দশ.
এক সময় মনে হয়ে ছিল যে মানুষ কে খুজে পাওয়াটা এক প্রকার অসম্ভব সেই বদরুল আলম বেনু'র সাথে আজ কথা হবে দেখা হবে ভাবতেই কেমন যেনো লাগছিল! গাড়ীতে আমি শান্ত আর গাড়ীর চালক মামুন। ঢাকায় নামার পর এয়ারপোর্ট থেকেই মামুন আমার সঙ্গী। আমার এই প্রজেক্টে সে ও জড়িয়ে গেছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম-দিনাজপুর কোন যায়গা বাদ নাই চষে ফেলেছে সব আমার সাথে। প্রোডাকশন টীমে থাকতে থাকতে মামুন ও জেনেগেছে ভাষ্কর আর ভাষ্কর্য্যর আগা মাথা! আসা যাওয়ার পথের মাঝে সে ও আলাপ জুড়ে দেয়, ঢাকার কোন শিল্প কর্মটা দেখার মত হয়েছে আর কোনটা দেখলে মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। আমি কোন আর্টিষ্ট নই তবুও মাঝে মাঝে ওর কথা মনযোগ দিয়ে শুনি। এক জন ছা'পোষা খেটে খাওয়া মানুষের শিল্প বোধ/ ভাবনা আমাকে উদ্বেলিত করে!
গাড়ী এয়ার্পোটের গোল চক্কর যখন পেরুচ্ছে তখন দেখলাম গোল চক্করটা চতুর দিক দিয়ে ঢাকা। এরই মাঝে দরজা মত ফাঁক দিয়ে আমরা দেখলাম ওখানে যেনো কিছু একটা সৌন্দর্য্য বর্ধক কোন স্থাপনা তৈরী হচ্ছে। আমি যেনো কোন কথায় ছিলাম চক্করটা ক্রস করতে করতে আপনাতেই জিজ্ঞেস করলাম এই খানে এইটা আবার কি হচ্ছে? সঙ্গে সঙ্গে মামুন ফশ্ করে বলে বসল, আন্কেল এইডা মনে হয় কোন আটিষ্টের কাম না মিস্তিরির কাম। কন্টেক্টর দিয়া করাইতাছে। আমি বলি, তুমি বুঝলা কেমনে মামুন? ও বলে, দেইকখা কইলাম আন্কেল। দেইখা পছন্দ অয় নাই তাই কইলাম। আমি আর ওর পন্ডিতির কোন জবাব দি না। গাড়ী ছুটে চলছে উত্তরার দিকে, দুপুর গড়িয়ে পড়ছে। ডে লাইটে শুট করবো ভেবে রেখেছি। শীতের বিকেলে কতটুকু আলো পাব আমার মাথায় সে চিন্তাও ঘুরছে তখন।
আমরা এক সময় উত্তরায় আশিক ইমরানের ফ্লাটে পৌছুলাম। আমাদের বসিয়ে রেখে আশিক ভেতরে গেলেন। আমি আর শান্ত ক্যামেরা সরঞ্জাম ঠিক ঠাক করে নিচ্ছি। আশিক তার মা কে নিয়ে ঢুকলেন। আমরা পরিচিত হলাম। তিনি আমাদের কুশল/ পরিচয় ইত্যাদি জানছিলেন। আশিক চলে গেলেন আবার ভেতরে। একটু পর ফিরলেন তার বাবা বদরুল আলম বেনু'র পিছু পিছু। আমরা উঠে দাড়ালাম। আশিক বেশ ভঙ্গি নিয়ে বললেন, এই হচ্ছেন আপনাদের আক্ংক্ষিত বদরুল আলম বেনু। আমার বাবা। 'আমার বাবা' এই শব্দ দু'টো উচ্চারনের সময় আশিকের মুখের অভিব্যাক্তি ছিল দেখবার মত। সত্যিই ত এমন পিতার সন্তান হওয়া ত যে কোন সন্তানের জন্য পরম সৌভাগ্যর মতন।
বেনু সাহেবের মুখে যেন হাসি লেগেই থাকে। খুব আন্তরিকতায় আমার কথা গুলো মন দিয়ে শুনলেন। কথা শেষে একটা নাতিদীর্ঘ শ্বাস ফেলে কিছুক্ষন চুপ করে বসে রইলেন। এত দিনে আমি জেনে গেছি অপরাজেয় বাংলা নিয়ে এই শিল্পীর রয়েছে আজীবনের এক অভিমান, মনোকষ্ট। আমি শঙ্কায় থাকলেও নির্দিধা ছিলাম। আমার বিশ্বাস ছিল এ কাজে আমাকে কেউ ফেরাবেন না। আমি পারবো।
