২৯ নভেম্বর ২০০৮ রাত ১১টায় সাম হয়ার ইন ব্লগ ডট নেট এর ব্লগার ফয়সল নোই ব্রেকিং নিউজ দিয়ে ব্লগ লিখল, "লালন ভাস্কর্যের পর মোল্লারা এবার বিমান অফিসের সামনের বলাকাগুলো ভেঙ্গে দিল!!! আরো ভাঙ্গল মতিঝিলের নতুন একটি ভাস্কর্য!!!" সাথে সাথে এদিক সেকি করে খবর নিলাম, ইচ্ছে করছিল তক্খুনি বেরিয়ে পড়ি। এই নিরাপত্তাহীন শহরে ক্যামেরা হাতে রাতে বের হবার মত আমার কোন সাপোর্ট নাই, নিজেকে বড় নিঃসঙ্গ বড় অসহায় লাগতে লাগল। বার বার মনে হচ্ছিল কোথাও বুঝি কেউ নেই! ছটফট করতে থাকলাম ভীষন ভাবে। বাইরে যাবো কোথায় যাবো কার কাছে যাবো কিচ্ছু ত বুজচ্ছি না! অসহায় হয়ে ব্লগে পড়ে রইলাম, কীবোর্ড টিপে অন্ধকারে রোদন করে লিখলাম বক ধার্মীকরা বক ভাংছে!।
ডিসেম্বর ২০০৮ বাংলাদেশের জন্য অনিশ্চয়তা ঘেরা একটি সময়! ইলেকশন কি আদো হবে, নাকি আর্মি নেমে পড়বে সরাসরি কত কিছু যে মনে হতে থাকল? সারা রাত অনিদ্রায় কাটিয়ে সকাল বেলায় ক্যামেরাটা নিয়ে চারু কলার পথে বের হলাম।
২০০৫ সালে ঢাকায় এসে ঢাকার দেয়ালে দেয়ালে অদ্ভুত কিছু দেয়াল লিখন দেখে ছিলাম। টিভি দেখা হারাম, ছবি তোলা হারাম, এটা হারাম ওটা হারাম এই জাতিয় স্লোগান। ঢাকার বেশ অনেক যায়গাতেই চোখে পড়ায় আত্নিয় স্বজন দু এক জন পরিচিতদের জিজ্ঞেস করি, এ সব কি হচ্ছে কে লিখছে এসব কেন লিখছে? দেখলাম এই সব লেখায় কারো কোন বিগার নেই অস্বস্তি নেই! বিদেশ থেকে এসে আমি এসব জিনিস নোটিস করছি দেখে সবাই এমন একটা ভাব করত যেনো আমি তিন মাসের বৈরাগী ভাতেকে বলছি অন্ন! তখন বিএনপি'র আমল বাংলাদেশ ক'দিন পরপরই দুর্নীতি চ্যাম্পিয়ন হচ্ছে। বিদেশে দেশের ভাবমূর্তি নিয়ে চলছে টেনশন। ইটালিয়ান ক্যামেরা ক্রু, বাংলাদেশী মহিলা দোভাষী, সাংবাদিক সালিম সামাদ এদের গ্রেফতার নিগ্রহের খবর ততদিনে কে না জানে?
তখন কানাডিয় ফিল্ম মেকার জেনেট বেস্ট ও ঢাকায়। আমি জেনেটের সাথে কাজ করছি বাংলাদেশের বাউল নিয়ে ও'র এক প্রজেক্টে। বাসা থেকে বের হলে আত্মীয় স্বজন চিন্তায় থাকে। সকলেই চায় আমি যেন ভালয় ভালয় দেশ থেকে বিদায় হই। কি নির্মম কথা! নিজের দেশে নিজেরই ঠাঁই নাই?
সারা দেশে তখন কেমন যেন একটা থমথমে জোর যার মুল্লুক তার পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। ২১শে আগষ্টের গ্রেনেড হামলা, আহসানউল্লাহ মাষ্টাকে হত্যা, কিবরিয়া সাহেব কে মেরে ফেলা হল, মাজারে মাজারে বোমাবাজী, কাদিয়ানীদের বিরুদ্ধে হুঙ্কার রয়েছে হুমায়ুন আজাদ কাহিনী! ভয়াবহ এক পরিস্থিতি! এর মাঝে যদি রাস্তায় বের হয়ে এক জন হোয়াইট মহিলাকে নিয়ে আল বাইয়্যিনাতের দেয়াল লিখনের ফিল্ম তুলি কে জানে কখন কোথায় দেশদ্রোহীতার অভিযোগে কে উঠিয়ে নিয়ে যায়!
