somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মূর্তি লইয়া আমার প্রামান্য কথন ১০: অপরাজেয় বাংলা

২৯ শে এপ্রিল, ২০০৯ ভোর ৫:১৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


দশ.

ক সময় মনে হয়ে ছিল যে মানুষ কে খুজে পাওয়াটা এক প্রকার অসম্ভব সেই বদরুল আলম বেনু'র সাথে আজ কথা হবে দেখা হবে ভাবতেই কেমন যেনো লাগছিল! গাড়ীতে আমি শান্ত আর গাড়ীর চালক মামুন। ঢাকায় নামার পর এয়ারপোর্ট থেকেই মামুন আমার সঙ্গী। আমার এই প্রজেক্টে সে ও জড়িয়ে গেছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম-দিনাজপুর কোন যায়গা বাদ নাই চষে ফেলেছে সব আমার সাথে। প্রোডাকশন টীমে থাকতে থাকতে মামুন ও জেনেগেছে ভাষ্কর আর ভাষ্কর্য্যর আগা মাথা! আসা যাওয়ার পথের মাঝে সে ও আলাপ জুড়ে দেয়, ঢাকার কোন শিল্প কর্মটা দেখার মত হয়েছে আর কোনটা দেখলে মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। আমি কোন আর্টিষ্ট নই তবুও মাঝে মাঝে ওর কথা মনযোগ দিয়ে শুনি। এক জন ছা'পোষা খেটে খাওয়া মানুষের শিল্প বোধ/ ভাবনা আমাকে উদ্বেলিত করে!

গাড়ী এয়ার্পোটের গোল চক্কর যখন পেরুচ্ছে তখন দেখলাম গোল চক্করটা চতুর দিক দিয়ে ঢাকা। এরই মাঝে দরজা মত ফাঁক দিয়ে আমরা দেখলাম ওখানে যেনো কিছু একটা সৌন্দর্য্য বর্ধক কোন স্থাপনা তৈরী হচ্ছে। আমি যেনো কোন কথায় ছিলাম চক্করটা ক্রস করতে করতে আপনাতেই জিজ্ঞেস করলাম এই খানে এইটা আবার কি হচ্ছে? সঙ্গে সঙ্গে মামুন ফশ্ করে বলে বসল, আন্কেল এইডা মনে হয় কোন আটিষ্টের কাম না মিস্তিরির কাম। কন্টেক্টর দিয়া করাইতাছে। আমি বলি, তুমি বুঝলা কেমনে মামুন? ও বলে, দেইকখা কইলাম আন্কেল। দেইখা পছন্দ অয় নাই তাই কইলাম। আমি আর ওর পন্ডিতির কোন জবাব দি না। গাড়ী ছুটে চলছে উত্তরার দিকে, দুপুর গড়িয়ে পড়ছে। ডে লাইটে শুট করবো ভেবে রেখেছি। শীতের বিকেলে কতটুকু আলো পাব আমার মাথায় সে চিন্তাও ঘুরছে তখন।

আমরা এক সময় উত্তরায় আশিক ইমরানের ফ্লাটে পৌছুলাম। আমাদের বসিয়ে রেখে আশিক ভেতরে গেলেন। আমি আর শান্ত ক্যামেরা সরঞ্জাম ঠিক ঠাক করে নিচ্ছি। আশিক তার মা কে নিয়ে ঢুকলেন। আমরা পরিচিত হলাম। তিনি আমাদের কুশল/ পরিচয় ইত্যাদি জানছিলেন। আশিক চলে গেলেন আবার ভেতরে। একটু পর ফিরলেন তার বাবা বদরুল আলম বেনু'র পিছু পিছু। আমরা উঠে দাড়ালাম। আশিক বেশ ভঙ্গি নিয়ে বললেন, এই হচ্ছেন আপনাদের আক্ংক্ষিত বদরুল আলম বেনু। আমার বাবা। 'আমার বাবা' এই শব্দ দু'টো উচ্চারনের সময় আশিকের মুখের অভিব্যাক্তি ছিল দেখবার মত। সত্যিই ত এমন পিতার সন্তান হওয়া ত যে কোন সন্তানের জন্য পরম সৌভাগ্যর মতন।

বেনু সাহেবের মুখে যেন হাসি লেগেই থাকে। খুব আন্তরিকতায় আমার কথা গুলো মন দিয়ে শুনলেন। কথা শেষে একটা নাতিদীর্ঘ শ্বাস ফেলে কিছুক্ষন চুপ করে বসে রইলেন। এত দিনে আমি জেনে গেছি অপরাজেয় বাংলা নিয়ে এই শিল্পীর রয়েছে আজীবনের এক অভিমান, মনোকষ্ট। আমি শঙ্কায় থাকলেও নির্দিধা ছিলাম। আমার বিশ্বাস ছিল এ কাজে আমাকে কেউ ফেরাবেন না। আমি পারবো।

বেনু সাহেব শুকনো গলায় বললেন, আজ এত দিন পর কি আর বলব! এ সব বলে কি বা আর হবে! আমি উত্তরে বললাম, আপনার যা বলার যা বলতে ইচ্ছে হয় তাই বলুন। আমরা আপনার কথা শুনতে এসেছি। বুঝলাম উনি বলতে চাইছেন কিন্তু কষ্টে হয়ত সব কিছু দলা পাকিয়ে দিচ্ছে। আমি চুপচাপ ক্যামেরা খুললাম। বেনু সাহেবের স্ত্রী ওনার পাশে বসে বললেন, বল না বল। অপরাজেয় বাংলা নিয়ে তোমার সব কথা বল। আজ এত দিন পর ওরা এসেছে তোমার খোজ নিয়ে। তুমি ওদের বল। বেনু সাহেব শিশুর মতন বললেন বলে কি হবে! সেবার এক সাংবাদিক এসে কত কি শুনল, আমার কত গুলো অমূল্য ছবি নিয়ে গেল। কই কোথাওত আমার কথা বলল না! অপরাজেয় বাংলার সেই মূল্যবান ছবি গুলোও আমায় আর ফেরত দিল না।