বেনু সাহেব শুকনো গলায় বললেন, আজ এত দিন পর কি আর বলব! এ সব বলে কি বা আর হবে! আমি উত্তরে বললাম, আপনার যা বলার যা বলতে ইচ্ছে হয় তাই বলুন। আমরা আপনার কথা শুনতে এসেছি। বুঝলাম উনি বলতে চাইছেন কিন্তু কষ্টে হয়ত সব কিছু দলা পাকিয়ে দিচ্ছে। আমি চুপচাপ ক্যামেরা খুললাম। বেনু সাহেবের স্ত্রী ওনার পাশে বসে বললেন, বল না বল। অপরাজেয় বাংলা নিয়ে তোমার সব কথা বল। আজ এত দিন পর ওরা এসেছে তোমার খোজ নিয়ে। তুমি ওদের বল। বেনু সাহেব শিশুর মতন বললেন বলে কি হবে! সেবার এক সাংবাদিক এসে কত কি শুনল, আমার কত গুলো অমূল্য ছবি নিয়ে গেল। কই কোথাওত আমার কথা বলল না! অপরাজেয় বাংলার সেই মূল্যবান ছবি গুলোও আমায় আর ফেরত দিল না।
ঘরের ভেতর আলো কমে যাচ্ছিল, আমরা সবাই মিলে ছাদে চলে এলাম। ক্যামেরা চলছে বেনু সাহেব তার কথা শুরু করলেন এভাবে, আমি দিনাজপুর থেকে উন্নিশ আটষট্টি সালে ঢাকায় এসে আর্ট কলেজে ভর্তি হই... তার পর একে একে মুক্তিযুদ্ধ, আমাদের স্বাধীনতা, অপরাজেয় বাংলা নির্মান পটভূমী ও নির্মান ইতিহাস। পাচাত্তরে পনরই আগষ্টের কলঙ্ক জনক হত্যাকান্ডের পর কেমন করে ট্যাংন্ক তাক করে রাখা হয়েছিল অপরাজেয় বাংলার দিকে শুনে হতবিহব্বল হয়ে গিয়ে ছিলাম সেদিন! কত কথা কত অজানা, আমি শট ঠিক করব ছবি ভাল করে তুলব না কি অবাক হয়ে শুনব কুলকিনারা পাচ্ছিলাম না কোন। আকাশের আলো হারিয়ে যাচ্ছিল দ্রুত, ততক্ষনে শিল্পী একটু একটু সহজ হয়ে উঠেছেন। তার ক্ষোভ অভিমান ভুলে স্মৃতি হাতরাতে শুরু করেছেন। আমি বুঝলাম এই এক দিনে হবে না। সাহস করে বললাম চলেন সামনের এক দিন আমরা অপরাজেয় বাংলার সামনে যাই। সেখানে না হয় আপনার বাকী কথা গুলো শুনব। উনি সাথে সাথেই সম্মতি দিলেন। আমরা আবার নিচে নেমে এলাম।
ফেরার পথে মামুন কে বললাম মামুন আমারে একটু গ্রামের পথ দিয়ে নিয়া চল। আমার ভীষন নদী জল এই সব দেখতে ইচ্ছে হচ্ছে এই সাঁঝের বেলায়। ফিরতে হবে জানি তবু এত তারাতারি নগরের জঞ্জালে ফিরতে মন চাইছে না। মরার ঐ শহরে আমি আমার বাংলাদেশ খুজে পাই না আর। আজ আমার বাংলাদেশের কাছে একটু থাকতে ইচ্ছে করছে। ঐ বেহুদা বিলবোর্ডের অযথা জঞ্জালে আরো কিছুক্ষন পরে যাবো, এখুনি না!
সে দিন বিকেলে আশুলিয়ার পাশ দিয়ে কোন এক মেঠো পথ ঘেসে কয় ঘন্টা লাগিয়ে সাভার নবীনগর হয়ে আমি বাড়ী ফিরি। তখন কি আর জানতাম আমরা যখন আশুলিয়ার পথ দিয়ে বাড়ী ফিরছিলাম ঠিক সেই মুহূর্তেই এয়ারপোর্টের সামনের গোল চত্তরটিতে সে দিনের সেই নাগরিক অন্ধকারে চলছিল মূর্তি ভাঙ্গার এক মহতি উৎসব!
(ছলিবেক)
মূর্তি লইয়া আমার প্রামান্য কথন ১: অপরাজেয় বাংলা
মূর্তি লইয়া আমার প্রামান্য কথন ২: অপরাজেয় বাংলা
মূর্তি লইয়া আমার প্রামান্য কথন ৩: অপরাজেয় বাংলা
মূর্তি লইয়া আমার প্রামান্য কথন ৪: অপরাজেয় বাংলা
মূর্তি লইয়া আমার প্রামান্য কথন ৫: অপরাজেয় বাংলা
মূর্তি লইয়া আমার প্রামান্য কথন ৬: অপরাজেয় বাংলা
মূর্তি লইয়া আমার প্রামান্য কথন ৭ : অপরাজেয় বাংলা
মূর্তি লইয়া আমার প্রামান্য কথন ৮ : অপরাজেয় বাংলা
মূর্তি লইয়া আমার প্রামান্য কথন ৯ : অপরাজেয় বাংলা
ওয়েব ঠিকানা, অপরাজেয় বাংলা
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই মার্চ, ২০১৬ রাত ১২:০৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