আমি ত ফ্রিল্যন্সার আমার পেছনে ত কেউ নাই! ভয়ে ভয়ে শহর ঘুরে সেই সব দেয়াল লিখনের বেশ কিছু ছবি তুলেছিলাম তখন। ধানমন্ডি স্কুলের পাশে, রেসিডেন্টশিয়াল কলেজের ঐখানে মগবাজারের ঐ দিকে মতিঝিলে শহরের বিভিন্ন যায়গায় দেয়ালে দেয়ালে অদ্ভুত সব ঘোষণা দিয়ে লিখা সব দেয়াল লিখন! আশ্চর্য্য, এরই মাঝে গাড়ী চলছে ঘোড়া চলছে আবাল চলছে, বৃদ্ধ চলছে বনিতা চলছে বনিক চলছে, প্রেমিক চলছে প্রেমিকা চলছে কারো কোন ভ্রুক্ষেপ নেই!
কাওরান বাজারের মাছের আড়ত ঘেঁষে দাড়িয়ে গেছে অনেক ক'টি ডিজিটাল টেলিভিশন স্টেশন। যাদের অনুষ্ঠান দেশের সীমানা পেরিয়ে পাড়ি দিয়েছে ইয়োরোপ, অষ্ট্রেলিয়া আর নর্থ আমেরিকায়। দেশ ত দেশ বিদেশ ও আমার এই ভাবনায় টিভি অলারা স্লোগান দেন হৃদয়ে বাংলাদেশ, প্রবাসেও বাংলাদেশ। অথচ ঐ টিভি স্টেশনের কয় গজ দূরেই কোন এক দেয়ালে লেখা আছে হয়ত টিভি দেখা হারাম! ছবি তোলা হারাম! কথা বলা হারাম! না জানি এম কত কি? এই না হলে বাক স্বাধীনতা, এই না হলে গণতন্ত্র।
বাংলাদেশ জিন্দাবাদ! বাংলাদেশ জিন্দাবাদ! বাংলাদেশ জিন্দাবাদ!
সে বার দেশের সব কিছু দেখে শুনে ভীষন মর্মাহত আর আশাহত হয়ে ফিরে গিয়ে ছিলাম। আশেপাশের মানুষদের যখনি বলেছি এসব কি, ওরা শুধু বলেছে ক'দিনের জন্য ঘুরতে আইছ ঘুইরা ঘাইরা ফুইটা যাও। এই দেশের কিছু নিয়া তোমার না ভাবলেও চলবে। এখানে যেমন চলছে তেমনি চলবে। সেই আল বাইনিয়্যাত গোকুলে যে বেড়েছে তার প্রমান ২৯ নভেম্বর ২০০৮ সে রাতে আক্রমন হয় মতিঝিল বিমান অফিসের সামনে শিল্পী মৃনাল হকের ভাস্কর্য বলাকা।
পর দিন চারুকলার পোলাপান শাহাবাগে তাদের দেয়াল ঘেরা চত্তরের ভেতর শীতের সকালে ভীষন উত্তেজিত হল। তারা চিল্লা ফাল্লা করে বেরিয়ে এল রাস্তায়। রাগে দুঃখে অপমানে কাঁপছিল ওরা, গর্জে উঠছিল বারে বারে। কারো কারো মুখে হতাশা কি হচ্ছে কি হবে? লালন ভেঙ্গেছে, বলাকা ভেঙ্গেছে এর পর কি অপরাজেয় বাংলা!
সারাটা দুপুর টি এস সি'র রাজু ভাষ্কর্য্যকে ঘিরে পথের মাঝে বসে থাকল ওরা, বিকেলে ছবির হাট থেকে বের হলো যথারিতী একটা মিছিল। রোজকার মিছিলের চে ঐ দিনের মিছিলে মানুষ কিছু বেশী হলো। ওরা ধন ধান্য পুষ্প ভরা আমাদেরই বসুন্ধরা গেয়ে গেয়ে টি এস সি হয়ে অপরাজেয় বাংলা হয়ে যথারীতি ফিরে আবার চারু কলায় ফিরে এলে মিছিল শেষ হয়ে যায়।
চারুকলার উল্টা দিকে ছবির হাট, ইমনের বাবার বানানো রং চা তে চুমুক দিতে শিল্পীরা জড়ো হন এক সাথে: কি হবে এখন?
আমিও থাকি সেখানে নিরব দর্শক। পাশকরা শিল্পীদের সাথে নবীন ছাত্রদের বচসা হয়। ওরা ক্ষুব্ধ হতে চায়, বড়রা তাদের শান্ত হতে বলেন।
বট গাছে তখন ফিরতে শুরু করেছে দিনের সকল পাখী।
শহরের অন্ধকার আকাশের দিকে তাকালে কোন তারা দেখা যায় না।
ফুশ করে জ্বলে সহসাই নেভে দেশলাইয়ের কিছু আগুন।
সব কিছু ওভারল্যাপ করে পাখিদের কিচিরমিচিরই বড় হয়ে উঠতে লাগল।
হায়, পাখিদের মত যদি হতে পারতাম!
ওরা পারে ডানা মেলে উড়তে।
আমরা পারি না।
(ছলিবেক)
মূর্তি লইয়া আমার প্রামান্য কথন: অপরাজেয় বাংলা (১ থেকে ১৩ এবং + )
ওয়েব ঠিকানা, অপরাজেয় বাংলা

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