ঘরের ভেতর আলো কমে যাচ্ছিল, আমরা সবাই মিলে ছাদে চলে এলাম। ক্যামেরা চলছে বেনু সাহেব তার কথা শুরু করলেন এভাবে, আমি দিনাজপুর থেকে উন্নিশ আটষট্টি সালে ঢাকায় এসে আর্ট কলেজে ভর্তি হই... তার পর একে একে মুক্তিযুদ্ধ, আমাদের স্বাধীনতা, অপরাজেয় বাংলা নির্মান পটভূমী ও নির্মান ইতিহাস। পাচাত্তরে পনরই আগষ্টের কলঙ্ক জনক হত্যাকান্ডের পর কেমন করে ট্যাংন্ক তাক করে রাখা হয়েছিল অপরাজেয় বাংলার দিকে শুনে হতবিহব্বল হয়ে গিয়ে ছিলাম সেদিন! কত কথা কত অজানা, আমি শট ঠিক করব ছবি ভাল করে তুলব না কি অবাক হয়ে শুনব কুলকিনারা পাচ্ছিলাম না কোন। আকাশের আলো হারিয়ে যাচ্ছিল দ্রুত, ততক্ষনে শিল্পী একটু একটু সহজ হয়ে উঠেছেন। তার ক্ষোভ অভিমান ভুলে স্মৃতি হাতরাতে শুরু করেছেন। আমি বুঝলাম এই এক দিনে হবে না। সাহস করে বললাম চলেন সামনের এক দিন আমরা অপরাজেয় বাংলার সামনে যাই। সেখানে না হয় আপনার বাকী কথা গুলো শুনব। উনি সাথে সাথেই সম্মতি দিলেন। আমরা আবার নিচে নেমে এলাম।

বসবার ঘরে দীর্ঘ্য তিরিশ বছর পর শিল্পী বদরুল আলম বেনু খুলেলেন লাল ফিতায় বাধা একটি অতি সাধারন কোর্ট ফাইল। যার ভেতর যতনে গচ্ছিত আছে ইতিহাসের অমূল্য সম্পদ। আমার ক্যামেরা চলতে থাকে, আমার আর বলার কোন ভাষা থাকে না। আমি শুধু চেয়ে থাকি। ভিউ ফাইন্ডারটা মাঝে মাঝে ঝাপসা লাগে, জানি না ক্যামেরার লেন্সটা ঘোলা হয়ে যাচ্ছে নাকি আমার চোখে সমস্যা দিচ্ছে!

ফেরার পথে মামুন কে বললাম মামুন আমারে একটু গ্রামের পথ দিয়ে নিয়া চল। আমার ভীষন নদী জল এই সব দেখতে ইচ্ছে হচ্ছে এই সাঁঝের বেলায়। ফিরতে হবে জানি তবু এত তারাতারি নগরের জঞ্জালে ফিরতে মন চাইছে না। মরার ঐ শহরে আমি আমার বাংলাদেশ খুজে পাই না আর। আজ আমার বাংলাদেশের কাছে একটু থাকতে ইচ্ছে করছে। ঐ বেহুদা বিলবোর্ডের অযথা জঞ্জালে আরো কিছুক্ষন পরে যাবো, এখুনি না!

সে দিন বিকেলে আশুলিয়ার পাশ দিয়ে কোন এক মেঠো পথ ঘেসে কয় ঘন্টা লাগিয়ে সাভার নবীনগর হয়ে আমি বাড়ী ফিরি। তখন কি আর জানতাম আমরা যখন আশুলিয়ার পথ দিয়ে বাড়ী ফিরছিলাম ঠিক সেই মুহূর্তেই এয়ারপোর্টের সামনের গোল চত্তরটিতে সে দিনের সেই নাগরিক অন্ধকারে চলছিল মূর্তি ভাঙ্গার এক মহতি উৎসব!

(ছলিবেক)


মূর্তি লইয়া আমার প্রামান্য কথন ১: অপরাজেয় বাংলা
মূর্তি লইয়া আমার প্রামান্য কথন ২: অপরাজেয় বাংলা
মূর্তি লইয়া আমার প্রামান্য কথন ৩: অপরাজেয় বাংলা
মূর্তি লইয়া আমার প্রামান্য কথন ৪: অপরাজেয় বাংলা
মূর্তি লইয়া আমার প্রামান্য কথন ৫: অপরাজেয় বাংলা
মূর্তি লইয়া আমার প্রামান্য কথন ৬: অপরাজেয় বাংলা
মূর্তি লইয়া আমার প্রামান্য কথন ৭ : অপরাজেয় বাংলা
মূর্তি লইয়া আমার প্রামান্য কথন ৮ : অপরাজেয় বাংলা
মূর্তি লইয়া আমার প্রামান্য কথন ৯ : অপরাজেয় বাংলা
ওয়েব ঠিকানা, অপরাজেয় বাংলা
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই মার্চ, ২০১৬ রাত ১২:০৮
৯টি মন্তব্য ১০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×