব্যবসায়ী আর অপরাধ জগতের বাসিন্দা। জীবনের বিশেষ বিশেষ মোড়ে life line এর সাহায্যে এরা সঠিক দিক-নির্দেশনা পায় না ! আমাদের slumdog –রা ভাগ্যদেবীর সুপ্রসন্নতার অভাবে নাটকীয়ভাবে millionaire হয় না !

*** সমাপ্তি : the end ***

It is written !!!







================
ছবিসূত্র :
১. Click This Link
২. Click This Link
৩. Click This Link
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই অক্টোবর, ২০০৯ দুপুর ২:০২
৫৪টি মন্তব্য ৪৫টি উত্তর পূর্বের ৫০টি মন্তব্য দেখুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

শিক্ষা খাতে শুরু হয়েছে তারেক রহমান ম্যাজিক

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১১:২৯


রাজনীতির মাঠে ক্ষমতার হাতবদল যেমনই হোক না কেন, সাধারণ মানুষের আসল নজর থাকে জীবনের মৌলিক জায়গাগুলোতে। আর একটি দেশের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো শিক্ষা ব্যবস্থা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×